Published : 14 Sep 2025, 04:24 PM
যার কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের গান বাঙালি মধ্যবিত্তের হৃদয় ছুঁয়েছে, ছড়িয়ে গেছে বিশ্বমঞ্চে, সেই ফরিদা পারভীনের কণ্ঠ থেমে গেছে চিরতরে।
এই শিল্পীর প্রয়াণে প্রিন্স মাহমুদ থেকে রুনা লায়লা, বাপ্পা মজুমদার থেকে আবিদা সুলতানা, মনির খান, কবি আলম আরা জুঁই থেকে অভিনেত্রী চিত্রলেখা গুহ– অনেক তারকাই ভেসেছেন স্মৃতির আবেগে।
কেউ লিখেছেন কান্নার কথা, কেউ গেয়ে উঠেছেন তারই গান, কেউ আবার স্মরণ করেছেন তার রেখে যাওয়া স্মৃতির কথা।
নজরুল, আধুনিক ও দেশের গান গাইলেও লালন ফকিরের গানেই নিজেকে পুরোপুরি বিলিয়ে দিয়েছিলেন ফরিদা পারভীন। শনিবার রাতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিংবদন্তি এই শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে।
‘আমি অপার হয়ে বসে আছি, ওহে দয়াময়, পড়ে লয়ে যাও আমায়’– লালন সাঁইয়ের গানের এই কথার মতই চলে গেলেন ফরিদা পারভীন।

লালনের গান ছাড়াও ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’, ‘তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম', 'নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে’সহ আরো কিছু গানে ফরিদা পারভীন নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য উচ্চতায়।
তার মৃত্যুতে শোকগ্রস্থ গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক প্রিন্স মাহমুদ ফেইসবুকে লিখেছেন, “কী লেখা উচিত বুঝতে পারছি না। ফরিদা পারভীন আপা দেখা হলেই বলতেন, তোমার ‘মা ও বাবা’ গানটি শুনলেই কান্না আসে।”
শুধু শিল্পীই নন, প্রিন্স মাহমুদের নিজের কাছেও ফরিদা পারভীনের গান মানে ছিল অশ্রুর আবেগ।
“আপা, আপনাকে জানানোই হল না সাত থেকে আট বছরের একটা ছেলে ‘তোমরা ভুলেই গেছো মল্লিকাদির নাম’ গানটি শুনলেই কেঁদে ফেলত।”
শৈশব-কৈশোরজুড়ে ফরিদা পারভীনের গান যেন ঘিরেই রেখেছিল প্রিন্স মাহমুদকে। তিনি লিখেছেন, ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি গেয়ে গেছেন ফরিদা পারভীনের দুটি গান ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’ এবং ‘মিলন হবে কত দিনে’। আশপাশের অনেকেই তখন স্নেহভরে তাকে ডাকতেন ‘মিলন হবে কত দিনে’ বলে।
প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী রুনা লায়লা লিখেছেন, "লালনগীতির প্রখ্যাত সাধিকা ফরিদা পারভীনের প্রয়াণ আমাদের এবং সংগীতজগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা।"
ফেরদৌস ওয়াহিদের কথায়, "যতদিন বাংলাদেশের মানুষ গান শুনবে, ততদিন ফরিদা পারভীন মানুষের মাঝে হীরার টুকরোর মত জ্বলজ্বল করবে।"
সংগীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদার লিখেছেন, “শান্তিতে থাকুন ফরিদা পারভীন আপা।”

কবি ও আবৃত্তিকার আলম আরা জুঁই ও ফরিদা পারভীন ছিলেন কলেজের বান্ধবী। বেলী ফুলের মালায় সাজা দুই বান্ধবীর একটি ছবি পোস্ট করে জুঁই লিখেছেন, "খাঁচা ভেঙে অচিন পাখি হয়ে উড়েই গেলি। মৃত্যু তোকে ছুঁয়ে গেলেও তুই বেঁচে থাকবি বাংলার হৃদয় জুড়ে। কতশত স্মৃতি ভারে মথিত আমার এ হৃদয়।"
সংগীতশিল্পী আবিদা সুলতানা লিখেছেন, "শান্তিতে ঘুমাও ফরিদা আপা। তোমার অভাব পূরণ হবে না।"

লালনসংগীতের সাধকী ফরিদা পারভীনের একটি গান গেয়ে মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী চিত্রলেখা গুহ। তিনি গেয়েছেন ‘আমি অপার হয়ে বসে আছি।’
চিত্রলেখা লিখেছেন, “পরপারে পাড়ি দিলেন প্রিয় শিল্পী, আমাদের শিকড়ের সুর ও কথার সাধিকা ফরিদা পারভীন। যার কণ্ঠে লালনগীতি শুনে আপ্লুত হয়ে যেতাম, আজ তার প্রয়াণে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা জানালাম তারই প্রিয় সাঁইজির গানে। এটা আমার আবেগের বহিঃপ্রকাশ।”
নির্মাতা ফাখরুল আরেফিন খান লিখেছেন, "প্রায় অর্ধশত বছরের নিস্তব্ধতা শেষে এক নারীর কণ্ঠে লালন সাঁইজি কোটি মানুষের হৃদয়ে আবার প্রবেশ করেন। সেই মহীয়সী ফরিদা পারভীন। জয় গুরু।"
সংগীতশিল্পী দিলশাদ নাহার কণা লিখেছেন, "বাংলা লোকসংগীতের আকাশ আজ আরও নিঃসঙ্গ। লালনগীতি সম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীনের প্রয়াণে আমরা হারালাম এক অসাধারণ শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সম্পদকে। তার গানের গভীরতা, মাটির গন্ধমাখা কণ্ঠ ও মানবিকতার বাণী আমাদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে। ফারিদা পারভীনের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। শান্তিতে থাকুন কিংবদন্তি শিল্পী।"
কোনাল লিখেছেন, "এই বৃষ্টির কান্নার মতন, আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, যেখানেই থাকেন সেখানেই, শ্রদ্ধেয় ফরিদা পারভীন ম্যাডাম।"

ফরিদা পারভীনের সঙ্গে হাস্যজ্বল একটি ছবি পোস্ট করে সংগীতশিল্পী মনির খান লিখেছেন, "খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়, আজ খাঁচা থেকে চিরতরে চলে গেলেন লোকসংগীতের বরেণ্যশিল্পী আমাদের ফরিদা পারভীন আপা। আপা আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আর এই স্নেহ ভরা হাসিমুখটি দেখা হবে না।"