Published : 11 Dec 2025, 08:38 AM
চার ম্যাচ ২৯ উইকেট, বোলিং গড় ১৩.০৩। এবারের জাতীয় লিগে এতটাই অসাধারণ বোলিং পারফরম্যান্স মুকিদুল ইসলামের। ৩৪ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট তানভির ইসলামের। কিন্তু আগুনে বোলিংয়ে ম্যান অব দা টুর্নামেন্ট হয়েছেন মুকিদুল। রংপুর বিভাগের শিরোপা জয়ে রেখেছেন বড় অবদান। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ২৫ বছর বয়সী এই পেসার তুলে ধরলেন তার সাফল্যের পেছনের গল্প, যেখানে আছে দিন-রাত একা একা ঘাম ঝরানোর নানা অধ্যায়। পাশাপাশি শোনালেন তার চোট-জর্জর ক্যারিয়ার, নানা পারিপার্শ্বিকতা, বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে সাফল্য আর হতাশার অধ্যায় ও জাতীয় দলে খেলার স্বপ্নের কথাও।
ফেইসবুকে আপনি লিখেছেন, ‘ফাইনালি প্লেয়ার অব দা টুর্নামেন্ট…”। যেটিতে ফুটে উঠছে, অনেক কাঙ্ক্ষিত ছিল আপনার এই অর্জন। অনেক দিন ধরে চাইছিলেন এমন কিছু করতে?
মুকিদুল ইসলাম: ইচ্ছে ছিল খুব ভালো করার। নিজেকে মেলে ধরার, একটা জায়গায় নিজেকে তুলে ধরার। আমার মূল লক্ষ্য ছিল আসলে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হওয়া। ম্যাচ বাই ম্যাচ এগোনোর লক্ষ্য ছিল। কিন্তু আমি ম্যাচ খেলতে পেরেছি মাত্র চারটি। প্রথমে তো আমার ইনজুরি ছিল, খেলতে পারিনি।
ইনজুরি থেকে ফিরে প্রথম ম্যাচটাও ততটা ভালো করিনি। পাঁচ উইকেট নিলেও আসলে তখনও নিজেকে গোছানোর চেষ্টা করেছি। এরপরে বাকি তিন ম্যাচে যতটুক চেয়েছি, ততটুকু পেরেছি আর কী…।
চোটে পড়েছিলেন তো জাতীয় লিগ টি-টোয়েন্টির সময়? একটি ম্যাচ খেলে আর খেলতে পারেননি…
মুকিদুল: হ্যাঁ, এনসিএল টি-টোয়েন্টির সময়। হ্যামস্ট্রিং টিয়ার ছিল, গ্রেড টু।
এবার লক্ষ্য ছিল এনসিএল টি-টোয়েন্টিতে খুব ভালো করার। কারণ বিপিএলে আপনারা জানেন, সেভাবে ভালো কিছু করার সুযোগ সবসময় মেলে না। দলের ব্যাপার থাকে, কম্বিনেশন থাকে, টিম ম্যানেজমেন্টের নানা চাওয়া থাকে, নানা কারণে সুযোগ কম মেলে। এনসিএল এমন একটা জায়গা, যেখানে সেই সমস্যা নেই। আমার রংপুরে তো আমিই মূল পেসার। এজন্যই ভাবনায় ছিল যে, মূল পেসার হিসেবে যেহেতু সব ম্যাচই খেলতে পারব, দারুণ কিছু করব এবার।

কিন্তু আল্লাহতায়ালার চিন্তা ছিল অন্যরকম। খেলতে পারলাম না। খুব খারাপ লাগছিল ইনজুরিতে পড়ার পর। কারণ, এনসিএলের আগে এবার খুব কষ্ট করেছিলাম। অনেক কাজ করেছিলাম।
মানে মৌসুম শুরুর আগের কথা বলছেন? কেমন কাজ করেছিলেন?
মুকিদুল: হ্যাঁ, ওই সময়টাতে অনেক চেষ্টা করছিলাম, যতটুক ফিট রাখা যায় নিজেকে। যা যা কাজ করা দরকার, সব করছিলাম।
ঢাকাতেই তো থাকি। মিরপুরে একাডেমিতে যেতাম, একা একাই কাজ করতাম। ফিটনেস, বোলিং, ব্যাটিং, সব নিয়েই কাজ করতাম। নিজের কাছেই মনে হচ্ছিল, ব্যাটিংয়ে উন্নতি দরকার। এজন্য ইনডোরে গিয়ে ব্যাটিং করতাম। বোলিং তো আছেই।
সকালে মাঠে গিয়ে দুই-আড়াই ঘন্টা ব্যাটিং নিয়ে কাজ করতাম। দুপুরে হালকা রানিং করতাম, বোলিং করতাম। তারপর যখন মনে হতো যে ক্লান্ত হয়ে গেছি…. ক্লান্তি নিয়ে কাজ করলে অনেক সময় কাজগুলো ভালোভাবে হয় না। তখন বাসায় ফিরে বিশ্রাম নিতাম। যখন আবার মাঠে যেতাম।
একা একাই কাজ করতাম, যখন কেউ দেখত না, তখন যেতাম। অনেক দিনই এমন হয়েছে যে সন্ধ্যায় গিয়েছি। ছয়টার দিকে যেতাম, কাজ-টাজ করে ৯টার দিকে ফিরতাম।
বেশির ভাগ সময় একা একাই করতাম। এছাড়া আমাদের ট্রেনার বাপ্পি ভাই আছেন, উনাকে গিয়ে বলতাম। উনি যেভাবে দেখিতে দিতেন, কাজগুলো করতাম। পরে এনসিএল টি-টোয়েন্টিতে যখন চোট পেলাম, তখনও উনার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেছি।
সাত ম্যাচের মাত্র চারটি খেলেই ম্যান অব দা টুর্নামেন্ট হওয়া তো দারুণ ব্যাপার…!
মুকিদুল: ম্যান অব দা টুর্নামেন্ট হওয়াটা আসলে সেভাবে ভাবনায় ছিল না। যতটা সম্ভব ভালো করতে চেয়েছি। ইনজুরি থেকে ফিরে প্রথম ম্যাচে একটু অগোছালো থাকার পরও যখন ৫ উইকেট পেলাম, তখন মনে হলো, আরেকটু চেষ্টা করলে তো আরও ভালো করতে পারি। পরের ম্যাচে আট উইকেট পেলাম।
এরপর মনে হলো, এখনও চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়া সম্ভব। তখন উইকেটের তালিকাটা দেখছিলাম। চার রাউন্ড চলে গেছে তখন। কিন্তু আমার দুই রাউন্ডেই ১৩ উইকেট। অন্যরা খুব এগিয়ে ছিল না। তখনই টার্গেট করলাম যে সর্বোচ্চ উইকেট নিতে হবে।

পরের ম্যাচেও আট উইকেট নিলাম। ওই ম্যাচ চলার সময় আমি এক নম্বরেই ছিলাম। আমার ২১ উইকেট ছিল, তানভির ভাইয়ের (তানভির ইসলাম) ২০টি। উনি দ্বিতীয় ইনিংসে ৭ উইকেট নিয়ে এক লাফে অনেকটা এগিয়ে গেলেন।
এর পরের রাউন্ডের ম্যাচে আমি খেলিনি। কারণ ইনজুরির সময় যেখানে ব্যাথা ছিল, সেটা ফিরে এসেছিল একটু। ফিজিওর সঙ্গে কথা বললাম। তিনি বললেন যে, ‘যেহেতু ইনজুরি থেকে ফিরে এসেছো, ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো।’ আমি বুঝছিলাম যে, না খেললে একটু পেছনে পড়ে যাব। কিন্তু নিজের ভালোর জন্যই বিশ্রাম নেওয়াটা জরুরি ছিল।
শেষ ম্যাচ খেলতে যখন বগুড়ায় গেলাম, তানভির ভাইয়ের তখন ৩১ উইকেট হয়ে গেছে। আমার চেয়ে ১০টা বেশি। বুঝে গেলাম যে, আমার হবে না। তখন ঠিক করলাম, অন্তত দুই-তিনে থাকতে পারলেও ভালো কিছু হবে। চেষ্টা করেছি আর কী। শেষ ম্যাচে অবশ্য মূল লক্ষ্য ছিল, নিজে উইকেট পাই আর না পাই, দল যেন জেতে, কারণ চ্যাম্পিয়নশিপের সামনে ছিলাম আমরা।
ভালো লাগছে যে দল জিতেছে, আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, আমার বোলিংও ভালো হয়েছে। সর্বোচ্চ উইকেট না হলেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট, পেসারদের মধ্যে সর্বোচ্চ। আল্লাহ নিজের হাতে দিয়েছেন আর কী। টি-টোয়েন্টিতে খেলতে পারিনি, এখানে উনি দিয়ে দিলেন এত কিছু।
উইকেটগুলো কেমন ছিল এবার? আপনি রাজশাহী, বগুড়া, কক্সবাজারে ম্যাচগুলো খেলেছেন। পেসারদের জন্য উপভোগ্য ছিল উইকেট?
মুকিদুল: একই উইকেটে ব্যাটসম্যানরা সেঞ্চুরি করেছে, পেসাররা ৫ উইকেট নিয়েছে, স্পিনাররাও ৫ উইকেট নিয়েছে। বুঝতেই পারছেন, উইকেট কেমন ছিল।
আমি তো বলব, খুবই ভালো উইকেট ছিল। সবার জন্যই সুযোগ ছিল। উইকেট নিয়ে কারও কোনো অভিযোগ শুনিনি, কেউ খারাপ বলবে বলে মনে হয় না।
ডিউক বলও তো পেসারদের ভালো করতে একটু বাড়তি সুবিধা দিয়েছে…!
মুকিদুল: ডিউক বলটা আসলে কী… পেসারদের জন্য ভালো অবশ্যই, কারণ শেষ পর্যন্ত মুভ করে। বল পুরোনো হলেও মুভ করে। যারা সুইং বোলার, ডিউক বল তাদের জন্য ভালো। শেষ পর্যন্ত সুইং হয়।
তবে শুধু পেসাররাই যে সুবিধা পায়, তা কিন্তু নয়। সর্বোচ্চ উইকেট তো স্পিনার তানভির ভাইয়ের। অন্য স্পিনাররাও ভালো করেছে (সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি আটজনের মধ্যে স্পিনার চারজন)।
মুভ বেশি করে বলে ডিউক বল নিয়ন্ত্রণ করাটাও তো একটা চ্যালেঞ্জ!
মুকিদুল: হ্যাঁ, কন্ট্রোল করা একটু মুশকিল। এটা শিখে নিতে হয়। যদি কন্ট্রোল করতে চান, সিমের কাজ একটু কমিয়ে দিতে হয়।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আপনার ১০০ উইকেটও পূরণ হয়েছে এই মৌসুমে। ছোটখাটো একটা মাইলফলক…
মুকিদুল: হ্যাঁ, ২৫ ম্যচে ১০০ হয়েছে। ২৬ ম্যাচে এখন ১০৯ উইকেট। আমার তো মনে হয়, বেশ ভালো!
এবার জাতীয় লিগ শুরুর আগে ৮০ উইকেট ছিল আমার। সাত ম্যাচ ছিল সামনে, ঠিক করেছিলাম, ১০০ উইকেট পার করব। পরে তো সব ম্যাচ খেলতে পারলাম না। তার পরও হয়ে গেছে, ভালো লেগেছে খুব।
ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত খেলছেন কয়েক বছর ধরে। এখন কি মনে হয়, ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং করছেন?
মুকিদুল: আপনি যদি আমার ক্যারিয়ার দেখেন, আগেও কিন্তু অনেক ভালো বোলিং করেছি…
জাতীয় লিগে এক ম্যাচে ১২ উইকেটও নিয়েছেন আপনি। কিন্তু এবার টানা ভালো বোলিং করেছেন…
মুকিদুল: গতবার জাতীয় লিগেও কিন্তু ৫ ম্যাচে ২৫ উইকেট ছিল আমার (২২টি)। ওই বছর জাতীয় লিগের টি-টোয়েন্টিতেও ওভারপ্রতি ছয় রান করে দিয়ে উইকেট নিয়েছি বেশ কিছু (ওভারপ্রতি ৬.৮০ রান দিয়ে ১২ উইকেট)। আমি যখনই খেলি, নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি।
ওই বছর আপনি শ্রীলঙ্কা সফরে গেলেন বাংলাদেশের প্রাথমিক টেস্ট স্কোয়াডের অংশ হয়ে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চট্টগ্রামে একটি প্রস্তুতি ম্যাচেও চার উইকেট নিয়েছিলেন…
মুকিদুল: এমনিতেই মানে ইন, আপনি তো মানে প্রমিজিং বোলার বেশ আগে থেকেই, অনেক মানে কয়েক বছর আগেও আপনাকে নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল যে উঠতি বোলার হিসেবে বা হয়তো ন্যাশনাল টিমে খেলবেন, একটা সময় সেটা এখনো হয় নাই। বাট ইনজুরি হয়েছে বেশ আসলে, প্রচুর ইনজুরি হয়েছে। সেটাও তো একটা সমস্যা ছিল আপনার। নানা সময়ে নানা রকম ইনজুরি হয়েছে আরকি।
নিজের প্রাপ্তির সঙ্গে দলীয় অর্জনও তো এলো। রংপুর চ্যাম্পিয়ন হলো। খুব কঠিন লড়াই ছিল এবার, শেষ রাউন্ডের আগে আপনারা পয়েন্ট তালিকায় তিনে ছিলেন। শেষ ম্যাচে প্রথম ইনিংসে বড় লিড পেল প্রতিপক্ষ। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন। কেমন ছিল সেই উত্তেজনা?
মুকিদুল: ওই ভালো লাগার কথা কী আর বলব… আমার নিজের জন্যও অন্যরকম ব্যাপার ছিল। যেটা বললাম একটু আগে যে, একটা ম্যাচ আমি খেলিনি সতর্কতার কারণে। কক্সবাজারে ওই ম্যাচের আগে অধিনায়ক আকবর আমাকে খুব করে বলছিল ম্যাচটা খেলতে। এমনকি ম্যাচের দিন টস করতে নামার আগেও বলেছিল, “প্লিজ ভাইয়া, আবার ভেবে দেখো। এই ম্যাচ জিতলে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাব। তোমাকে আমার লাগবে…।”
কিন্তু ফিজিওর সঙ্গে কথা বলে আমি জানতাম যে, এই ম্যাচ খেলাটা ঝুঁকির হয়ে যাবে। ওকে বললাম সব বুঝিয়ে। একটা পর্যায়ে আকবর বুঝতে পেরে বলল, “যেহেতু ইনজুরির ব্যাপার, তাহলে ঠিক আছে। তবে বগুড়ায় (শেষ ম্যাচে) তোমাকে চাই, সেখানে তোমাকে পুরো রিদমে চাই।”
ওই ম্যাচটায় আমরা বাজেভাবে হেরে গেলাম। পরে বগুড়ায় আসার পর সকালে আমাকে বলল, “ভাই এটাই শেষ ম্যাচ, আমাকে নিরাশ করো না।” আমি বললাম, “সমস্যা নেই, আমি খেলব, সবটুকু দিয়েই বল করব।”
আমাদের আরেক পেসার রবিউল শেষ ম্যাচটা খেলেনি। ও কিন্তু খুব ভালো বোলিং করেছে আগের ম্যাচগুলোয় (৫ ম্যাচে ২২ উইকেট)। ও যাওয়ার আগে বলে গেছে আমাকে, “আমি আর পারছি না, তুমি খেলো…।”
মাঠে নামার পর শুরুতে যখন উইকেট পাচ্ছিলাম না, তখনও আকবর বলছিল, “তুমি ছাড়া আমাদের ম্যাচ জেতানোর কেউ নেই…।” একজন অধিনায়ক যখন এভাবে বলেন, তখন আসলে দলের জন্য সব করতে ইচ্ছে করে।
পরে তো তিনটি উইকেট পেলাম প্রথম ইনিংসে। ব্যাটিংয়ে তো আমরা ভালো করিনি। একসময় ফলো-অনে পড়ার অবস্থা ছিল। পরে তো বাবু ভাইয়ের (আলাউদ্দিন বাবু) সঙ্গে আমার ভালো একটা জুটি হলো। শেষ পর্যন্ত নট আউট থাকলাম। সবাই খুব প্রশংসা করছিল।
আপনাদের রংপুর দলে তো বন্ধনটা অন্যরকম। অনেকেই বলেন, এটিই আপনাদের সাফল্যের বড় কারণ…
মুকিদুল: আমাদের দলে সবাই খুব ঘনিষ্ঠ। সিনিয়র-জুনিয়র কোনো পার্থক্য নেই। সবাই একসঙ্গে থাকি, আড্ডা দেই, মজা করি। সবাই পরস্পরকে নিজের ভাইয়ের মতো দেখে। একদম আপন বড় ভাই বা ছোট ভাইয়ের মতো সম্পর্ক।
আর নাসির ভাই (নাসির হোসেন) তো আছেই, মজা করার জন্য সেরা। মাঠে চাপের সময় এমন সব কথা বলেন যে, চাপ সরে যায়। সবাই হাসতে থাকে।
প্রথম ইনিংসে আমরা পিছিয়ে থাকলেও উনি আমাকে বলছিল যে, “তুমি চাইলে আমাদেরকে এখান থেকেও ম্যাচ জেতাতে পারবে…।” আমি যদিও পুরো ফিট ছিলাম না, তবু জোর করে বল করলাম। শুরুতে দুটি উইকেট নিলাম। ওদের ৫ উইকেট পড়ার পর একটা জুটি হলো।
তখন শরিফুল তো ছিলই, ও একাই সবাইকে উজ্জীবিত করে যাচ্ছিল, চিৎকার করে, বকাঝকা করে, নানাভাবে কথা বলেই যাচ্ছিল। পরে তো উইকেট পড়ল। আমি আরও তিন উইকেট নিয়ে পাঁচ উইকেট নিলাম।
এরপর লক্ষ্য যখন ২৩০, আমাদের বিশ্বাস ছিল যে আমরা পারব। ইকবাল তো দারুণ একটা সেঞ্চুরি করল। খুব ভালো ব্যাট করে ছেলেটা।
আপনাদের ম্যাচ তো তিন দিনেই শেষ। সিলেটের ম্যাচের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। পরদিন সিলেট যখন ড্র করল, আপনারা চ্যাম্পিয়ন হলেন, কেমন মজা হলো?
মুকিদুল: আমরা তো মাঠে গিয়ে সবাই একসঙ্গে খেলা দেখছিলাম। মুশফিক ভাই (সিলেটের মুশফিকুর রহিম) যখন আউট হলো, তখনই বুঝে গেছি, আর হবে না ওদের। পরে সাড়ে তিনটা-চারটার দিকে আমরা নিশ্চিত হয়ে যাই, উৎসব শুরু হয়ে যায়। অনেক মজা করেছি সবাই।
অনেক দিন ধরেই আপনাকে প্রতিশ্রুতশীল মনে করা হচ্ছে। কিন্তু জাতীয় দলে সুযোগ এখনও হয়নি। নিজেকে মেলে ধরার তাড়নার কথা বলছিলেন এই আলোচনার শুরুতে, সেটি কি জাতীয় দলের স্বপ্ন পূরণের জন্যই?
মুকিদুল: আসলে, ওই স্বপ্ন সবারই থাকে। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিটি সুযোগে নিজের সেরাটা দেওয়া। আমি পারফর্ম করে যেতে চাই। কেউ যাতে বলতে না পারে, ছেলেটা পারফর্ম করেনি। আমি আমার প্রক্রিয়ায় থাকতে চাই। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আপনার রেকর্ড তো দারুণ। ২৬ ম্যাচে ১০৯ উইকেট বাংলাদেশের বাস্তবতায় পেসারদের জন্য ভালো। আপনার বোলিং গড় (২০.৫৭), স্ট্রাইক রেট (৩৭.৮) খুব ভালো। নিজের কাছে কি মনে হয়, টেস্ট ক্রিকেটের জন্য আপনি প্রস্তুত?
মুকিদুল: আমার কাছে তো প্রস্তুত মনে হয়েছিল আগেই। কখন জানেন? ২০২১ সালে, যখন শ্রীলঙ্কায় গেলাম। তখন আমার সবকিছু খুব ন্যাচারালি হতো। এখন তো অনেক কিছু সামলে বোলিং করতে হয়। তখন অনেক কিছু নরম্যালি হয়ে যেত। ২০২১, ২০২২ সময়টায় খুব ভালো ছন্দে ছিলাম।
২০২২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলে নেওয়া হয়েছিল আমাকে। কিন্তু চার দিনের ম্যাচ দুটিতে আমাকে খেলানো হয়নি। খালেদ ভাই (সৈয়দ খালেদ আহমেদ), রাজা (রেজাউর রহমান), মৃত্যুঞ্জয় ওদেরকে খেলানো হয়েছিল। একদিনের ম্যাচে খেলেছিলাম, খুব ভালো বোলিং করেছিলাম (৩ ম্যাচে ৬ উইকেট, ওভারপ্রতি ৪.৩৭ রান দিয়ে)।
ওখান থেকে আসার পর ‘এ’ দলের পরের সিরিজে বাদ পড়েছিলাম। এরপর জাতীয় লিগের খেলা ছিল মিরপুরে। সাত উইকেট নিয়ে ম্যান অব দা ম্যাচ হলাম। হাবিবুল বাশার স্যারের (সেই সময়ের জাতীয় নির্বাচক) কাছ থেকে পুরস্কার নিলাম। পরে ‘এ’ দলে নেওয়া হলো, কিন্তু আবার বাইরে বসে ছিলাম। এরপর বিপিএলে এক ম্যাচে ৫ উইকেট নিলাম।
তো চেষ্টা করেছি নানা সময়ে ভালো করার।
আগামী বছর বাংলাদেশের অনেকগুলো টেস্ট আছে। আশা আছে দলে আসার?
মুকিদুল: আমার কাছে সবচেয়ে জরুরি নিজেকে ফিট রাখা। চেষ্টা করছি আর কী।
চোট তো আপনাকে নানা সময়ে ভুগিয়েছে, পিছু ছাড়েই না!
মুকিদুল: এটা তো আসলে কারও নিয়ন্তরণে নেই। যে কোনো সময় যে কারও হতে পারে। কারও কম হয়, কারও বেশি। অনেকের অনেক সময় মাঠে বাজেবাজ পড়ে গেলেও কিছু হয় না, অনেকের আবার হালকা টান লাগলেও অনেক কিছু হয়ে যায়।
পেস বোলারদর চোট হয়ই। অনেকে হয়তো বলেন, “আরে অমুক তো কষ্ট করতে চায় না… এজন্য এত ইনজুরিতে পড়ে…।” কিন্তু কষ্ট না করলে কি কেউ এই লেভেলে খেলতে পারে? কষ্ট সবাই করে, কেউ সামনাসামনি, কেউ আড়ালে।
সামনে তো বিপিএল, এখন কি আপনি পুরো ফিট?
মুকিদুল: নাহ, হ্যামস্ট্রিংয়ের টান নিয়েই তো খেলেছি জাতীয় লিগে। মনের জোরে খেলেছি। কতদিন আর বাইরে থাকব! ঠিক করেছিলাম, যা-ই হোক, খেলবই। এখনও আমার রিহ্যাব চলছে। প্রতিদিনই কিছু না কিছু কাজ থাকে।
ক্যারিয়ার নিয়ে স্বপ্ন কি আাপনার?
মুকিদুল: সবাই তো নিজেকে বড় পর্যায়ে দেখতে চায়। আমারও ইচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলব, ভালো করব। অনেক দিন খেলব, ডমিনেট করব।
কপালে থাকলে একদিন হবে। তবে আমি আসলে যেখানেই খেলি, ভালো করতে চাই। খারাপ খেলে কোনো জায়গা থেকে সরতে চাই না।