Published : 14 Oct 2025, 11:06 PM
পাহাড় ঘেরা প্রকৃতির কোলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন চলছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের ভোট শুরুর অপেক্ষা; শিক্ষার্থীরা নানা হিসাব নিকাশে ঠিক করে নিচ্ছেন কেমন নেতৃত্ব তারা বেছে নেবেন।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর হতে যাওয়া এবারের নির্বাচনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আশা, তাদের প্রতিনিধি যারাই নির্বাচিত হবেন, তারা যেন দলীয় লেজুড়বৃত্তির বাইরে থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে কাজ করেন।
প্রতি বছর কেন্দ্রীয় ছাত্র ও হল সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধ শতাব্দীর ইতিহাসে নির্বাচন হয়েছে মাত্র ছয়বার। এর মধ্যে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি।
বুধবার ভোট সামনে রেখে সোমবার শেষ হচ্ছে চাকসু নির্বাচনের প্রচার পর্ব। ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির, বাম ছাত্র সংগঠন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও আদিবাসী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অন্তত ১২টি প্যানেলের হয়ে এবার ভোটের মাঠে রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭ হাজার ৫১৬ জন ভোটারের ভোটে নির্বাচিত হবে চাকসু, হল সংসদ ও হোস্টেল সংসদের নতুন নেতৃত্ব। এসব পদে মোট ৯০৮ জন প্রার্থী হয়েছেন।
প্রচার পর্বে প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছোটালেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটের ভাবনায় আছে আবাসন সংকট নিরসন, শিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং পরিবহন সমস্যা মেটানোর মত মৌলিক বিষয়।
বিশ্ববিদ্যালয়েল অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইমদাদ হোসেন বলেন, “আমাদের আবাসন ও পরিবহন সমস্যা সবচেয়ে বেশি। ৩-৪ ঘণ্টা চলে যায় শহর থেকে ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়ায়। এতে করে শিক্ষার্থীদের প্রচুর সময় নষ্ট হয়। এই দুটি সংকট নিরসন খুব জরুরি।

“দলীয় লেজুড়বৃত্তির বাইরে আমরা এমন কাউকে চাই, যারা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের জন্য কাজ করবে। দলীয়রা আশ্বাস দেয় কিন্তু কাজ করে না।”
অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র তাওসিফ হোসেনের চাওয়া, চাকসুতে যে নতুন নেতৃত্ব আসবে, তারা যেন নিজ নিজ সংগঠনের বাইরে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করেন।
“সংগঠন থেকে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তারা জিতে আসুক, তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পরে তারা দলীয় আচরণ করবেন, এমনটা আমরা চাই না। আমাদের মাত্র ২৭ শতাংশ ছাত্রছাত্রী আবাসন সুবিধা পায়। তাই আমরা চাই, পূর্ণাঙ্গ আবাসনের ব্যবস্থা করার জন্য নতুন নেতৃবৃন্দ কাজ করবেন।”
সমাজতত্ত্ব বিভাগের রাফাত আহমেদ বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের সিংহভাগ কর্মীদের বেতন-ভাতা খাতে চলে যায়। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষাকেন্দ্রিক সুযোগ বাড়াতে হবে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের জন্য চাপ সৃষ্টি করবে সেরকম নেতৃত্ব প্রয়োজন।”
এই শিক্ষার্থী বলেন, “রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা তাদের দলীয় আদর্শ সমুন্বত রেখে ছাত্রদের কল্যাণের কথা বলে। দলীয় আদর্শের বাইরে গিয়ে যারা শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদার কথা বলবে, এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন।”
সমাজতত্ব বিভাগের আনিকা আনজুম বলেন, “এমন শিক্ষার্থী প্রতিনিধি চাই, আমাদের মৌলিক চাহিদাগুলো নিয়ে যাদের সাথে সরাসরি আমরা যোগাযোগ করতে পারব।”
১৯৯০ সালে সবশেষ চাকসু নির্বাচনের পর পেরিয়ে গেছে ৩৫ বছর। এই সময়ে জাতীয় রাজনীতিতেও অনেক পালাবদল হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিতেও ঘটেছে নানা বাঁক বদল।
এমন এক সময় এই নির্বাচন হচ্ছে, যখন কোনো রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় নেই। ফলে ক্যাম্পাসে কার্যত সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনেরও আধিপত্য নেই। সে কারণে এবারের চাকসু নির্বাচনকে ‘পরিবর্তনের সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন কোনো কোনো শিক্ষার্থী।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ফাহমিদা অর্পি বলেন, “এখন আমরা কোনো সংগঠনের অধীনে থেকে হলে বসবাস করতে চাই না। যারা আসবে তারা যেন দলের বাইরে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে থাকে।”
একই বিভাগের ছাত্রী ইবতিসাম আহমেদ বলেন, “দলীয় বা সাংগঠনিক মতাদর্শের বাইরে গিয়ে যারা কাজ করবে তাদের নেতৃত্বে আসা দরকার। সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের জবাবদিহিতা থাকতে হবে ।
“ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য দাবি আদায়ে যারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চাপ সৃষ্টি করতে পারবে, এমন যোগ্যতাসম্পন্ন নেতৃত্ব আমাদের প্রয়োজন।”
ইংরেজি বিভাগের সাদিকা আফরিন রিহা বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীবান্ধব নেতৃত্ব চাই। প্রচারে যেমন উৎসবমুখর পরিবেশ দেখছি, ভোট গ্রহণ এবং ভোটের পর নানা উদ্যোগে যেন বিজয়ী ও পরাজিত সব প্রার্থী এই ঐক্য ধরে রাখেন।”
চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী রুদ্র তিতাস বলেন, যারা রাজনীতির সাথে জড়িত, তারাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তারা নির্বাচন করুক, জয়ী হোক কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তারা যেন দলীয় গণ্ডি থেকে বের হয়ে সাধারণের পক্ষে থেকে কথা বলে।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮টি বিভাগ ও ছয়টি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ২৬টি পদের জন্য তাদের নেতা বেছে নেবেন ভোটে। এসব পদে প্রার্থী হয়েছেন মোট ৪১৫ জন।
চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী, চাকসুর ভিপি পদে ২৪ জন, জিএস পদে ২২ এবং এজিএস পদে ২১ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বুধবার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ হবে। ক্যাম্পাসের আইটি ভবন, নতুন কলা ভবন, বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান ও বাণিজ্য (বিবিএ) অনুষদ ভবনে চলছে ভোটগ্রহণের আয়োজন।
পুরানো খবর:
চাকসু ভোট: 'ক্যান্টিন' পরিচয় ঘুচিয়ে অধিকার আদায়ের আশা
এবার চাকসুর ভোটের পরিবেশ 'অপেক্ষাকৃত ভালো': প্রধান নির্বাচন কমিশনার
চাকসু ভোট: প্রচারণার শেষ দিনে সরগরম ক্যাম্পাস
চাকসু: দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ভোট কেন্দ্র স্থাপ
চাকসু নির্বাচন: ভোট কক্ষে থাকবে সিসি ক্যামেরা, ব্যালট বাক্স হবে স্বচ্ছ