Published : 03 May 2024, 02:22 PM
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘নষ্টনীড়’ নিয়ে ১৯৬৪ সালে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র চারুলতা। দর্শক-চিত্র সমালোচকদের কাছে তো বটেই, সত্যজিৎ নিজেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ‘চারুলতা’কে তার অন্যতম প্রিয় সিনেমা হিসেবে অবহিত করেছেন। সেই চারুলতা হয়ে পর্দায় আসা পশ্চিমবঙ্গের অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায় সত্যজিতের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতার দৈনিক ‘এই সময়’ এ একটি কলাম লিখেছেন। যেখানে উঠে এসেছে তার ‘চারুলতা’ হয়ে ওঠার গল্প।

মাধবী তার সাত দশকের ক্যারিয়ারে ৭০টির বেশি সিনেমা করলেও একাল-সেকাল সবকালের দর্শকদের কাছে তিনি পরিচিত ‘চারুলতা’ নামে।
মাধবী লিখেছেন, “একবার এক অনুষ্ঠানে সত্যজিতের সঙ্গে তার দেখা। সেখানে অস্কারজয়ী এই নির্মাতা বলেন, ‘আবার কবে তোমার সঙ্গে কাজ করব’। একথা শুনে তো আমি অবাক! বলে কী। এ তো আমার বলার কথা। আমি খানিকক্ষণ চুপ করে গিয়েছিলাম। কিছুদিন পর আমার কাছে ফোন এল একদিন। আমাকে বললেন, তুমি একটু রবিঠাকুরের নষ্টনীড়টা পারলে পড়। আমি বললাম ওমা, সে তো আমার পড়া। বললেন, না আবার পড়। বইও পাঠিয়ে দিলেন।”

এই অভিনেত্রী বলেছেন, এর কিছুদিন পর সত্যজিৎ তাকে বাড়িতে ডেকে পাঠান, পড়ে শোনান চিত্রনাট্যও। কিন্তু ওই চিত্রনাট্যে চারুলতার দৃশ্য পুরোপুরি লেখা ছিল না।
“উনি বলেন ওটা (চারুলতার দৃশ্য) পুরোপুরি লেখা নেই। কিন্তু, আমি শুরু করে দিয়েছি। লিখছি।”
সত্যজিতের সঙ্গে কাজের সুবিধা নিয়ে মাধবীর ভাষ্য, “তার চিত্রনাট্যে সবটাই ছবির মত থাকত। পুরো চিত্রনাট্য দিয়ে দিতেন তাও আবার নিজের হাতে লিখে। এখন যেমন ফটোকপির ব্যবহার করা হয়, সেটা ছিল না। ফলে নিজে হাতে লিখে সবটা দিয়ে দিতেন। তখন অবশ্য সব পরিচালকেরাই তাই করতেন। নিজের হাতে লিখে দিতেন চিত্রনাট্য।

“এরপর একটা স্ক্রিন টেস্ট হয়। চারুলতাকে কেমন দেখাবে মেকআপে, ক্যামেরায় কোন অ্যাঙ্গেলে ফুটে উঠবে চারু, এভাবেই সবটা ঠিক হয়। কাজও শুরু হয়।”
সত্যজিতের সেই হাতে লেখা চিত্রনাট্য মাধবীর হাতে নেই বলে দুঃখের শেষ নেই তার।
“আজ বড় দুঃখ হয় একটা কথা ভেবেই সেগুলোর একটাও আমার কাছে নেই। পরবর্তীকালে বিয়ে হয়ে গেল। তখন এত মূল্যবান সব জিনিসের গুরুত্ব কেউ বুঝতে পারেনি। সবার মনে হয়েছে এ তো কাগজপত্র, কী আর হবে। পূর্ণেন্দু পত্রী থেকে শুরু করে তপন সিনহা, সকলের স্ক্রিপ্ট সযত্নে রাখা ছিল। কিন্তু ওই যে সময়ের ফেরে আজ সব চলে গিয়েছে।”
সত্যজিতের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন মাধবী।
তার ভাষ্য, “সত্যজিৎ রায়ের কাজ হল সবচেয়ে সহজ। এত সুন্দর করে তিনি সবটা সাজিয়ে রাখতেন। কিছু নতুন করে, কষ্ট করে ভাবতে হয় না। প্রশ্ন করার আলাদা করে জায়গাও থাকে না। আসলে চারুলতা তো একেবারে অন্যরকম একটা গল্প। সেই সময় স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর সম্পর্ক ছিল গুরু-শিষ্যার সম্পর্ক। পরবর্তীকালে যখন চারুর জীবনে অমল আসল, তখন খানিক বন্ধুত্ব তৈরি হল। চারু বুঝকে শিখল কাকে বলে আসল বন্ধু।

“এবার আমার ক্ষেত্রে যেহেতু নষ্টনীড় পড়া ছিল, তাই চরিত্রটা ফুটিয়ে তুলতে অনেক সুবিধা হয়েছে। তবে সব বিষয়টাই খানিক গুরুগম্ভীর। সকলেই নিজেদের মতো করে কাজ নিয়ে ব্যস্ত। শিল্পীরা যে যার নিজেদের চরিত্র নিয়ে ব্যস্ত। পরিচালক ছবির দৃশ্য, শ্যুটিং থেকে শুরু করে কী হবে না হবে, গানের কম্পোজিশন, এডিটিং সেই বিষয়টা নিয়ে ব্যস্ত। ফলে আলাদা করে আর খুব একটা গল্প করার সময় থাকত না।”
চারুলতা রবীন্দ্রনাথ না সত্যজিতের, সেই প্রসঙ্গে মাধবী তার লেখায় বলেছেন, “কেউ বলবে রবীন্দ্রনাথের চারুলতা। কেউ বলতেন সত্যজিতের চারুলতা। যে যেভাবে পুরো বিষয়ের বিশ্লেষণ করে আর কী! এটা তো একেবারে সত্যি মানুষ চরিত্রটাকে ভালোবেসেছে। আর সেইজন্যই তো এতটা সফল হয়েছে।”
ব্যক্তি মানুষ এবং নির্মাতা দুই ভূমিকাতেই সত্যজিৎকে মূল্যায়ন করেছেন মাধবী।

“পরিচালক সত্যজিৎ রায় বা মানুষ হিসেবে সত্যজিৎ রায়, নম্বর দিতে বললে, কাকে কত দেওয়া যায় জানেন! আমি দুটোতেই তাকে ১০০ দিয়ে দেব। কারণ, যখন তিনি শুটিং করেন তখন তো নতুনদের নিয়েও কাজ করেছেন। সেখানে অনেকেই এক টেকে সবটা ঠিকঠাক করতে পারেন না। তাদেরকে বোঝানোর একটা অনবদ্য কৌশল বরাবর অবলম্বন করেছেন তিনি। বলতেন, আমার মনে হয় এরপর যে শটটা নেব, সেটা আরও ভালো হবে। চলুন দেখা যাক। এই কথা একজন অভিনেতার মনে জোর দেয় অনেকটা।
“কখনও মেজাজ হারাতে দেখিনি। এতটাই গুছিয়ে কাজ করতেন যে তার এসবের প্রয়োজনই হত না কখনও। ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে সর্বদা কাজ করতেন। আসলে তার কর্মটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড়। কর্মের দ্বারাই তো মানুষ একটা বড় জায়গায় পৌঁছে যায় তাই না। তার কাজকে তিনি সাধনার জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন। যা তিনি নিজেই তৈরি করেছেন। তাই সমস্ত সম্মান-ভালো তো সত্যজিৎ রায়ের প্রাপ্য।”