Published : 09 Jul 2025, 11:54 PM
মাস তিনেকের ব্যবধানে ফের চট্টগ্রামে নালায় পড়ে প্রাণ গেছে আরেক শিশুর, যে ঘটনা ফের মনে করিয়ে দিচ্ছে বন্দরনগরীর অরক্ষিত নালাগুলো যেন একেকটি ‘মৃত্যুকূপ’।
নয় বছরে নগরীতে এমন মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৫ জনের। প্রত্যেকটি ঘটনার পর টনেক নড়ে স্থানীয় প্রশাসনের, যদিও কিছুদিন পরই সেগুলো তারা ভুলতে বসেন।
বুধবার দুপুরে আনন্দপুর তাসফিয়া গেইট এলাকায় হুমাইরা আক্তার নামে ৩ বছরের শিশুটি নালায় পড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হালিশহর থানার এসআই ইমন দত্ত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিশুটির মা ওই এলাকায় একটি কারখানায় চাকরি করেন। মায়ের অজান্তে শিশুটি খেলতে খেলতে সড়কে নেমে আসে এবং যে ভবনে শিশুটির মা কাজ করেন তার সাথে লাগোয়া নালায় পড়ে পানিতে তলিয়ে যায়।”
দুদিন ধরে টানা বৃষ্টিতে ওই এলাকার সড়কে পানি জমে ছিল। পানির কারণে সড়ক নালা আলাদা করে বোঝা যাচ্ছিল না। ভবনের পাশে লাগোয়া ছোট নালাটি বড় নালার সাথে যুক্ত হয়েছে। শিশুটি ছোট নালায় পড়ে গিয়ে পানিতে তলিয়ে যায়।
এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি)। সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাটিতে কারও গাফিলতি পেলে ব্যবস্থা নেবেন।
এর আগে ১৮ এপ্রিল রাতে চকবাজারের কাপাসগোলা এলাকায় যাত্রীসহ একটি রিকশা নালায় পড়ে গেলে সাত মাস বয়সী এক শিশু তলিয়ে যায়। এর ১৪ ঘণ্টা পর নগরীর চাক্তাই চামড়া গুদাম এলাকা থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল-নালায় পড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে কয়েকদিন হইচই হয়। কিন্তু এরপর খাল-নালাগুলো ঝুঁকিমুক্ত করতে কোনা কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না। তাই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

বুধবার শিশু হুমাইরা আক্তারের মৃত্যুর পর বন্দর নগরীকে ‘মৃত্যু উপত্যকার’ সঙ্গে তুলনা করেন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “নিয়মিত খাল-নালায় পড়ে স্রোতে ভেসে মানুষ মারা যাচ্ছে। এত বছরেও এই জায়গাগুলো সুরক্ষিত করা গেল না। এগুলো দায়িত্বহীনতাজনিত হত্যাকাণ্ড।
“আগে তবু ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কাউন্সিলররা ছিলেন। এখন তারা নেই। কে কীভাবে দেখাশোনা করছে, তা নগরবাসী জানে না। কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে পুরো শহরের সব ওয়ার্ডের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা এলাকায় যান না। শুধু সনদ ইস্যু করেন।”
বন্দরনগরীকে ‘অভিভাবকহীন শহর’ বলে বর্ণনা করেন প্রকৌশলী দেলোয়ার। তিনি বলেন, “কেউ মারা গেলে কয়েকদিন সবাই মিলে শোরগোল করি। তারপর সবাই ভুলে যায়। এরপর কর্তৃপক্ষ আর কিছুই করে না।
“আজ (বুধবার) যেখানে শিশুটি মারা গেল, সেখানে পানি জমে থাকায় ড্রেনের মুখই দেখা যাচ্ছিল না। এগুলো দেখার কী কেউ নেই? যাদের সন্তান মারা গেল তাদের ক্ষতি অপূরণীয়।”
সবগুলো সেবা সংস্থাকে সচেতন ও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বলেন, “দায়িত্বশীলতার সাথে অঙ্গীকার ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে, যাতে নগর জীবনে এরকম ঘটনা আর না ঘটে।”
নয় বছরে যত প্রাণহানি
২০১৭ সালের ২ জুলাই এম এম আলী সড়কে রয়েল গার্ডেন কমিউনিটি সেন্টারসংলগ্ন বড় নালায় পড়ে তলিয়ে যান সাবেক সরকারি কর্মকর্তা শীলব্রত বড়ুয়া (৬২)। পরদিন প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে মিয়াখান নগরে চাক্তাই খালে তার লাশ পাওয়া হয়।
২০১৮ সালের ৯ জুন আমিন জুট মিল এলাকায় নালায় পড়ে ৭ বছরের শিশু মো. আল আমীনের মৃত্যু হয়।
২০২১ সালের ৩০ জুন নগরীর মেয়র গলি এলাকায় চশমা খালে পড়ে মারা যান সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুলতান (৩৫) ও যাত্রী খাদিজা বেগম (৬৫)।
ওই বছরের ২৫ অগাস্ট নগরীর মুরাদপুর মোড়ে চশমা খালে পা পিছলে তলিয়ে যাওয়া সবজি বিক্রেতা ছালেহ আহমেদের আর খোঁজ মেলেনি।
একই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর নগরীর আগ্রাবাদ মাজার গেট এলাকায় ফুটপাত ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় পা পিছলে নাছির ছড়া খালে পড়ে মৃত্যু হয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী শেহেরীন মাহমুদ সাদিয়ার।
এরপর ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর একই খালে তলিয়ে যায় শিশু মো. কামাল উদ্দিন। তিন দিন পর নগরীর মির্জা খাল থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়।
২০২৩ সালের ৭ অগাস্ট চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের ফতেহপুর ইসলামিয়া হাটসংলগ্ন বাদামতলা এলাকায় বৃষ্টির মধ্যে নালায় পড়ে মৃত্যু হয় কলেজছাত্রী নিপা পালিতের (২০)।
এরপর নগরীর উত্তর আগ্রাবাদের রঙ্গীপাড়ায় নালায় পড়ে নিখোঁজ হয় দেড় বছরের শিশু ইয়াছিন আরাফাত।
২০২৩ সালের ২৭ অগাস্টের ওই ঘটনায় শিশুটির লাশ মেলে ১৬ ঘণ্টা পর; নালার আবর্জনার নিচে।
পরের বছরের ২৭ মে ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে ভারি বর্ষণ ও জোয়ারের মধ্যে নগরীর আছাদগঞ্জ শুটকিপল্লী এলাকায় কলাবাগিচা খালে পড়ে মারা যান নগরীর ইসলামিয়া কলেজের ইংরেজি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আজিজুল হাকিম।
একই বছরের ৯ জুন নগরীর আগ্রাবাদে নাছির খালে পড়ে মারা যায় সাইদুল ইসলাম নামে সাত বছরের এক শিশু।
২০২৪ সালের ১১ জুন চাক্তাই খালের স্লুইস গেট এলাকায় এক শিশু নিখোঁজ হয়, ১৪ ঘণ্টা পর তার লাশ উদ্ধার হয় রাজাখালী খাল থেকে।
এরপর ২০২৫ সালের ১৮ এপ্রিল রাতে চকবাজারের কাপাসগোলা এলাকায় যাত্রীসহ একটি রিকশা নালায় পড়ে গেলে সাত মাস বয়সী এক শিশু তলিয়ে যায়। ১৪ ঘণ্টা পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
নালায় পড়ে মৃত্যুর মিছিলের সবশেষ বুধবার যোগ হয়েছে ৩ বছরের হুমাইরা আক্তার নাম। তাদের গ্রামের বাড়ি ভোলা। চাকরিসূত্রে শিশুটির বাবা-মা আনন্দপুর এলাকায় থাকেন। তার বাবার নাম আবদুর রহমান।
বল তুলতে গিয়ে তলিয়ে যায় হুমাইরা
বুধবার দুপুরে হালিশহরের আনন্দপুর তাসফিয়া গেইট এলাকায় মসজিদ গলির মুখে একটি ভবন লাগোয়া সার্ভিস ড্রেনে পড়ে যায় হুমাইরা। মায়ের সঙ্গে ওই ভবনে এসেছিল শিশুটি। তার মা ভবনটির একটি কারখানার কর্মী।
ভবনটির সিসিটিভি ভিডিওতে দেখা গেছে, হুমাইরা হাতে বল নিয়ে ভবনের মূল ফটকের সামনের সড়কে খেলছিল। ওই সড়ক ধরে লোকজনকেও হেঁটে যেতে দেখা যায়। ফটকের পাশেই মসজিদ গলি জুড়ে ছিল জলাবদ্ধতা। গলিটি যেখানে মূল সড়কে মিশেছে, সেই কোণায় হুমাইরার হাত থেকে বল পানিতে পড়ে যায়। তখন বল তুলতে নিচু হতেই হুমাইরা সার্ভিস ড্রেনে পড়ে যায়।

এরপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মসজিদ গলি ধরে দুজন যুবক ছুটে আসেন। তাদের চিৎকারে শিশুটির মাসহ ভবন থেকে কয়েকজন বের হয়ে আসেন। তারা সার্ভিস ড্রেনের সঙ্গে যুক্ত মূল সড়কের বড় নালায় শিশুটিকে খুঁজতে থাকেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর ৩০ গজ দূরে নালার স্ল্যাব তুলে হুমাইরাকে খুঁজে পাওয়া যায়।
হালিশহর থানার এসআই ইমন দত্ত বলেন, টানা বৃষ্টিতে ওই এলাকার সড়কে পানি জমে গেছে। পানির কারণে সড়ক নালা আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে না। ভবনের পাশে লাগোয়া ছোট নালাটি বড় নালার সাথে যুক্ত হয়েছে। আর শিশু হওয়ার কারণে ছোট নালায় পড়ে গিয়ে পানিতে তলিয়ে যায়।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসের লিডার কামরুল ইসলাম বলেন, “শিশুটি যেখানে পড়ে গেছে সেখান থেকে অন্তত ৩০ গজ দূর থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, রামপুরা ও আশেপাশের কয়েকটি এলাকার পানি আনন্দপুর এলাকা দিয়ে নামে। এ কারণে বৃষ্টি হলেই মসজিদ গলি ও আশেপাশের কয়েকটি এলাকার সড়কে পানি জমে যায়।
মঙ্গলবার রাত থেকে নগরীতে ভারি বৃষ্টি শুরু হয়। বুধবার সকালে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে ১৬৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
তদন্তে কমিটি
নালায় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।
‘সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা কমান্ডার ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরীকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, “এই দুর্ঘটনা যদি কারও কোনো অবহেলার জন্য হয়ে থাকে, সিটি করপোরেশন বা অন্য কারও গাফিলতির জন্য। অবশ্যই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।”
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিনি বলেন, “যে নালায় শিশুটি পড়ে যায় সেটি ছোট নালা। সার্ভিস ড্রেন, এর মালিকানা সিটি করপোরেশনের না। এ ধরনের ড্রেনে দুর্ঘটনা ঘটার কোনো সম্ভাবনা নাই। বেশি ছোট হওয়ায় শিশুটি এ নালায় পড়ে গিয়ে তলিয়ে যায়।”
প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তার দাবি, ওই এলাকায় সিটি করপোরেশনের সবগুলো নালায় স্ল্যাব বসানো আছে।
সিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “চকবাজারে যে দুর্ঘটনা ঘটেছিল এরপর মেয়র মহোদয় যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন নগরীতে যতগুলো অরক্ষিত খাল-নালা আছে সেগুলোতে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। রিটেনিং ওয়াল, বাঁশের বেড়া বা লোহা যাই দিয়ে হোক।
“সে অনুসারে বড় খালগুলো আমরা কাভার করে ফেলেছি। যেগুলো পারিনি আমরা বাঁশ দিয়েও করে দিয়েছি। এখানে কেন হয়নি সেটা আমরা জানি না।”
সিসিসির অধীনে যে ১৬০০ কিলোমিটার নালা আছে সেগুলোর নিরাপত্তা বেস্টনী দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন বলে ইখতিয়ার উদ্দিন জানিয়েছেন।
সিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে এক দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
“যেখানে ঘটনা ঘটেছে সেটা ‘বাই লেইন’। মূল খাল-নালা আমরা বেশিরভাগ ইতিমধ্যে কাভার করেছি। বাই লেইন কাভার করার ক্যাপাসিটি সিটি করপোরেশনের নেই।”
ঘটনাস্থলে নালায় স্ল্যাব না থাকা সংক্রান্ত স্থানীয়দের অভিযোগ দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “সেটা সঠিক নয়। এটা ভবনের লাগোয়া গলির মধ্যে একটা সার্ভিস ড্রেন। তবে শহরে অনেক জায়গায় স্ল্যাবের ঢাকনা ও ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হয়। এমনকি খাল-নালায় দেওয়া লোহারি ফেন্সিং এর লোহাও চুরি হয়। এটাকে কী বলব?”
আরও পড়ুন-
চট্টগ্রামে নালায় তলিয়ে যাওয়া শিশু উদ্ধার
ব্যস্ত নগরীতে উদাম নালা, নিরাপদ হবে কবে?