গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে প্রস্তাব এরই মধ্যে বিইআরসিতে

তবে ‘আপাতত’ খুচরায় দাম বাড়বে না বলে আশ্বস্ত করেছেন প্রতিমন্ত্রী।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 21 Nov 2022, 06:40 PM
Updated : 21 Nov 2022, 06:40 PM

পাইকারিতে দাম বাড়ানোর পর গ্রাহক পর্যায়ে ‘আপাতত’ বাড়বে না বলে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ আশ্বস্ত করলেও পাইকারি বিক্রেতাদের তোড়জোড় থেমে নেই।

সোমবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ২০ পয়সা করে।

চলমান সংকটের মধ্যে এই সিদ্ধান্তের পরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম বাড়লেও গ্রাহকদের উপর তা এখনই প্রভাব ফেলবে না।

তবে এই ঘোষণার আগের দিন রোববার খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়াতে বিইআরসির কাছে আবেদন করে রাখে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণকারী ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি-ওজোপাডিকো।

কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আজহারুল ইসলাম সোমবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ওই আবেদনে পাইকারিতে মূল্যবৃদ্ধি সাপেক্ষে খুচরা পর্যায়ে দাম সমন্বয় চাওয়া হয়েছে।

“আমরা মোটামুটি ব্রেক ইভেনে আছি। তবে গত অর্থবছরে কিছুটা লোকসান হয়েছে। এজন্য নতুন করে দাম বাড়ালে সেটা সমন্বয় করেই আমাদের চলতে হবে। সেই বিবেচনায় মূল্যবৃদ্ধির আবেদনটি করা হয়েছে।”

তবে সোমবার পাইকারিতে মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার সময় বিইআরসির চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল বলেন, “পাইকারিতে মূল্য বাড়ানো হলেও এই অজুহাতে বিতরণ কোম্পানিগুলো খুচরায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ পাবে না। দাম বাড়াতে হলে তাদেরকে আবেদন নিয়ে বিইআরসিতে আসতে হবে। সেখানে বিচার বিশ্লেষণ করে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

এ দিন সচিবালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, “গ্রাহক পর্যায়ে আদৌ দাম বাড়ানোর প্রয়োজন আছে কি না তা বিইআরসির উপর নির্ভর করছে। আপাতত গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ছে না। গ্রাহক পর্যায়ে যাতে স্বস্তি দেওয়া যায়, সেই বিষয়টিও আমরা বিবেচনা করব। এখন যেটা (দাম বৃদ্ধি) হয়েছে গ্রাহক পর্যায়ে নয়।”

Also Read: পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ল ১৯.৯২%

Also Read: বিদ্যুতের দাম আপাতত গ্রাহক পর্যায়ে বাড়ছে না: প্রতিমন্ত্রী

সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে (খুচরা) বিদ্যুতের দাম সর্বশেষ বাড়ানো হয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখন পাইকারিতেও দাম বাড়ে। বিতরণকারীদের জন্য দর ইউনিট প্রতি (প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা) ৫ টাকা ১৭ পয়সা নির্ধারণ করে দিয়েছিল বিইআরসি।

চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি নিজেদের ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতির তথ্য তুলে ধরে বিদ্যুতের পাইকারি দাম ৬৬ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫৮ পয়সা করার প্রস্তাব নিয়ে আসে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি। তবে সেই আবেদনে বেশ কিছু অসঙ্গতি ও তথ্যের ঘাটতি তুলে ধরে তা ফেরত পাঠায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি।

দ্বিতীয় দফায় আবারও আবেদন করে পিডিবি। সেই আবেদনের ওপর গত ১৮ মে গণশুনানি হয়। আরও কিছু তথ্য ও লিখিত মতামতের জন্য ৩১ মে পর্যন্ত পিডিবিকে সময় দেয় বিইআরসি। কারিগরি কমিটি পিডিবির ১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির হিসাব দাঁড় করিয়ে তা পোষাতে বিদ্যুতের দাম ৫৮ শতাংশ দাম বাড়ানোর পরামর্শ দেয়।

তবে ১৩ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে শুনানির আদেশ ঘোষণার দিন সবাইকে চমকে দিয়ে পাইকারি বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত রাখার কথাই জানিয়েছিলেন বিইআরসির চেয়ারম্যান।

এর ৪০ দিনের মাথায় আবার কেন দাম বাড়ানোর আদেশ জারি করা হলো, এর ব্যাখ্যায় বিইআরসির চেয়ারম্যান বলেন, শুনানি ও পরবর্তী মতামত বিশ্লেষণ করে দাম বাড়ানো হলে এর অনিবার্য প্রভাব নিরসনের বিষয়ে পিডিবির ভূমিকা কী হবে সেই বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিদ্যুতের ক্রয়- সংক্রান্ত কিছু তথ্যের ঘাটতি ছিল যা শেষ পর্যন্ত জানা যায়নি। এছাড়া বৃহৎ ক্রেতা হিসাবে পিডিবি ছাড়াও অন্যান্য সংস্থা বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ কিনছে জানতে পেরে সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু পাওয়া যায়নি।

“এসব সমস্যার সমাধান করে ১৩ নভেম্বর পিডিবি আদেশ পুনঃবিবেচনার আবেদন দাখিল করে। সেই আবেদন বিবেচনায় নিয়ে, বিস্তারিত পর্যালোচনা ও পরীক্ষা শেষে- আজকের আদেশটি দেওয়া হলো।”

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার বিষয়ে সম্প্রতি সমঝোতায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ সরকার। ওই ঋণের জন্য বিভিন্ন শর্তের কথা তখন আলোচনায় আসে। আইএমএফ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরের সময় বিইআরসির সঙ্গেও বৈঠক করে। আইএমএফের চাপেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে কিনা, সেই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল বিইআরসি চেয়ারম্যানের কাছে।

উত্তরে চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল বলেন, “আমরা কোন পদ্ধতিতে বিদ্যুতের মূল্যহার ঠিক করি তারা সেটা বুঝতে চেয়েছে। আমরা তাদের বোঝানোর পর এ নিয়ে তারা আর কিছুই বলেনি। বিদ্যুতের মূল্যহার বাড়ানোর বিষয়ে আইএমএফের কোনো বক্তব্য ছিল না। তাদের চাপে পড়ে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেনি।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক