Published : 19 Oct 2025, 04:26 PM
আবু ধাবিতে রাশিদ খানের গুগলিতে ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছেতাইভাবে সিরিজ হেরেছে বাংলাদেশ। সেই তিক্ততার রেশ মিলিয়ে যায়নি পুরোপুরি। তবে মিরপুরের কালো মাটির উইকেটে বাংলাদেশের ক্রিকেট খানিকটা স্বস্তির পরশ পেল লেগ স্পিনের ছোঁয়াতেই। রাশিদ এখানে নেই। ঘূর্ণি বলের গল্প লিখলেন এবার রিশাদ হোসেন। উইকেটের সহায়তা কাজে লাগিয়ে টার্ন, ফ্লাইট, গতি ও নানা বৈচিত্র মেলে ধরে এই লেগ স্পিনার যেন চোখে সর্ষে ফুল দেখালেন ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যানদের।
বল পড়তে না পারার বিভ্রান্তি আর ব্যাটসম্যানদের ভোগান্তি অনেকটা একইরকমের। শুধু রাশিদের জায়গায় নামটা এখানে রিশাদ।
এমনিতে দুজনের তুলনাই চলে না। সীমিত ওভারের ক্রিকেট দুনিয়ার সেরা লেগ স্পিনার রাশিদ। সেখানে সেখানে নিজের নাম ছড়াতে শুরু করেছেন সবে। আফগান তারকার মতো গুগলির জাদু এখনও রপ্ত করতে পারেননি বাংলাদেশের তরুণ। তবে বিসিবির স্পিন কোচ সোহেল ইসলামের বিশ্বাস, গুগলিতেও একসময় ২২ গজ রাঙাবেন রিশাদ।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে শনিবার ব্যাট হাতে মহামূল্য একটি ক্যামিও ইনিংস খেলার পর বল হাতে রেকর্ড গড়া বোলিংয়ে ৬ উইকেট নিয়ে ম্যাচ-সেরা হন রিশাদ।
ওই ৬ উইকেটের স্রেফ শেষটি ছিল গুগলিতে। তার লেগ স্পিনেই এমন ভুগেছে ক্যারিবিয়ানরা, খুব বেশি গুগলির চেষ্টা করতে হয়নি তাকে। তবে সম্প্রতি এশিয়া কাপে ও পরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে কিছু গুগলি করতে দেখা গেছে ২৩ বছর বয়সী লেগ স্পিনারকে।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য সেটি দারুণ রোমাঞ্চকর, কারণ গুগলি পুরোপুরি রপ্ত করতে পারলে রিশাদ নিশ্চিতভাবেই হয়ে উঠবেন ব্যাটসম্যানদের আতঙ্ক।
আফগানদের বিপক্ষে সিরিজের সময়ই রাশিদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে রিশাদকে। গুগলির আলোচনায় হয়তো সেখানে ছিল। ওই আলোচনার সময় সেখানে ছিলেন বাংলাদেশের স্পিন বোলিং কোচ মুশতাক আহমেদ। সাবেক পাকিস্তানি লেগ স্পিনার খেলোয়াড়ি জীবনে ছিলেন গুগলির ‘মাস্টার।’
মুশতাকের কাছ থেকে দীক্ষা নিচ্ছেন রিশাদ। শিখছেন তিনি সোহেলের সংস্পর্শেও। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ শুরুর আগের দিন অনুশীলনেও যেমন দেখা গেল।
শের-ই-বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের ইনডোরের আউটার নেটে সেদিন রিশাদের বোলিংয়ে পুরোটা সময় পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মুশতাক ও সোহেল। তরুণ লেগ স্পিনারের প্রতিটি ডেলিভারিই তারা পরখ করেছে গভীর মনোযোগে।
এমনিতেই বাংলাদেশ দল যখন ইনডোর বা একাডেমি মাঠে প্রস্তুতি নেয়, বিসিবি নিয়মিতভাবেই যুক্ত রাখে সোহেল। বিশেষ করে দেশের স্পিনারদের জন্য বরাবরই ভরসার জায়গা এই কোচ। মিরাজ, তাইজুল ইসলামরা নানা সময়েই তার সঙ্গে কাজ করে উপকৃত হয়েছেন। রিশাদের ক্ষেত্রে সোহেলকে দেখা যায় অনেকটা গুরুর ভূমিকায়।
শুক্রবারের অনুশীলনে রিশাদের প্রতিটি ডেলিভারির পরই দেখা যায় কিছু না কিছু আলোচনা। তার কবজির অবস্থার, গ্রিপ, শরীরের ভারসাম্য, রিলিজ পয়েন্ট, নানা কিছু নিয়ে চলে তাৎক্ষণিক ছোট ছোট আলোচনা। মুশতাক কখনও নেটের পেছনে দাঁড়িয়ে দেখেন বলের ফ্লাইট, কখনও কাছে গিয়ে বলে যান কিছু। সোহেলও পাশ থেকে দিতে থাকেন নানা নির্দেশনা।
লেগ স্পিনারদের জন্য সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জ ছন্দ ধরে রাখা। ফর্মে থাকার সময়ও অনেক সময় হুটহাট রিদম হারিয়ে যায়। রিশাদের গত কিছু দিনে নানা রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে।

কয়েক মাস আগে পাকিস্তান সুপার লিগে ৭ ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে আলোচনায় ছিলেন তিনি। কিন্তু এরপরের পাকিস্তান সিরিজে ছন্দ হারিয়ে ফেলেন। তখনই ধরা পড়ে ছোট্ট এক সমস্যা, সাইড আর্ম অ্যাকশন আর হেড পজিশনে ত্রুটি। টেকনিকের ছোট ভুলে অনেক সময় প্রভাব পড়ে বড়।
কোচ সোহেল তখন রিশাদকে পর্যবেক্ষণ করে বলেছিলেন, বল ছাড়ার সময় দেহের ভারসাম্য ঠিক হচ্ছে না, কব্জির ঘূর্ণনও সঠিকভাবে কাজ করছে না। সেই জায়গাতেই মুশতাক ও সোহেল মিলে কাজ শুরু করেন। নেট অনুশীলন, ছোট ছোট সংশোধন করে চলতে থাকে বোলিং অনুশীলন। ধীরে ধীরে ফিরতে থাকে পুরনো ছন্দ। মিলতে থাকে নতুন ধার। সেই পথ ধরেই এশিয়া কাপে ও আফগানিস্তানে বিপক্ষে সিরিজে ভালো বল করে এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে রেকর্ডময় বোলিং।
রিশাদরে এমন পারফর্মে দারুণ খুশি কোচ সোহেল ইসলাম। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বললেন, অ্যাকশন নিয়ে কাজ করার সুফল মিলতে শুরু করেছে।
‘‘টানা ম্যাচ খেলা বা সংষ্করণে বদলে নিজের খেলার ধরন পাল্টাতে গিয়ে কখনও কখনও সমস্যা চলে আসতে পারে। ওর হয়তো এজন্যই কিছু সমস্যা ছিল। আমার সেই সমস্যা নিয়ে কাজ করেছি। এটা টেকনিক্যাল সমস্যা। একটু ওপেন ছিল, সাইড অন করা হয়েছে। আমিও চেষ্টা করছি। মুশতাক ভাইও চেষ্টা করেছে। কয়েক সেশনে আমরা এ নিয়ে কাজ করেছি। তারপর থেকে ও এটা মেইনটেইন করছে। ও যখন অনুশীলনে আসে, আমরা এই জিনিসগুলো দেখি।’’
‘‘সাইড আর্মের বোলিং সমস্যাটা ঠিক হয়ে গেছে। এখন সাইড অন আছে, ঠিক আছে। আগে যে ক্রটি যে ছিল, তার থেকে সামান্য অ্যাডজাস্টমেন্ট করা হয়েছে। ছোট ছোট কিছু অ্যাডজাস্টমেন্ট এসব।’’
একজন লেগ স্পিনার সাধারণত বলকে কব্জি ও আঙ্গুলের সাহায্যে ঘুরিয়ে বল করার সময় কব্জির অবস্থান শরীরের কাছাকাছি বা সাইড-অন পজিশনে রাখে, যাতে বলটি ব্যাটসম্যানের দিকে গেলে ডান থেকে বামে (ডানহাতি ব্যাটারের জন্য) বাঁক খায়। এটি বলকে বৈচিত্র্য দিতে এবং ব্যাটসম্যানকে বিভ্রান্ত করতে সাহায্য করে।
শনিবারে ম্যাচে রিশাদ ৯ ওভারে ৩৩ রানে ৬ উইকেট শিকার করেন। রান দেননি ৩৫ ডেলিভারিতে। ৩৪ উইকেট নিয়ে এ বছর এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের সফলতম বোলার তিনিই।

সোহেলের মতে, অ্যাকশনের সমস্যাটুকু শুধরে নেওয়াতেই রিশাদের সাফল্যের হার বেড়েছে।
‘‘আগের থেকে রিশাদের বোলিংয়ের যেটা পরিবর্তন হয়েছে, সেটা হচ্ছে অ্যাকুরেসি বাড়ছে এখন। আগের চেয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ ভালো ওর। একজন লেগ স্পিনারের জন্য এটা দারুণ ইতিবাচক বিষয়। শর্ট বল কম করছে এখন, সামনে বল করছে। এই ম্যাচে উইকেটের সুবিধা তো ছিলই। সুযোগটা কাজে লাগিয়ে নিজের প্রক্রিয়া ঠিক করে জায়গায় বল করে গেছে।’’
ছুটে চলার এই পথে সামনে তাকিয়ে রিশাদের গুগলি নিয়েও বড় স্বপ্ন দেখছেন সোহেল।
‘‘ও যখন ম্যাচ খেলা শুরু করেছে, তখন তো গুগলি ছিল না ওর। এখন ও লেগ স্পিনে আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে আগের চেয়ে বেশি। গুগলিটিও চেষ্টা করছে। আস্তে আস্তে এখানেও মাস্টার হয়ে উঠবে। এসব চলতে থাকবে। এগুলো উন্নতির একেকটি প্রক্রিয়া।’’