Published : 06 Jul 2026, 08:39 PM
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে এক যুবককে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে।
মামলায় খেলাফত মজলিস এবং জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের নেতাসহ ২১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ঘটনার দুই দিন পর সোমবার সকালে নিহত যুবকের মা বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলাটি করেন বলে জানান একই থানার ওসি মোহাম্মদ মাহবুব আলম।
নিহত ২২ বছর বয়সি মো. সিজান ফতুল্লার পশ্চিম মাসদাইর এলাকার ইউনুছ ওরফে ইনু মিয়ার ছেলে।
আসামির হলেন- পশ্চিম মাসদাইরের আল ফালাহ জামে মসজিদের ইমাম ও খেলাফত মজলিসের সদর থানা শাখার সাবেক সহসভাপতি মুফতি কাউছার আহাম্মেদ কাসেমী (৪০), জেলা কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক আব্দুল গনি (৫০), জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের ফতুল্লা থানার আহ্বায়ক জিলানী ফকির (৫৫), একই এলাকার বাসিন্দা আজহার রাজমিস্ত্রী (৫৫), সাইদুল (৪২) এবং আলম (৩৮)। বাকিরা অজ্ঞাত পরিচয়।
ওসি বলেন, “লাশ দাফনের পর সিজানের মা শিল্পী বেগম মামলা করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হননি। আসামিদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে পুলিশ।”
মামলার এজাহারে বাদী লিখেছেন, “সিজান তার ছোট ছেলে। সে অসৎ সঙ্গে বিপথে গেলেও পরিবারের লোকজন তাকে ওইসব কর্মকাণ্ড থেকে ফিরিয়ে এনেছিল। এজন্য তাকে তাবলীগেও পাঠানো হয়েছিল। ভালোর দিকে ফিরে সিজান তার বড় ভাইয়ের কাঁচামালের ব্যবসায় সহযোগিতা করছিল।”
এর আগে শনিবার বিকালে অনিক (২৮) নামের এক যুবককে মোবাইল চোর সন্দেহে আটক করে ‘পশ্চিম মাসদাইরের আল ফালাহ সমাজ কল্যাণ’ সংগঠনের কার্যালয়ের সামনে মারধর করা হয়। অনিকের ভাষ্যে পরে সিজানকে বাসার সামনে থেকে ধরে একই জায়গায় নিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন মা শিল্পী।
তিনি বলেন, “এক পর্যায়ে তারা দুজনকে রাস্তার পাশের বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে স্টিলের পাইপ দিয়ে পেটাতে থাকে। ব্যথায় চিৎকার করলে সিজানের মুখে কালো কাপড় বেঁধে পেটানো হয়।
“খবর পেয়ে আমি সেখানে গিয়ে তাদেরকে অনেক অনুনয় বিনয় করি কিন্তু তারা আমার সামনেই ছেলেকে পেটাতে থাকেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে অচেতন অবস্থায় ছেলেকে আমার জিম্মায় দেয়।”
সেখান থেকে সিজানকে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলেও মামলায় উল্লেখ করেন বাদী।
স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ জানায়, সিজানকে ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে ধরে আনেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি। পরে তারা সিজান ও অনিককে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে কয়েকজন মিলে বেধরক পেটান।
মারধরকারীরা পশ্চিম মাসদাইর এলাকার বাসিন্দা এবং আল ফালাহ সমাজ কল্যাণ সংগঠনের সদস্য। তারা সংগঠনের নামে এলাকায় প্রায় সময় ‘মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ চালান। এর আগেও তারা একাধিক ব্যক্তিকে ধরে এনে কার্যালয়ের সামনে মারধর করেছেন বলে ভাষ্য স্থানীয়দের।
সংগঠনের নামে চালানো এসব কার্যক্রমের কয়েকটি ভিডিও কাউছার কাসেমীর ফেইসবুক পেইজে পাওয়া গেছে। যার মধ্যে সিজান ও অনিককে আল ফালাহ সংগঠনের কার্যালয়ের সামনে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পেটানোর ভিডিও ফেইসবুকে ভাইরাল হয়েছে।
সিজান হত্যার ঘটনার রাতে একটি ভিডিওতে স্থানীয় লোকজনের উদ্দেশ্যে মুফতি কাওছারকে বলতে শোনা যায়, “যার কাছে যা আছে তা নিয়ে নেমে যেতে হবে। ঐক্য থাকলে বাংলাদেশের প্রশাসন কি, কোনো কুত্তায়ও আমাদের কিছু করতে পারবো না। পাবলিক যদি কোনো কুত্তারে মেরে ফেলে তাহলে কি অন্যায় হবে? ইনশাল্লাহ কোনো মামলা হামলা কিচ্ছু হবে না। এভাবে সবাই এক থাকবেন।”
ঘটনার পরদিন বিকালে এলাকায় সাংবাদিকদের ডেকে দেওয়া এক বক্তব্যেও কাউছার কাসেমী দাবি করেন, “সিজান ছিল মাদকাসক্ত ও ছিনতাইকারী। শনিবার সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ আগে বিক্ষুব্ধ জনতা সিজানকে ধরে তাদের কাছে নিয়ে আসে। এ সময় তারা নামাজ শেষে বিষয়টি দেখার কথা জানিয়ে মসজিদে গেলে উত্তেজিত জনতা তাকে মারধর করে।”
সিজানকে পেটানোর ঘটনায় তাদের সংগঠনের কেউ জড়িত নয় বলে দাবি সংগঠনের উপদেষ্টা ও ওলামা দল নেতা জিলানী ফকিরের।
যদিও এদিন দুপুর থেকে কাউছার কাসেমী ও জিলানী ফকিরের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়ায় মামলার বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আর পড়ুন-