Published : 08 May 2026, 03:40 PM
তিন দিন কোমায় থাকার পর মারা গেলেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) শিক্ষক জাকিয়া সুলতানা জুথি।
৩৬ বছর বয়সী জুথি সিভাসুর ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফ্যাকাল্টির ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
সহকর্মীরা জানান, সপ্তাহ দুয়েক আগে বান্দরবানে গিয়েছিলেন জুথি। তারপর দুদিনের জ্বরে ভুগে খিচুনি দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যান। পরীক্ষায় দেখা যায় মস্তিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চিকিৎসকদের ধারণা, তিনি ‘জাপানিজ এনকেফেলাইটিস’ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির যে ধরনের লক্ষণ থাকে, তা জুথির ছিল বলে জানিয়েছেন তার চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা একজন চিকিৎসক।
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, যেহেতু দুই সপ্তাহ আগে অধ্যাপক জাকিয়া সুলতানা জুথি বান্দরবানে গিয়েছিলেন তাই তার মশাবাহিত যে কোনো রোগ হয়ে থাকতে পারে। সেটি ম্যালেরিয়া নাকি জাপানিজ এনকেফেলাইটিস তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না।
তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অধ্যাপক জুথির ম্যালেরিয়া পরীক্ষার ফল ‘নেগেটিভ’ এসেছিল।
অধ্যাপক জুথির সহকর্মী সিভাসুর অধ্যাপক শিরিন আকতার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শনিবার রাতে জুথির জ্বর আসে। রোববার জ্বর, পাতলা পায়খানা ও বমি হয়। রোববার রাত ১২টার দিকে হঠাৎ ওর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন সে নিজেই গিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়।
“চমেকে সিট পায়নি। তাকে ফ্লোরে রাখা হয়। কিন্তু ফ্লোরে থাকা সম্ভব নয় বলে রাত ২টার দিকে গিয়ে মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ভর্তি হয়। সোমবার ভোর ৬টার দিকে জুথির প্রচন্ড খিচুনি হয়। সেসময় হাত-পা বাঁকা হয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। তখনই তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়।”
সেদিনের পরিস্থিতি বর্ণনা করে শিরিন আকতার বলেন, “শুরুতে ডাক্তাররা ম্যালেরিয়া ধারণা করেছিলেন। কিন্তু সোমবার সকালে এমআরআই করার পর দেখা যায় জুথির ব্রেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এত দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি, ব্রেইনে ক্ষতি এবং অন্যান্য লক্ষণ দেখে ডাক্তাররা মত দেন, জাপানিজ এনকেফেলাইটিস হয়ে থাকতে পারে।
“সোমবার ওর অবস্থা আরো খারাপ হয়। এক পর্যায়ে হার্ট অ্যাটাক হয় এবং সে কোমায় চলে যায়। এরপর সোমবার সন্ধ্যায় তাকে এভারকেয়ারে ভর্তি করা হয়। সেখানে শুরুতে আর্টিফিশিয়াল ভেন্টিলেশনে যেটুকু রেসপন্স করেছিল, পরে আর তাও করছিল না। বৃহস্পতিবার ভোরে সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”
মেট্রোপলিটন হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের চিকিৎসক ডা. কাওসারুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উনার (জুথি) জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট ছিল। এমআরআই রিপোর্টে উনার ব্রেইনে চেঞ্জ স্পষ্ট ছিল। উনার ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছিল।
“মেডিসিনের দুজন সিনিয়র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও দেখে মতামত দিয়েছেন, লক্ষণ অনুসারে উনার জাপানিজ এনকেফেলাইটিস ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে। দ্রুত উনার অবস্থা খারাপ হওয়া এবং ব্রেইনে যেরকম ক্ষতি হয়েছে তা এই ভাইরাসের সংক্রমণ নির্দেশ করে।”
ডা. কাওসারুল আলম বলেন, “দুই সপ্তাহ আগে উনি বান্দরবান গিয়েছিলেন। এটা জেনে আমরা শুরুতেই ম্যালেরিয়া শনাক্তকরণ টেস্ট করাই কিন্তু রেজাল্ট নেগেটিভ এসেছিল।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিষয়টি আমরা জেনেছি। উনার বান্দরবান যাবার একটা হিস্ট্রি আছে। তাই মেট্রোপলিটন হাসপাতালের সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করে উনার সব টেস্টের রিপোর্ট চেয়েছি, ম্যালেরিয়া কিনা সেটা নিশ্চিত হতে। বান্দরবান ভ্রমণকারীদের কখনো কখনো ম্যালেরিয়া হয়।”
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে সিভিল সার্জন বলেন, “জাপানিজ এনকেফেলাইটিস মশাবাহিত ভাইরাস। সেটাও হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি এখনই নিশ্চিত না হয়ে বলা সম্ভব না। আমরা খোঁজ নিচ্ছি। নিশ্চিত হলে জানাতে পারব।”
ড. জাকিয়া সুলতানা জুথির মরদেহ বৃহস্পতিবার শ্বশুরবাড়ি ময়মনসিংহে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রাতে সেখানেই তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
জাকিয়া সুলতানা জুথি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষে জাপানের হিরোশিমা ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেন। তার স্বামী অধ্যাপক শাহরিয়ার হাসেম অর্ণব বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এই দম্পতির পাঁচ বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।
জাকিয়া সুলতানা জুথির আকস্মিক মৃত্যুতে তার সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও সহপাঠীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন সিভাসুর উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান।