অভিযোগ বা প্রমাণ পেলে এবং পত্র পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে পরবর্তীতে আচরণ বিধি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
Published : 01 Dec 2023, 12:02 AM
আচরণবিধি নিয়ে প্রশ্ন করায় সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হওয়া, পতাকাবাহী গাড়িতে পুলিশ প্রহরায় মনোনয়ন জমা, হাজার নেতাকর্মী নিয়ে ‘শোডাউন’, মিছিল-স্লোগান সবই হয়েছে চট্টগ্রামে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন।
আচরণ বিধি লঙ্ঘনের এমন ঘনঘটার মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর্ব।
আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বা মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নির্বাচনী আচরণবিধি মানার তোয়াক্কা করেননি খুব একটা।
অনেক প্রার্থীর ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা ঘটলেও কেবল চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীকে তলব করা হয়েছে। অন্য ঘটনাগুলোয় কোনো ব্যবস্থা বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ বা প্রমাণ পেলে এবং পত্র পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে পরবর্তীতে আচরণ বিধি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
বৃহস্পতিবার মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে মোট ১৩৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। এর আগের দিন বুধবার ১৩টি মনোনয়ন পত্র জমা পড়ে। সে হিসেবে এবার ১৬ আসনে মোট ১৫১টি মনোনয়ন জমা পড়ল।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম আদালত ভবন এলাকায় একই ভবনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে আসেন প্রার্থীরা। চট্টগ্রাম নগরীসহ মোট ৬টি আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা বিভাগীয় কমিশনার। বাকি ১০ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক।
তেড়ে গেলেন মোস্তাফিজুর
বেলা সাড়ে ১১টায় রিটার্নিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের কাছে মনোনয়ন পত্র জমা দেন আওয়ামী লীগ মনোনিত বাঁশখালী-১৬ আসনের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। এসময় রিটার্নিং ককর্মকর্তার কার্যালয়ে তার সঙ্গে ঢুকে পড়েন ১৪-১৫ জন নেতাকর্মী।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বের হন তারা। তখন ইনডিপেনডেন্ট টিভির সাংবাদিক রাকিব উদ্দিন প্রশ্ন করেন, “আপনি কি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে মনোনয়নপত্র জমা দিলেন?”
সাথে সাথে মোস্তাফিজুর রেগে গালি দিয়ে তাকে হাত দিয়ে ধাক্কা দিতে শুরু করেন এবং হুমকি দিতে থাকেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও এসময় অন্যন্য সাংবাদিকদের উপর চড়াও হন। এ সময় সাংবাদিকদের ক্যামেরাসহ অন্যন্য সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইনডিপেনডেন্ট টিভির সাংবাদিক রাকিব উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোম্তাফিজুর রহমান ৫ জনের বেশি লোক নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে আসেন। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আমার দিকে তেড়ে আসেন। মারতে উদ্যাত হন। হুমকিও দেন। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। উঠার পর পেছন থেকে আবার উনার কর্মীরা আবার ধাক্কা দিতে থাকে।”
এরপর সাংবাদিকরা প্রতিবাদ করলে তাদেরও সাংসদের অনুসারীরা ধাক্কা দিয়ে দোতলা থেকে নিচে নামিয়ে ফেলে।
তারপর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুরের গাড়ি থামিয়ে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি গাড়ি চালিয়ে চলে যান। তার অনুসারীরা সাংবাদিকদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়।
পরে সাংবাদিকরা গাড়ি ঘিরে প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করে। তখন সংসদ সদস্যের অনুসারীরা স্লেগান দিয়ে গাড়ির চারপাশে অবস্থান নিয়ে সেটিকে আদালত ভবন এলাকা পার করে দেয়।
এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সাংবাদিকরা রিটার্নিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের কাছে গিয়ে ঘটনার প্রতিবাদ জানান।
পরে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান অনুপম শীল ঘটনার বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের নির্বাচন অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আবু সালেম মোহাম্মদ নোমান তিনজন সাংবাদিকের বক্তব্য শোনেন।
পরে বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানকে এ ঘটনায় নির্বাচন অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান তলব করেন তিনি।
রিটার্নিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাংবাদিকদের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্বাচন অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান তাদের বক্তব্য শুনেছেন। তিনি আগামীকাল বিকাল ৩টার মধ্যে সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বা তার প্রতিনিধিকে হাজির হতে বলেছেন।”
পতাকাশোভিত গাড়িতে সামশুল
বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে আসেন চট্টগ্রাম- ১২ (পটিয়া) আসনের সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী। এবার তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি; স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
দুপুরে কয়েকটি গাড়িতে নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে আদালত ভবন এলাকায় আসেন সামশুল। তিনি যে গাড়িতে ছিলেন সেটায় ছিল জাতীয় পতাকা; ছিল পুলিশ প্রহরাও।
পতাকা শোভিতগাড়িতে করে মনোনয়ন জমা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে সামশুল হক চৌধুরী বলেন, “এটা ১৭ তারিখের পর আমি শুধু জাতীয় পতাকা ও প্রটোকল নিয়ে আমার নির্বাচনী এলাকায় ঢুকতে পারব না।”
এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নির্দেশনা সাংবাদিকরা তুলে ধরলে সামশুল বলেন, “প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, আমি শুধু আমার নির্বাচনী এলাকায় প্রটোকল পাব না, পতাকা পাব না। আমি এই পাঁচ বছরে সরকারি গাড়িতে চড়িনি। তেলও ব্যবহার করিনি। বা চালকও নিইনি। সুতরাং পতাকা ও প্রটোকল বন্ধ হবে আমার এলাকায় ঢুকলে।
“তফসিল ঘোষণার পর আচরণবিধি যদি কার্যকর হয়, তাহলে আমি এখনো পতাকা নিয়ে আমার এলাকায় ঢুকি নাই। এখনো আমাকে কিছু জানানো হয়নি। জানালে আর পতাকা নিয়ে ঢুকব না।”
হাজারো নেতাকর্মী নিয়ে লতিফ
বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম আদালত ভবন এলাকায় মনোনয়ন ফরম জমা দিতে আসেন চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের সংসদ সদস্য এম এ লতিফ।
লতিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার আগে লতিফের অনুসারী প্রায় হাজার খানেক নেতাকর্মী বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় প্রাঙ্গণে হাজির হন।
এদের মধ্যে ‘স্বাধীনতা নারী শক্তি’ নামে এম এ লতিফ প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের নারী নেতাকর্মীদের সংখ্যাই ছিল বেশি। তাদের সবার পরনে ছিল একই রঙের শাড়ি, কামিজ ও বোরকা।
বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় ভবনের দ্বিতীয় তলায় বিভাগীয় কমিশনারের অফিস কক্ষে এম এ লতিফ ও তার ছেলে ওমর হাজ্জাজ মনোনয়নপত্র জমা দিতে গেলে সামনের করিডরে নেতাকর্মীরা ভিড় করেন।
হ্যান্ড মাইকে বারবার ঘোষণা দিয়েও তাদের সরানো যাচ্ছিল না। পরে এম এ লতিফ নিজে কক্ষ থেকে বেরিয়ে তাদের সরিয়ে দেয়।
মনোনয়ন জমা দেয়া শেষে এম এ লতিফ উপস্থিত নেতাকর্মীদের ভিড় ঠেলে আদালত ভবন চত্বরের শহীদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়ান।
তখন সাংবাদিকরা জানতে চান ‘শোডাউন’ করে মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ায় আচরণ বিধি ভঙ্গ হয়েছে কিনা।
জবাবে এম এ লতিফ বলেন, “আমার কোনো শোডাউন নেই। উনারা সবাই সাধারণ মানুষ। আমার গাড়িতে কোনো ভেপু নেই। গত ১৫ বছরে আমার এলাকায় আমার নিজের একটিও ছবি নেই। আপনি কি আমাকে মিছিল করতে দেখেছেন?
“আমি কখনো আইন ভঙ্গ করি না। কোনো পুলিশ বা গানম্যানও আমার কখনো ছিল না। সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে আমি নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়েছি। তাই মানুষ দেখতে এসেছে। আমি কখনো কাউকে আনিনি।”
সাংবাদিকদের সাথে আলাপ শেষে লতিফ তার অনুসারীদের নিয়ে মিছিল করতে করতে আদালত ভবন এলাকা ছেড়ে যান।
এর আগে বেলা ২টার দিকে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে আসেন চট্টগ্রাম-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ নেতা গিয়াস উদ্দিন। এ সময় তার সাথে ছিলেন যুবলীগ নেতা নিয়াজ মোর্শেদ এলিট।
মনোনয়ন জমা দেওয়ার আগে গিয়াস উদ্দিনের অনুসারীরা আদালত ভবন প্রাঙ্গণে মিছিল করেন। গিয়াস নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে সেখানে বক্তব্যও দেন।
এছাড়া বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম-৯ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রাম-১০ আসনে মহিউদ্দিন বাচ্চু ও চট্টগ্রাম-৮ আসনে নোমান আল মাহমুদ এই তিন প্রার্থী নগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে মনোনয়ন পত্র জমা দেন।
তারা যখন রিটার্নিং কর্মকর্তা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে মনোনয়ন পত্র জমা দেন তখন নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি মানুষ ওই কক্ষে উপস্থিত ছিল।
চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়ি আসনে সদ্য সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হোসাইন মো. আবু তৈয়র তার অনুসারী নেতাকর্মীদের নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন।
এরপর আরো বেশ কয়েকজন প্রার্থীর সাথে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিল। নেতাকর্মীদের মিছিল ও গাড়ির কারণে বৃহস্পতিবার দিনভর আদালত ভবন এলাকায় ওঠার পথে গাড়ির দীর্ঘ সারি ছিল।
এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রিটার্নিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অন্য যে ঘটনাগুলো বললেন সেসব বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি।
“আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ নেই। কেউ অভিযোগ দিলে বা আগামীকাল এ বিষয়ে পত্র পত্রিকায় আসলে তখন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
আরও পড়ুন
বাঁশখালীর এমপি মোস্তাফিজুরকে নির্বাচন অনুসন্ধান কমিটিতে তলব
পতাকাশোভিত গাড়িতে এসে মনোনয়নপত্র দিলেন হুইপ সামশুল
আচরণবিধি নিয়ে প্রশ্ন শুনে তেড়ে গেলেন প্রার্থী, চড়াও হল অনুসারীরা