Published : 13 Feb 2026, 02:46 PM
মঞ্চ, টেলিভিশনের নাটকের বহু চরিত্রকে ‘অমর করে তোলা’ অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদিকে তিনটি জায়গায় স্থান দিয়েছেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী।
চঞ্চলের ভাষায়, ফরিদী কেবল তার সহশিল্পী ছিলেন না; প্রয়াত এই অভিনেতা ছিলেন তার শিক্ষক, বন্ধু ও অভিভাবক এবং এক অনন্য প্রেরণার উৎস।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে গিয়ে ফরিদীকে স্মরণ করেছেন চঞ্চল। তিনি বলেছেন, সুযোগ পেলে তিনি হুমায়ুন ফরিদীকে নিয়ে একবারের জন্য হলেও ডিনারে বসতে চাইতেন।
ফরীদি নেই প্রায় দেড় দশক হতে চললো। ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারিতে অনন্তকালে যাত্রা করেন অভিনেতা। শুক্রবার এই অভিনেতার ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী।
এক অনুষ্ঠানে সঞ্চালক চঞ্চলের কাছে জানতে চান, যদি তিনি কখনো একবারের জন্য কোনো প্রয়াত বড় অভিনেতার সঙ্গে বসার সুযোগ পান, তবে কাকে বেছে নেবেন?
উত্তরে চঞ্চল বলেন, “যার সঙ্গে আমার বসার অভ্যাস ছিল, অনেক ডিনার করেছি, রাতভর আড্ডা দিয়েছি ওনাকেই আবার আনতে চাই। আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না যে উনি এভাবে চলে যাবেন। তিনি ফরিদী ভাই, আমাদের হুমায়ুন ফরিদী।”
ফরিদীর সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন ছিল প্রশ্নে চঞ্চল বলেন, "সম্পর্কটা ছিল কখনো গুরু-শিষ্যের, কখনো বন্ধুর, আবার কখনো অভিভাবকের মত।"
চঞ্চলের অভিনীত কোনো কাজ দেখে মতামত জানাতে ফোন দিতেন ফরিদী।
“তখন বাটন ফোনের সময়। কাজ দেখেই ফোন দিতেন ‘এই চঞ্চল, তোর কাজটা দেখলাম। ভালো হয়েছে। তবে মুখটা একটু তেলতেলে লাগছিল, পরেরবার মেকআপে খেয়াল রাখিস।’ আবার বলতেন, ‘কিরে, কী করছিস? আয় বাসায়, আড্ডা দেই।’”
চঞ্চলের ভাষায়, হুমায়ুন ফরিদী ছিলেন অভিনয়ের শিক্ষক।
“ওই মাপের গুণী অভিনেতা বাংলাদেশে বহু বছর পর এসেছিলেন। ভবিষ্যতে কবে আসবেন, জানা নেই।,”
মানুষ হিসেবে ফরিদী কেমন ছিলেন জানতে চাইলে চঞ্চল বলেন, “খুবই বন্ধুবৎসল, আন্তরিক। আড্ডাবাজ মানুষ ছিলেন। রাতের পর রাত আমরা আড্ডা দিতাম।”
ফরিদীর চিন্তাভাবনা অনেকটা দার্শনিকের মত ছিল জানিয়ে চঞ্চল বলেন, “তার ভাবনা, সাক্ষাৎকার সবকিছুই আলাদা মাত্রার ছিল।”

আশি ও নব্বইয়ের দশকে যে কয়েকজন অভিনয় শিল্পী দেশের মঞ্চ ও টিভি নাটককে তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিলেন, ফরীদি ছিলেন তাদেরই একজন।
১৯৫২ সালের ২৯ মে ঢাকায় জন্ম ফরীদির। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ফরীদি ছিলেন দ্বিতীয়।
পড়ালেখা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।
নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা মঞ্চ সবখানেই ছিল ফরীদির অবাধ বিচরণ। মঞ্চ দিয়েই শুরু তার পথচলা। প্রথম মঞ্চনাটক করেন কিশোরগঞ্জে মহল্লার নাটকে ১৯৬৪ সালে। প্রথম মঞ্চনাটক নির্দেশনা দেন স্কুলজীবনে ‘ভূত’।
মঞ্চে তার ‘ত্রিরত্ন’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘মুন্তাসির ফ্যান্টাসি’, ‘কেরামত মঙ্গল’ নাটক বিখ্যাত।
ফরীদি অভিনীত টিভি নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’, ‘বকুলপুর কতদূর’, ‘মহুয়ার মন’, ‘সাত আসমানের সিঁড়ি’, ‘একদিন হঠাৎ’, ‘কান কাটা রমজান’ , ‘চানমিয়ার নেগেটিভ পজিটিভ’, ‘অযাত্রা’, ‘পাথর সময়’, ‘দুই ভাই’, ‘শীতের পাখি’, ‘সংশপ্তক’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘সমুদ্রে গাঙচিল’, তিনি একজন’, ‘চন্দ্রগ্রস্ত’, ‘কাছের মানুষ’, ‘মোহনা’, ‘বিষকাঁটা’, ‘ভবের হাট’ ও ‘শৃঙ্খল’।
তবে ‘সংশপ্তক’ নাটকে ‘কান কাটা রমজান’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজেকে নিয়ে যান অন্য উচ্চতায়।
তার অন্য নাটকগুলোর মধ্যে আছে, ‘দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা’, ‘একটি লাল শাড়ি’, ‘প্রিয়জন নিবাস’। সর্বশেষ তিনি ‘তখন হেমন্ত’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটক পরিচালনা করেন এবং ‘পূর্ণ চাঁদের অপূর্ণতায়’ নামের একটি নাটকে অভিনয় করেন।
পরে সিনেমাতেও আসেন ফরীদি। তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ‘একাত্তরের যিশু’, ‘সন্ত্রাস’, ‘ব্যাচেলর’, ‘জয়যাত্রা’ ও ‘শ্যামলছায়া’ অন্যতম। বাণিজ্যিক ধারার সিনেমার খল চরিত্র করেও তিনি খ্যাতি পান।
‘মাতৃত্ব’ সিনেমার জন্য ২০০৪ সালে সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান হুমায়ূন ফরীদি। ২০১৮ সালে পেয়েছেন মরণোত্তর একুশে পদক।
ব্যক্তি জীবনে দুবার বিয়ে করেন ফরীদি। নাটকে ক্যারিয়ার শুরু পর অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তফার সঙ্গে সংসার শুরু করেন। তবে ২০০৮ সালে ফরীদি-সুবর্ণার বিচ্ছেদ হয়ে যায়।