Published : 09 Feb 2026, 01:43 AM
আর এক সপ্তাহের মধ্যে রাষ্ট্রের হাল ধরবে নতুন একটি সরকার; বদলে যাওয়া বাংলাদেশে বিপুল প্রত্যাশার চাপ মাথায় নিয়ে তরী বাইতে গিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নানা ঝড়-ঝঞ্ঝার মোকাবেলা তাদের করতে হবে, তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে স্থবিরপ্রায় অর্থনীতির প্রপেলারে গতি সঞ্চার করা।
ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামল শেষে দেশ যখন গণতান্ত্রিক উত্তরণের চূড়ান্ত সোপানে, তখন পরবর্তী সরকার অর্থনীতির বন্ধুর পথ কেমন করে পাড়ি দেবে, সেই আলোচনা ঘুরেফিরে আসছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের প্রলেপ দেওয়ার আওয়াজ তুললেও সেখানে সফলতার পাল্লা ভারি হওয়ার বদলে ব্যর্থতাই উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে সকল খাতে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের ‘দুঃশাসনের’পাতা উল্টে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর তাগিদ যেমন নতুন সরকারের ওপর থাকবে, তেমনি দুর্নীতি আর ভুল নীতির নির্মম শিকার অর্থনীতিকে সুস্থ করে তুলতে যথাযথ দাওয়াই ও শুশ্রূষার দরকার হবে।
এমন বাস্তবতায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর থিতু হওয়ার আগেই বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়বে নির্বাচিতরা।
দীর্ঘদিন ধরে চড়ে থাকা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের ক্ষত নিরাময় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার বহুমুখী চাপ মিলিয়ে কঠিন এক পথ পাড়ি দিতে হবে আগামী প্রশাসনকে।

মহামারীর অভিঘাত আর চব্বিশের অভ্যুত্থান দেশের অর্থনীতিকে যে খাদের কিনারে পৌঁছে দিয়েছিল, সেখান থেকে উদ্ধারের বদলে নতুন করে পতন ঠেকানোতেই বেশি মনোযোগী ছিল অন্তর্বর্তী সরকার। রাষ্ট্র সংস্কারের বিরাট ডামাডোলে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন বলতে তেমন কিছু হয়নি। বরং বর্তমান সরকার উত্তরসূরিদের জন্য যে অর্থনীতি রেখে যাচ্ছে, সেখানে যোগ হয়েছে বিনিয়োগের আস্থাহীনতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, নয়া প্রশাসনকে এসেই চাঁদাবাজির লাগাম টেনে ধরার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে নজর দিতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে বাণিজ্য নীতি তৈরির সঙ্গে সঙ্গে রুগ্ন রাজস্ব কাঠামো ঢেলে সাজাতে হবে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে কীভাবে সমঝোতা করে ব্যবসা বাড়ানো যায়, সেই উপায় খুঁজতে হবে।
পুরনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামো আর গৎবাঁধা রাজনৈতিক ছকের আমূল পরিবর্তন না হলে ‘পুরো বাংলাদেশই বিপদে পড়বে’ বলে আশঙ্কার কথা আসছে।
নির্বাচন শেষে বাংলাদেশের অর্থনীতি কি এতসব চ্যালেঞ্জ সামলে নবযাত্রা শুরু করতে পারবে?
অর্থনীতিবিদ কে এ এস মুর্শিদ বলছেন, এর উত্তর নির্ভর করবে নবনির্বাচিত সরকার কতটা ‘বলিষ্ঠ পদক্ষেপ’ নিতে পারবে তার ওপর।
“বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল যেভাবে চলেছি বহুকাল, সেখান থেকে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়ে আমরা একটা নতুন ধারা রচনা করতে চাইছি। সেজন্য কিছু সুস্পষ্ট উদ্যোগ এখানে দৃশ্যমান হওয়াটা জরুরি।”
তেমন উদ্যোগ নিয়ে নতুন সরকার প্রথম দিন থেকেই যদি জনগণের আস্থা অর্জন করতে না পারে, তাহলে বিপদ আরো বাড়বে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।

কেমন আছে অর্থনীতি?
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার প্রভাব এখন স্পষ্ট; আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে তার বড় অংশ বিদেশে পাচারের ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এখনও প্রকট।
সে সময় অর্থনীতির ক্ষতগুলো নানাভাবে কার্পেটের নিচে চাপা দিয়ে রাখায় প্রকৃত চিত্র অজানাই ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে তার কিছুটা তথ্য বাজারে ছাড়লেও তাদের রেখে যাওয়া ব্যর্থতার চিত্র উঠে আসতে ঢের সময় লাগবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তথ্য প্রবাহে বাধা, তথ্য গোপন এবং প্রয়োজনমাফিক পরিমার্জন ও বদলে নেওয়ার ওই চর্চা অর্থনীতির নীতি তৈরিতে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠেছিল।
তবে নির্বাচনের পর আগামী সংসদে বিরোধী দল ‘শক্তিশালী’ হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় সুস্থ ধারায় ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন।
তবে নতুন ও প্রয়োজনীয় নীতিকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে সেটা যে একটা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, সেই আশঙ্কার কথা তুলে ধরে মিনহাজ মান্নান বলেন, “যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তার বিপক্ষে একটা শক্তিশালী বিরোধী দল থাকবে। ফলে পরবর্তী সরকারের জন্য দেশ পরিচালনা একটা চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।”

দেড় বছর আগে অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে যে দশায় পেয়েছে, বিদায় বেলায় রিজার্ভ ও ব্যাংক খাতের আপাত স্থিতিশীলতা ছাড়া সংখ্যার বিচারে আর কোথাও ইতিবাচক পদাঙ্ক রেখে যেতে পারছেন না।
বিগত সরকারের শেষ সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ধরে রাখা এবং অর্থ পাচারের ফলে ডলারের রিজার্ভ কমতে কমতে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে রেমিটেন্সের প্রবাহ বাড়ে। সঙ্গে রপ্তানি আয় বাড়ায় বাজারে ডলারের যোগান বাড়তে থাকে।
তাতে ১৮ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে ঘুরতে থাকা রিজার্ভ বেড়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুসারে ২৫ বিলিয়ন ডলারে ছাড়ায়। একই সঙ্গে ‘গ্রস’ রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে চলে যায়।
বিনিময় হার বাজারভিত্তিক হওয়ায় রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্সের প্রবাহ বাড়লেও চাপ পড়ে আমদানির ওপর। ডলারের দর প্রায় ৩০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় আমদানি প্রবণতা কমে। আবার রপ্তানির সেই ইতিবাচক ধারাও খুব বেশি টেকসই হয়নি।
টানা ছয় মাস ধরে পণ্য ও সেবা রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় আগের বছরের একই মাসের চেয়ে কমেছে। আর অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মোট রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমেছে। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে রপ্তানি আয়ে ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
আমদানির ক্ষেত্রে দেখা যায়, ডিসেম্বরে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তি হয়েছে ৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ কম।
এ প্রবণতা আগের মাসগুলোতেও দেখা গেছে। এবং নভেম্বর ও অক্টোবরেও এ প্রবণতা ছিল ১০ শতাংশের বেশি। নভেম্বরে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এলসি নিষ্পত্তি ১০ শতাংশ কম ছিল। অক্টোবরে ছিল ১১ দশমিক ৪৮ শতাংশ কম।

অবশ্য রেমিটেন্স প্রবাহ এখনও আশা দেখিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির আরেক গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতিতে আশার আলো দেখা যাওয়ার পর তা আবার নিভু নিভু হতে শুরু করেছে।
আঁটসাঁট মুদ্রানীতিতে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়িয়ে বাজারে মুদ্রা সরবরাহে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলেও টানা কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানার চেষ্টা এক জায়গায় এসে থমকে গেছে।
ধাপে ধাপে কমতে থাকা মূল্যস্ফীতি টানা দুইমাস ধরে আবার বেড়ে চলেছে। ডিসেম্বরে এসে এটি দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে।
এদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে। উচ্চ সুদের হার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আস্থা রাখতে পারছেন না। তাতে বেকারত্বের হার পৌঁছেছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কেমন চলছে–তা দেখার সূচক বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হারেও আশা জাগানোর মত কিছু নেই।
২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ পয়েন্ট কম। এত কম বাস্তবায়নের হার আর কোনো বছর দেখা যায়নি।
একই ধারা চলছে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও। প্রথম ছয় মাসে খরচ হয়েছে বরাদ্দের সাড়ে ১৭ শতাংশ অর্থ, যা আগের চার অর্থবছরের চেয়ে কম।
স্বস্তি নেই বিদেশি ঋণের অর্থছাড়েও। বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে বিদেশি ঋণ, বিনিয়োগ ও অনুদানে উল্লম্ফন দেখাবে–এমন প্রচারণা থাকলেও ঘটেছে উল্টোটা।
ডিসেম্বর শেষে দেখা যাচ্ছে, আগের ছয় মাসে বিদেশি ঋণ ও অনুদানে যে পরিমাণ অর্থ ছাড় হয়েছে, তা গত বছরের ছয় মাসের চেয়ে ২৯ শতাংশ কম।
এদিকে প্রথম ছয় মাসে ১৯৯ কোটি ডলারের ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি মিলেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে সাড়ে ১৩ শতাংশ কম।

ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান বলেন, “সত্যি কথা বলতে, গত ১৫ বছরে অর্থনীতির যে হাল করে গিয়েছে আগের সরকার, এটা কাঙ্ক্ষিত ছিল যে অন্তর্বর্তী সরকার হয়ত কিছুটা রিকভার করবে। তারা ব্যাংক খাতকে কিছুটা সান্ত্বনা দিতে পেরেছেন, কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে আসলে অর্থনীতির কোনো সুখবর তারা দিয়ে যেতে পারেননি।
“দেশের যে সার্বিক ঋণ, টাকার যে মূল্যমান, মূল্যস্ফীতি–কোনোটাতেই কিন্তু সুখবর তারা দিয়ে যেতে পারেননি। ব্যবসা খাতেও কোনো ধরনের আগ্রহ বা উদ্দীপনা তৈরি করতে পারেননি।”
তার ভাষ্য, “ব্যবসায়ীরা হাত গুটিয়ে বসে আছেন, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ইমপোর্ট বন্ধ। সবকিছু মিলিয়ে একটা চূড়ান্ত স্থবির অবস্থান অর্থনীতির। ঠিক এইরকম একটা পরিস্থিতিতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসবে, তার জন্য দেশ পরিচালনা খুবই কঠিন হবে।”
উত্তরণ কোন পথে?
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা মনে করেন, গত দেড় দশকে কাগজে কলমে প্রবৃদ্ধির চমক দেখানো হলেও অর্থনীতিতে কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কার হয়নি। বিশেষ করে কর নীতি, বাণিজ্য নীতি এবং অভ্যন্তরীণ ফিসকাল পলিসির ক্ষেত্রে কোনো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত নিচে। এই ‘রুগ্ন’ রাজস্ব কাঠামো নিয়ে একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন সচল রাখা কঠিন।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার বলেন, “এখন যদি নতুন সরকার অর্থনীতির দিকটা ঘোরাতে চায়, বেশ কিছু গভীর সংস্কার অত্যন্ত প্রয়োজন হয়ে গেছে।”
এ অর্থনীতিবিদ বলছেন, “ট্যাক্স নেট আমাদের কম আছে, কিন্তু খুব কম ট্যাক্স করি—তা না। কিন্তু ট্যাক্স রেট আমাদের খুব বেশি। যেদিকেই তাকান, ট্যাক্স রেট খুব বেশি। আসলে ট্যাক্স সিস্টেমে আমাদের মৌলিক সংস্কার দরকার। সবার আগে এ খাতে মৌলিক সংস্কার করতে হবে নতুন সরকারকে।

“এই ট্যাক্স সিস্টেমে মানুষেরও কষ্ট হচ্ছে, ট্যাক্সপেয়ারদের কষ্ট হচ্ছে আর ট্যাক্স কালেক্টরদের কমপিটেন্স সম্পর্কে এবং ট্যাক্স নীতি সম্পর্কে আমাদের অনেক মৌলিক প্রশ্ন হয়ে যাচ্ছে। সেখানে নতুন পদ্ধতি আনতে হবে।”
কর কাঠামোর কারণে বিনিয়োগেও যে চাঙ্গাভাব আসে না, সে কথা তুলে ধরে বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক এ পরামর্শক বলেন, “বিদেশি বিনিয়োগ তো এই ট্যাক্স সিস্টেমে আসতে চাইবে না। এবং যারা এসেছে তারা অনেক কমপ্লেইন করছে। হঠাৎ এসে (কর্ম কর্মকর্তারা) বলে যে এত কোটি টাকা তোমার গায়ে পড়ে গেছে। একদম ভুয়া।
“কারণ তারা অনেক ইয়ে করে (ঘুষ চায়) যে আমাকে টাকা দেন, তারপর আমরা ঠিক করে দেব। এই ধরনের কতগুলো বিষয় আসছে। সে কারণে আমি বলছিলাম, এখানে ট্যাক্স সিস্টেমে মৌলিক সংস্কার করতে হবে।”
জায়েদী সাত্তারের বিচারে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশও ‘খুব খারাপ’। বিদ্যমান যে বাণিজ্য নীতি, তাতে বিদেশি বিনিয়োগ আসা ‘খুবই কঠিন’।
“আমাদের বাণিজ্য নীতির যথেষ্ট উদারীকরণ দরকার আছে। ট্যারিফ যৌক্তিীকরণ দরকার আছে। সেটা না হওয়ায় আমাদের আরেকটা সমস্যা যেটা হচ্ছে, আমরা তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বাড়াতে পারছি না।”
এর সঙ্গে আইন শৃঙ্খলার উন্নতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করে আস্থা ফেরানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুর্শিদ।
তিনি বলেন, নতুন সরকারকে অনেক কাজে একসঙ্গে হাত দিতে হবে। প্রথম কাজটা হবে অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।
“অনেকের নানা ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়ে গেছে, ল্যাক অফ কনফিডেন্স। বিজনেস ইনভেস্টমেন্টের জন্য কনফিডেন্স অপরিহার্য, সেখানে একটা শক্তিশালী ভূমিকা রাখা ইমিডিয়েট প্রয়োজন হবে।
“আর কনফিডেন্সটা রেস্টোর করতে হলে শুধু অর্থনীতি দিয়ে হয় না, এখানে আপনার ল অ্যান্ড অর্ডারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদাবাজি, ল অ্যান্ড অর্ডার এই জিনিসগুলোকে প্রথম প্রহরেই যদি খুব শক্ত হাতে ডিল করতে না পারি, তাহলে পরে আরও কঠিন হয়ে যাবে।”

এ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, দায়িত্ব নিয়েই নতুন সরকারকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি ‘শক্ত বার্তা’ দিতে হবে।
“সেটা অর্থনীতির জন্য জরুরি, রাজনীতির জন্য জরুরি, স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি। তো ওই স্ট্রং সিগন্যালটা আমরা আসলে আশা করি। উনারা কতটা পারবেন সেটা আমরা দেখব। তার পরের প্রায়োরিটি নিয়ে অনেকের অনেক ধরনের মতামত থাকতে পারে।”
কে এ এস মুর্শিদ মনে করেন, ব্যবসা খাত ছাড়াও কৃষি খাতের প্রাধান্য পাওয়া উচিত। কারণ, দুটো খাতই তার বিচারে ‘সংকটপূর্ণ অবস্থায়’ আছে।
“শেষ বিচারে বটম লাইনটা হচ্ছে কর্মসংস্থান তৈরি করা; দারিদ্র্য বিমোচনের যে উদ্যোগগুলো ছিল, সেগুলো পুনরুদ্ধার করে আরও শক্তিশালী করা।”
একইরকম পরামর্শ দিচ্ছেন ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান, যিনি দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে পুঁজিবাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তিনি বলেন, “প্রথমত, যে সরকার পরিচালনা করবে, সে যে সৎ এবং আন্তরিক, এটা জনগণের কাছে স্পষ্ট করতে হবে। তাহলে জনগণ বিশ্বাস করবে, জনগণ তাকে সময় দেবে, সুযোগ দিবে, তার সাথে সাথে জনগণও হাত মেলাবে।
“কিন্তু সে যদি প্রথম দিন থেকে এ ধরনের কোনো আশ্বাস বা বিশ্বাস তৈরি করতে না পারে, সেক্ষেত্রে অর্থনীতি আরও বড় চ্যালেঞ্জে পড়বে। তার মানে তাকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলেই শুধু হবে না, সেই বার্তাটা জনগণকে বিশ্বাসও করাতে হবে, তারা আসলে চাইছে।”
মিনহাজ মান্নানের কথার মূল বিষয় হল, নতুন সরকারের কথা ও কাজে মিল থাকতে হবে।
“আপনি মুখে বলবেন আপনি দুর্নীতি চান না, কিন্তু আপনি বক্তৃতার সময় ঋণখেলাপিকে পাশে রাখবেন—জনগণ মেনে নেবে না। আপনি বলবেন সন্ত্রাস দমন করবেন, কিন্তু পাশে সন্ত্রাসী দাঁড়িয়ে থাকবে—জনগণ মানবে না।
“আপনি বলবেন শেয়ার বাজার ভালো করবেন, আবার দেখবেন শেয়ার বাজারে যারা লুণ্ঠন-চুরির সাথে জড়িত বড় বড়, তাদেরকে পাশে রেখেছেন মন্ত্রিসভায় বা আশপাশের দলীয় কাঠামোতে, মানুষ তখন বিশ্বাস করবে না। এই জিনিসগুলোকে অ্যাড্রেস করতে হবে।”

নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
মিনহাজ মান্নান মনে করেন, অর্থনীতির পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিমণ্ডল, ক্ষমতার সমীকরণে বাংলাদেশের হিস্যা বুঝে নেবার সক্ষমতাও নতুন সরকারের থাকতে হবে।
“যে সরকার ক্ষমতায় আসুক, সে যদি অর্থনীতিকে পথে ফেরাতে না পারে, বাংলাদেশই বিপদে পড়বে। কারণ আপনাকে দেখতে হবে যে, আমেরিকা, ভারত, পাশে পাকিস্তান, চায়না–বৈশ্বিক রাজনীতির একটা জটিলতার মধ্যে বাংলাদে পড়ে গেছে।
“ফলে বিশ্ব আগে যেভাবে বাংলাদেশকে দেখত, এখন তা দেখে না। বাংলাদেশকেও তারা তাদের রাজনীতির একটা হিস্যা হিসেবে তৈরি করেছে। ফলে পরবর্তীতে যারা ক্ষমতায় আসবে, তারা যদি বৈশ্বিক রাজনীতির সাথে তাল মেলাতে না পারে, সেটাও একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হবে।”
কে এ এস মুর্শিদ বলেন, “আমাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করাটা খুব ডিফিকাল্ট না। এটা মোটামুটি কমন সেন্সের ওপর ভিত্তি করেই করা যায়, কারণ আমাদের সমস্যাগুলো অত্যন্ত মৌলিক ও বেসিক। তবে যেটা কঠিন, সেটা হচ্ছে, আমাদের ‘বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল’ পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
অর্থনীতিবিদ জায়েদী সাত্তারের পরামর্শ হল, কর কমিয়ে বাণিজ্যে প্রাণ ফেরাতে হবে। সেই সঙ্গে শুরুতেই মূল্যস্ফীতি কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে মানুষ স্বস্তি পায়।
“এক দিকে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো স্বাধীনতা দিতে হবে, অন্যদিকে ফিসকাল এবং মানিটারি কোঅর্ডিনেশন যাতে আরও ভালো হয় এবং যাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেজন্য নতুন কিছু চিন্তা করা প্রয়োজন।এবং আমার মনে হয় উচ্চ পর্যায়ের একটা ইকোনমিক পলিসি কাউন্সিল করা প্রয়োজন আছে।”