Published : 01 May 2026, 04:14 PM
চট্টগ্রামের হালদা নদীতে দুই দফায় ডিম ছেড়েছে মা মাছ; শেষ হয়েছে ডিম সংগ্রহের কাজও। এখন হ্যাচারিগুলোতে চলছে রেণু পরিস্ফূটনের কাজ।
বৃহস্পতিবার সকালে ও রাতে দুই দফায় ডিম ছাড়ে মা মাছ। সংগ্রহকারীরা বলছেন, এবার ডিমের পরিমাণ কম। দিনভর যারা নদীতে ছিলেন, তারা ভালো পরিমাণে ডিম পেয়েছেন। তবে অন্যরা খুব বেশি ডিম পাননি।
মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, ২৫০টি নৌকা নিয়ে হালদা পাড়ের ডিম সংগ্রহকারীরা প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ছয় হাজার কেজির মত ডিম পেয়েছেন।
ডিম সংগ্রহকারী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার তাদের প্রত্যাশিত সময়ের এক মাস আগে ডিম ছেড়েছে মা মাছ। এছাড়া জোয়ার ও ভাটার টানে ডিম ভেসে গেছে। পাশাপাশি দূষণসহ কয়েকটি কারণে নদীতে কমেছে মা মাছের সংখ্যাও।
বৃহস্পতিবার সকালে মা মাছ ডিম ছাড়লেও সংগ্রহকারী ও সংশ্লিষ্টরা শুরুতে ধারণা করেছিল, সেটা ‘নমুনা ডিম’। সংগ্রহকারীরা নদীতে নামতে নামতে জোয়ারের টানে ডিম ছড়িয়ে পড়ার কারণে সংগ্রহ কম হয়েছে।
তবে চলতি মৌসুমে আরো একবার মা মাছ ডিম ছাড়তে পারে বলে আশা তাদের।
দক্ষিণ এশিয়ায় কার্প জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহের অন্যতম প্রাকৃতিক উৎস হালদা নদীতে বছরের এমন সময়ে (এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুন পর্যন্ত) বজ্রসহ বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢল নামলে অমাবশ্যা বা পূর্ণিমা তিথিতে নদীতে জোয়ার ও ভাটার সময়ে নিষিক্ত ডিম ছাড়ে কার্প জাতীয় মাছ।
নদীতে রুই, কাতাল, মৃগেল ও কালিবাউশ মাছের ছাড়া সেই নিষিক্ত ডিম বিশেষ ধরনের জাল দিয়ে সংগ্রহ করা হয়। পরে হ্যাচারিতে তা থেকে রেণুর জন্ম হয়।

সংগ্রহ কম
গেল বছর হালদা থেকে ১৪ হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ হয়েছিল। এবার বৃহস্পতিবার দিন ও রাতে দুই দফায় ছাড়া ডিমের মধ্যে সংগ্রহ হয়েছে ছয় হাজার কেজির মতো। সংগ্রহ করা ডিম নিয়ে শুক্রবার সকালে হ্যাচারিতে গেছেন সংগ্রহকারীরা।
হালদা পাড়ের গড়দুয়ারা এলাকার বর্ষীয়ান ডিম সংগ্রহকারী কামাল উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবার ছয়টি নৌকা নিয়ে ১৪ বালতি ডিম পেয়েছি। রেণু ফোটার পর বলতে পারব কতটুকু টিকবে। এখন ডিম নিয়ে হ্যাচারিতে আছি।
“এবার ডিম কম পেয়েছি গতবারের তুলনায়। গত কয়েক বছর সাধারণত মে মাসের শেষের দিকে ডিম ছাড়ত। সে হিসেবে এবার এক মাস আগে ডিম ছেড়েছে। আরেকবার হয়ত ডিম পাব।”
হালদা পাড়ের দক্ষিণ মাদার্শার বড়ুয়ার পাড়ার ডিম সংগ্রহকারী আশু বড়ুয়া বলেন, “বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে ডিম ছাড়ে মা মাছ। তখন জোয়ার ছিল। যারা সময়মত নদীতে নামতে পারেনি, তারা ডিম খুব কম পেয়েছে।
“দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি নাপিতের ঘাট থেকে আজিমের ঘাট হয়ে আমতুয়া পর্যন্ত অংশে ডিম ছেড়েছে মা মাছ। যারা আজিমের ঘাট অংশে ছিল, তারা মোটামুটি ডিম পেয়েছে। অন্যরা তেমন পায়নি। নৌকা প্রতি হয়ত দুই বালতি করে ডিম মিলেছে।”

হালদা বিশেষজ্ঞ ড. মনজুরুল কিবরিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অন্যান্য বছর প্রথম যে বৃষ্টি হয়, তাতে ময়লা আবর্জনা সরে যেত। তারপর পূর্ণিমা বা অমাবস্যার জো’তে ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল নামলে তখন মা মাছ ডিম ছাড়ত। এবার মৌসুমের প্রথম ভারি বৃষ্টিতেই ডিম ছেড়েছে মা মাছ। ফলে ডিম সংগ্রহকারীদের প্রস্তুতি ছিল কম।
“গতকাল (বৃহস্পতিবার) দুপুর পর্যন্ত ডিম বেশি সংগ্রহ হয়েছে। তবে বিকালে আর রাতে সংগ্রহের পরিমাণ কম।”
এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত এবারের মৌসুমে মোট ৭টি পূর্ণিমা ও অমাবস্যার জো আছে জানিয়ে অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, “গতকাল মৌসুমের তৃতীয় জো’তে ডিম ছাড়ল মা মাছ। আশা করি, আগামী মাসে অন্য কোনো জোতে আবার ডিম ছাড়তে পারে।”
মৎস্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রায় ২৫০ নৌকা নিয়ে ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। আমরা এখন হ্যাচারিগুলোতে ঘুরে ঘুরে হিসাব করছি। প্রাথমিকভাবে ছয় হাজার কেজি ডিম সংগ্রহের হিসাব মিলেছে।
“গতকাল সকালে যখন ডিম ছেড়েছে তখন বৃষ্টি ছিল। খারাপ আবহাওয়ার কারণে অনেক ডিম সংগ্রহকারী তখন প্রস্তুত ছিল না। সেজন্য সবাই সংগ্রহ করতে পারেনি।”
হালদা যেখানে কর্ণফুলীর সঙ্গে মিশেছে, সেই কালুরঘাট সেতুর কাছের অংশ থেকে উজানে মদুনাঘাট হয়ে নাজিরহাট পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার অংশে নদীর দুই তীরে হাটহাজারী, রাউজান ও ফটিকছড়ি এই তিন উপজেলা।
মদুনাঘাট থেকে সমিতির হাট পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার অংশে হাটাহাজারী ও রাউজান উপজেলা সংলগ্ন অংশেই মেলে নিষিক্ত ডিম। এই অংশেই মা মাছের আনাগোনা বেশি।
প্রতি বছর হালদা নদীর মদুনাঘাটের কাছে ছায়ার চর, রামদাস মুন্সিরহাট, আমতুয়া, নাপিতার গোনা, আজিমের ঘাট, মাছুয়া ঘোনা, কাগতিয়া, আইডিএফ হ্যাচারি, সিপাহী ঘাট, নোয়াহাট, কেরামতালির বাক, অঙ্কুরিগোনাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চলে ডিম সংগ্রহের উৎসব।
ডিম কম হওয়ার কারণ কী
হালদা পাড়ের ডিম সংগ্রহকারীদের হিসাবে প্রতি বালতিতে (পানি ও ডিম একসাথে) ১০-১২ কেজি নিষিক্ত ডিম থাকে। সংগ্রহের পর ডিম থেকে রেণু উৎপাদনের জন্য হালদা নদীর তীরের হ্যাচারিগুলোতে নিয়ে যান সংগ্রহকারীরা।

মদুনাঘাট এলাকার হ্যাচারিতে ডিম নিয়ে আসা বর্ষীয়ান ডিম সংগ্রহকারী ওসমান বলেন, “মা মাছ একদিনে দুই-তিনবার করে ডিম ছাড়ায়, কেউ কেউ ডিম পেয়েছে, আবার কেউ পায়নি। আগে একসাথে একবারে ডিম ছাড়লে বেশি ডিম পাওয়া যেত। আমরা চার বালতি ডিম পেয়েছি। এতে হয়তো এক থেকে দেড় কেজি রেণু হবে।
“নদীতে মা মাছ কম। অনেকে সারা বছর চুরি করে মাছ মারে। এছাড়া খালগুলোর পানি দূষিত হয়ে গেছে। কেউ কেউ খালে বিষও দেয়। সেজন্য মাছ কমে গেছে।”
ডিম ছাড়ার মৌসুমে হালদার সাথে সংযুক্ত খাল ও বিল হয়েও মা মাছেরা নদীতে আসে।
স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার নাজিম উদ্দিন বলেন, “কাটাখালি খাল ও খন্দকিয়া খাল দিয়ে আসা শিল্পের বর্জ্যের কারণে হালদা নদী দূষিত হচ্ছে নিয়মিত। বিশেষ করে হালদার পশ্চিম পাশে বেড়িবাঁধ হয়েছে, কিন্তু পূর্ব পাশে বেড়িবাঁধ হয়নি। সেকারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।”
অন্যদিকে শাহমাদারি হ্যাচারিতে থাকা রওশনগীর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা চারটি নৌকা নিয়ে ৮ বালতির মতো ডিম পেয়েছি। মূলত আজিমের ঘাট অংশে এবার ডিম পাওয়া গেছে। আশেপাশেও কয়েকটি এলাকায় পাওয়া গেছে, তবে পরিমাণে কম।”
হালদা রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনকারী মো. আমিনুল ইসলাম মুন্না বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হালদার পশ্চিম পাশে (হাটহাজারী অংশে) মোহরা থেকে গড়দুয়ারা পর্যন্ত বেড়িবাঁধ হয়েছে। আর পূর্ব পাশে (রাউজান অংশে) বেড়িবাঁধ নেই। ফলে পানি পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে।

“জোয়ারে-ভাটায় বেড়িবাঁধের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নদীর প্রবাহ পাল্টে যাচ্ছে। এতে শুধু স্রোতের সাথে ডিম ছড়িয়ে যাচ্ছে- এমন না; পাশাপাশি নদীর কুমগুলো (নদীর তলদেশে থাকা গর্ত যেখানে মা মাছ আশ্রয় নেয়) ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পুরো ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। আর বছরব্যাপী দূষণ ও মা মাছ শিকার এখনো বন্ধ হয়নি। এসব কারণে হালদা ভালো নেই। এসবের নেতিবাচক ফলাফল হয় ডিম সংগ্রহের সময়।”
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গতকাল বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আমরা নদীর পাড়ে ছিলাম। এখন হ্যাচারিগুলোতে যাচ্ছি। ডিম সংগ্রহ শেষ এখন পরিস্ফূটনের কার্যক্রম চলছে। ডিমের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি আছে আমাদের।
“তথ্য সংগ্রহ করেছি। হিসেব চূড়ান্ত হলে আপনাদের জানাতে পারব।”
এর আগে ২০২৪ সালে হালদায় মা মাছ ডিম ছাড়েনি। ওই বছর কয়েক দফায় নমুনা ডিম ছেড়েছিল কার্প জাতীয় মাছে। তাতে মোট ডিম সংগ্রহের পরিমাণ ছিল ১৪৮৬ কেজি মাত্র। তার আগে ২০২৩ সালে ডিম সংগ্রহ হয়েছিল ১৪ হাজার ৬৬৪ কেজি।