Published : 16 May 2026, 06:31 PM
দিনের খেলা শেষে মৃদু পায়ে মাঠ ছাড়ছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। ডাগআউটের কাছাকাছি গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন নাজমুল হোসেন শান্ত। পেছন ঘুরে একজনের দিকে তাকিয়ে করতালি দিতে দিতে কিছু বললেন তিনি। জটলার মধ্যেও সবাই বুঝে গেল, অধিনায়কের এই তালি কার জন্য। দিনের নায়ক তো ওই একজনই। বিপর্যয়ে অনেকবারই ভার বয়েছেন যিনি, সেই লিটন কুমার দাস আরও একবার দলের ত্রাতা।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে ভুল বানিয়ে সিলেটে আলোর অভাব ছিল না দিনজুড়ে। যখনই একটু কমে এসেছে আলো, জ্বলে উঠেছে মাঠের ফ্লাডলাইট। কিন্তু ভরদুপুরেই বাংলাদেশের ড্রেসিং রুমে নেমে এসেছিল আঁধার। ঘাসের ছোঁয়া থাকা উইকেটে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে ধসে পড়ার মুখে ছিল দলের ব্যাটিং। লিটন সেখানেই আগলে রাখলেন দলকে। তিমিরে থাকা ইনিংস ঝলমলে হয়ে উঠল তার ব্যাটিং দ্যুতিতে।
সিলেট টেস্টের প্রথম দিনে অসাধারণ এক সেঞ্চুরি উপহার দিলেন লিটন। বিপর্যয় কাটিয়ে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে তুলতে পারল ২৭৮ রান। দিন শেষে পাকিস্তানের রান কোনো উইকেট না হারিয়ে ২১।
লিটন যখন ক্রিজে যান, বাংলাদেশের রান তখন ৪ উইকেটে ১০৬। একটু পরই তা হয়ে যায় ৬ উইকেটে ১১৬। লিটনের রান তখন ২, অন্য প্রান্তের ব্যাটসম্যানের নাম তাইজুল ইসলাম।
কে ভাবতে পেরেছিল, সেখান থেকে শতরানের সীমানা পেরিয়ে যাবেন লিটন!
স্কিল, টেম্পারমেন্ট ও হিসেবি ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনী মেলে ধরে লিটন উপহার দিলেন ১২৬ রানের স্মরণীয় এক ইনিংস। ১৫৯ বলের ইনিংসে চার ১৬টি, ছক্কা ২টি।
তার এই লড়াইয়ের সঙ্গী দলের লোয়ার অর্ডার। তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম বুক চিতিয়ে লড়ে গেলেন। লিটন বাড়ালেন রান।
এই তিনজনের সঙ্গে উইকেটে কাটিয়েছেন তিনি ৩৮ ওভার। রান এসেছে এই সময়ে ১৬২, তাতে লিটনের অবদান ১২৪।
স্কিলের সঙ্গে এক পর্যায়ে লড়াইটি হয়ে উঠেছিল মনস্তাত্ত্বিক। লিটন স্ট্রাইকে থাকলেই বেশির ভাগ ফিল্ডার পাঠানো হয় সীমানায়। তার পরও তিনি লোয়ার অর্ডারদের আড়াল করেছেন, স্ট্রাইক ধরে রেখেছেন এবং সীমানার প্রহরীদের ফাঁক গলে বারবার বল পাঠিয়েছেন বাইরে।

লিটনের টেস্ট ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ শতরান এটি। তিনটিই করলেন পাকিস্তানের বিপক্ষে। প্রথমটি ছিল ২০২১ সালে চট্টগ্রামে, পরেরটি ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে। সেদিন ২৬ রানে ৬ উইকেট হারানো দলকে উদ্ধার করেছিলেন তিনি ১৩৮ রানের ইনিংসে।
লিটনে এখন বাংলাদেশের ‘ক্রাইসিস ম্যান’ বলাই যায়!
দিনের শুরুটা ছিল নাটকীয়। ম্যাচের প্রথম বলেই এলবিডব্লিউয়ের জোরাল আবেদন হয়। সেটিতে রক্ষা পেলেও পরের বলেই স্লিপে ধরা পড়েন মাহমুদুল হাসান জয়। ২২ টেস্টের ক্যারিয়ারে অষ্টমবার শূন্যতে কাটা পড়লেন তিনি।
শুরুতে উইকেট হারালেও চাপের লেশমাত্র ছিল না অভিষিক্ত তানজিদ হাসান ও ফর্মে থাকা মুমিনুল হকের ব্যাটিংয়ে। ওভারপ্রতি চারের বেশি রান আসতে থাকে জুটিতে।
তানজিদকে যে কারণে টেস্ট দলে নেওয়া হয়েছে, সেটিই মেলে ধরার আভাস দিচ্ছিলেন তিনি দারুণ কয়েকটি শটে। তবে আউটও হয়েছেন নিজের মতোই। ২৪ রানে হাসান আলিকে ফিরতি ক্যাচ দিয়েও বেঁচে গিয়ে একটু পরই উইকেট হারান মোহাম্মাদ আব্বাসের শর্ট বলে (৩৪ বলে ২৬)।
টানা পাঁচ ফিফটির পর মুমিনুল এবার বোল্ড ২২ রানেই। খুররাম শাহজাদের ডেলিভারিটি ছিল দারুণ, তবে অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান ব্যাট চালিয়েছিলেন ভুল লাইনে।
নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিমের জুটি আর কোনো বিপদ হতে দেয়নি লাঞ্চের আগ পর্যন্ত। প্রথম সেশনে ২৬ ওভারে ১০১ রান তোলে বাংলাদেশ। জুটি অবশ্য থামতে পারত আগেই। ১৮ রানে সাজিদ খানের বল মুশফিকের গ্লাভস ছুঁয়ে আশ্রয় নেয় কিপার মোহাম্মাদ রিজওয়ানের গ্লাভসে। তবে আম্পায়ার আউট দেননি, পাকিস্তান নেয়নি রিভিউ।
লাঞ্চের পর আঁটসাঁট বোলিংয়ে রানের গতি একদম আটকে ফেলেন আব্বাস ও সাজিদ। ৬ ওভারে রান আসে ৪। সেই চাপের প্রবাহেই জুটি ভাঙে ৪৩ রানে। আব্বাসের বল খেলবেন নাকি ছাড়বেন, এই সংশয়েই স্লিপে ধরা পড়েন শান্ত (২৯)।

একটু পর আব্বাসের জায়গায় বোলিংয়ে এসে প্রথম ওভারেই মুশফিককে (২৩) ফেরান শাহজাদ। এই টেস্ট দিয়েই দলে ফেরা পেসারের পরের ওভারে হুক শটে উইকেট বিলিয়ে দেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
লাঞ্চের পর ১০ রানের মধ্যে বাংলাদেশ হারায় ৩ উইকেট। ২০০ তো বহুদূর, ১৫০ হওয়া নিয়েই তখন টানাটানি।
সেখান থেকেই লিটনের প্রতিরোধ-পর্ব। সেটির প্রথম অধ্যায়ে তার সঙ্গী তাইজুল। শুধু উইকেটই আগলে রাখেননি দুজন, এসেছে রানও। ৬০ রানের জুটি থামে তাইজুলের ১৬ রানে বিদায়ে।
এরপর তাসকিন আহমেদের সঙ্গে জুটি ৩৮ রানের। ততক্ষণে ফিফটি পেরিয়ে এগিয়ে চলেছেন লিটন, সেঞ্চুরির সম্ভাবনা উঁকি দিতে শুরু করেছে। ভাগ্যের ছোঁয়াও কিছুটা পান অবশ্য। ৫২ রানে তিনি কিপারের হাতে ধরা পড়েছিলেন শাহজাদের বলে। কিন্তু আম্পায়ার আউট দেননি, পাকিস্তানও রিভিউ নেয়নি।
পরে শরিফুল ইসলামকে নিয়ে বাকি পথ পাড়ি দেন তিনি ক্রিকেটীয় দক্ষতার চূড়ান্ত প্রদর্শনী মেলে ধরে। পঞ্চাশ করতে বল লেগেছিল তার ৯৩টি। পরের পঞ্চাশে লাগে ৪২ বল।
৮৩ রান থেকে সাজিদ খানের বলে যে দুটি বাউন্ডারিতে তিনি নব্বয়ে পা রাখেন, তার ব্যাটিংয়ের দারুণ বিজ্ঞাপন হয়ে থাকবে তা। একটি ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে বোলারের মাথার ওপর দিয়ে, আরেকটি সুইপ করে মিড উইকেট দিয়ে। দুবারই দুজন ফিল্ডার ছিল খুব কাছাকাছি, কিন্তু কিছু করার ছিল না তাদের।
শতরানের পৌঁছানো শটটি ছিল তার ‘ট্রেডমার্ক’ দৃষ্টিনন্দন কাভার ড্রাইভ।
সেঞ্চুরির পরও দারুণ কয়েকটি শট খেলেন। দ্রুত রান বাড়ানোর চেষ্টায় সীমানায় ধরা পড়ে শেষ হয় তার ধ্রুপদি ইনিংস। জুটি থামে ৬৪ রানে।
নাহিদ রানার বিদায়ে ওই ওভারেই শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস।
পরে ছয় ওভার বোলিং করে উইকেট মেলেনি। পাকিস্তানের দুই ওপেনার দিনটি পার করে দিন নির্বিঘ্নে।
ক্রমশ ভালো হয়ে আসা উইকেটে বাংলাদেশের বোলারদের অপেক্ষায় কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে লিটন এমন ইনিংস না খেললে হয়তো প্রথম দিনেই ম্যাচের ভাগ্য একরকম গড়া হয়ে যেত!
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৭৭ ওভারে ২৭৮ (জয় ০, তানজিদ ২৬, মুমিনুল ২২, শান্ত ২৯, মুশফিক ২৩, লিটন ১২৬, মিরাজ ৪, তাইজুল ১৬, তাসকিন ৭, শরিফুল ১২*, নাহিদ ০; আব্বাস ১৬-৩-৪৫-৩, শাহজাদ ১৭-১-৮১-৪, হাসান ১১.৫-১-৪৯-২, সালমান ১.১-০-১-০, সাজিদ ৩১-১-৯৬-১)
পাকিস্তান ১ম ইনিংস: ৬ ওভারে ২১/০