Published : 29 Jul 2025, 12:08 AM
উন্মুক্ত ও অরক্ষিত খাল, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত না হওয়া, সমন্বয়ের অভাব, পর্যাপ্ত আলোর অভাব, জলাবদ্ধতা, জরুরি রেসপন্স টিমের অভাব এবং জনসচেতনতার অভাবসহ কয়েকটি কারণে খাল-নালায় পড়ে বন্দর নগরীতে প্রাণহানি বাড়ছে বলে উঠে এসেছে এক তদন্ত প্রতিবেদনে।
চার মাস আগে খালে পড়ে ছয় মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি এসব কারণ চিহ্নিত করেছে।
গত ৯ বছরে খাল-নালায় পড়ে ১৬ জনের মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরে এসব ঘটনার কারণ চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে এ তদন্ত প্রতিবেদনে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদন দেখে সেখানে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আমরা আলোচনা করে পদক্ষেপ নেব।”
গত ১৮ এপ্রিল নগরীর চকবাজার এলাকার কাপাসগোলায় হিজড়া খালে পড়ে শিশু সেহরীশের মৃত্যুর ঘটনায় ১১ সদস্যের এই তদন্ত কমিটি করা হয়।
কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (সিসিসি) সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন। সদস্য সচিব ছিলেন সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান সোহেল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট, জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম ওয়াসা এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রতিনিধি ছিলেন কমিটিতে।
দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয় এবং ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণের দায়িত্ব পাওয়া এ কমিটি সোমবার ২৯ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে তাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরে।

‘অদক্ষতা ও অসচেতনতা’
১৮ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে নগরীর চকবাজার থানার কাপাসগোলা এলাকার নবাব হোটেলের পাশের গলিতে যাত্রীসহ একটি রিকশা খালে পড়ে যায়।
রিকশায় ছয় মাস বয়সী শিশু আনাবিয়া মেহেরিন সেহরীশ, তার মা ও শিশুটির দাদি ছিলেন। মূল সড়ক থেকে পাশের গলিতে প্রবেশ করে কিছুদূর যাওয়ার পরে রিকশাটি হিজড়া খালে পড়ে যায়।
সেদিন ভারি বর্ষণের কারণে খাল উপচে পানি সড়কে উঠে গিয়েছিল।
সেহেরীশের পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয়দের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চালকের অদক্ষতা এবং অসচেতনতার কারণে খালের যে অংশে নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিল না, সেই অংশের শেষ প্রান্ত দিয়ে রিকশাটি খালে পড়ে যায়।
“রিকশাটি খালে পড়ে যাওয়ার পর অর্ধ ডুবন্ত থাকলেও তৎক্ষণাৎ রিকশাচালক যাত্রীদের তোলার চেষ্টা করেনি। বরং রিকশার উপর ভর দিয়ে তিনি রাস্তায় উঠে পালিয়ে যান। রিকশাচালকের ভরে রিকশাটি খালে সম্পূর্ণরূপে ডুবে যায়।”
শিশুটির মা ও দাদি খালে পড়ে ভেসে যান। সেসময় শিশুটি মায়ের হাত থেকে ছুটে যায়। পরে স্থানীয়রা সেহেরীশের মা ও দাদিকে উদ্ধার করলেও শিশুটি খালে ভেসে যায়।
পরদিন ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে নগরীর আছাদগঞ্জ শুটকি পল্লী এলাকায় চাক্তাই খাল থেকে শিশু সেহেরীশের মরদেহ উদ্ধার হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ না হওয়ায় সিডিএ’র অধীনে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় হিজড়া খালের সংস্কার কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ হয়নি।
কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে সিডিএ ও সেনাবাহিনীর ৩৬ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে হিজড়া খালে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলছিল।
হিজড়া খালের ওই অংশে আগে থাকা নিরাপত্তা বেষ্টনী (বাঁশের তৈরি) খালের মাটি ও আবর্জনা অপসারণের জন্য সরানো হয়েছিল। ওই অংশেই দুর্ঘটনাটি ঘটে।

শিশু মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ
হিজড়া খালে পড়ে শিশু মৃত্যুর সম্ভাব্য আটটি কারণ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
এরমধ্যে প্রথমটি হল- অদক্ষ রিকশা চালক ও অনিয়ন্ত্রিত গতি। বৃষ্টির ফলে পানিতে পরিপূর্ণ খাল ও সংকীর্ণ সড়কে অদক্ষ রিকশাচালক এই দুর্ঘটনার জন্য অন্যতম দায়ী বলে তদন্ত কমিটি মনে করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “যাত্রী বারবার চালককে রাস্তার ডানপাশ ঘেঁষে রিকশা চালাতে অনুরোধ করলেও তিনি শোনেননি। আবার দুর্ঘটনার পর যাত্রীদের উদ্ধারের চেষ্টা না করে গাড়ির উপর ভর দিয়ে উঠে পালিয়ে যায় চালক। ফলে রিকশাটি একেবারে ডুবে যায় এবং যাত্রীরা সবাই ভেসে যায়।”
চালক আরেকটু সর্তক হলে এই প্রাণহানি এড়ানো যেত বলে তদন্ত কমিটির ধারণা।
‘অরক্ষিত খাল’কে ওই দুর্ঘটনার দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে তদন্ত কমিটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাঁশের তৈরি নিরাপত্তা বেষ্টনীর একটি অংশ খুলে পরিচ্ছন্নতার কাজ করায় খালের ওই অংশটি অরক্ষিত ছিল।
এছাড়া সংকীর্ণ সড়ক, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে কোনো চিহ্ন না থাকা, বৃষ্টিপাত, খাল-নালাগুলো বর্জ্যে পরিপূর্ণ থাকা, পর্যাপ্ত জনবল ও উদ্ধার সামগ্রীর অভাব এবং সচেতনতার অভাবকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

বর্ষায় নগরীর ৩ সংকট
তদন্ত কমিটি বর্ষা মৌসুমে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের তিনটি প্রধান সমস্যা চিহ্নিত করেছে। এগুলো হচ্ছে- জলাবদ্ধতা, পাহাড় ধস এবং নালা ও খালে পড়ে মৃত্যু।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের একটি জরিপের তথ্য উদ্ধৃত করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নগরীতে খাল নালায় পড়ে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে ১০ জন পুরুষ এবং ৬ জন নারী। তাদের বয়স ছয় মাস থেকে ৬৫ বছর পর্যন্ত।
এসব ঘটনায় ৭ জন নালায় পড়ে এবং অন্য ৮ জন খালে পড়ে মারা যান।
খালে পড়ে মৃত্যুর এসব ঘটনা ঘটেছে নগরীর চাক্তাই খাল, চশমা খাল, নাছির খাল ও হিজড়া খালে।
এরমধ্যে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে একজন করে, ২০২১ সালে ৫ জন, ২০২৩ সালে ৩ জন, ২০২৪ সালে ৪জন এবং চলতি বছর ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম শহরে খাল-নালায় পড়ে প্রাণহানির ঘটনা একটি ‘মারাত্মক জননিরাপত্তা সংকট’ বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
খাল-নালায় পড়ে মৃত্যু রোধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে সরকারি সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে মনিটরিং কমিটি গঠন, কুইক রেসপন্স টিম গঠন ও নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়ার প্রস্তাব সুপারিশ করা হয়েছে।
পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি আরো কিছু প্রস্তাব করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
নগরীর কয়েক দশকের পুরোনো জলাবদ্ধতার সমস্যা নিরসনে সিডিএর মেগা প্রকল্পটিসহ চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এগুলো মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা।
এরমধ্যে জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ৩৬টি খাল নিয়ে যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তার ব্যয় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। আর মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের জুনে।
প্রকল্পের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত ৮৪ শতাংশ। ৩৬টি খালের মধ্যে ২৫টি খালের কাজ শতভাগ শেষ। বাকিগুলোর মধ্যে ছয়টি খালের কাজ ৯০ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে। আর পাঁচটি খালের কাজ ৯০ শতাংশের নিচে।
রিলেটেড লিংক-
চট্টগ্রামে খালে পড়ে শিশুর মৃত্যুতে তদন্ত কমিটি
চট্টগ্রামে রিকশা পড়ল নালায়, তলিয়ে গেল ৭ মাসের শিশু
চট্টগ্রামে নালায় নিখোঁজ শিশুর লাশ মিলল ১৪ ঘণ্টা পর