Published : 12 Oct 2025, 08:34 AM
নির্বাচন হয়নি ৩৫ বছর; নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে চাকসু পরিণত হয়েছিল কেবলই কম দামে খাবার পাওয়ার ‘ক্যান্টিন’।
সেই অচলায়তন ভেঙে হতে চলেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন। স্বভাবতই ক্যাম্পাসে এখন আলোচনা চাকসু ঘিরে। নির্বাচন হবে—এই ঘোষণার পর শিক্ষার্থীদের অনেকেই জেনেছেন, চাকসু কেবলই ক্যান্টিন না, নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলার ফোরাম।
তবে ভোট ঘিরে আগ্রহের ভিন্নতা আছে। কেউ কেউ খুব আগ্রহী জীবনে প্রথম ভোট দেবেন বলে। কারোবা আগ্রহ কয়েকদিনের উৎসবমুখর প্রচারণা ঘিরে।
তবে চাকসু শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া কতটা পূরণ করতে পারবে তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের খুব বেশি আশা নেই। আবার অনেকে জানেন না, চাকসু’র কর্মপরিধিই বা কতটুকু।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ঝুপড়িতে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েকটি বিভাগের পাঁচ শিক্ষার্থী। তাদের আলোচনায় ছিল চাকসু নির্বাচন।
তাদের মধ্যে চারুকলা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী তাবাসসুম বললেন, “ক্যাম্পাসে ক্লাস শুরুর পর চাকসু নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। তখন আমরা শুধুমাত্র ক্যান্টিন হিসেবেই জানতাম এটিকে। খাবার খেতেই মাঝেমধ্যে যাওয়া হতো।

“কম দামে খাওয়া আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার জন্যই সেখানে যেতাম। পরবর্তীতে চাকসু সম্পর্কে ধারণা পাই। নির্বাচনের ঘোষণা আসে। তখন ধীরে ধীরে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।”
তাবাসসুম বলেন, “চাকসুতে যারা জিতবে, তারা হয়তো আহামরি তেমন কিছু করে ফেলবে না। কিন্তু হয়তো সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথাগুলো বিশেষ করে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সংকট রয়েছে, সেগুলো প্রশাসনের কাছে তুলে ধরলে সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।”
তার সহপাঠী স্নেহা বলেন, “আমাদের মতো বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরই চাকসু নিয়ে কোনো ধারণা বা আগ্রহ ছিল না। ভোটের কথা আসার পর থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ হয়েছে।
“দীর্ঘসময় ধরে নির্বাচন না হওয়ায় হয়তো চাকসু নিয়ে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই জানতো না। এখন নির্বাচন হচ্ছে। আশা করি, ভালো কিছু হবে, শিক্ষার্থীরা অধিকার সচেতন হবে, চাকসু শিক্ষার্থীদের আসল প্রতিনিধি হবেন।”
তাদের সঙ্গে আড্ডায় থাকা দ্বিতীয় বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করে বললেন, “নির্বাচন হলেও এক শ্রেণির শিক্ষার্থীর মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও অনেকের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। যোগাযোগ অসুবিধার কারণে শহরে থাকা শিক্ষার্থীদের অনেকেই ভোট দিতে নাও আসতে পারে।”

কলা ঝুপড়িতে চা খেতে আসা পালি বিভাগের ২০২২-২৩ বর্ষের শিক্ষার্থী অপরূপ বড়ুয়া বলেন, “অতীতে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী চাকসু বলতে ক্যান্টিনই ভাবতো। সেখানে ডিম খিচুড়ি, মোরগ পোলাও খাওয়ার জন্যই বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যেত।
“কিন্তু এখন এসে ধারণাটা পাল্টেছে। নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাকসু নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তারা খোঁজ রাখছে, কারা কী করতে চাইছে বা চাকসুতে নির্বাচিত প্রতিনিধি কেন দরকার।”
ইংরেজি বিভাগের ২০১৮-১৯ বর্ষের শিক্ষার্থী এস এম বোরহান উদ্দিন বলেন, “চাকসু ছাত্র অধিকার রক্ষার একটা প্লাটফর্ম হলেও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী অতীতে সেভাবে ভাবত না। নির্বাচন হলে যারাই আসবে, তাদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের কথা বলার জায়গা তৈরি হবে।
“গত বছরের ৫ অগাস্টের আগে স্টুডেন্টরা এটাকে নাস্তা করা বা আড্ডার জায়গা হিসেবেই দেখত। সাম্প্রতিক সময়ে ডাকসু বা জাকসু নির্বাচন হওয়ার পর চাকসু নির্বাচনের তারিখ পড়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তারা এটা নিয়ে ভাবছে।”
বোরহান বলেন, “নির্বাচন হবে, ভবিষ্যতেও এর ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। কিন্তু তাদের জবাবদিহিতার জায়গা কতটুকু তৈরি হচ্ছে, সেটাই দেখার বিষয়।”

‘প্রথম ভোটের’ আগ্রহ
চবির রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ২০২৪-২৫ বর্ষের শিক্ষার্থী আজিমুস সাকিব সজীব ক্লাস শুরু করার তিন মাসের মধ্যে চাকসু নির্বাচন পাচ্ছেন। তাতে তিনি বেশ উচ্ছ্বসিত।
সজীব বললেন, “এখানে ভর্তির পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পর থেকেই ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আমরা জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচন বা ক্যাম্পাস মিলিয়ে প্রথম কোনো ভোট দেব। সেকারণে আগ্রহ বা উচ্ছ্বাস একটু বেশি।”
দর্শন বিভাগের একই সেশনের শিক্ষার্থী তৈমুল হাসিব বলেন, “আমাদের জীবনের প্রথম নির্বাচন, ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছি। অতীতে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন দেখিনি। এ সম্পর্কে ধারণাও নেই।
“শিক্ষার্থীদের কথা বলার জন্য প্রতিনিধি দরকার। অতীতে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের জন্য তেমন কিছুই করেনি। আশা করি, চাকসুতে যারা জয়ী হবে, তারা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবেই কাজ করবে।”
চাকসুর সবশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর দুয়েকবার আলোচনা উঠলেও ভোটের আয়োজন আর হয়নি। সাড়ে তিন দশক বাদে আগামী ১৫ অক্টোবর চাকসু ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী কালচিরণ চাকমা বলেন, “আগে কোনোসময় চাকসু নির্বাচন দেখিনি। সেকারণে কোন ধারণাই ছিল না।
“৫ অগাস্টের পর এটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তারা আমাদের প্রতিনিধিত্ব করবে। প্রার্থীরা আমাদের কোছে আসছে, তাদের কথা শুনছি, ভালোই লাগছে। সব দিক বিবেচনা করে ভোট দেব।”

আবাসন, নিরাপত্তা ও যোগাযোগ
চাকসু নির্বাচন ঘিরে ঘুরেফিরে কয়েকটি বিষয় প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে আলোচনায় আছে।
অপরূপ বড়ুয়া বলেন, “শিক্ষার্থীদের আবাসন, কম্পিউটার ল্যাব, শাটল ট্রেন ও যাতায়তের সমস্যা রয়েছে। আমরা এসব নিয়ে ভুক্তভোগী হলেও আমাদের আন্দোলনে কোনো কাজ হয় না। চাকসুতে ছাত্র প্রতিনিধিরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে হয়তো প্রশাসনকে এসব সংকটের কথা তুলে ধরতে পারবেন।”
সংগীত বিভাগের ২০২১-২২ বর্ষের শিক্ষার্থী ক্যাপ্রিও চাকমা রাঙামাটির বাসিন্দা হলেও থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই নম্বর গেইট এলাকায় একটি বেসরকারি কটেজে।
ক্যাপ্রিও চাকমা বলেন, “চাকসু গঠিত হলেই সব হয়ে যাবে তা না, একটা প্রক্রিয়া তো অন্তত শুরু হবে। দাবি তোলার মানুষ তো পাওয়া যাবে।”
নাট্যকলা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষার্থী সাইমা আক্তার বলেন, “অনেক প্রার্থীকে হয়ত চিনতাম না। নতুন করে চিনছি। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন বিষয়ে উন্নয়ন নিয়ে অনেক প্রতিশ্রুতি পাচ্ছি।
“আমাদের প্রত্যাশা শিক্ষার্থী বান্ধব নেতৃত্ব। নির্বাচনের পর আমরা কোনো নেতানেত্রী দেখতে চাই না। আমরা চাই, তারা যেন আমাদের সাথে আন্তরিক হয়।”
সাইমা আক্তার বলেন, “দেশে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবসান ব্যবস্থা সবচেয়ে কম। মাত্র ১৯ শতাংশের আবাসনের সুবিধা আছে। অনেক শিক্ষার্থীর বাড়ি বহু দূরে এবং আর্থিক সংকট আছে। তাদের জন্য আবাসন খুব প্রয়োজন।
“হয়ত শতভাগ আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব না। অন্তত ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা যেন হয়। এক্সটেনশন বা কটেজ পদ্ধতিতে অল্প সময়ে আরো অনেক শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব। ক্যাম্পাসে জমির কোনো সমস্যা নেই। নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিরা যেন এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়।”

পদার্থবিদ্যা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বললেন, “যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা—দুটি বড় সমস্যা। শাটল ট্রেন অপ্রতুল। এর সুবিধা বাড়ানোর জন্য বহুবার বলেও কোনো কাজ হয়নি।
“নিরাপত্তার বিষয়টি সাম্প্রতিক জোবরাবাসীর সাথে সংঘাতে আরো প্রকট হয়ে উঠেছে। চাকসুর নির্বাচিত নেতৃবৃন্দ এ দুটো বিষয়ে কাজ করাটা খুব জরুরি।”
পালি বিভাগের ২৩-২৪ বর্ষের শিক্ষার্থী সজীব হোসেন বলেন, “যারা রাজনীতি সংশ্লিষ্ট বা সচেতন, তাদেরই চাকসু নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ বেশি। যারা নতুন শিক্ষার্থী, তাদের মধ্যে তুলনামূলক আগ্রহ কম বলে মনে হচ্ছে। তার পরও দীর্ঘদিন পর চাকসু নির্বাচন হচ্ছে, এটাই বড় দিক।
“৩৫ বছর ধরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি, এখন হচ্ছে। এ প্র্যাক্টিসটা চালু হলে চাকসু নিয়ে সকল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে।”
দর্শন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী উম্মে সুমাইয়া বলেন, “যখন ক্যাম্পাসে প্রথম আসি, তখন চাকসু নিয়ে কোনো ভাবনাই ছিল না। বিভাগে ক্লাস করতে যাবার পথে চাকসু ভবন পড়তো। ভবনটি দেখে অনেক কিউরিসিটি তৈরি হতো। সে জায়গা থেকে গুগলে সার্চ দিয়ে দেখেছি চাকসু কী। পরে সিনিয়রদের জিজ্ঞেসও করেছি।
“অনেক বছর নির্বাচন হচ্ছে। ছাত্রদের প্রতিনিধি নির্বাচন হবে। এবারেই নতুন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সবকিছু করে ফেলবে বলে মনে করি না। এজন্য নিয়মিত চাকসু নির্বাচন হতে হবে। নিয়মিত নির্বাচন হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের কাছে নির্ভরতার জায়গা দাঁড়াবে। কথা বলার জায়গা তৈরি হবে।”