Published : 02 Aug 2025, 10:11 PM
চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় দোকানের এক কর্মচারী নিহতের মামলায় আওয়ামী লীগের তিনজন সাবেক মন্ত্রী, দুই মেয়র ও আট সাবেক সংসদ সদস্যকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ।
নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায় ২০২৪ সালের ৩ অগাস্টের ওই ঘটনার মামলায় তাদের পাশাপাশি নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ২৬ জন সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ মোট ২৩২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের আদালতে পুলিশ গত বুধবার ওই অভিযোগপত্র জমা দিলেও বিষয়টি জানা যায় শনিবার।
চান্দগাঁও থানার ওসি আফতাব উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আদালতে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে তদন্তে যাদের ‘সম্পৃক্ততার’ প্রমাণ পাওয়া গেছে তাদের আসামি করা হয়েছে।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলায় নিহত ও আহতের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৫১টি মামলা হয়েছে চট্টগ্রামে। এর মধ্যে এই প্রথম কোনো মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হল।
অভিযোগপত্রে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এবং সাবেক দুই সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন ও রেজাউল করিম চৌধুরীকে আসমি করা হয়েছে।
পাশাপাশি সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে আসামি হয়েছেন- আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী, এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, এম আবদুল লতিফ, এস এম আল মামুন, আবদুচ ছালাম, মহিউদ্দিন বাচ্চু, দিদারুল আলম দিদার ও নোমান আল মাহমুদ।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ছাত্র জনতার ‘যৌক্তিক আন্দোলনকে প্রতিহত করতে’ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগসহ অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনের চট্টগ্রাম নগর ও পার্শ্ববর্তী জেলার লাঠি-শোঠা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মিছিল-সমাবেশ করে।
“শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নির্দেশনায় দলটি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী এবং ক্যাডাররা ছাত্র-জনতার উপর সশস্ত্র হামলা করেছিল।”
নিহত শহিদুল ঘটনার দিন চাকরি শেষে বাড়ি ফেরার পথে বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল বলে অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়।
অভিযোগপত্রে আরও আসামি করা হয়- নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক কাউন্সিলরদের মধ্যে এসরারুল হক, কাজী নুরুল আলম মামুন, এম আশরাফুল আলম, সাইফুদ্দিন খালেদ সাইফু, জাবেদ নজরুল ইসলাম, পুলক খাস্তগীর, ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরী, মো. ইলিয়াছ, মোরশেদ আলী, মোবারক আলী, গিয়াস উদ্দিন, জহর লাল হাজারী, আবদুস সবুর লিটন, চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, হাসান মুরাদ বিপ্লব, জিয়াউল হক সুমন, গোলাম মোহাম্মদ জোবায়ের, নেছার উদ্দিন আহমদ মঞ্জু, নূর মোস্তফা টিনু, আবুল হাসান মো. বেলাল, মোরশেদ আলম, নাজমুল হক ডিউক, জহুরুল আলম জসিম, শৈবাল দাশ সুমন, কফিল উদ্দিন খান ও সলিমুল্লাহ বাচ্চুকে।
এছাড়া অভিযোগপত্রে আসামি হিসেবে নাম এসেছে নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নূরুল আজিম রনি, নগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম, যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি দেবাশীষ নাথ দেবু, নগর যুবলীগের সহ-সভাপতি দেবাশীষ পাল দেবু, নগর ছাত্রলীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক আরশেদুল আলম বাচ্চু, ছাত্রলীগ সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু ও সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীরের।
মামলার তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৩ অগাস্ট সন্ধ্যায় ব্ষৈম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন দোকান কর্মচারী মো. শহিদুল ইসলাম শহিদ (৩৭)। তিনি নগরীর কদমতলি এলাকায় একটি জুতার দোকানে চাকরি করতেন।
সেদিন সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটের দিকে বাজার করে বাসায় ফেরার পথে বহদ্দার পুকুর পাড় এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন শহিদুল। পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে নগরীর বেসরকারি পার্ক ভিউ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তার মৃত্যু হয়।

এরপর মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালের মৃত্যু সনদে গুলিতে শহিদুল ইসলামের মৃত্যু হয়েছে বলে তুলে ধরা হয়।
পরে পুলিশ সুরতহাল করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠায়। এ ঘটনার ১৬ দিন পর ১৯ অগাস্ট নিহতের ভাই শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে ৮ জন আসামির নাম দিয়ে অজ্ঞাতনামা ৩০০-৪০০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
প্রায় এক বছর পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চান্দগাঁও থানার এসআই মো. ফয়সাল আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন বুধবার।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, চমেক হাসপাতালে ময়নাতদন্তের সময় নিহত শহিদুলের শরীর থেকে ১০টি ‘ধাতব পিলেট’ বের করা হয়। এগুলো আলামত হিসেবে জব্দ করে পুলিশ।
এসব ধাতব পিলেটের ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট উদ্ধৃত করে অভিযোগপত্রে বলা হয়, এগুলো কোনো শর্টগান বা বন্দুক বা স্থানীয়ভাবে তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ’ফায়ার’ করা হয়েছে বলে সিআইডির ফরেনসিক বিশারদ মতামত দেন।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে শহিদুলের হৃৎপিন্ড, ফুসফুস ও পাকস্থলীসহ শরীরের অন্যান্য স্থানে আঘাত পান বলে তুলে ধরা হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ঘটনার দিন প্রথমে আসামি মহিউদ্দিন ফরহাদ তার হাতে থাকা পিস্তল থেকে গুলি করে। এরপর অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মো. ফিরোজ, তৌহিদুল ইসলাম ও দেলোয়ার শর্টগান দিয়ে গুলি করে।
এছাড়া সেদিন আসামি মো. জালাল, এইচ এম মিঠু, নূর মোস্তফা টিনু, ঋভু মজুমদার ও মো. তাসিন গুলি ছুড়েছিল যাতে সেখানে আরো অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল বলে বলা হয়।