Published : 29 Dec 2025, 04:30 PM
উইকেট সবুজ ঘাসে ঢাকা। চারপাশ গুমোট। আকাশ মেঘলা। বাতাশ হীমশীতল। সিলেটে যেন পুরোপুরি ইংলিশ কন্ডিশন! গোটা আবহ যেরকম আভাস দিল, চট্টগ্রাম রয়্যালসের ব্যাটিংয়েও ফুটে উঠল সেই চিত্র। রংপুর রাইডার্সের বোলিংয়ের সামনে দাঁড়াতেই পারল না তারা। আগের ম্যাচে জয় পাওয়া দলটিকেই গুঁড়িয়ে বিপিএল শুরু করল ফেভারিট রংপুর রাইডার্স।
দেশি-বিদেশি ক্রিকেটারের শক্তি-সামর্থ্যে অন্য সব দলের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে থাকা রংপুর রাইডার্স শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করল ৭ উইকেটের জয়ে।
সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে সোমবার চট্টগ্রাম গুটিয়ে যায় স্রেফ ১০২ রানে। ওপেনার মোহাম্মদ নাঈম শেখ বিদায় নেন শুরুতে ঝড় তোলার পর। তাদের আর কোনো ব্যাটসম্যান পারেননি উল্লেখযোগ্য কিছু করতে।
গত বিপিএলে ফরচুন বরিশালের শিরোপা জয়ে বড় অবদান রাখা ফাহিম আশরাফ এবার নতুন দলের হয়ে শুরু করলেন পুরোনো চেহারাতেই। পাকিস্তানি অলরাউন্ডার রংপুরের হয়ে ৫ উইকেট নিলেন ১৭ রান দিয়ে।
এবারের বিপিএলে ৫ উইকেট শিকারি প্রথম বোলার তিনি। মুস্তাফিজুর রহমান, আলিস আল ইসলাম ও সুফিয়ান মুকিমও ছিলেন উজ্জ্বল।
রান তাড়ায় রংপুর জিতে যায় ৫ ওভার বাকি থাকতে। এক পর্যায়ের যদিও মনে হচ্ছিল ব্যবধান হবে আরও বড়। তবে ৯৩ রানের উদ্বোধনী জুটির পর তিনটি উইকেট হারায় তারা।
আগের রাতে দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া দাভিদ মালান করেন ফিফটি।
কন্ডিশন যেমন ছিল, টস জিতে বোলিং নিতে ভুল করেননি রংপুর অধিনায়ক নুরুল হাসান সোহান। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সিলেটে পা রাখা অ্যাডাম রসিংটনকে একাদশে নিয়ে ওপেনিংয়ে পাঠায় চট্টগ্রাম। কদিন আগে নেপাল প্রিমিয়ার লিগে সর্বোচ্চ রান করা ইংলিশ ব্যাটসম্যান বিপিএল অভিষেকে পারেননি কিছু করতে।
প্রথম ওভারে শরীর তাক করে আসা নাহিদ রানার ১৪৫.৮ কিলোমিটারের ডেলিভারিতে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন রসিংটন। দুই বল পর নাহিদের ১৪৬.৬ কিলোমিটার গতির ডেলিভারি সামলাতে না পেরে আউট হয়ে যান তিনি দৃষ্টিকটূভাবে।
অন্য প্রান্তে নাঈম ছিলেন অন্য চেহারায়। ফাহিমের বলে বাউন্ডারি দিয়ে শুরুর পর নাহিদ রানাকে তুলাধুনা করেন তিনি। গতিতারকার এক ওভারে তিনটি চার ও একটি ছক্কা মারেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। পরে দুটি চার মারেন তিনি আলিসকে, মুস্তাফিজের প্রথম বলেও মারেন বাউন্ডারি।
ব্যস, সেখানেই শেষ তার অভিযান। মুস্তাফিজের বেশ বাইরের বল স্টাম্পে টেনে আনেন তিনি বাজে শট খেলে। ক্যারিয়ারে আগেও অনেকবার আউট হয়েছেন এভাবে। নিলামের সবচেয়ে দামি ক্রিকেটার ফেরেন ২০ বলে ৩৯ রান করে।

৫ ওভারে ৪৫ রান করা দলের পথ হারানোর শুরু সেখান থেকেই।
মাহমুদুল হাসান জয়কে শূন্য রানে ফেরান আলিস। গত বিপিএলের পর চোট-অস্ত্রোপচার মিলিয়ে মাঠের বাইরেই ছিলেন তিনি। প্রায় ১১ মাস পর ফিরে দারুণ বোলিং করেন এই রহস্য স্পিনার।
ফাহিমের প্রথম শিকার ছিলেন মাহফিজুল ইসলাম রবিন। পরে মাসুদ গুরবাজকে ফেরান তিনি চোখধাঁধানো এক ফিরতি ক্যাচে।
আফগান তারকা রাহমানউল্লাহ গুরবাজের ভাই মাসুদের টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং গড় ৯.৭২, স্ট্রাইক রেট ৮৯.১৬। বিদেশের একটি লিগে তিনি কীভাবে খেলছেন, বিস্ময় জাগতে বাধ্য। সেটিকে ভুল প্রমাণ করার মতো কিছু করতে পারেননি তিনি ব্যাট হাতে (১৫ বলে ৯)।
আগের ম্যাচে ৮০ রান করে ম্যাচ-সেরা হওয়া মির্জা তাহির বেগ এবার ২৪ বল খেলে করতে পারেন ২০ রান। শেষ দিকে একটি ছক্কা মারলেও ১৩ রান করতে আবু হায়দার রনি খেলেন ২১ বল।
আবু হায়দার ও শরিফুল ইসলামকে এক ওভারে ফিরিয়ে চট্টগ্রামের ইনিংস শেষ করার পাশাপাশি ৫ উইকেট পূর্ণ করেন ফাহিম।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এই স্বাদ পেলেন তিনি চতুর্থবার।

সহজ রান তাড়ায় রংপুর রাইডার্স এগিয়ে যায় অনায়াসেই। দুই ওপেনার দাভিদ মালান ও লিটন দাস মিলেই দলকে নিয়ে যান জয়ের কাছে।
প্রথম দুই ওভারে দুই ব্যাটসম্যান দুটি করে বাউন্ডারি মেরে দেন। পেস সহায়ক কন্ডিশনেও বিস্ময়করভাবে পেসারদের সেভাবে কাজে লাগাননি চট্টগ্রাম অধিনায়ক শেখ মেহেদি। শুরুটা শরিফুল করলেও পরের চার বোলারই ছিলেন স্পিনার। এমনকি মির্জা বেগ ও জয়ের মতো অনিয়মিত স্পিনারদেরও বোলিংয়ে আনা হয় মুকিদুল ইসলাম, আবু হায়দারের আগে।
তাতে মালান ও লিটনের কাজটা সহজ হয়ে ওঠে। মালানের ছক্কা ও লিটনের দুই ছক্কা এক চারে জয়ের এক ওভার থেকেই আসে ২৪ রান।
দুই ব্যাটসম্যানই অবশ্য জীবন পান। ২৭ রানে মালান বেঁচে যান কিপার রসিংটনের ব্যর্থতায়। লিটন ২০ রানে রক্ষা পান রান আউট হওয়া থেকে, ৪৬ রানে শেখ মেহেদির বলে তার সহজ ক্যাচ ছাড়েন নাঈম শেখ।
দূরে রাখা মুকিদুলকে শেষ পর্যন্ত আক্রমণে আনার পর ভাঙে এই জুটি। লিটন আউট হন ৩১ বলে ৪৭ রান করে।
মুকিদুল পরের ওভারে ফেরান তাওহিদ হৃদয়কেও। দারুণ ক্যাচ নেন তানভির ইসলাম।
শেষ নয় সেখানেই। ৪৮ বলে ৫১ রান করা মালান উইকেট উপহার দেন জয়কে। ওই ওভারে খুশদিল শাহর ছক্কায় শেষ হয় ম্যাচ।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
চট্টগ্রাম রয়্যালস: ১৭.৫ ওভারে ১০২ (নাঈম ৩৯, রসিংটন ১, মির্জা ২০, জয় ০, মাহফিজুল ১, গুরবাজ ৯, শেখ মেহেদি ১, আবু হায়দার ১৩, তানভির ৬, শরিফুল ৬, মুকিদুল ১*; নাহিদ ৩-০-৩৩-১, ফাহিম ৩.৫-০-১৭-৫, আলিস ৩-০-১৭-১, মুস্তাফিজ ৩-০-১৯-২, মুকিম ৪-০-১২-১, খুশদিল ১-০-৩-০)।
রংপুর রাইডার্স: ১৫ ওভারে ১০৭/৩ (মালান ৫১, লিটন ৪৭, হৃদয় ১, মাহমুদউল্লাহ ১*, খুশদিল ৬*; শরিফুল ২-০-১৬-০, শেখ মেহেদি ৪-০-২৭-০, তানভির ৪-০-২৭-০, মির্জা ১-০-২-০, জয় ২-০-৩০-১, মুকিদুল ২-০-৫-২)।
ফল: রংপুর রাইডার্স ৭ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: ফাহিম আশরাফ।