সেন্ট মার্টিনে বিদ্যুতের দাম বেড়ে ৬২ টাকা ইউনিট, দুশ্চিন্তায় ব্যবসায়ীরা
বেসরকারি উদ্যোগে ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা হয়। ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড সেটি চালু করে।
দিনে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ আর রাতে অন্ধকারে থাকে পুরো প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন। এর মধ্যেই শুরু হচ্ছে পর্যটন মৌসুম। স্বল্প সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যেই ১ নভেম্বর থেকে বাড়ানো হয়েছে দ্বীপটির বিদ্যুতের দাম।
সেন্ট মার্টিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড প্রতি ইউনিট আবাসিক বিদ্যুৎ ৪২ টাকা থেকে ১০ টাকা বাড়িয়ে ৫২ টাকা এবং বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ ৫২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২ টাকা করেছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছেন সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, আশির দশকে সরকারিভাবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জেনারেটরভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছিল। সেখান থেকে পাঁচ শতাধিক গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হত।
১৯৯৪ সালের ঘূর্ণিঝড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যুতের খুঁটি ও সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে সেটি বন্ধ আছে।
এরপর বেসরকারি উদ্যোগে ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা হয়। ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড সেটি চালু করে। তখন থেকে বিদ্যুতের দাম সরকারি দামের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে যায় বলে বাসিন্দাদের অভিযোগ।
সম্প্রতি আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে স্থানীয়রা এর প্রতিবাদ করেন। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে ২১ অক্টোবর বিকালে দ্বীপের ইউরো-বাংলা রিসোর্টের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন দেড় শতাধিক গ্রাহক।
এতে বক্তব্য দেন সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. নুরুল আলম, টেকনাফ উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ ইকবাল।
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় ক্ষোভ জানিয়ে দ্বীপের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী জিয়াউল হক বলছেন, “এত বেশি দাম দিয়েও দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। তার মধ্যে রাতে অন্ধকারে থাকতে হয়। সামনে পর্যটন মৌসুমী চিন্তায় আছি আমরা।”
হোটেল মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, “দ্বীপের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুতের উচ্চ মূল্যের কারণে ভোগান্তিতে রয়েছেন। একদিকে নিয়মিত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে দামও বাড়ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটননির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।”
তিনি বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি প্রিপেইড মিটারে রিচার্জের টাকা থেকে বিভিন্ন খাতে অর্থ কেটে নেওয়া এবং মিটার চার্জ আদায় নিয়েও গ্রাহকদের অসন্তোষ রয়েছে।
এ ব্যাপারে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের সেন্ট মার্টিন কার্যালয়ের প্রকৌশলী মোহাম্মদ শিহাব বলেন, “প্রকল্পটি স্থাপনের সময় বিদ্যুতের চাহিদা অনেক কম ছিল। এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা প্রবেশ করায় চাহিদা বেড়েছে। ফলে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “এ ছাড়া পর্যটন মৌসুমে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা করছে কোম্পানি।”
‘দ্বীপে ৩০০টির বেশি জেনারেটর’
পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে সেন্ট মার্টিনে পরিচালিত কাছিম প্রজনন কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবীদের সুপারভাইজার আবদুল আজিজ বলেন, জেনারেটরের শব্দ ও কম্পনে ভয় পেয়ে অনেক সময় মা কাছিম ডিম না পেড়েই গভীর সমুদ্রে ফিরে যায়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এ ধরনের জেনারেটর বড় ধরনের ক্ষতি করছে।
তার হিসাবে, বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বর্তমানে দ্বীপে ৩০০টির বেশি জেনারেটর রয়েছে।
এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপ-পরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ১ নভেম্বর থেকে সাড়ে চার মাসের জন্য সেন্ট মার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এ সময় জেনারেটরের শব্দদূষণ এবং ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। নানা কারণে সেন্ট মার্টিনের অচল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সচল করা সম্ভব হয়নি। সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দ্বীপের বিদ্যুৎ সংকট দূর হবে।
সরকারি উদ্যোগে বিদ্যুৎ চান দ্বীপবাসী
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ছৈয়দ আলম বলেন, প্রথম দুই বছর ঠিকমতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছিল। এখন দিনে তিন ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। বাকি সময় সরবরাহ বন্ধ থাকে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে দ্বীপের মানুষ প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
“সরকারিভাবে পিডিপির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলে আমরা স্বাগত জানাবো। কোনো বাসিন্দা কিংবা ব্যবসায়ী ইউনিটপ্রতি ৬২ টাকা বিদ্যুতের বিল মেনে নেবে না।”
তিনি বলেন, সরকারিভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে দ্বীপে কেবল স্থাপন করে বিদ্যুৎ আনা হোক। যাদের স্থাপনা রয়েছে, তাদের ছাদ ব্যবহার করে সোলারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।”
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, “বিদ্যুতের সংকটের বিষয়টি আমরা সরকারের কাছে তুলে ধরেছি। কিছুদিন আগে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকে আমরা জানিয়ে দিয়েছিলাম, বাড়তি দামে আমাদের বিদ্যুতের প্রয়োজন নেই। প্রতিষ্ঠান চাইলে তাদের বিদ্যুৎ নিয়ে চলে যেতে পারে। আমরা দ্বীপবাসীর সুবিধার্থে সরকারিভাবে পিডিবির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি করছি।”
তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দ্বীপের পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্ব পাশের সৈকত এলাকায় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা গেলে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। বর্তমানে ব্যক্তি মালিকানাধীন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ছাড়া দ্বীপে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা নেই। সরকারের প্রতি সেন্টমার্টিন মানুষের একটাই দাবি, সরকারিভাবে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা।
যা বলছে বিদ্যুৎ কোম্পানি
ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড ও ব্লু মেরিন রিসোর্টের মালিক জাফর আহমদ পাটোয়ারী বলেন, পর্যটন মৌসুমে দ্বীপে পর্যটক আসবেন। তখন ২৩০টির বেশি হোটেল-রিসোর্ট, ২০০টির বেশি রেস্তোরাঁ ও দোকানপাট চালু হবে। এতে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোওয়াটে পৌঁছাতে পারে।
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ থেকে পাওয়া যাবে প্রায় ১৮০ কিলোওয়াট। বাকি বিদ্যুৎ জেনারেটর চালিয়ে সরবরাহ করতে হবে। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা। টেকনাফ থেকে দ্বীপে ডিজেল আনতে লিটারে আরও ৪০ টাকা খরচ হয়। এসব ব্যয় বিবেচনায় নিয়েই ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
“২৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে সিস্টেম লস বাদ দিয়ে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১৩৮ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এই বিদ্যুৎ দিয়ে এক হাজারের বেশি গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।”
জাফর আহমদ পাটোয়ারী বলেন, দ্বীপে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক বা টমটমের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার জন্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে তার অভিযোগ, টমটমের ব্যাটারি চার্জের তিন ভাগের দুই ভাগই চোরাই সংযোগের মাধ্যমে নেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রায় ৬০০টি বাসাবাড়ির মিটার থেকে কয়েকশ বাসাবাড়িতে অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে কর্মীরা বাসাবাড়ি কিংবা ব্যাটারি চার্জের গ্যারেজে গেলে তাদের মারধর করা হয়।
প্রকল্পের ব্যাটারির অবস্থাও খারাপ উল্লেখ করে জাফর আহমদ পাটোয়ারী বলেন, প্রকল্পের অধিকাংশ ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেছে। ১০ বছর মেয়াদের ব্যাটারিগুলো সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যেই অচল হয়ে পড়েছে। নতুন ব্যাটারি চীন থেকে আনার জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে। ব্যাটারি আসতে আরও দেড় মাসের মতো সময় লাগতে পারে।
এ ব্যাপারে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, “বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের পক্ষ থেকে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দাম বাড়ানো হবে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল। কিন্তু এর বাইরে আর কিছু জানানো হয়নি। তারা স্থানীয়দের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছিলেন। বিষয়টি আমরা দেখছি।”
