Published : 18 Aug 2025, 06:41 PM
মুক্তিযুদ্ধের দুই সিনেমা ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘আলোর মিছিল’ এবং ‘লাঠিয়াল’ করে দেশের সিনেমা জগতে নিজেকে আলোয় নিয়ে আসতে পারলেও চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠানের ক্যারিয়ারের বাঁক বদলে দেয় ‘সারেং বৌ’।
শহীদুল্লা কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বৌ’ নির্মাণ করেন আবদুল্লাহ আল মামুন। এ সিনেমায় কদম সারেং ও নবীতুন চরিত্রে ফারুক-কবরী জুটির রসায়ন স্মরণীয় হয়ে আছে।
২০০৩ সালে ওই সিনেমার ২৫ বছর পূর্তিতে দেশের একটি বাংলা দৈনিক পত্রিকায় 'স্মরণের প্রান্তরে' শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন কদম সারেং চরিত্রাভিনেতা ফারুক। প্রতিবেদনের একটি কাটিং ছবির অ্যালবামে যত্ন করে রেখে দিয়েছেন ফারুকের স্ত্রী ফারহানা হোসেন ফিউরী।
কোন পত্রিকায় কত তারিখে নিবন্ধটি ছাপা হয়েছিল, তা মনে করতে পারেননি ফারুকের পরিবারের সদস্যরা। সে সময় সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনকে ওই পত্রিকার কাটিংয়ের ছবি দেখিয়েও পত্রিকাটির নাম উদ্ধার করতে পারেনি গ্লিটজ।
সেখানে ‘সারেং বৌ’ নিয়ে নিজের খোলামেলা মতামত তুলে ধরেছিলেন ফারুক। কক্সবাজারের ঘূর্ণিঝড়ের দৃশ্য থেকে শুরু করে ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানের দৃশ্যপট বাঙময় হয়েছে নায়কের লেখায়।
সে সময় হাতে একাধিক সিনেমা থাকলেও পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনের প্রস্তাবেই ‘সারেং বৌ’ সিনেমায় অভিনয় করতে রাজি হয়ে যান তিনি। ফারুকের ভাষায়, আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল ‘ভ্রাতৃত্বপূর্ণ’।
সিনেমার দৃশ্যধারণ শুরু হওয়ার আগে ফারুক অসুস্থ হয়ে পড়লেও শুটিং সেট তৈরি হয়ে যাওয়ায় কাজ বন্ধ রাখতে পারেননি।
তবে সিনেমার কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেছেন ফারুক। তার মতে, সিনেমায় উপন্যাসের প্রতি ‘বিশ্বস্ততা পুরোপুরি রক্ষা করা হয়নি’। বিদেশি অংশের দৃশ্যায়ন ‘দুর্বল’ ছিল। তার বিচারে, কদম সারেং চরিত্রটিও কিছুটা ‘অবমূল্যায়িত’ হয়েছে।
পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনকে নিয়েও অকপটে ফারুক। তার মূল্যায়ন, আবদুল্লাহ আল মামুন ‘মেধাবী’ নির্মাতা হলেও এ সিনেমায় পুরোপুরি ‘বিকশিত হতে পারেননি’।
গান নিয়েও কথা বলেছেন ফারুক। সিনেমার জনপ্রিয় ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানে তার লিপসিং সঠিকভাবে হয়নি, সেটা স্বীকার করেছেন।
এ গানের জন্য কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার জাতীয় পুরস্কার পেলেও পরে তাকে ‘অবহেলা’ করা হয়েছে বলে খেদ প্রকাশ করেছেন ফারুক।
চলচ্চিত্রের প্রয়াত এই নায়কের ৭৭তম জন্মবার্ষিকীতে 'স্মরণের প্রান্তরে' নিবন্ধের ছবি থেকে লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করছে গ্লিটজ।
***
'স্মরণের প্রান্তরে'
ফারুক
১৯৭৮ সালের ছবি 'সারেং বৌ'। সে সময় আমার হাতে অনেক সিনেমা। মামুন ভাইয়ের সঙ্গে আমার বড় ভাই, ছোট ভাইয়ের মত মধুর একটা সম্পর্ক ছিল। তার বাসায় প্রায় আড্ডা হত। 'সারেং বৌ' সম্পর্কে বলতেন এরকম-ওরকম ভাবছি। হঠাৎ একদিন ভাবীকে মামুন ভাই বললেন, 'সারেং-এর চরিত্রটা ফারুক করুক, কি বল?"
ছবিটার একটি বিশাল গুরুত্বপূর্ণ অংশের শুটিং হয়েছিল কক্সবাজারে। বিচ জুড়ে সে কি এলাহী কারবার। ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড একটা গ্রাম্য আবহ তৈরি- সে কি চাট্টিখানি কথা, অনেক কষ্ট করেছিলেন মামুন ভাই। হঠাৎ করে শুটিং শুরুর আগে আমি ভীষণ জ্বরে পড়ি। ডাক্তার কড়াভাবে নিষেধ করলেন কাজ করতে। কিন্তু দুই তিনদিনের কষ্টে সেটটা বানানো হয়েছে। মামুন ভাই কিছু বলতে পারছেন না আমাকে। বড় মায়া লাগল। তখনকার সময় টিমওয়ার্ক ছিল একটি ছবির প্রাণ। এতে ইনভলভমেন্টটাও বেশি হত। অভিনেতা হিসেবে এমনি একটা তাগিদ এসে যায়। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম।
শুটিংয়ের সময় কেন যেন মনে হচ্ছিল লং শট অনেক ব্যবহার করছেন মামুন ভাই। যাতে আমি না থাকতে পারলে শুটিংয়ে ডামি ব্যবহার করা যায়। কেমন যেন একটা জেদ তৈরি হয়ে গেল। টানা দুদিন শুটিং করে শেষ করলাম। কোন রকম বিশ্রাম না নিয়ে। থকথকে কাদা গায়ে মেখে। বালুর গর্তে পুরো শরীর ডুবিয়ে দিয়ে।

ঘূর্ণিঝড়ের শেষে দারুণ তৃষ্ণায় কদম সারেংকে চারদিকে লবণ পানির কারণে নবীতুনের নিজের স্তন থেকে তরল পান করানোর দৃশ্যের শুটিং এ সময় হয়েছিল। দৃশ্যটি নিয়ে দারুণ আলোচনার ঝড় উঠেছিল সে সময়। আজও হয়। ঔপন্যাসিক যে সাইকোলজি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তা আমি নিজে বিশ্বাস করি। তা হল এই 'জীবন বাঁচানোর নিমিত্তে মানুষের সেইমুহূর্তে যা করণীয় তাই করতে হবে।' তখন আমার গায়ে জ্বরের চিহ্নমাত্র নেই। টানা দুদিনের শুটিং শেষে যখন ফ্রেশ হলাম ডাক্তারসহ আমি খুব অবাক হয়েছিলাম।
ছবির বন্যার দৃশ্য। জলোচ্ছ্বাসের কিছু অংশ হয়েছিল এফডিসিতে কৃত্রিমভাবে। কিছু ছিল স্টক শট।
পঁচিশ বছর হয়ে গেল। এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে আমার মনে হয় ছবিতে অনেক ত্রুটি ছিল। প্রথমত, সারেং চরিত্রটি অবমূল্যায়িত হয়েছে। উপন্যাসটি পড়ে সারেং-এর যে ছবি পাওয়া যায় তার প্রতি নজর দেওয়া হয়নি।
দ্বিতীয়ত উপন্যাসের প্রতি বিশ্বস্ততার জায়গাতে অনেক কমতি আছে। যেমন- বিদেশি পার্টের আবহ তেমন আসেনি। এটি বাইরে গিয়ে করা যেত। মামুন ভাই সেরকম চেয়েছিলেনও, কেন যে করলেন না! ছবিতে আসল জাহাজকেও সেট মনে হয়েছে। আমার কাছে মনে হয় পুরো সারেং বৌ-এ কোথায় যেন একটা অন্যপক্ষ ছিল! ছবিটি নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। আজও বিভিন্ন ফোরামে হয়। সারেং এর গেটআপ নিয়ে কথা উঠেছিল।
আমার উইগ নিয়ে কথা উঠেছিল। যখন কদম সারেং বাড়ি ফেরে নবীতুনকে দেখে তখন তার গেটআপ ঠিক ছিল না। প্রথমত বলতে চাই, এ ধরনের মানুষ নানারকম হতে পারে। যেহেতু সে বন্দরে বন্দরে ঘোরে তার কিছু সৌখিনতার ভঙ্গিমা আসতে পারে। চুল বড় রাখা না রাখা সেটা নিয়ে আমার মনে হয় মামুন ভাই গল্পের সারেং হিসেবে নিজেকে ভেবেছিলেন। তার চুল বড় ছিল। সফট উইগ হলে ভালো হত। তবে এর চেয়ে ভাল উইগ ছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি এ নিয়ে সমালোচনার অধিকার কারও নেই। ইচ্ছে হলে পরিচালককে জিজ্ঞেস করতে পারে।
মামুন ভাই অনেক আড্ডায় বসতেন। কোনটা ফিল্ম ঘরানা, কোনটা টিভির। এসব জায়গাতে কিছু আঁতেল সব সময় থাকে। কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা! বিতর্ক তুলতে ওস্তাদ। আমরা চলচ্চিত্রের মানুষেরা কল্পনা করতে ভালবাসি। তাতে দোষ নেই! তবে কেউ কেউ তোষামোদ পছন্দ করি। আমার কেন যেন মনে হয় কিছু কিছু জায়গায় মামুন সাহেব নিজেকে ঠিক রাখেননি। তার ফলে তিনি যে মেধার মানুষ সেভাবে ফিল্মে বিকশিত হতে পারেননি।
যে গানটি চলচ্চিত্রটিকে ভিন্ন ব্যঞ্জনা দিয়েছে সেটি হল 'ওরে নীল দরিয়া' গানটিতে আমার লিপসিং ঠিকমত হয়নি। এ ছবিতে গানের জন্য আবদুল জব্বার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। অথচ আমাদের দেশ বলেই সম্ভব হয়েছে জব্বারকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়া হয়েছে। গানটি সে সময় যতটা নাড়া দিয়েছে, বর্তমান প্রজন্মকে তার চেয়েও বেশি নাড়া দিয়েছে।

‘সারেং বৌ’: এক নারীর অন্তহীন সংগ্রামের বয়ান
নোয়াখালির উপকূলীয় অঞ্চলের এক নারীর জীবনযুদ্ধের দলিল 'সারেং বউ'। উপকূলীয় এক গ্রামের সহজ সরল মেয়ে নবিতুন। এক বৃদ্ধ সারেংয়ের মেয়ে সে।
তার বিয়ে হয় কদম সারেংয়ের সঙ্গে, যিনি জাহাজের চাকরি করেন। নবিতুন চায় জাহাজের চাকরি ছেড়ে গ্রামেই কৃষিকাজ করুক কদম। কিন্তু নাবিকের রক্ত বইছে কদমের ধমণীতে। সমুদ্র তাকে ডাকে। সেই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পারে না কদম।
নতুন বউ ফেলে জাহাজের চাকরিতে চলে যায় সে। যাবার আগে বাড়ির আঙিনায় সে একটি বড়ই গাছের চারা লাগিয়ে রেখে যায়। সেই গাছটি বড় হতে থাকে। সেই গাছের দিকে তাকিয়ে স্বামীর ফেরার পথ চেয়ে থাকে সারেং বাড়ির বউ নবিতুন। জন্ম হয় তাদের মেয়ের। বাবার স্নেহ ছাড়াই বড় হয়ে উঠতে থাকে মেয়েটি।
এদিকে নবিতুন একা থেকে যায়। গ্রামের মোড়ল লন্দুর কুপ্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে মেয়েকে নিয়ে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যায়। দুর্বিপাকে তাকে চৌধুরী বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করতে হয়। প্রতিকূলতা ও অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যেও নবিতুন তার সাহস, শৃঙ্খলা ও ধৈর্য ধরে রাখে।
অন্যদিকে কদম সমুদ্রে ও বিদেশে সততার পথে থেকেও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়েন, জেলেও যেতে হয় তাকে। দীর্ঘদিন ধরে কদম বিদেশে। তাকে মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়। পারিবারিক বৈঠকে স্থির হয় কদমের চাচাতো ভাই কোরবানের সঙ্গে বিয়ে হবে নবিতুনের। নবিতুনের আপত্তি কেউ শোনে না। বিয়ের দিন স্থির হয়। সেই সময় গ্রামে ফেরে কদম।
গ্রামের মোড়ল ও কুচক্রী মানুষ কদমের কানে কুমন্ত্রণা দেয়। তাকে বলা হয় নবিতুনের গর্ভে যে সন্তান তা অন্য মানুষের, কদমের নয়। সন্দেহের বিষে জ্বলে ওঠে কদম। নবিতুনের কষ্ট যেন আরো বেড়ে যায়। যে স্বামীর জন্য তার এতদিনের সংযম ও প্রতীক্ষা সেই স্বামীই তাকে সন্দেহ করে। তাকে তালাক দিতে চায়। গর্ভস্থ শিশুটির মৃত্যু হয় কদমের লাথিতে।
এদিকে প্রকৃতিও যেন আঘাত হানতে উদ্যত হয় জনপদের ওপর। সাইক্লোন ধেয়ে আসে উপকূলে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় মানুষের গড়া সভ্যতার চিহ্ন। প্রবল ঝড়ে ও বানে ভেসে যায় কদম ও নবিতুন। সারা রাতের সাইক্লোনের পর শান্ত হয় প্রকৃতি। একে অপরকে ফিরে পায় কদম ও নবিতুন। নবিতুন তার সাহসিকতায় কদমকে বাঁচায়, প্রচলিত সামাজিক বিধিনিষেধ অমান্য করে। নতুন চরের বুকে তারা এক নতুন জীবন, নতুন সমাজের দিকে এগিয়ে যায়।
নবিতুনের চরিত্রে অভিনয় করেন কবরী। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেন গোলাম মোস্তফা, জহিরুল হক, নাজমুল হুদা বাচ্চু, বাবর, দারাশিকো, নার্গিস, মিনু রহমানসহ অনেকে।
সিনেমার সংগীত পরিচালক ছিলেন আলম খান। গীতিকার মুকুল চৌধুরী। কণ্ঠশিল্পী ছিলেন সাবিনা ইয়াসমিন, রথীন্দ্রনাথ রায়, আবদুল জব্বার।
এ সিনেমার আবদুল জব্বারের কণ্ঠে ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানটি হয়ে ওঠে অনবদ্য। কদম সারেংরূপী ফারুকের নিজের দেশের প্রতি মমতা, বাড়িতে রেখে যাওয়া স্ত্রীর প্রতি আকুলতা ফুটে ওঠে ‘ওরে নীল দরিয়া গানে’।
[ফরুকের লেখা নিবন্ধটি কোন পত্রিকায় কবে প্রকাশিত হয়েছিল সে বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে কেউ সহযোগিতা করতে পারলে গ্লিটজ প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করে নেবে। তথ্য দেওয়ার ঠিকানা: [email protected]]