বিশ্ব জ্বালানির রূপান্তর: পারমাণবিক শক্তিকে ছাড়াল সৌরবিদ্যুৎ
২০২৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ নিশ্চিত করে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে জ্বালানি খাতের অন্যতম স্তম্ভ পরমাণু শক্তিকে পেছনে ফেলেছে সৌরবিদ্যুৎ।
সব ধরনের পূর্বাভাস ও হিসাব-নিকাশ ভুল প্রমাণ করে বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুতের সূচকীয় প্রবৃদ্ধি ঘটছে। এখন পরমাণু শক্তিকেও ছাড়িয়ে অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক শক্তির উৎসে পরিণত হয়েছে সৌরবিদ্যুত।
বিবিসি লিখেছে, বর্তমানে ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে বিশ্বের সৌরবিদ্যুৎ খাত। কেবল এক দশক আগে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের মোট চাহিদার কেবল ১ শতাংশ আসত সৌরশক্তি থেকে।
২০২৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ নিশ্চিত করে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে জ্বালানি খাতের অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসাবে থাকা নিউক্লিয়ার পাওয়ারকে পেছনে ফেলতে চলেছে সৌরবিদ্যুৎ।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক জ্বালানি বিষয়ক গবেষণা কোম্পানি ‘এমবার’-এর পরিসংখ্যান অনুসারে, বিশ্বজুড়ে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০২৫ সালেই পরমাণু বিদ্যুতের উৎপাদনকে স্পর্শ করেছিল।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত ১২ মাসের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সৌরবিদ্যুৎ এখন পরমাণু শক্তিকে ছাড়িয়ে এর চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
এ নিয়ে এমবারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেভ জোন্স বলেছেন, “বিশ্বের সব পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদনকে ছাড়িয়ে সৌরশক্তি থেকে বেশি বিদ্যুৎ তৈরি হওয়া নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর মাইলফলক।”
চীনের বড় সোলার পার্ক থেকে শুরু করে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা সৌর বিদ্যুতের নতুন জোয়ার সবমিলিয়ে সৌরশক্তির এ নাটকীয় উত্থান পূর্বের সব হিসাবকেই পেছনে ফেলেছে।
যে সাতটি মূল কারণে সৌরবিদ্যুত ‘অপ্রতিরোধ্য শক্তি’ হয়ে উঠেছে তা হল–
১. ধারণার চেয়েও বড় শক্তির উন্মেষ
যুক্তরাজ্যের ‘ইউনভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড’-এর জ্বালানি ও জলবায়ু নীতি বিষয়ের অধ্যাপক জান রোজেনো বলেছেন, “সৌরশক্তি এখন বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের প্রধান ইঞ্জিনে পরিণত হয়েছে।”
ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাওয়া নতুন বিদ্যুৎ উৎস হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ, যা বিশ্বজুড়ে নতুন বিদ্যুৎ চাহিদার সবচেয়ে বড় যোগানদাতা। ২০২৫ সালে বিশ্বে নতুন তৈরি হওয়া বিদ্যুত চাহিদার তিন-চতুর্থাংশই পূরণ করেছে সৌরশক্তি।
এর মাধ্যমে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনকেও ছাড়িয়েছে সৌরবিদ্যুত। বায়ুবিদ্যুৎও বাড়ছে, তবে গতি কিছুটা ধীরে।
অধ্যাপক ও গবেষক রোজেনো বলেছেন, “বিষয়টি মোটেও অনুমিত ছিল না।”
মূলধারার পূর্বাভাসগুলোতে বছর পর বছর ধরে সৌরশক্তির সম্ভাবনাকে কম করে দেখা হয়েছে।
প্যারিসভিত্তিক প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি’ বা আইইএ-এর মতো সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে ধরা হয়েছিল, সৌরবিদ্যুতের প্রবৃদ্ধি হবে ধীর ও রৈখিক এবং খরচও কমবে খুব ধীরে। তবে দুটি ধারণাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
২০২৬ সালে বিভিন্ন তথ্য অনুসারে, বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন পারমাণবিক শক্তিকে ছাড়িয়ে যাবে। ২০০০ সাল থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন যেখানে কমবেশি একই জায়গায় স্থির রয়েছে, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ গুণ
২. কল্পনাাতীত সাশ্রয়ী
গত ১৫ বছর ধরে পরিপক্ক প্রযুক্তি হিসাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া সৌরবিদ্যুৎ ২০২০ সালেই ইতিহাসের সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎস হিসাবে স্বীকৃতি পায়।
এরপর থেকে সৌরবিদ্যুতের প্রযুক্তিগত স্কেল বেড়েছে, কার্যসক্ষমতা ও দক্ষতা বেড়েছে এবং প্যানেলে ব্যবহৃত সিলিকন ও রূপার পরিমাণ কমেছে, যার ফলে উৎপাদন খরচ আরও আশাতীতভাবে কমেছে বলে জানান এমবারের ডেভ জোন্স।
অধ্যাপক রোজেনো বলেছেন, “চীনের বড় ম্যানুফ্যাকচারিং স্কেল ও বর্তমান অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার কারণে সোলার মডিউলের দাম ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।”
২০২৩-২৪ সালে সোলার প্যানেলের দামে বড় ধস আমাদের এমন এক যুগে নিয়ে এসেছে যাকে জোন্স বলছেন ‘অফেন্সিভলি চিপ’ বা বিস্ময়কর রকমের সাশ্রয়ী।
“একটি প্যানেল নিজেই এখন এতটাই সাশ্রয়ী হয়ে গেছে যে, ১০০ ডলারের চেয়েও কম দামে তা পাওয়া যায়... আর এটা কোনো অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই আপনাকে টানা ৩০ থেকে ৪০ বছর বিদ্যুৎ দিয়ে যাবে।”
কেবল অর্থনৈতিক দিক থেকেই যে সৌরবিদ্যুৎ খরচ কমাচ্ছে তা নয়।
গবেষকরা বলছেন, আমেরিকার ক্রমাগত বাড়তে থাকা বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জলবায়ু সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য বাবদ প্রায় ২৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলার সাশ্রয় হয়েছে।
৩. বিশ্বজুড়ে সৌরশক্তির বিস্তার
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে চীন এখনও বিশ্বের শীর্ষস্থানে রয়েছে। তবে তারা একক কোনো খেলোয়াড় নয়।
যুক্তরাষ্ট্র সৌর প্রযুক্তির ওপর নানা ধরনের শুল্ক আরোপ করার পরও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এবং এর পরিধি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিজয়ী হওয়া অঙ্গরাজ্যগুলোতে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে যত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে তা দিয়ে দেশটির এক-তৃতীয়াংশের বেশি পরিবারের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
‘ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড’-এর মার্কিন মিটিগেশন পাথওয়ে বিশেষজ্ঞ অ্যালিসিয়া ঝাও বলেছেন, “পরিবেশবান্ধব শক্তির বিকাশে বাধা দেয় এমন শুল্ক ও অন্যান্য ফেডারেল নীতি খরচ বাড়াবে এবং এই খাতের সম্প্রসারণ ধীর করবে।
“তবে সৌরশক্তি এত দ্রুত প্রসারিত হওয়ার পেছনে মূল অর্থনৈতিক হিসfব-নিকfশটাই বড় ভূমিকা রেখেছে। খরচ বেড়ে যাওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিদ্যুতের জন্য সৌরশক্তি এখনও অন্যতম সাশ্রয়ী উৎস। রাজনীতি বা দলীয় ব্যবধান ভুলে এটা সব জায়গায় গড়ে উঠছে।”
এদিকে, ভারত জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসিল ফিউয়েল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের চেয়েও দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত দুই বছরে দেশটিতে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদার ৬০ শতাংশই পূরণ করেছে নতুন গড়ে ওঠা সৌরবিদ্যুৎ।
অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ায় এখন ৪০ লাখেরও বেশি বাড়িতে সোলার প্যানেল রয়েছে, যা দেশটির মোট গৃহস্থালির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
৪. জীবাশ্ম জ্বালানির অনিশ্চয়তা
পাকিস্তান ও লেবাননের মতো দেশগুলোও দ্রুতগতিতে সৌরবিদ্যুৎ বসাতে শুরু করেছে। পুরো আফ্রিকা জুড়ে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ সোলার প্যানেল বসানো হচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেইন সংঘাত ও ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে ডিজেলের আকাশচুম্বী দাম অনেক জায়গায় অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবকে আরও বেশি সৌরবিদ্যুতের পক্ষে এনে দিয়েছে।
আফ্রিকার অনেক দেশের জন্য সৌরবিদ্যুত বিশেষ ভূমিকা রাখছে, যেখানে জাতীয় গ্রিড নির্ভরযোগ্য না হওয়ায় বসতবাড়ির ডিজেল জেনারেটরই ছিল মূল ভরসা।
তবে বর্তমানে এর বিকল্প হিসাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ছাদের ওপর বসানো সোলার প্যানেল, যার প্রায় সবই চীন থেকে আমদানি করা।
তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো ও পরিবেশ দূষণ রোধের অংশ হিসাবে পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ি আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে ইথিওপিয়া।
যেসব দেশে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক গ্রিড বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটাতে পারছে না, সেখানেও দ্রুত আলো ছড়াচ্ছে সৌরশক্তি।
সৌর প্রযুক্তির দ্রুততম প্রবৃদ্ধির কারণে নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে পাকিস্তান। ২০১৯ সালে দেশটিতে মোট বিদ্যুতের কেবল ২ শতাংশের কম আসত সৌরশক্তি থেকে।
বর্তমানে গ্রিডের চড়া দাম, অনির্ভরযোগ্যতা ও চীন থেকে কম দামে আসা সোলার প্যানেলের দৌলতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশে।
এ নিয়ে এমবারের ডেভ জোন্স বলেছেন, “পাকিস্তানের বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর... সেখানে সৌরশক্তির এই বিপ্লব মানুষের নিজ খরচে ঘটেছে। কোনো ব্যাংক ঋণ ছাড়াই মানুষ এটা কেন সাধ্যের মধ্যে পাচ্ছে।"
লেবানন থেকে শুরু করে নাইজেরিয়ার মতো অন্যান্য ‘সান বেল্ট’ বা রৌদ্রোজ্জ্বল দেশগুলোতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
অধ্যাপক রোজেনো বলেছেন, “সৌরশক্তি মানুষকে সরকার বা বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোম্পানির ওপর নির্ভর না করে নিজেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এই অনিশ্চিত সময়ে এমন গতি ও স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ।”
৫. ব্যাটারি প্রযুক্তির অভাবনীয় বিপ্লব
সৌরবিদ্যুৎ অবশ্যই কেবল দিনের বেলায় তৈরি হয় যখন সূর্য আলো দেয়। এ শক্তিকে যে কোনো সময় ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুতে রূপান্তর করতে হলে ব্যাটারির সঙ্গে যোগ করা প্রয়োজন।
সৌরবিদ্যুতের বিকাশকে পূর্ণতা দিতে ব্যাটারির ক্ষেত্রেও বিপ্লব ঘটেছে।
রোজেনো বলেছেন, “রৌদ্রোজ্জ্বল অঞ্চলগুলোতে নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চেয়ে সৌরশক্তি ও ব্যাটারির যৌথ প্রযুক্তি ব্যবহার করা এখন তুলনামূলক সাশ্রয়ী। দুপুরের রোদকে ধরে রেখে সন্ধ্যায় ব্যবহারের দৈনিক যে চ্যালেঞ্জ ছিল তা ব্যাটারি প্রযুক্তি দিয়ে অনেকটাই সমাধান করা গেছে।”
ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে সন্ধ্যায় ব্যবহারের শীর্ষ সময়ে (রাত ৭টা থেকে ৯টা) সৌরশক্তি ও ব্যাটারির মাধ্যমে বিদ্যুতের মোট চাহিদার চার ভাগের এক ভাগের বেশি মেটানো সম্ভব হয়েছে।
ভারমন্টের মতো মার্কিন অঙ্গরাজ্য এখন গ্রিডের সঙ্গে যোগ গৃহস্থালি ব্যাটারি ব্যবস্থা চালু করছে, যা প্রায়শই সৌর প্যানেলের সঙ্গে সমন্বিত থাকে।
তবে ঋতু পরিবর্তন, মেঘলা দিন বা বর্ষাকালের মতো দীর্ঘ মেয়াদে সৌরশক্তি সঞ্চয় করে রাখার ক্ষেত্রে এখনও কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, বললেন রোজেনো ও জোন্স দুজনই।
সার্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে সৌরশক্তির একীকরণ বা ইন্টিগ্রেশন এখনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেন রোজেনো।
৬. সর্বক্ষেত্রে বিদ্যুৎ চালিত ব্যবস্থার বিস্তার
আগে যেসব ক্ষেত্রে সরাসরি বিদ্যুতের ব্যবহার ছিল না, যেমন ইলেকট্রিক গাড়ি সেসব খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বিদ্যুৎচালিত ব্যবস্থা চালুর মূল চাবিকাঠি হিসাবে দেখা হচ্ছে সৌরশক্তিকে।
তুরস্কের জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনেও এই বিদ্যুৎকেন্দ্রিক রূপান্তরকে অন্যতম প্রধান বিষয় হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এমবারের ডেভ জোন্স বলেছেন, “সৌরশক্তি কেবল বিদ্যুতের রাজত্বেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটা জ্বালানি খাতের রাজায় পরিণত হতে চলেছে।”
এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ‘কপ২৬’-এ প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক অলাভজনক সংগঠন ‘লং ডিউরেশন এনার্জি স্টোরেজ কাউন্সিল’-এর প্রধান নির্বাহী জুলিয়া সাউডার।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, “নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই সব ক্ষেত্রে বিদ্যুৎচালিত ব্যবস্থা চালুর ঝুঁকি রয়েছে। যথেষ্ট নমনীয়তা না রেখে হঠাৎ বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বাড়ালে পুরো ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই সবকিছু বিদ্যুৎচালিত করলেই যে টেকসই হবে, এমন নয়।”
অধ্যাপক রোজেনো বলেছেন, সৌরবিদ্যুতের মূল সীমাবদ্ধতা এখন আর সোলার প্যানেল বা দামে নয়, বরং সমস্যা বিদ্যুৎ গ্রিড, সঞ্চয় ব্যবস্থা ও আমরা কত দ্রুত চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে পারছি তার ওপর।
“আসল প্রশ্ন এটা নয় যে সৌরশক্তি বাড়বে কি না, বরং প্রশ্ন হল আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও কোম্পানিগুলো এর সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে কি না।”
গবেষক অ্যালিসিয়া ঝাও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টার ও সর্বজনীন বিদ্যুৎ রূপান্তরের ফলে গত কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের চাহিদা হু হু করে বাড়ছে ও শক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জাতীয় অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“যুক্তরাষ্ট্রে নতুন যোগ হওয়া মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার ৯০ শতাংশেরও বেশি আসছে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি থেকে। নিরাপত্তা ও দ্রুত সরবরাহযোগ্য বিদ্যুতের এই তীব্র চাহিদা বর্তমান ফেডারেল সরকারের সমর্থন ছাড়াও পরিবেশবান্ধব শক্তির আরও বড় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে পারে।”
৭. উদীয়মান প্রযুক্তি
গেল কয়েক বছরে জার্মানিতে ‘প্লাগ-ইন সোলার প্যানেল’ বা বারান্দায় ব্যবহারযোগ্য সোলার প্যানেল দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো ছাদের প্যানেলের তুলনায় কম বিদ্যুৎ তৈরি করলেও একটি সকেটের মাধ্যমেই সরাসরি গৃহস্থালি লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।
জার্মানির সাফল্যের পর ক্যালিফোর্নিয়া’সহ একাধিক মার্কিন অঙ্গরাজ্য ও অন্যান্য দেশেও এটা অনুমোদন পেয়েছে।
অন্যদিকে, জমি ব্যবহারের জটিলতা কাটাতে কৃষিকাজ ও সৌর প্যানেলের যৌথ ব্যবহার অর্থাৎ ‘এগ্রিভোল্টাইক্স’ প্রযুক্তি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
পাশাপাশি, ভাসমান সোলার প্ল্যান্ট, ‘মিরর’ সোলার প্ল্যান্ট থেকে শুরু করে পেরোভস্কাইট প্যানেল ও সোলার উইন্ডোর মতো নিত্যনতুন প্রযুক্তি আগামী বছরগুলোতে দ্রুত প্রসার লাভ করতে পারে।
সৌরশক্তির ভবিষ্যত
এমবারের ডেভ জোন্স বলেছেন, ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়তে থাকলেও এর বার্ষিক বৃদ্ধির গতি প্রথমবারের মতো কিছুটা মন্থর হতে পারে।
এর নেপথ্যে রয়েছে চীন।
দেশটির সরকার নতুন সৌর প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও সহায়তার নিয়মে পরিবর্তন আনায় আগের নির্ধারিত দামের সুযোগ নিতে ২০২৫ সালেই রেকর্ড সংখ্যক প্যানেল বসানো হয়েছিল। তবে চীনের বাইরে চিত্রটি ভিন্ন।
জোন্স বলেছেন, “চীনকে বাদ দিলে হিসাব করলে দেখা যায়, গত বছরের চেয়ে এ বছর বিশ্বজুড়ে আরও বেশি সোলার প্যানেল বসানো হচ্ছে।”
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংগঠন আইইএ-এর ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ২০২৫ সালের তুলনায় দ্বিগুণে পৌঁছাবে ও জলবিদ্যুৎকে পেছনে ফেলে বিশ্বের তৃতীয় বড় বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হবে।
অধ্যাপক রোজেনো বলেছেন, “যেখানেই গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যয়বহুল ও অনির্ভরযোগ্য, সেখানকার অর্থনৈতিক বাস্তবতা মানুষকে সৌরশক্তির দিকে টেনে নিচ্ছে। তবে একটিই শর্ত, যদি চীনা সোলার প্যানেল আমদানিতে জটিলতা তৈরি হয় তবে এই রূপান্তর আর আগের গতিতে ঘটবে না।”
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বজুড়ে সম্প্রতি বহু নেতিবাচক খবর সামনে এসেছে।
২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত বিশ্ব উষ্ণায়নের ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা পেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এখন প্রকট ও এ শতাব্দীতেই বিশ্ব জলবায়ুর বেশ কিছু বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তবে সৌরবিদ্যুতের এই অভাবনীয় সাফল্যই প্রমাণ মেলে, আমরা এমন কিছু ক্ষেত্রেও অগ্রগতি করছি, যা আগে কখনও কল্পনাও করা যায়নি।
জোন্স বলেছেন, এক দশক আগে কেউ ধারণাও করতে পারেনি এমনটা ঘটবে। পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনে এ অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি সরাসরি নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সংখ্যা কমিয়ে এনেছে।
“জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আগে যেখানে তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ার চরম আশঙ্কা করা হচ্ছিল, পরিবেশবান্ধব শক্তির দরুন সেই আশঙ্কার মাত্রা এখন ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নেমে এসেছে।”
