Published : 20 Jun 2025, 11:56 PM
রোহিত শার্মা ও ভিরাট কোহলির অবসরের পর টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের নতুন যুগের শুরুর দিনটা কাটল দুর্দান্ত। সাদা পোশাকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দারুণ ফর্ম ধরে রেখে আরেকটি সেঞ্চুরি উপহার দিলেন ইয়াশাসভি জয়সওয়াল। অসাধারণ ব্যাটিংয়ে শুবমান গিল নেতৃত্বের অভিষেক রাঙালেন সেঞ্চুরি করে। হেডিংলি টেস্টে বড় সংগ্রহের ভিত পেয়ে গেল ভারত।
ইংল্যান্ডের মাটিতে নিজেদের সবশেষ টেস্ট সিরিজে, ২০২১ সালে এই মাঠে ম্যাচের প্রথম দিন স্রেফ ৭৮ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল ভারত, ম্যাচটি হেরেছিল তারা ইনিংস ব্যবধানে।
সেখানেই এবার ভারত দারুণ ব্যাটিং প্রদর্শনীতে প্রথম দিন ৩৫৯ রান তুলেছে স্রেফ ৩ উইকেট হারিয়ে। অ্যান্ডারসন-টেন্ডুলকার ট্রফির শুরুর দিনে সফরকারীরা ওভারপ্রতি রান করেছে ৪.২২ করে।
গত বছর ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে ৯ ইনিংসে দুটি ডাবল সেঞ্চুরিতে ৮৯ গড়ে ৭১২ রান করেছিলেন জয়সওয়াল। এবার ইংল্যান্ডের মাটিতে নিজের প্রথম টেস্টে এই ওপেনার খেললেন ১৫৯ বলে ১০১ রানের আলো ঝলমলে ইনিংস। ভারতের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিজের খেলা প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরির কীর্তি গড়লেন ২৩ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান।
গিলের জন্য শুধু নেতৃত্বের অভিষেকই নয়, আরেকটি বাড়তি দায়িত্ব নেন তিনি কাঁধে, কোহলির রেখে যাওয়া চার নম্বরে ব্যাট করার চ্যালেঞ্জ। ২৫ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান প্রথম দিনেই দেখিয়ে দিলেন, এই ভার বইতে তিনি প্রস্তুত।

চতুর্থ ভারতীয় হিসেবে টেস্ট নেতৃত্বের অভিষেক ইনিংসে সেঞ্চুরি করে ১২৭ রানে অপরাজিত আছেন গিল। তার ১৭৫ বলের ইনিংস গড়া ১৬টি চারে।
দিনের শেষ দিকে দারুণ সব শট খেলে ১০২ বলে ৬৫ রানে অপরাজিত আছেন সহ-অধিনায়ক রিশাভ পান্ত।
কোনো টেস্ট সফরের প্রথম দিন দুই ভারতীয় ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরির তৃতীয় ঘটনা এটি। ২০০১ সালে ব্লুমফন্টেইনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সাচিন টেন্ডুলকার ও ভিরেন্দার শেবাগ এবং ২০১৭ সালে গলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শিখার ধাওয়ান ও চেতেশ্বর পুজারা পেয়েছিলেন এই স্বাদ।
অস্ট্রেলিয়ার পর ইংল্যান্ডে প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরি, জয়সওয়ালের অনন্য কীর্তি
অভিষেকে শূন্য, ভারতের টেস্ট ইতিহাসে সুদার্শান যেখানে প্রথম
হেডিংলিতে সবশেষ ছয় টেস্টে জিতেছে পরে ব্যাটিং করা দল। শুক্রবার টস জিতে বোলিং নিতে তাই ভাবেননি ইংলিশ অধিনায়ক বেন স্টোকস। গিল জানান, টস জিতলে তিনিও বোলিং নিতেন।
উইকেটে আছে ঘাসের ছোঁয়া। দিনের শুরুতে সুইংয়ের পাশাপাশি সিম মুভমেন্ট মিলেছে বেশ। তবে দুই ভারতীয় ওপেনারকে খুব একটা পরীক্ষায় ফেলতে পারেননি ইংলিশ পেসাররা। ধৈর্য ধরে, দেখেশুনে খেলে এগিয়ে যান জয়সওয়াল ও লোকেশ রাহুল।
এখানে এই ম্যাচ ধরে সবশেষ সাত টেস্টে প্রথম ১০ ওভারে কোনো উইকেট পড়ল না এবারই প্রথম। প্রথম ঘন্টায় ভারত করে ৪৪ রান। ষোড়শ ওভারে স্পর্শ করে পঞ্চাশ।
২০১২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রায়েম স্মিথ ও আলভিরো পিটারসেনের (১২০) পর প্রথম উদ্বোধনী যুগল হিসেবে এই মাঠে টেস্টের প্রথম ইনিংসে শুরুর জুটিতে পঞ্চাশ স্পর্শ করলেন জয়সওয়াল ও রাহুল।
প্রথম সেশনটা পুরোপুরি হতে পারত ভারতের। এক ঘন্টা ৫৪ মিনিট নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদেরই। কিন্তু লাঞ্চ-বিরতির আগের দুই ওভারে ছয় বলের মধ্যে ২ উইকেট হারিয়ে ফেলে তারা।
পেসার ব্রাইডন কার্সের অফ স্টাম্পের বাইরের বলে ব্যাট চালিয়ে স্লিপে জো রুটের হাতে ধরা পড়েন রাহুল (৭৮ বলে ৪২), ভাঙে ৯১ রানের শুরুর জুটি।
তিন নম্বরে সুযোগ পেয়ে বাজে শটে ফেরেন অভিষিক্ত সাই সুদার্শান। স্টোকসের লেগ স্টাম্পের বাইরের বলে কিপারের গ্লাভসে ধরা পড়েন তিনি। এবারের আইপিএল মাতানো ব্যাটসম্যান চার বল খেলে রানের দেখা পাননি।
ভারতের টেস্ট ইতিহাসে তিন নম্বরে নেমে অভিষেকে শূন্য রানে আউট হওয়া প্রথম ব্যাটসম্যান তিনি।
লাঞ্চ-বিরতির পর শুরু হয় জয়সওয়াল ও গিলের লড়াই। দারুণ সব শটের পসরা মেলে ওয়ানডে ঘরানার ব্যাটিংয়ে এগিয়ে যান গিল। জয়সওয়াল পঞ্চাশে পা রাখেন ৯৬ বলে। পরে রানের গতিতে দম দেন তিনিও। পরের পঞ্চাশ করতে তার লাগে কেবল ৪৮ বল!
কার্সকে চার মেরে নব্বইয়ের ঘরে পৌঁছানোর পর কনুইয়ে কিছুটা আঘাত পান তিনি। নিতে হয় ফিজিওর সেবা-শুশ্রূষা। ওই ওভারেই দুই বল পর, টানা দুটি চারের পর এক রান নিয়ে স্পর্শ করেন কাঙ্ক্ষিত মাইলফলক।
ষষ্ঠ ভারতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ইংল্যান্ডে নিজের প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরি করলেন তিনি। আগের পাঁচ জন- ভিজায় মাঞ্জরেকার, আব্বাস আলি বেগ, সান্দিপ পাতিল, সৌরভ গাঙ্গুলি, মুরালি ভিজায়।
২০ টেস্টে জয়সওয়ালের পঞ্চম সেঞ্চুরি এটি, এর তিনটিই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।
চা-বিরতির পর আর এক রানের বেশি যোগ করতে পারেননি তিনি। স্টোকসের বলে বোল্ড হয়ে শেষ হয় তার ১৬ চার ও এক ছক্কায় গড়া ১০১ রানের ইনিংসটি। তার সবগুলো বাউন্ডারিই ছিল অফ সাইডে।
আগের চার সেঞ্চুরির সবগুলোতে দেড়শ ছাড়িয়েছিলেন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান।
জয়সওয়াল ও গিলের জুটিতে ১২৯ রান আসে ১৬৪ বলে।
প্রথম পঞ্চাশ করতে গিলের লেগেছিল ৫৬ বল। পরে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি ১৪০ বলে। তার ষষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরি এটি। তার আগে ভারতের হয়ে নেতৃত্বের অভিষেক ইনিংসে সেঞ্চুরি করেছিলেন ভিজায় হাজারে, সুনিল গাভাস্কার ও কোহলি।
আগ্রাসী ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচিত পান্ত এ দিন শুরুতে ভিন্ন রূপে মেলে ধরেন নিজেকে। প্রথম ৬৭ বলে তার রান ছিল কেবল ৩১। এরপর স্পিনার শোয়েব বাশিরকে পরপর চার ও ছক্কা মেরে নিজের আসল রূপ মেলে ধরেন তিনি।
তিন হাজার টেস্ট রান পূর্ণ করেন তিনি ৭৬ ইনিংসে। উইকেটকিপারদের মধ্যে তার চেয়ে কম ইনিংসে এই মাইলফলক ছুঁতে পেরেছেন কেবল অ্যাডাম গিলক্রিস্ট (৬৩)।
দিনের শেষ ওভারের প্রথম বল বেরিয়ে এসে ক্রিস ওকসকে ডিপ স্কয়ার লেগ দিয়ে ছক্কায় ওড়ান পান্ত। বাকি পাঁচ বলও খেলেন তিনি। তার ১০২ বলে ৬৫ রানের ইনিংসে ৬ চারের পাশে ছক্কা আছে ২টি।
গিল ও পান্ত অবিচ্ছিন্ন আছেন ১৩৮ রানের জুটিতে। তাদের পর শেষ বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান হিসেবে অপেক্ষায় আছেন এই ম্যাচ দিয়ে আট বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরা কারুন নায়ার। ভারতের সামনে তাই বিশাল সংগ্রহের হাতছানি।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: (প্রথম দিন শেষে)
ভারত ১ম ইনিংস: ৮৫ ওভারে ৩৫৯/৩) জয়সওয়াল ১০১, রাহুল ৪২, সুদার্শান ০, গিল ১২৭*, পান্ত ৬৫*; ওকস ১৯-২-৮৯-০, কার্স ১৬-৫-৭০-১, টং ১৬-০৭৫-০, স্টোকস ১৩-১-৪৩-২, বাশির ২১-৪-৬৬-০)