Published : 22 Mar 2026, 10:49 AM
একসময় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস কাঁপত হেভি গিটারের রিফে। তরুণদের ভিড়ে জমে উঠত কনসার্ট। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাব ও ভেন্যুতে মেটাল বা হেভি মেটাল ব্যান্ডের ঝংকার তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করত।
আশির দশকে কয়েকজন তরুণের পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টা থেকে শুরু হওয়া এই ধারাই নব্বইয়ের দশকে পায় শক্ত ভিত্তি, তৈরি হয় বাংলাদেশের এক স্বতন্ত্র ‘মেটাল মিউজিক সিন’।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ঝংকার যেন অনেকটাই স্তিমিত।
সদস্যদের বিদেশে চলে যাওয়া, ভিন্ন পেশায় যুক্ত হওয়া, নতুন গান ও সরাসরি কনসার্ট কমে যাওয়া এবং বদলে যাওয়া শ্রোতার রুচির কারণে মেটাল সংগীতের পরিসরে এসেছে বড় পরিবর্তন।
তবে শিল্পীরা বলছেন, লাইভ পারফরম্যান্স ও নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে এই সংগীত টিকে থাকবে নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে।

মেটাল ব্যান্ড কী, বাংলাদেশে উত্থান
মেটাল বা হেভি মেটাল হলো রক সংগীতের একটি শক্তিশালী ধারা, যেখানে ভারী ও উচ্চস্বরে গান করা হয়। এখানে ডিস্টরশন গিটার, জোরালো ড্রাম, দ্রুত রিদমে গান তোলা হয়।
মেটালের রয়েছে বিভিন্ন ধরন। যেমন- হেভি মেটাল, থ্র্যাশ মেটাল, ডেথ মেটাল, নু মেটাল, ব্ল্যাক মেটাল, প্রগ্রেসিভ মেটাল, মেটালকোর। তবে বাংলাদেশে বেশিরভাগ ব্যান্ডই মূলত হেভি মেটাল বা প্রগ্রেসিভ মেটাল।
বাংলাদেশে হেভি মেটাল ও থ্র্যাশ মেটালের উত্থান আশির দশকের শেষ থেকে নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে। সেসময় বিদেশি ব্যান্ডের প্রভাব, ক্যাসেট সংস্কৃতি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শো সবই ছিল প্রাথমিক ভরসা। তখন থেকে ঢাকার ‘আন্ডারগ্রাউন্ড মিউজিক সিনে’ মেটালের ঢেউ উঠেছিল।

ব্যান্ডশিল্পী এ কে রাহুল বলেন, আশির দশকে প্রভাব ফেলা মেটাল ব্যান্ডগুলো হলো 'ওয়েভস', 'রকস্ট্রাটা', 'ওয়ারফেজ', 'ইন ঢাকা'।
নব্বই দশকে 'ক্রিপটিক ফেইট', 'আর্টসেল', 'অর্থহীন', 'ব্ল্যাক' এই চারটি ব্যান্ড তরুণদের একটু ‘হেভিয়ার মিউজিক’ করতে সাহস জুগিয়েছিল।
তিনি বলেন, “ব্ল্যাক যদিও মেটাল ব্যান্ড না, তবুও আমাদের মত অনেকে মেটাল ব্যান্ড তৈরিতে উৎসাহ পেয়েছি।”
শূন্য দশক পরবর্তী সময়ে প্রভাব ফেলা হেভি মেটাল ব্যান্ড হিসেবে রয়েছে 'স্টেনটোরিয়ান', এছাড়াও চট্টগ্রামের 'রিবর্ন' ব্যান্ড, অনি হাসানের 'ভাইব' ব্যান্ড, 'পয়জন গ্রিন'।
এর পরের সময়ে 'সিভিয়ার ডিমেনশিয়া', 'পাওয়ারসার্জ', 'মেকানিক্স', 'ফিউনারেল অ্যান্থেম', ‘মিরর ব্লেজ', 'ওরাটর', 'ট্রেইনরেক', মিনার্ভা', 'টর্চার গোরগ্রাইন্ডার','এভার্স', 'থ্র্যাশ'সহ আরও কিছু ব্যান্ড ছিল।
‘মেটাল শুধু সংগীত নয়, একটি সংস্কৃতি’
মেটাল ব্যান্ডের সংজ্ঞা কী? 'এ কে রাহুল দ্য ব্যান্ডের' শিল্পী রাহুল বলেন, “মেটাল মূলত একটি সংস্কৃতি। এটি অনেক কিছু প্রতিনিধিত্ব করে। আপনি কীভাবে পোশাক পরছেন, কী ধরনের গান শুনছেন, সংগীতের সঙ্গে কীভাবে নিজেকে যুক্ত করছেন এসবই এর অংশ। এমনকি আপনি আপনার রাগ কীভাবে প্রকাশ করছেন বা ভালোবাসা কীভাবে প্রকাশ করছেন, সেটাও মেটালের মাধ্যমে ফুটে উঠতে পারে।”
তার ভাষায়, মেটাল সংগীত অনেক সময় তীব্র বা আক্রমণাত্মক শোনালেও এর ভেতরের বার্তা নেতিবাচক নয়।

মেটাল সংস্কৃতির সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট জীবনধারাও জড়িয়ে আছে বলে মনে করেন এই শিল্পী। শ্রোতাদের পোশাক, চুলের ধরন বা ব্যান্ডের টি-শার্ট পরা এসবও সেই সংস্কৃতির অংশ।
মেটাল সংগীতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ ধরনের সংযোগ তৈরি করে। এই সংগীতের শ্রোতা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী।
হারানো ব্যান্ডের গল্প
‘ওয়েভস’, ‘রকস্ট্রাটা’, ‘ওয়ারফেজ’, ‘ইন ঢাকা’ থেকে শুরু হওয়া মেটাল ব্যান্ডের মধ্যে দারুণ সাফল্যের সঙ্গে টিকে আছে ‘ওয়ারফেজ’। গেল মাসে দলটি পেয়েছে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’। ব্যান্ডগুলো হারিয়ে গেল কেন তা জানতে কথা হয় ‘রকস্ট্রাটা’ ও ‘ইন ঢাকার’ দুই পথিকৃতের সঙ্গে।
'ওয়েভস'

আশি দশকের শুরুর দিকে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুটে সংগীত বিষয়ে পড়াশোনা করা বাংলাদেশি দুই তরুণ ইফতেখার এবং মাহমুদ মিলে গড়ে তোলেন মেটাল ব্যান্ড 'ওয়েভস'। সেখানকার লোকাল ব্যান্ডগুলোর সাথে জ্যামিং করতে করতে মেটাল শেখা তাদের। বন্ধু মিঠুকে ড্রামার হিসেবে নিয়ে ১৯৮১ সালে তারা এই দল গঠন করেছিল। জার্মানিতে ওয়েভস গঠনের পর বাংলাদেশে এই ব্যান্ডের পথচলা শুরু হয় ১৯৮৩ সালে। তখন তাদের দলে যোগ দিয়েছিলেন মিনু, শফিক ও কামাল।
ওয়েভস ছিল বাংলাদেশের প্রথম মেটাল ব্যান্ড। সেসময় দলটি কাভার করত কিছু ক্ল্যাসিকাল ব্যান্ডের গান। যেমন অস্ট্রেলিয়ার রক ব্যান্ড 'এসি/ ডিসি', লন্ডনের হেভি মেটাল ব্যাণ্ড 'মোটরহেড', আমেরিকান রক ব্যান্ড 'কিস', ইংল্যান্ডের হেভি মেটাল 'ব্ল্যাক সাবাথ', লন্ডনের রক ব্যান্ড 'কুইন', জার্মান রক ব্যান্ড 'স্কর্পিয়ানস', জিপি টপের গান, এরিক ক্ল্যাপটনের 'কোকেইন' গানগুলো পরিবেশন করত।
শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট, বিটিভিসহ বিভিন্ন জায়গায় পারফর্ম করে জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় ‘ওয়েভস’।

১৯৮৪ সালে বিটিভিতে নিজেদের তিনটি গান রেকর্ড করে ওয়েভস। তবে তখনকার সমাজ ব্যবস্থা ও পশ্চিমা সংগীতের প্রভাব ছিল বলে 'অপসংস্কৃতির' আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করা হয় ওয়েভসকে। এরপর বিরতির পর ১৯৯৫ সালে ওয়েভস নতুন করে গঠিত হয় এবং ১৯৯৬ সালে প্রকাশ্যে আসে তাদের অ্যালবাম 'পুরনো স্মৃতি'। অ্যালবামের 'ভোরে', 'মনীষা', 'স্মৃতি', 'প্রেম দাও', 'কোথাও কেউ নেই', গানগুলো শ্রোতাদের কাছে সমাদৃত হয়।
১৯৯৬ সালেই 'ওয়েভস' বিটিভিতে শেষ শো করে। এরপর এই ব্যান্ডের আর কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি।
'রকস্ট্রাটা'
১৯৮৪ সালে কলেজ পড়ুয়া চার তরুণ মইনুল ইসলাম, ইমরান হোসেইন, মাহবুবুর রশীদ ও আরশাদ আমিনের মাধ্যমে গড়ে উঠে মেটাল ব্যান্ড 'রকস্ট্রাটা'।
প্রথমে এই দল শুরু করেন সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের দুই বন্ধু মইনুল ইসলাম ও ইমরান হোসেইন। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন আসিফ ইকবাল, আসিফ আলম ও শাফকাত জান চৌধুরী, তারা একটা দল তৈরি করে গান করতেন স্কুলের অনুষ্ঠানগুলোতে। সেমসয় তারা ব্যান্ডের নাম দেয় 'রকস্ট্রাটা'। এসএসসি পরীক্ষার আগে দল থেকে সরে দাঁড়ান ড্রামার আসিফ ইকবাল।

পরীক্ষার পর ব্যান্ডের সদস্যরা ভর্তি হন নটর ডেম কলেজে। তাদের সঙ্গে দলে যোগ দিলেন আরশাদ আমীন।
কলেজের ক্যান্টিনে মইনুল ও ইমরানের সঙ্গে পরিচয় আরশাদের। ব্যান্ডে যুক্ত হওয়ার গল্প স্মরণ করে গ্লিটজকে আরশাদ বলেন, “ক্যান্টিনে তারা ‘ব্ল্যাক সাবাথ’ নিয়ে কথা বলছিল। আমি ব্ল্যাক সাবাথের গান শুনতাম, তাদের কথা শুনে তাদের সঙ্গে পরিচয় হতে যাই। তখন জানতে পারলাম তাদের ব্যান্ড আছে, নিয়মিত অনুশীলন করে। আমি তাদের কার্যক্রম দেখতে চাইলাম এবং আমি গিটারে যুক্ত হলাম।
“একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল নটর ডেমে, আমরা গান করার আগ্রহ দেখালাম। যখন স্টেজে উঠলাম আমাদের ফাদার এসে বন্ধ করে দিয়ে বলল এসব কী করা হচ্ছে, এটা অপসংস্কৃতি। সেটা থেকে আমাদের একটা জেদ কাজ করল যে আমাদের শো করতে হবে।”
১৯৮৬ সালে দলটি একটি কনসার্ট করে। তখনকার সময়ে ‘ওয়ারফেজ’ ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই কনসার্ট করে রকস্ট্রাটা।
আরশাদ বলেন, "আমরা একা একা একটা পুরো কনসার্ট করতে পারব না, তখন ওয়ারফেজ মিলে আমরা কনসার্টের নাম দেই 'রকস্ট্রাটা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস'। সেটা ছিল আমাদের প্রথম কনসার্ট। আমাদের কোনো যন্ত্রপাতি নেই, ভালো সাউন্ড সাপোর্ট নেই কিন্তু তবুও অনেক ভিড় হলো, অনেক শ্রোতা হলো। তখন বুঝলাম মেটালেরও বড় শ্রোতা আছে।"
'রকস্ট্রাটা' ব্যান্ডের পরিচিতি বাড়তে থাকে। ভক্তরা তখন ব্যান্ডের গান শুনে নাম দিয়েছিল 'রকফাটা ব্যান্ড'।
আরশাদ বলেন, "ছিয়াশি সালের পর থেকেই আমরা সিরিয়াসলি প্র্যাকটিস শুরু করলাম, তখন বামবায় (বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশন) আটটা ব্যান্ড ছিল। মাকসুদ ভাইয়ের (মাকসুদুল হক) মাধ্যমে বামবাতে যুক্ত হই। বামবার সঙ্গে বিভিন্ন কনসার্টে পারফর্ম করার জন্য ডাক দিলেন। তখন মাকসুদ ভাই বললেন, 'তোমরা 'রকস্ট্রাটা', 'ওয়ারফেজ' দুইটা ব্যান্ড এক ঘণ্টা করে পারফর্ম করো’।
“আমরা তখন বললাম আমাদের সঙ্গে আরও দুই ব্যান্ড আছে। তখন মাকসুদ ভাই বললেন, এত সময় দেওয়া যাবে না। আমরা মেটাল ব্যান্ড তখন এতটাই একতাবদ্ধ। আমরা বললাম, আমাদের সময় কমিয়ে দেন, তবুও আমরা একসঙ্গে পারফর্ম করব।”
একটি কনসার্টের জন্য দলটি প্রথম নিজেদের বাংলা গান করে। তা জানিয়ে আরশাদ বলেন, "নব্বইয়ের দিকে অনেক বড় একটা কনসার্ট হলো, সেখানে আমাদের পারফর্ম করার জন্য মাকসুদ ভাই ডেকে বললেন, তোমরা পারফর্ম করতে পারবে কিন্তু নিজেদের বাংলা গান করতে হবে। আমরা তখন লিখে ফেললাম, 'সামান্য দু:স্বপ্ন'। গানটি থেকে অসাধারণ সাড়া পেলাম।"
১৯৯২ সালে প্রকাশ হয়েছিল তাদের প্রথম অ্যালবাম 'রকস্ট্রাটা'।

২২ বছর পর ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসেছিল ব্যান্ডটির দ্বিতীয় অ্যালবাম 'নতুন স্বাদের খোঁজে'। সেই বছরই সেই নতুন অ্যালবামের গান নিয়েই আয়োজন করা হয়েছিল কনসার্ট ‘রকস্ট্রাটা: ওয়ান লাস্ট লাইভ’।
২০১৫ সালের পর আর কোনো কার্যক্রমে দেখা মেলিনি 'রকস্ট্রাটা' ব্যান্ডের।
আরশাদ জানিয়েছেন, আরেকটি অ্যালবাম নিয়ে ফেরার ইচ্ছে আছে এই ব্যান্ডের, সেই প্রস্তুতি চলছে দীর্ঘদিন ধরে।
'ইন ঢাকা'
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে গড়ে ওঠা একটি ব্যান্ড 'ইন ঢাকা'। ব্যান্ডটির সদস্যরা ছিলেন জয় ইসলাম (গিটার), মাশুক রহমান (গিটার), শাহেদ আহমেদ (ভোকাল) ডাক নাম ‘গোর্কী’ , তুষার আহমেদ (বেস গিটার ও ভোকাল) এবং চৌধুরী সাইদুজ্জামান, (ড্রাম), তিনি ‘রোজেন’ নামে পরিচিত ছিলেন।
ব্যান্ডটির ইতিহাস নিয়ে জানতে কথা হয় রোজেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, “ইন ঢাকার গঠনটা মূলত লালমাটিয়া কেন্দ্রিক। আমরা সবাই তখন লালমাটিয়াতেই থাকতাম, গান করতাম। ম্যাট্রিকের পরের সময়, আনুমানিক ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে জয় ও মাশুকের সঙ্গে যখন পরিচয়টা একটু ঘনিষ্ঠ হয়। তখন সিরিয়াসভাবে কোনো ব্যান্ড তৈরি করতে পারি কিনা সেই ভাবনায় ছিলাম।"
সেই ভাবনা থেকেই চৌধুরী সাইদুজ্জামান, মাশুক রহমান ও জয় ইসলাম এই তিনজন মিলে ব্যান্ড গঠনের উদ্যোগ নেন। তখন তাদের বয়স ১৭-১৮ বছর। সময়টা ১৯৮৫ সালের দিকে।

‘রোজেন’ বলেন, "তখন আমরা টুকটাক বাজাতে পারতাম। কিন্তু কীভাবে কী করতে হবে বুঝতে পারছিলাম না। তখন একজন গিটারিস্ট ছিলেন পান্না ভাই। ওনার কাছ থেকে সাহায্য নিলাম। আমাদের সব থেকে বেশি সহযোগিতা করলেন শাহিন ভাই। উনি আমাদের ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দেন কীভাবে একটি ব্যান্ড গড়ে ওঠে। ওটা আমাদের জন্য খুব ভালো শেখার অভিজ্ঞতা ছিল।"
সেই সময় তারা ধীরে ধীরে যন্ত্রপাতি জোগাড় করতে শুরু করেন। জয় ইসলাম কোনোভাবে একটি ভাঙাচোরা অ্যাম্প্লিফায়ার জোগাড় করেছিলেন। কারও ড্রইংরুমে, কখনও রোজেনের বাসায় বিভিন্ন জায়গায় বসেই চলত অনুশীলন।
এরপর ব্যান্ডে যুক্ত হন আরও দুই সদস্য। তুষার আহমেদ লালমাটিয়ার কাছাকাছি এলাকায় থাকতেন, আর শাহেদ আহমেদ ‘গোর্কী’ ছিলেন লালমাটিয়ারই বাসিন্দা। এভাবে চূড়ান্তভাবে ব্যান্ডের গঠন দাঁড়ায় রোজেন ড্রামসে, তুষার বেস গিটারে, জয় ইসলাম ও মাশুক রহমান গিটারে এবং গোর্কী ভোকালে।
সে সময় লালমাটিয়ারই শান্ত নামের এক তরুণ মাঝেমধ্যে তাদের সঙ্গে বাজাতেন। তিনি কিবোর্ড বাজাতে পারতেন। ব্যান্ডের নিজস্ব কিবোর্ড না থাকায় প্রয়োজন হলে তাকে ডেকে নেওয়া হত।
প্রথমদিকে তাদের অনুশীলনের কেন্দ্র ছিল মাশুক রহমানদের বাসা। লালমাটিয়ার সেই বাড়ির ড্রইংরুমেই ছিল একটি ড্রামস সেট, যা দিয়েই শুরু হয় অনুশীলন।
১৯৮৫ সালের সেই সময়টায় ‘ইন ঢাকা’ মূলত ইংরেজি গান পরিবেশন করতেন। গান শোনার মাধ্যম ছিল ক্যাসেট। বিভিন্ন গান সংগ্রহ করতে তারা ক্যাসেটে রেকর্ড করে আনতেন। কখনও ‘রেইনবো’ থেকে রেকর্ড করে এনে সেই গান শুনে শুনে অনুশীলন করতেন এবং সেখান থেকেই গান নির্বাচন করতেন।
ধীরে ধীরে তাদের সংগীতধারা বদলাতে থাকে। প্রথমে রক, এরপর হার্ড রক এবং পরে মেটাল ঘরানার দিকে ঝুঁকে পড়েন তারা।
রোজেন বলেন, "তখন আমাদের সাথে পরিচয় হল রকস্ট্রাটার ইমরানের সঙ্গে, আর ওয়ারফেজের কমল ও টিপুর সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল আমার। তিন ব্যান্ডের ভালো যোগাযোগ তৈরি হল, আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হল, আমরা খুব ভালো প্রতিযোগী হয়ে উঠেছিলাম। প্রতিযোগিতা ছিল, তবে সেটা ছিল স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা।
এরপর দলটি কনসার্ট করা শুরু করে।
"আমরা কনসার্ট করা শুরু করলাম, ততদিনে নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা তৈরি হয়ে গেছে। তখন গিটারিস্ট নিলয়দা (নিলয় দাশ) ছিলেন, উনার সঙ্গে রাতের পর রাত ওই সংসদের টানেলে বসে এটা ওটা বাজাতাম, উনি আমাদের শিখাতেন।"
পরবর্তীতে ইন ঢাকা যুক্ত হয় মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনে (বামবার)।
এর কিছুদিন পর সংগীত প্রতিষ্ঠান সারগাম তাদের প্রস্তাব দেয় ব্যান্ডটির একটি স্বতন্ত্র অ্যালবাম প্রকাশ করবে। সেই প্রস্তাব পাওয়ার পর নতুন উদ্যমে গান তৈরি করতে শুরু করেন তারা।
সেসময় একটা হিড়িক ছিল উচ্চশিক্ষার জন্য সবাই বিদেশে পড়াশোনা করতে চলে যেত।
রোজেন বলেন, “অ্যালবামের কাজ মাঝামাঝি রেখে চলে যান জয়, মাশুক ও তুষার। আমাদের সময়েই ওয়ারফেজ, রকস্ট্রাটা অ্যালবাম বের করেছিল। আমরা করতে পারিনি। তারপর মাশুক দেশে ফিরে, সবার সহযোগিতায় আমরা তখন ১০ টা গান করি।”
গান তৈরি হওয়ার পর আবারও একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে।
রোজেন তখন কলকাতায় ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানে থাকতেই তিনি জানতে পারেন তাদের অ্যালবাম 'নিঃশব্দ কোলাহল' প্রকাশ হয়ে গেছে।
অ্যালবাম প্রকাশের পর তারা শুনতে পান, অ্যালবামের অধিকাংশ গানই নষ্ট হয়ে গেছে।
"এই অ্যালবামের আগে একটা মিক্সড অ্যালবাম বের হয়েছিল, সেখানে 'এই রাতে' গানটা জনপ্রিয় ছিল। ওই একটা গানই পরিষ্কারভাবে গিয়েছিল। বাকি সব গানই নষ্ট হয়ে গেছে, কারণ ফাইনাল ড্রাফট দিয়ে অ্যালবাম বের হয়নি। তাদের অ্যালবাম বের করতে হবে তাই করে দিয়েছে। ১৯৯১ সালে অ্যালবাম 'নিঃশব্দ কোলাহল' বের হয়। দশ গান ছিল সেই অ্যালবামে।"
তবে এই ঘটনার পর ব্যান্ডের সদস্যরা বড় একটি ধাক্কা খান। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার মত অনুভূতি হয় তাদের।
রোজেন বলেন, “আমরা সবাই খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। এরপর অনেকেই বিদেশে চলে গেলাম। ইন ঢাকার কার্যক্রম মোটামুটি বন্ধ হয়ে যায়। এক ধরনের অভিমান নিয়েই বিদায় নেওয়া।”

'ইন ঢাকা' ব্যান্ড পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা আছে কিনা প্রশ্নে এই শিল্পী বলেন, "আছে, আমাদের নয়টি গান তৈরির ইচ্ছে আছে, তিন থেকে চারটি গান প্রস্তুত, এই বছর বা সামনে বছর আমরা অ্যালবামটা শেষ করে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে আমরা ফিরব।"
মেটালের বর্তমান অবস্থা
সংগীতজীবনের চল্লিশ বছর পার করে ফেলেছে ওয়ারফেজ।
নব্বই দশকের তুলনায় এখন মেটাল ব্যান্ডের অবস্থা কেমন? দলটির প্রধান শেখ মনিরুল আলম টিপু বলেন, "মেটাল ব্যান্ডের উপস্থিতি আগের তুলনায় কম, বিভিন্ন সময়ে অনেক ব্যান্ড তৈরি হয়েছে, আবার অনেক ব্যান্ড হারিয়ে গেছে। এটা ব্যান্ড সংগীতের স্বাভাবিক চক্রের অংশ। কারণ বাংলাদেশে সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো স্থিতিশীলতা কম। তাই অনেকেই শেষ পর্যন্ত অন্য পথে চলে যায়।"
অনেকের বিদেশে চলে যাওয়া, অন্য ক্যারিয়ারে যুক্ত হওয়ায় আগের ব্যান্ডগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।

মাঝখানের শূন্যতা ছিল কিনা, সেই প্রশ্নে টিপু বলেন, “শূন্যতা ছিল না, নতুন নতুন ব্যান্ড এসেছে, গান করেছে। আবার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।”
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খুব হতাশ নন এই শিল্পী। তার ভাষায়, এখন যারা ভালো গান করছে এবং শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে, তারা ভালোই করছে।
“এখন সোশাল মিডিয়ার কারণে গান দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। নতুন ব্যান্ড তৈরি হচ্ছে, তারা ভালো গান করতে পারলে শ্রোতারাই তাদের টিকিয়ে রাখবে। তাদেরকে গ্লোবালি চিন্তা করে এগোতে হবে।”

ক্রিপটিক ফেইটের প্রধান ভোকালিস্ট, বেজিস্ট এবং অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শাকিব চৌধুরী বলেন, “সত্তর, আশি বা নব্বইয়ের দশকে বিশ্বজুড়ে মেটাল সংগীতের যে জনপ্রিয়তা ছিল, এখন তা আগের মত নেই। তবে বাংলাদেশে এই ধারাটা এখনো মোটামুটি ভালোভাবেই টিকে আছে। ওয়ারফেজ একুশে পদক পেয়েছে, সে দিক থেকে আমাদের দেশে কদর এখনো ভালো আছে।”
এই শিল্পীর মতে, সময়ের সঙ্গে সংগীতের বাজার ও শ্রোতার রুচিও বদলেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, নতুন ধারার সংগীত এবং পরিবর্তিত সংগীতভূমির কারণে মেটাল সংগীত এখন আগের মত মূলধারায় নেই।
তবে এখনো লাইভ পারফরম্যান্সই মেটাল সংগীতের শক্তি বলে মনে করেন এই সংগীতশিল্পী।
শাকিবের ভাষ্য, “ওয়ারফেজ, আর্টসেল, অর্থহীন, আমরা, নতুন প্রজন্মের অনেক ব্যান্ড মেটাল গান ভালো করেই ধরে রেখেছি, তাই নতুনরাও যদি ভালো গান তৈরি করে এবং লাইভ পারফরম্যান্সে জোর দেয়, তাহলে ভবিষ্যতেও মেটাল সংগীতের সম্ভাবনা থাকবে।”

নব্বই দশকে মেটাল ব্যান্ডের অবস্থা কেমন ছিল, এখন কী বদলেছে জানতে চাইলে শাকিব বলেন, “দুই সময়ের প্রভাব দুই ধরনের। তখন ইন্টারনেট ছিল না, দশটা গানে অ্যালবাম বের হত, সেটা জনপ্রিয় হয়ে উঠলে ব্যান্ড আলোচনায় চলে আসত। এখন মানুষের এত এত অপশন, যারা মেটাল শোনেন শুধু তারাই ব্যান্ডের খবর রাখেন।”
নতুন প্রজন্মের শিল্পী হিসেবে রাহুলের মতে, মেটাল সংগীতের একটি উজ্জ্বল সময় ছিল ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে।

সেসময় বিভিন্ন কনসার্টে একসঙ্গে মেকানিক্স, পাওয়ারসার্জ, ট্রেনরেক, ক্রিপটিক ফেইটসহ সব মেটাল ব্যান্ড বড় বড় কনসার্ট করেছিল। কোভিড মহামারী পরবর্তী সময়ে এটা থেমে যায় বলে জানিয়েছেন তিনি।
“সেই সময় দীর্ঘদিন সরাসরি কনসার্ট বন্ধ থাকায় মেটাল সংগীতের মূল আকর্ষণ লাইভ পারফরম্যান্স থেমে যায়। সেসময় সোনার বাংলা সার্কাস, কার্নিভাল, লেভেল ফাইভ, আফটারম্যাথসহ প্রচুর ব্যান্ডের নতুন নতুন অ্যালবাম এলো আর মেটাল ব্যান্ডের শ্রোতারা অন্যদিকে সরে গেল। এটা স্বাভাবিক, কারণ হেভি মিউজক, আসলে রুমে বদ্ধ অবস্থায় কেউ উপভোগ করতে পারবে না।”
মেটাল ব্যান্ড সামনে কি অবস্থায় যেতে পারে প্রশ্নে, রাহুল বলেন, যে মেটাল ব্যান্ডগুলো এখনো আছে তারা যদি তাদের কার্যক্রম নিয়মিত চালিয়ে যায়, গান প্রকাশ করে, তাদের চেষ্টা চালিয়ে যায় মেটাল ব্যান্ড সামনে বড় একটা জায়গা নিতে পারবে।