১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ফরিদপুরের বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি: দামে ধস, দিশেহারা চাষি

“পেঁয়াজ সংরক্ষণের সুযোগ বাড়ানো গেলে কৃষকরা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।”

ফরিদপুর প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Jul 2026, 03:07 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:35 PM

ফরিদপুরে এবার পেঁয়াজের বাজারমূল্যের ধসে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় প্রায় অর্ধেক দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন বহু চাষি।

তারা বলছেন, এ বছর ফরিদপুরে পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হয়েছে। কিন্তু সংরক্ষণের সুযোগ কম থাকায় কৃষকরা একসঙ্গে বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। ফলে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম কমে গেছে।

চাষিদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে অনেকেই পেঁয়াজ চাষ থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। এতে ভবিষ্যতে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ার পাশাপাশি দামের অস্থিরতাও বাড়তে পারে।

ফরিদপুর কৃষক সমিতির নেতা পেশায় আইনজীবী মালিক মজুমদার বলেন, “কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ ফরিদপুরের সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সদরপুর ও মধুখালী উপজেলার হাজার হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পেঁয়াজ উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত।

“পেঁয়াজের বাজারে ধস নামলে কৃষকের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, যা স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেবা খাতেও প্রভাব ফেলে।”

বর্তমানে ফরিদপুরের বিভিন্ন হাটবাজারে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। অথচ কৃষকদের দাবি, এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে তাদের গড়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়েছে। সে হিসাবে প্রতি মণে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

দেশসেরা নারী কৃষকদের একজন ফরিদপুরের কৃষাণি সাহিদা বেগম বলছিলেন, এ পরিস্থিতিতে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, বিনিয়োগ করা মূলধন ফেরত পাওয়াও কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবই এ সংকটের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন এ নারী কৃষক।

তিনি বলেন, “উৎপাদন মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ বাজারে চলে আসায় দাম দ্রুত কমে যায়। অন্যদিকে কৃষকদের কাছে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করেন।”

সালথা উপজেলার চাষি সেলিম মাতুব্বর ও সাইফুল ইসলাম বলেন, বীজ, সার, কীটনাশক, ডিজেল ও শ্রমিকের খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদিত পেঁয়াজের দাম সেই অনুযায়ী বাড়েনি। এখন এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এক কেজি গরুর মাংসও কেনা দায়।

একই হতাশার সুর প্রকাশ পেল বোয়ালমারী উপজেলার কৃষক শেখ মনিরুজ্জামানের কণ্ঠে। তিনি বলছিলেন, “একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে দাম কমছে। কৃষকরা বছরের পর বছর লোকসান দিলে একসময় পেঁয়াজ চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।”

কানাইপুরের পাইকারি ব্যবসায়ী শাহজাহান মোল্লাহ বলছেন, দাম কম থাকায় তারাও কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাচ্ছেন না।

ফরিদপুর শহরের পাইকারি ব্যবসায়ী আনন্দ সাহা বলেন, “এ বছর পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। ফলে দাম কমে গেছে। তবে বাজার ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হলে কৃষক ও ব্যবসায়ী-উভয় পক্ষই উপকৃত হতেন।”

ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটি-সনাকের এর সাবেক সভাপতি শিপ্রা গোস্বামী বলেন, “পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে অধিকাংশ কৃষকের কাছে আধুনিক গুদাম বা সংরক্ষণ প্রযুক্তি না থাকায় তারা দীর্ঘ সময় ফসল সংরক্ষণ করতে পারেন না।

“ফলে উৎপাদন মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ একসঙ্গে বাজারে চলে আসে, এতে অতিরিক্ত সরবরাহ সৃষ্টি হয়ে দাম পড়ে যায়।”

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান জানান, কৃষকদের সংরক্ষণ সুবিধা বাড়াতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো (পেঁয়াজের স্তূপের মধ্যে বাতাস চলাচল করে)

মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে। ২০২৬ সালে ৭০০টি বিতরণ করা হয়েছে এবং চলতি বছরে আরও ২ হাজার ৫০০টি মেশিন বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, “পেঁয়াজ সংরক্ষণের সুযোগ বাড়ানো গেলে কৃষকরা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। এতে বাজারে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং কৃষকও ন্যায্যমূল্য পেতে পারবেন।”

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে ক্রয় কার্যক্রম চালু, আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তাদের মতে, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে কৃষকরা ধীরে ধীরে পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারাবেন; যা ভবিষ্যতে উৎপাদন ও সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

স্থানীয় কৃষি বিশ্লেষক কৃষিবিদ আনোয়ার হোসেন বলেছেন, বর্তমান সংকট কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কৃষকের ঘামঝরা শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে উৎপাদন কমে গিয়ে বাজারে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।

পেঁয়াজের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও টেকসই করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।