Published : 29 Jun 2026, 04:49 PM
চারুশিল্পী, ‘পাপেটম্যান’ হিসাবে খ্যাত পাপেট চর্চার অন্যতম প্রাণপুরুষ মুস্তাফা মনোয়ারকে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তার ছেলে সাদাত মনোয়ার বলেন, শৈশব থেকেই তারা এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে বড় হয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমরা সবসময় এরকম পরিবেশেই বড় হয়েছি। সবসময় দেখতাম আব্বু পাপেট বানাচ্ছেন। উনাকে ছবি আঁকতে তুলনামূলক কম দেখলেও, তার ছবি আঁকার বিশেষত্ব ছিল দারুণ। দেখতাম যে রং-তুলি ধরলেই ম্যাজিকের মতন ছবি হয়ে যেত। এছাড়া সব মাধ্যমেই তার বিচরণ ছিল, অনেক কিছু বানাতেন। মাঝে মাঝে যখন গান করতেন, খুব ভালো গানও গাইতে পারতেন।”

মুস্তাফা মনোয়ারের হাতে ধরে দেশের পাপেটশিল্প পৌঁছেছিল অনন্য উচ্চতায়। তার সৃষ্টি পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ এর সম্বোধনে তিনি ছিলেন ‘শিল্পী ভাই’। সেই থেকে কয়েক প্রজন্মের শিশু-কিশোরের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘শিল্পী’ ভাই।
ছেলে সাদাত মনোয়ারের কথায়, মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন খুব ‘ইতিবাচক মনের মানুষ’।
“চলে যাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে উনি কখনো কথা বলতেন না, আলোচনার মধ্যেও এগুলো আনতেন না। বাবা হিসেবে তিনি ভীষণ ভালো ও অমায়িক ছিলেন। কোনো সময় আমাদের বকাঝকা করতেন না। উনাকে নিয়ে কেবলই চমৎকার সব স্মৃতি রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, "মুস্তাফা মনোয়ার নিজে নতুন প্রজন্মকে পাপেট তৈরির ও পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিতেন, যেন এই সংস্কৃতি বেঁচে থাকে। বাবার এই আজীবন সাধনাকে টিকিয়ে রাখতে তার শিক্ষার্থীদেরও ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তিনি পাপেটের মাধ্যমে আনন্দের শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন।"
মুস্তাফা মনোয়ারকে ছোটবেলায় গ্রামবাংলার পুতুলনাচ আকৃষ্ট করেছিল। তাকেই বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও কাহিনী সংবলিত পাপেট প্রদর্শনের পুরোধা বলা হয়।
কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তে গিয়ে তিনি প্রথম ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের পাপেট দেখেন। পাপেট নিয়ে বহুদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তার আছে।
প্রথমবার তিনি তার নিজের পাপেট দলসহ বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে মস্কো ও তাসখন্দ সফর করেন। সেখানে বাংলাদেশের ফোক পাপেট দারুণ প্রশংসিত হয়।

১৯৬০-৬১ সালে কলিম শরাফী তার একটি ডকুমেন্টারিতে মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেটকে অন্তর্ভুক্ত করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে শিশুদের আতঙ্কগ্রস্ত মলিন চেহারা মুস্তাফা মনোয়ারকে ব্যথিত করে। তাই বাচ্চাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সেই শরণার্থীশিবিরেই আয়োজন করেন পাপেট শো।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন আঙ্গিকে বাংলাদেশের শিল্পজগতে মুস্তাফা মনোয়ার মেলে ধরেন পাপেটের এক নতুন রূপ। তার সৃষ্টি পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ দেখে ইউনিসেফের র্যাচেল কার্নেগি উৎসাহিত হন; তৈরি হয় ‘মীনা’ চরিত্রটি।
টেলিভিশনে 'আজব দেশে' অনুষ্ঠানে নিয়মিতভাবে প্রদর্শনী হয় মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট চরিত্র 'বাঘা' ও 'মেনি'।
দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এই সব্যসাচী শিল্পীর মৃত্যু হয়। মুস্তাফা মনোয়ারের বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।
মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ মঙ্গলবার নেওয়া হবে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে। সেখানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

এরপর বিটিভি থেকে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে মরদেহ নিয়ে আসা হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সেখানেই রাখা হবে বলে জানিয়েছেন চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান।
তিনি আরও জানিয়েছেন শহীদ মিনার থেকে মরদেহ নেওয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে, সেখানে জানাজা সম্পন্ন হবে। জানাজা শেষে মরদেহ আধা ঘণ্টার জন্য নেওয়া হবে তার প্রিয় কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। তারপর বিকালে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হবে মুস্তাফা মনোয়ারকে।
মুস্তাফা মনোয়ারের শূন্যতা 'সহজে পূরণ হওয়ার নয়'
মুস্তাফা মনোয়ার: শিল্পের জন্য এক জীবন