Published : 10 Oct 2025, 12:27 AM
সাড়ে তিন দশক পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু), হল সংসদ ও হোস্টেল সংসদ নির্বাচন শিক্ষার্থীরা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করছেন বলে মনে করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মনির উদ্দিন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাষ্য, শিক্ষার্থীরা নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করছে। এ কারণে কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দেড় মাসে তাদের কোনো ‘কঠিন’ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়নি।
১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত চাকসু নির্বাচন হয়েছে ছয়বার। আগামী ১৫ অক্টোবরের নির্বাচন নিয়ে হবে সপ্তম বার। এবারের চাকসু নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বে আছেন রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিন। চাকসুর আগের ছয়টি নির্বাচনের তিনটিই দেখেছেন তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে শিক্ষক হওয়া মনির উদ্দিন নিজেই ১৯৮৪ সালে চাকসুর পঞ্চমবারের নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন।
এর আগে ১৯৯০ সালের নির্বাচনে সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আর চাকরি জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে পেলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব। আগামী ডিসেম্বরে অবসরোত্তর ছুটিতে যাবেন অধ্যাপক মনির।
চাকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মনির উদ্দিন বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা বলেছেন তার ছাত্রজীবনের চাকসু নির্বাচন আর এবারের চাকসু নির্বাচন নিয়ে।
তার কথায় উঠে এসেছে আগেকার সময় আর এ সময়ের পরিবেশ, প্রার্থী ও ভোটারদের অবস্থা, সঙ্গে প্রচার-প্রচারণার নানা দিকও।
অধ্যাপক মনির উদ্দিন বলেন, নির্বাচন বরাবরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এখনকার মতো প্যানেল নির্বাচন তখনও ছিল, যদিও সংখ্যায় কম ছিল। ওই সময় অল্প সংখ্যক স্টুডেন্ট পরস্পর পরস্পরের কাছে পৌঁছে যেতে পারত। যেটা এখন সম্ভব নয়।
আশির দশকে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “ওই সময় অনাকাঙিক্ষত ঘটনা বহু ঘটেছে। পরস্পরের প্রতি যে বিদ্বেষ ছিল না, সেটা তো নয়। সবসময় ছিল, কারণ নির্বাচন বিষয়টা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।”
তবে আগেকার সময়ের নির্বাচনি পরিবেশ থেকে বর্তমান সময়ের পরিবেশটাই ‘অপেক্ষাকৃত ভালো’ মনে করছেন মনির উদ্দিন।
ছাত্রজীবনে ১৯৮২ সালের নির্বাচনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ১৯৮২ সালে নির্বাচনটা খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। তখন ক্যাম্পাসে জাসদ ছাত্রলীগের একটা দুর্দান্ত প্রতাপ ছিল। ভেতরে ভেতরে ছাত্রদল, শিবিরের ছেলেরা ছিল, সেবার জিতেছিল জাসদ ছাত্রলীগ।
“আমাদের অনেক ‘ফান’ প্যানেল ছিল, আমরা অনেকেই মজা করে বলতাম ‘গেঞ্জাম পার্টি’, ‘ঝামেলা পার্টি’, মজা করে আমরা মিছিল করতাম। প্রার্থীদের কাছ থেকে মজা করে এটা সেটা আবদার করতাম।”
তিনি বলেন, “সেময় পারস্পরিক ভিন্ন আচরণ আমরা দেখছি। ওটা যে ‘কগনিজিয়ান’ ছিল, সেটা আমি বলব না। তবে ওই সময় পরস্পর পরস্পরকে মান্যগন্য করার বিষয়টা ছিল, কিন্তু যেটা এখন একটু কমে গেছে। এর কারণ, আজকের দিনে ছেলে-মেয়েরা অনেক বেশি ডিজিটালাইজ, মেকানাইজ হয়ে গেছে। আগে ওটা ছিল না।
“তখন যোগাযোগ ছিল ব্যক্তি পর্যায়ে, এখন সেটা হয়ে গেছে টেলিফোনে। অনেকেই অনেকের চেহেরা চেনে। দেখে নাই, কিন্তু তার সাথে যোগাযোগ হচ্ছে। আগে সেটা ছিল না, তখন ছিল পার্সোনাল কনটাক্ট। তখন আমরা বাসায় বাসায় যেতাম।”
১৯৮৪ সালে চাকসুর পঞ্চম নির্বাচনে নির্বাহী সদস্য পদে প্রার্থী হওয়া মনির উদ্দিন বলেন, “নির্বাচনে যখন প্রার্থী হলাম, তখন দেখলাম প্রত্যেকের কাছে আমাকে গিয়ে পৌঁছাতে হয়, কথা বলতে হয়। যেটা এখন অনেকের কাছে সম্ভব হয় না। তখন আমরা প্রার্থীরা সবাই ভোটারদের কাছাকাছি যেতাম। এজন্য খুব ব্যস্ত সময় কেটেছিল।”
ওই নির্বাচনে নিজেদের দল পরাজিত হয়েছিল বলে জানান তিনি।

১৯৯০ সালের চাকসু নির্বাচনের সময় মনির উদ্দিন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সেবার তিনি সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন।
“সে সময় (১৯৯০) সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য একটা প্যানেল হয়েছে। আবার তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপ ছিল। এটার কারণে নির্বাচনটা বরাবর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল।
অধ্যাপক মনির মনে করেন, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালন করা এবং ভোটার হওয়ার চেয়েও প্রার্থী হওয়া অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের।
“এটাতে (নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বে) কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। এখানে সবাই সহযোগিতা করে। আমি সবার সহযোগিতা পাই। বিশেষ করে প্রার্থীদের। প্রার্থীদের যে সমস্যা আছে, তারা এসে আমাকে বলে। তখনতো আমরা বলতাম না, নিজেরা গিয়ে ধরে ফেলতাম। এখনকার ছেলেরা সবাই ভালো।”
তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আন্তরিকভাবে এ নির্বাচনটা গ্রহণ করছে। কারণ আমার বিশ্বাস তারা চায় তাদের বিশ্ববিদ্যালয় সুনাম অর্জন করুক। প্রতিনিধি যারা হবে, তারা যেন ভদ্র-সভ্য হয়। তারা যেন আরেকজনের মতামতকে শ্রদ্ধা করে। এরকম একটা আচরণ আমি ছাত্রদের মধ্যে দেখছি। বিষয়টি আমার খুব ভালো লাগছে।”
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, “আমি গত দেড় মাস ধরে এ নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনা করছি। শিক্ষার্থীরা দারুণভাবে সহযোগিতা করছে, আমি খুবই খুশি। কারণ এখন পর্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি আমাকে মোকাবিলা করতে হয়নি।
“যার কারণে আমি বলতে পারিনি, আগের চেয়ে এখন পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে।”
বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীদের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এখনকার শিক্ষার্থীদের ভালো একটা দিক আছে। তারা অনলাইন প্রচার চালায় এবং প্রত্যেকটা স্টুডেন্ট কোনো না কোনো কাজে সম্পৃক্ত। তাদের ব্যস্ততা আছে, নির্বাচন বা রাজনীতিটা তাদের একমাত্র কাজ না। শিক্ষার্থীরা ক্লাস পরীক্ষার বিষয়ে সিরিয়াস। আমরা দেখলাম ১৫ তারিখে নির্বাচন, ১৪ তারিখেও পরীক্ষা আছে।”
চাকসু নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির পরস্পরবিরোধী অভিযোগ করেছেন নির্বাচন কমিশনে।
তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার মনে করেন, যেসব অভিযোগ আসছে, সেগুলো আচরণবিধির ‘সামান্য বরখেলাপি’। এটা যেকোনো মানুষ একটু ভুল করেও করে ফেলতে পারে।
আগামী ১৩ অক্টোবর রাতে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার শেষ হবে। শুক্র ও শনিবার ক্যাম্পাস ছুটি। এরপর রোববার ও সোমবার নির্বাচনি প্রচার চালাতে পারবেন প্রার্থীরা।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ‘মারাত্মক’ কোনো ধরনের ব্যতয় কমিশন দেখেনি বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক মনির।
তিনি বলেন, “এবারের নির্বাচনে যেটা দেখলাম প্রার্থীর সংখ্যা বেশি। নির্বাচনি কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। প্রত্যেকে নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা, এটা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন নিয়ে আর কোনো সমস্যা হবে না।”
প্রার্থীদের দাবি দাওয়া নিয়ে অধ্যাপক মনির বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের সব দাবিগুলো পূরণের চেষ্টা করেছি। তার নির্বাচনের দিন বাস চেয়েছে, বাসের ব্যবস্থা করছি; ট্রান্সপারেন্ট ব্যালেট বক্স চেয়েছে, সেটারও ব্যবস্থা করেছি। ফল ডিসপ্লে করার কথা বলেছে, সেটাও করেছি। তারা যা চেয়েছে, সব করছি, কারণ এটা তাদের নির্বাচন।”
পুরানো খবর