Published : 06 Jun 2026, 03:04 AM
সম্প্রতি দক্ষিণ জার্মানিতে একটা পরিত্যক্ত দুর্গের খননকাজ চলছিল। ধসে পড়া দেয়ালের ধ্বংসস্তূপ সরাতেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের চোখে পড়ল এক বিস্ময়কর গুপ্তধন।
কোনো স্বর্ণমুদ্রা বা হীরা-জহরত নয়, বরং এটি ছিল মধ্যযুগের মানুষের অবসরের সঙ্গী: একটি ছোট দাবার ঘোড়া (নাইট), একটি ছয় পিঠের ছক্কা এবং ফুলের আকৃতি খোদাই করা চারটি ঘুঁটি।
প্রায় এক হাজার বছর মাটির নিচে চাপা পড়ে থেকেও হাড় ও শিং দিয়ে তৈরি এই টুকরোগুলো প্রায় অক্ষত। বিশেষ করে দাবার ঘোড়াটি, যার চোখে মুখে খোদাই করা কারুকাজ আর কেশর আজও স্পষ্ট, তা এগারশ বা বারশ শতাব্দীর কথা মনে করিয়ে দেয়।
সেই সময় ইউরোপে দাবা খেলাটি ছিল একেবারেই নতুন। কিন্তু খুব দ্রুতই এটি অভিজাত শ্রেণির মধ্যে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন জাগতে পারে, ভারত থেকে আসা এই খেলাটি কীভাবে সুদূর ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক সমাজকে জয় করে নিল?
মধ্যযুগের নাইট বা সামন্ত প্রভুদের জীবন খুব একটা বৈচিত্র্যময় ছিল না। যুদ্ধের ময়দান বা শিকারে যাওয়ার বাইরে দীর্ঘ সময় তাদের কাটাতে হতো দুর্গের পাথুরে দেয়ালের আড়ালে। বিশেষ করে কনকনে শীতের মাসগুলোতে যখন বাইরে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ত, তখন একঘেয়েমি দূর করার জন্য তাদের একটি বুদ্ধিদীপ্ত মাধ্যমের প্রয়োজন ছিল। দাবা ছিল ঠিক তেমনই একটি সমাধান।
এটি কেবল সময়ের অপচয় ছিল না, বরং ছিল রণকৌশল আর বুদ্ধির এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। সামন্ততান্ত্রিক সমাজের যে হায়ারার্কি বা স্তরবিন্যাস, দাবার ছকেও ছিল তারই প্রতিফলন। শারীরিক শক্তির চেয়ে এখানে জয়ী হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল ধুরন্ধর মগজের।
ধীরে ধীরে খেলাটি দুর্গের অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে জনপদগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে দাবার জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে। স্কটল্যান্ডে পাওয়া বিখ্যাত ‘লুইস চেসম্যান’ যেমন দাবার এক সোনালি সময়ের সাক্ষী, জার্মানির এই নতুন পাওয়া ঘোড়াটিও প্রমাণ করে যে, মধ্যযুগে দাবার জনপ্রিয়তা আজকের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।
দাবা যদিও আজ পাশ্চাত্যের খেলা হিসেবে পরিচিত, এর শেকড় লুকিয়ে আছে পূর্বের দেশগুলোতে। ষষ্ঠ শতাব্দীতে ভারতে এই খেলার উদ্ভব হয় ‘চতুরঙ্গ’ নামে। চতুরঙ্গ কথাটির অর্থ হলো সেনাবাহিনীর চারটি অঙ্গ— পদাতিক, অশ্বারোহী, হস্তিবাহিনী এবং রথবাহিনী। এই প্রাচীন খেলায় ভাগ্যের কিছুটা ছোঁয়া থাকলেও, আজকের দিনের বোড়ে (পদাতিক বা সৈনিক), ঘোড়া (অশ্বারোহী), গজ (হাতি বা ধর্মগুরু) এবং নৌকার (রথ বা দুর্গ) আদি রূপ তখনই তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
রেশম পথ বা সিল্ক রোড ধরে এ খেলা একসময় পারস্যে পৌঁছায় এবং সেখানে এর নাম হয় ‘শতরঞ্জ’। পারস্য বিজয়ের পর খেলাটি আরব ও মুসলিম বিশ্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। নবম ও দশম শতাব্দীতে আল আদলি এবং আল সুলির মতো দাবার ওস্তাদরা দাবার তাত্ত্বিক দিক নিয়ে বিশদ গবেষণা শুরু করেন। তারা দাবার চাল, ওপেনিং এবং বিখ্যাত সব ম্যাচের বিবরণ লিখে রেখেছিলেন, যা আজও দাবার ইতিহাসে অমূল্য সম্পদ।
ইউরোপে দাবার প্রবেশ ঘটে মূলত মুসলিম বিশ্বের মাধ্যমেই। দশম ও একাদশ শতাব্দীতে স্পেন, সিসিলি এবং ক্রুসেডারদের মাধ্যমে এটি ইউরোপীয়দের নজরে আসে। স্পেনের কর্ডোভা ছিল তখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র, যা এই খেলাটি ইউরোপে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করেছিল।
১০০৮ সালের একটি ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায়, কাতালোনিয়ার উর্জেলের প্রথম শাসক এরমেনগোল তার উইলে দাবার কিছু স্বচ্ছ ঘুঁটি একটি মঠকে দান করে গিয়েছিলেন। এটিই প্রমাণ করে সেই যুগে দাবার ঘুঁটিগুলো কতটা মূল্যবান ও সম্মানজনক উপহার হিসেবে বিবেচিত হতো।
ইউরোপে যখন দাবার আবির্ভাব ঘটে, তখন সময়টি ছিল এর প্রসারের জন্য একেবারে আদর্শ। পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপ ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, যেখানে সামন্ত প্রভুরা ছিল ক্ষমতার মূল উৎস। কিন্তু একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে রাজতন্ত্র শক্তিশালী হতে শুরু করলে যুদ্ধবিগ্রহ কিছুটা কমে আসে। অভিজাত শ্রেণি তখন অখণ্ড অবসর পেতে শুরু করে। দাবার চেয়ে উৎকৃষ্ট কোনো বিনোদন তাদের সামনে ছিল না।
দাবার প্রতিটি ঘুঁটি যেন সে সময়ের সমাজ ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। রাজা, সামন্ত প্রভু, নাইট আর সাধারণ কৃষকদের মধ্যকার যে সামাজিক চুক্তি বা সম্পর্ক, তা যেন দাবার বোর্ডের ৬৪টি ঘরে জীবন্ত হয়ে উঠত। পেত্রাস আলফনসির মতো পণ্ডিতরা মনে করতেন, একজন সুশিক্ষিত নাইটের যে সাতটি গুণ থাকা আবশ্যক, তার মধ্যে দাবা অন্যতম।
ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটি অ্যামহার্স্টের মধ্যযুগীয় সাহিত্যের অধ্যাপক জেনি অ্যাডামস যথার্থই বলেছেন, “দাবা ছিল সে সময়ের সামাজিক শৃঙ্খলা অনুশীলনের একটি প্রতীকী উপায়।”
ইউরোপীয়রা দাবা খেলতে গিয়ে লক্ষ্য করলেন যে, এই খেলাটি বেশ ধীরগতির। খেলার গতি বাড়াতে তারা কিছু নতুন নিয়ম যোগ করলেন। যেমন- প্রথম চালে বোড়ে বা পনকে দুই ঘর এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো। বিশপের আদি রূপ ছিল হাতির মতো, যা মাত্র দুই ঘর যেতে পারত; কিন্তু ইউরোপীয়রা এর চালকে অসীম করে দিল।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এলো মন্ত্রী বা উজির ঘুঁটিটিতে। পারস্যের সেই পুরুষ ঘুঁটিটি ইউরোপে এসে হয়ে গেল রানি বা কুইন। রানিকে দেওয়া হলো পুরো বোর্ডে অবাধে বিচরণ করার ক্ষমতা। রাজার নিরাপত্তার জন্য প্রবর্তন করা হলো ‘ক্যাসলিং’ বা কিস্তিমাত থেকে বাঁচার বিশেষ চাল।
ঘুঁটিগুলোর চেহারায়ও বদল এলো। পারস্যের উজির হয়ে গেল রানি, যা রাজকীয় নারীদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতীক। হাতি বদলে গিয়ে হলো বিশপ বা গির্জার প্রতিনিধি, যা সেসময়ের সমাজে চার্চের আধিপত্যকে ইঙ্গিত করে। আর রথ হয়ে গেল রুক বা একটি সুরক্ষিত দুর্গ। তবে ঘোড়া ও বোড়ে তাদের আদি রূপ ও মর্যাদা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
দাবা কেবল রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা হয়ে থাকেনি। ধীরে ধীরে এটি শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণি, ব্যবসায়ী ও কারিগরদের মাঝেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে সময়কার ইহুদি সম্প্রদায় এবং যাযাবর চারণকবি বা ট্রুব্যাডোরদের মধ্যেও দাবার বেশ প্রচলন ছিল। একজন ট্রুব্যাডোরকে কেবল গান বা কবিতা জানলেই চলত না, দাবা খেলাতেও তাকে পারদর্শী হতে হতো।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, মধ্যযুগে দাবা ছিল নারী ও পুরুষের মধ্যে মেধা ও বুদ্ধির লড়াইয়ের এক অনন্য ক্ষেত্র। অভিজাত পরিবারের কন্যারা তাদের ভাইদের সঙ্গেই দাবা শিখতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা পুরুষদের চেয়েও দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হতেন। সে সময়কার অনেক চিত্রকলায় দেখা যায়, একজন তরুণ ও তরুণী দাবার বোর্ডের সামনে বসে একে অপরের প্রেমে মজেছেন। অর্থাৎ, দাবা তখন কেবল যুদ্ধবিদ্যা নয়, বরং সামাজিক মেলামেশার এক শৈল্পিক বাহন হয়ে উঠেছিল।

৯৯৭ সালের দিকে যখন দাবায় রানির প্রবেশ ঘটে, তখন সেটি ছিল কেবল রাজার পাশে এক সাধারণ মন্ত্রী। কিন্তু পনেরশ শতাব্দীর স্পেনে শক্তিশালী রানি ইসাবেলা যখন সিংহাসনে বসলেন, তখন দাবার রানিও হয়ে উঠল সবচেয়ে শক্তিশালী ঘুঁটি। ঐতিহাসিকভাবে মনে করা হয়, প্রভাবশালী নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নই দাবার ছকে রানির আধিপত্যের পথ প্রশস্ত করেছিল।
চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে ইউরোপে কাঠের ব্লকে ছাপা তাসের প্রচলন শুরু হয়। তাস ছিল দাবার চেয়ে অনেক বেশি সহজ এবং দ্রুতগতির খেলা। ফলে অভিজাতরা ধীরে ধীরে দাবার চেয়ে তাসের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন।
আঠারো শতকের দিকে তাস দাবাকে সরিয়ে প্রধান বিনোদনের জায়গা দখল করে নেয়। যদিও পনেরশ শতাব্দীর শেষদিকে নিয়মের আধুনিকায়ন দাবাকে কিছুটা নতুন প্রাণ দিয়েছিল, কিন্তু কার্ড গেমের প্রবল জোয়ারের কাছে তা সাময়িকভাবে ফিকে হয়ে যায়।
তবে দাবার মহিমা কখনো শেষ হয়ে যায়নি। হালের করোনাভাইরাস মহামারীর সময় যখন পুরো পৃথিবী স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখন মানুষ আবারও এই ধ্রুপদী খেলায় ফিরে এসেছে। অনলাইনের কল্যাণে দাবা এখন বিশ্বব্যাপী এক বিশাল মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। জার্মানির বার্গস্টেইন দুর্গে পাওয়া সেই এক হাজার বছরের পুরোনো দাবার ঘোড়াটি আজ ডিজিটাল থ্রিডি মডেলের মাধ্যমে সারা বিশ্বের গবেষক ও দাবাপ্রেমীদের সামনে উন্মোচন করা হচ্ছে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক হিস্ট্রি ম্যাগাজিন, মে/জুন ২০২৬ সংখ্যা।