Published : 23 Jul 2023, 05:41 PM
ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় গণসংগীতের প্রয়াত শিল্পী ফকির আলমগীরের বসবাস ছিল স্বাধীনতার আগে থেকে, আর খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার ৬ নম্বর সড়কে নিজের বাড়িতে তিনি থেকেছেন দুই দশক। তার ইচ্ছে ছিল, বাড়ির সামনের রাস্তাটি তার নামে হোক। জীবদ্দশায় না হলেও শিল্পীর সেই ইচ্ছা অবশেষে পূরণ হয়েছে।
রোববার খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার ৬ নম্বর সড়কের নাম ‘ফকির আলমগীর সড়ক’ করা হয়েছে বলে তার ছেলে মাশুক আলমগীর জানিয়েছেন।
গ্লিটজকে তিনি বলেন, “ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম সকালে বাবার নামে সড়কটির নামফলক উন্মোচন করেছেন।“
সে সময় ফকির আলমগীরের গাওয়া ‘ও সখিনা গেছস কিনা/ভুইল্যাই আমারে’ গানটির কয়েক কলি মেয়র গেয়ে শোনান বলে জানান মাশুক।

ফকির আলমগীরের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন সেখানে।
মেয়র আতিক এর আগে খিলগাঁও তালতলা কবরস্থানে ফকির আলমগীরের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান এবং কবর জিয়ারত করেন।
কোভিড আক্রান্ত হয়ে ২০২১ সালের ২৩ জুলাই ৭১ বছর বয়সে মারা যান একাত্তরে কণ্ঠযোদ্ধা ফকির আলমগীর।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মৃত্যুর আগে মেয়র আতিকুল ইসলামের কাছে ফকির আলমগীর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, যে সড়কে তার বাড়ি, সেই সড়কটি যেন তার নামে করা হয়।
ফকির আলমগীর মারা যাওয়ার দুই মাসের মাথায় সিটি করপোরেশনের বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয়, খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার ৬ নম্বর সড়কটি হবে ফকির আলমগীরের নামে।

মাশুক বলেন, “বাবার নামে সড়ক, এটা আমার জন্য খুবই গর্বের বিষয়। মুক্তিযুদ্ধে এবং দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাবার যে অবদান, তার মূল্যায়ন করার জন্য সিটি করপোরেশনের প্রতি আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই। এটি যেহেতু সারাজীবন থাকবে, পরের প্রজন্ম জানতে পারবে যে ফকির আলমগীর এই দেশের জন্য কি ভূমিকা রেখেছেন।”
ফকির আলমগীরের সৃজনশীল কাজ ‘সংরক্ষণের’ জন্য মেয়রকে অনুরোধ করেছেন জানিয়ে মাশুক বলেন, “আমার অনুরোধ একটাই, বাবার গান, লেখাসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ যেন সংরক্ষণ করা হয়। মেয়র মহোদয় আশ্বাস দিয়েছেন, তিনি সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় এটি করবেন। এছাড়া আজম খান, ফিরোজ সাঁই, ফেরদৌস ওয়াহিদসহ আরও যারা গুণি শিল্পী আছেন, তাদের গানও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেবেন তিনি।”
চৌধুরীপাড়ার ৬ নম্বর সড়কের নামফলকে প্রয়াত ফকির আলমগীরের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিতে লেখা হয়েছে, “বীর মুক্তিযোদ্ধা সংগীতশিল্পী ফকির আলমগীরের জন্ম ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার কালামৃদ্ধ গ্রামে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ও পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন শব্দ দৈনিক হিসেবে গণসংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
“তিনি গণসংগীতের শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। গণসংগীত ও দেশীয় পপ সংগীতে তার ব্যাপক অবদান রয়েছে। তিনি ১৯৯৯ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। তিনি ছিলেন শিল্পী, সাহিত্যিক। ২০২১ সালের ২৩ জুলাই ৭১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।”

দেশের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গায়ও ফকির আলমগীরের নামে একটি সড়ক রয়েছে বলে জানান মাশুক।
তিনি বলেন, “ফরিদপুরে আমাদের গ্রামের বাড়িতে ফকির আলমগীরের নামে একটি জাদুঘর করা হয়েছে। সরকারের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই যে সেই জাদুঘরটি আরও বড় পরিসরে করার জন্য সরকারের তরফ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”

এই শিল্পীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ‘কথা গানে ফকির আলমগীরকে স্মরণ’ শিরোনামের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী। অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণার পাশাপাশি আবৃত্তি ও গান পরিবেশন করা হবে।
আয়োজক সংগঠনের ফকির সিরাজ গ্লিটজকে জানিয়েছেন, তাদের আয়োজনে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদসহ অনেকে উপস্থিত থাকবেন। সভাপতিত্ব করবেন সুরাইয়া আলমগীর।
গণমানুষের গানে একজন ফকির আলমগীর
ফকির আলমগীরের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলার ভাঙা থানার কালামৃধা গ্রামে।
কালামৃধা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেন।
এর মধ্যেই ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ফকির আলমগীর জড়িয়ে যান বাম ধারার ছাত্র রাজনীতিতে। সেই সূত্রে ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী ও গণশিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে তার গান আর সংগ্রামের জগতে প্রবেশ।
ঠিক তার পরপরই আসে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সেই উত্তাল সময়। গানের শিল্পী ফকির আলমগীর তাতেও কণ্ঠ মেলান।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। তার বয়স তখন ২১ বছর। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে কলকাতার নারিকেল ডাঙায় শরণার্থী শিল্পী গোষ্ঠীতে যোগ দেন।
স্বাধীনতার পর পাশ্চাত্য সংগীতের সঙ্গে দেশজ সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বাংলা পপ গানের বিকাশে ভূমিকা রাখেন এ শিল্পী। সংগীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার ১৯৯৯ সালে ফকির আলমগীরকে একুশে পদক দেয়।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তার কণ্ঠের বেশ কয়েকটি গান দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। এর মধ্যে ‘ও সখিনা’ গানটি এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
১৯৮২ সালের বিটিভির আনন্দমেলা অনুষ্ঠানে গানটি প্রচারের পর দর্শকদের মাঝে সাড়া ফেলে। গানটি লিখেছেন আলতাফ আলী হাসু। কণ্ঠ দেয়ার পাশাপাশি গানটির সুরও করেছেন ফকির আলমগীর।
এছাড়া ‘মন তুই দেখলি না রে’, ‘কালো কালো মানুষের দেশে’, মায়ের একধার দুধের দাম’, ’মন আমার দেহ ঘড়ি’, ‘আহারে কাল্লু মাতব্বর’, ‘ও জুলেখা’, ‘ঘর করলাম না রে আমি’, ‘সান্তাহার জংশনে দেখা’, ‘বনমালী তুমি’সহ তার গাওয়া বহু গান আশি ও নব্বইয়ের দশকেও দারুণ জনপ্রিয় ছিল।
তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠাতা, গণসংগীত চর্চার আরেক সংগঠন গণসংগীত শিল্পী পরিষদের সাবেক সভাপতি।
ফকির আলমগীর নিয়মিত লেখালেখিও করতেন ।‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বিজয়ের গান’, ‘গণসংগীতের অতীত ও বর্তমান’, ‘আমার কথা’, ‘যারা আছেন হৃদয় পটে’সহ বেশ কয়েকটি বই রয়েছে তার।
পুরনো খবর
‘সত্যেন সেন সম্মাননা’ পেলেন প্রয়াত ফকির আলমগীর
দাম দিয়ে কেনা বাংলা, সর্বহারা ‘রিসকাচালক’ এবং ফকির আলমগীর
খিলগাঁও কবরস্থানে চিরঘুমে ফকির আলমগীর