Published : 03 May 2026, 11:58 AM
‘ইইউ টি-টোয়েন্টি বেলজিয়াম’-এর লঞ্চিং ইভেন্ট ছিল সম্প্রতি মুম্বাইয়ে। সেই আয়োজনে ছিলেন এই টুর্নামেন্টে রয়্যাল ব্রাসেলস দলের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার জিইয়ে আছে আপাতত দেশের বাইরে এই ধরনের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতেই। পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেই থাকেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশে ফিরতে পারেননি ওই সরকারের এই সাংসদ। ওই বছরের অক্টোবরে যদিও দেশে ফেরার পথে ছিলেন, তবে ফিরে যেতে হয়েছিল দুবাই থেকেই। এরপর তার দেশে ফেরা নিয়ে আলোচনা ছিল নিত্য, অনেকবারই অনেক সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে হয়নি কিছুই।
মুম্বাই থেকে ফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সাকিব বললেন তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা ও বাধার নানা দিক নিয়ে। এছাড়াও তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার ও রাজনৈতিক জীবনের ভবিষ্যৎ, আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা, জুলাই আন্দোলন, বিসিবিতে পালাবদল, নিজের পরিবার এবং আরও অনেক কিছু নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন ৩৯ বছর বয়সী অলরাউন্ডার।
ভারতে যখন এলেন, দেশের জন্য টান তো একটু বেশিই অনুভব করার কথা। গত দেড় বছরে আগেও এসেছেন সম্ভবত। এত কাছে এসে দেশে ফেরার ইচ্ছে আরও তীব্র হয় না?
সাকিব আল হাসান: নাহ, এরকম চিন্তা করিনি তো আসলে। যখনই এসেছি, জানতাম যে এখানে কাজে এসেছি এবং ওই ভাবনা নিয়েই এসেছি যে, কাজ শেষে আবার চলে যাব। রিটার্ন টিকেটও করা ছিল সব সময়।
আপনার দেশে ফেরার ব্যাপারটি এখন কোন পর্যায়ে আছে? কিছুদিন আগে তো বেশ আলোচনা ছিল…
সাকিব: এখন আলোচনা একদমই নেই। সব উধাও!
যখন আলোচনা চলছিল, তখন আসলে সেটা কোন পর্যায়ে ছিল? আপনার সঙ্গে কতটা যোগাযোগ হয়েছিল?
সাকিব: আমার সঙ্গে যোগাযোগ করত বোর্ড। বোর্ড কার সঙ্গে যোগাযোগ করত, এটা তো আসলে আমার পক্ষে বলা মুশকিল।
আপনার সঙ্গে যখন যোগাযোগ হচ্ছিল, কোন ধরনের আলোচনা চলছিল? কতটা সুনির্দিষ্ট ছিল?
সাকিব: তারা কীভাবে চেষ্টা করছে, কী কী করবে, কীভাবে আনতে চায় দেশে, এগুলোই বলত।
সেগুলো আপনার কাছে কি বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে? সত্যিই চেষ্টা করেছে বলে মনে হয়েছে?
সাকিব: বাংলাদেশে তো সবই বাস্তব এবং সবই অবাস্তব। বাস্তব করতে চাইলেই বাস্তব হয়, আর বাস্তব না করতে চাইলেই বাস্তব না। শুনলে তো মনে হয় সবই বাস্তব! কিন্তু কিছু না হওয়া পর্যন্ত বাস্তব না কোনোটিই।
তখনকার বোর্ড পরিচালক আসিফ আকবর যেভাবে বলছিলেন, মনে হচ্ছিল আপনাকে ফিরিয়ে আনা স্রেফ সময়ের ব্যাপার!
সাকিব: তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক আগে থেকে। সেটা মানে ৫ই আগস্টের আগে ছিল, তার আগেও ছিল। ২০০৭ থেকেই সম্ভবত তার সঙ্গে আমার পরিচয়। জাতীয় দলে ঢোকার কিছুদিন পর থেকেই। ওই পরিচয়টা তো ছিলই। ফেরার ব্যাপারেও উনিই যোগাযোগ রাখছিলেন আমার সঙ্গে।
সেই আসিফ আকবরই তো কয়েক মাস আগে বলেছিলেন, সাকিবকে ফিরতে হলে কিছু একটা প্রক্রিয়ায় ফিরতে হবে, বলতে হবে যে ‘আমার দল খুন করেছে, আমি করিনি’ বা এই ধরনের কিছু করে আসতে হবে!
সাকিব: উনি তো অনেক কথা অনেকবার বলছে। এগুলো নিয়ে আমি আসলে পড়ে থাকি না। একেকজনের কথা একেক সময় একেক রকম হয়। আজকে যে ভালো বলে, কালকে সে-ই খারাপ বলে। পরশু সেই লোক আবার ভালো বলে। এগুলো নিয়ে আসলে খুব বেশি মাথা ঘামানোর দরকার আছে বলে মনে করি না।
লন্ডনে আপনাকে দেখা গেছে তার সঙ্গে জন্মদিনের কেক কাটতে। সেখানে কি ফেরার আলোচনা কিছু হয়েছিল?
সাকিব: ওটা আসলে একদমই কাকতালীয়ভাবে মিলে গিয়েছিল। আমি লন্ডনে যাচ্ছিলাম, উনার একদিন আগে বোধহয় পৌঁছেছি বা উনি একদিন আগে গিয়েছেন, এরকম ব্যাপার ছিল। ওই সময় কথা যেহেতু নিয়মিত হচ্ছিল, জানলাম যে উনিও যাচ্ছেন, তখন দেখা হয়েছে আর কী। পূর্ব পরিকল্পিত কিছু নয়।
গত ২৪ জানুয়ারি বোর্ড সভার পর হুট করেই বলা হলো, শর্তসাপেক্ষে আপনাকে জাতীয় দলে বিবেচনা করা হবে আবার…
সাকিব: শর্তসাপেক্ষ বলতে কী, আমি জানি না। কারণ, আমাকে তো কোনো শর্ত দেয়নি!
তখন বোর্ড বলেছিল, সাকিবের ‘অ্যাভেইলঅ্যাবিলিটি, ফিটনেস এবং অ্যাকসেসিবিলিটির ওপর ভিত্তি করে এবং পাশাপাশি খেলা হবে যেখানে, সেখানে যদি উপস্থিত থাকার মতো ক্যাপাসিটি থাকে’ তাহলে বিবেচনা করা হবে…
সাকিব: এসব বাস্তবতা তো ওই বোর্ড মিটিংয়ের আগেও ছিল!
সেজন্যই প্রশ্নটি উঠছে। আগের ব্যাপারই আবার ঘটা করে ঘোষণা দেওয়ায় আপনি কি অবাক হয়েছিলেন? হুট করে যেদিন ঘোষণা দেওয়া হলো, সেদিনই বাংলাদেশের বদলে বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়েছিল আইসিসি এবং সেদিনই বোর্ড পরিচালক ইশতিয়াক সাদেক পদত্যাগ করেছিলেন। ওসব আড়াল করতেই সেদিন আপনার ব্যাপারটি সামনে আনা হয়েছিল কি না…
সাকিব: কী জানি! আমি যেহেতু ঘটনা থেকে অনেক বেশি দূরে থাকি, আমার জন্য বলা কঠিন। ওই সময় যখন বোর্ড মিটিং হয়েছে, আমার ওখানে (যুক্তরাষ্ট্রে) তখন রাত। ঘুম থেকে উঠে দেখেছি ব্যাপারটা। অবাক হওয়া বলতে… বাংলাদেশে যত কিছু দেখেছি আর দেখছি, এখন আর কোনো কিছুই অস্বাভাবিক লাগে না আমার কাছে। মনে হয় বাংলাদেশে সবকিছুই হতে পারে।

আরেকটু পেছনে যাওয়া যাক, ২০২৪ সালের অক্টোবরে যখন দেশে ফেরার পথে ছিলেন, অন্তবর্তী সরকারের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া হয়েছিল বলেই তো ফিরছিলেন, হুট করে দুবাইয়ে আসার পর আপনাকে ফিরতে মানা করা হলো কেন?
সাকিব: সবকিছু ঠিকঠাক আছে জেনেই প্লেনে উঠেছিলাম। তখন যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেই দেশে যাচ্ছিলাম। দুবাইয়ে নামার পরে দেখলাম, ফোনে মিসড কল। আমি কল ব্যাক করলাম। ওখান থেকে বলল যে, ‘একটু সমস্যা হয়ে গেছে, আপনি না এলে ভালো হয়।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, তাহলে আর কী করার!’ দুবাইয়ে একদিন থেকে ফেরত গেলাম।
ওই সময় নিউজ-টিউজে একটু দেখলাম যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর মিরপুর স্টেডিয়ামের সামনে কিছু কিছু ‘ইয়ে’ হয়েছে। ২০-২৫ জন মনে হয়, বা সর্বোচ্চ ৫০ জন হতে পারে, কোনো প্রোটেস্ট করেছে।
এটা কি আপনার কাছে সাজানো মনে হয়েছিল?
সাকিব: হু… সবাই তো এরকমই বলে আমাকে। আমি যদিও বিশ্বাস করতে নারাজ। কিন্তু সবাই সেটা বলে।
আপনাকে নিয়ে এত আপত্তি-সমস্যা থাকলে অনুমতি আগে কেন দেওয়া হয়েছিল? কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সব বদলে গেল কিভাবে? পরে কি সেটা খোঁজ নিয়েছিলেন বা জিজ্ঞেস করেছিলেন?
সাকিব: নাহ, এত খোঁজ নিয়ে আসলে কী করব! যেটা হয়ে গেছে, ওটা তো আর তখন ফেরানো সম্ভব ছিল না আমার পক্ষে।
এর কিছুদিন আগে ফেইসবুকে আপনি কিছু লিখেছিলেন, যেটা বোঝাপড়ার অংশ বলেই মনে হয়েছিল। এমন কি ব্যাপার ছিল যে, ওই লেখাটা তাদের পছন্দ হয়নি?
সাকিব: সেটা যদি তারা মনে করত, তাহলে তো বললেই পারত। তাদের ‘ইয়ে’ নিয়েই তো দেওয়া হয়েছিল স্ট্যাটাসটা। তারা যেটায় খুশি হবে ওরকম লেখাই ছিল।
এমন কি ব্যাপার ছিল যে, তারা আরও সরাসরি কথা আশা করেছিল আপনার কাছে?
সাকিব: জানি না আসলে, কারও মনের কথা আমার বোঝা কঠিন। তবে সাধারণত, আমি যেটা লিখি, কে কী চায় বা না চায়, সেসব ব্যাপার তো ভাবনায় থাকেই, তবে যেটা আমি বিশ্বাস করি, সেটায় অটল থাকি। যতগুলো কথা বলেছি, জানি না এতদিন কোনো কথা থেকে এখনও পর্যন্ত সরে এসেছি বলে মনে পড়ে না এবং সরে আসার চান্সও নাই কোনোটাতেই।
দুঃখিত যে ওই সময়ের আলোচনা একটু বেশিই হচ্ছে, আসলে অনেক কিছু পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। তখনকার ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভুঁইয়া তো মূলত আপনার ফেরার ব্যাপারটি দেখছিলেন। তিনিই আবার পরে বললেন যে আপনাকে ফিরতে না দিয়ে ঠিকই করেছেন! আবার এটিও দাবি করেছেন যে, আপনার পাসপোর্ট জটিলতার সমাধান তিনি করেছেন…
সাকিব: না না, পাসপোর্ট জটিলতা ঠিক হয়নি, তথ্যটি ভুল।
উনি নিজেই পরে বলেছেন যে আমাকে আসতে দেননি, নিজেই পরিষ্কার করে দিয়েছেন। এখানে আমার কিছু বলার নাই।
উনি একেক সময় একেক কথা বলছেন। আমি যেটা বলতে পারি, তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, যোগাযোগ করে কীভাবে দেশে আসা যায়। আমার কাছে এক সময় মনে হয়েছে, তিনি আন্তরিকভাবেই চেষ্টা করেছেন। পরে আবার মনে হয়েছে, উনি চান না। আমি জানি না যে, উনাদের সিদ্ধান্তগুলি আসলে কার কোনটি ছিল। মানে, উনাদের চেইন অব কমান্ড কী, কিংবা কার কথায় কী হবে, আমার জন্য বুঝতে পারা কঠিন ছিল।
অন্তবর্তী সরকারের সময় যে মবের দাপট দেখা গেছে, আপনার ঘটনা থেকেও কি মনে হয়েছে, দেশে এসব কী চলছে!
সাকিব: হু দেশজুড়ে তো এসব ছিল, অস্বীকার করার কিছু নাই। সবাই তো সেটাই বলে। এখনও নিউজে সেটাই দেখি। নতুন সরকারের তিন মাস হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো আগের সরকারের সমালোচনা চলছে। আমি আমার ঘটনাটা দিয়ে বুঝতে পারি, যে এক রকম হওয়ার কথা ছিল, হুট করে তা বদলে গেছে। আমার ক্ষেত্রেই তাদের সিদ্ধান্ত অনেকবার পরিবর্তন হয়েছে।
৫ অগাস্টের পরও তো আপনি পাকিস্তানে, ভারতে খেলেছেন বাংলাদেশের হয়ে। অন্তবর্তী সরকার ও আসিফ মাহমুদ দায়িত্বে থাকার সময়ই খেলেছেন। কিন্তু আপনার দেশে ফেরা আটকে যাওয়ার পর বিদেশে খেলার পথও বন্ধ হলো কিভাবে?
সাকিব: দেখুন, একজন ক্রিকেটার দেশে খেলবে না, কিন্তু দেশের বাইরে খেলবে, এটা কি কখনও হয়? এখন যেমন দেশে আমাদের টানা তিন-চার সিরিজ চলছে। সেখানে আমি নেই, বিদেশের সিরিজে খেলব, এটা কি উচিত? আপনারাই তো তখন প্রশ্ন তুলতেন!
দেশের বাইরে খেলার প্রস্তাব কি দেওয়া হয়েছিল আপনাকে?
সাকিব: হ্যাঁ, ফারুক ভাই (তখনকার বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ) বলেছিলেন যে, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজটা (২০২৪ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে) তুই খেলে ফেল।’ আমি বলছি, ‘ভাই, এটা আসলে কেমন দেখায়? এটা আপনাদের জন্য ভালো নয়, দলের জন্যও ভালো নয়।”
আমি তো আর এমন নই যে আগে কখনও খেলিনি, যে কোনো মূল্যে এই দুই ম্যাচ আমার খেলতেই হবে! খেললে ঠিকভাবে সব জায়গায় খেলব, না হলে নয়।
আপনার দেশে ফেরা বা ফেরানোর ক্ষেত্রে একটা সমস্যার কথা বলা হয় যে, রাজনৈতিক মামলার পাশাপাশি আপনার কিছু ব্যক্তিগত মামলাও আছে, শেয়ার মার্কেট, দুদক, এসব…
সাকিব: এই জিনিসগুলা দেখি মাঝেমধ্যে নিউজে আসে যে অনেক সমস্যা আছে, কিন্তু কেউ বিস্তারিত বলতে পারে না। কথার কথা, কেউ বলল যে, ‘শেয়ার মার্কেটের কারসাজি আছে।’ তো সেটা কি? দুই বছর ধরে কেউ কিছু প্রমাণ করতে পেরেছে?
রাজনৈতিক মামলা একটা আছে, হত্যা মামলা। সেটাও তো দেড় বছরে কিছু এগোয়নি! আর একটা চেক বাউন্সের মামলা আছে, সেটা একদম বেসিক জিনিস, যদি আপনি ইনস্টলমেন্ট না দিতে পারেন, সাইন করা যে চেকগুলো থাকে, ওটা নিয়ে ব্যাংক মামলা করে। সেটা খুবই নরম্যাল ব্যাপার এবং এটা রিশিডিউলও করা যায়, টাকা দিলে সেই মামলা বন্ধ হয়ে যায়।
আমি যে সেটা করব, আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রেখেছে ফ্রিজ করে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ কেন? হয়তো তাদের মনে হয়েছে, তদন্তের স্বার্থে ফ্রিজ করা দরকার। এখন তো দেড় বছর হয়ে গেল সেই তদন্ত! কিছুই তো এখনও পর্যন্ত পায়নি! আমার বিশ্বাস, কিছু পাওয়ার কোনো চান্স নাই।
লোকের কথা শুনলে মনে হয় যে, আমার কয়েক হাজার সমস্যা এবং সমস্যা সমাধান করতে কয়েক দশক লেগে যাবে। আসলে ইচ্ছে থাকলে কতদিন লাগতে পারে? তদন্ত করে দোষ প্রমাণিত হলে অ্যাকশন নিন। তদন্তে কিছু না পেলে ক্লিয়ারেন্স দিন, রিলিজ দিন। আমার অ্যাকাউন্ট ওপেন হয়ে গেলে রিশিডিউল করে আমি কালকেই এটা জমা দিয়ে দিলে পরশুদিন ওরা মামলা তুলে নেবে!
হত্যা মামলাটিও এখন সাধারণ অবস্থায় আছে। আইন মন্ত্রণালয় অথবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাদের কাছে একটা নির্দেশনা যাবে যে, মামলাটিতে তার যোগসূত্রতা আছে নাকি নাই। যেহেতু এখনও চার্জশিট হয়নি, আমার যোগসূত্রতা না পেলে ছেড়ে দেবে।
যেখানকার ঘটনায় মামলা, সেই আদাবরে তো জীবনেও গিয়েছি বলে মনে পড়ে না। আমার সম্পৃক্ততা যদি না থাকে, তাহলে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন দিতে পারে যে, এটাতে তার যোগসূত্র নাই। এটার জন্য কতদিন লাগতে পারে? দুই বছর হতে চলেছে!
আর যদি তারা মনে করে, আমি কানাডায় বসে ফোনে ফোনে দুনিয়ার বিশাল একটা মাফিয়া গোষ্ঠী নিয়ে বিশাল একটা ইয়ে করেছি, সেটা যদি তারা প্রমাণ দেখায়, তাহলে ঠিক আছে, বিচার করুক! সদিচ্ছা থাকলেই সব হয়।
যেহেতু আপনি মামলাগুলি নিয়ে এত আত্মবিশ্বাসী, তাহলে দেশে ফিরছেন না কেন? সামনাসামনিই মোকাবেলা করতে পারেন!
সাকিব: আমার যেসব মামলা, দেশে এসে কিছু করার আছে বলে মনে হয় না। হ্যাঁ, দুদকের মামলায় জামিন নিতে পারি। কিন্তু দুদকের এরকম মামলা তো দেশে হাজার হাজার মানুষের আছে এবং তারা দেশে খুব ভালোভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ব্যবসা করছে, সবই করছে।
আপনি কি ফিরছেন না গ্রেপ্তার হওয়ার শঙ্কায়?
সাকিব: এখন তো আর কোনো কিছু অস্বাভাবিক মনে হয় না! যদিও আমি আশাবাদী যে ওরকম করা হবে না। যতক্ষণ না আমার দোষ প্রমাণিত হচ্ছে, সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু অনেক কিছুই আমি ভাবতাম এক রকম, হচ্ছে আরেক রকম! কিছুই তাই বলা যায় না।
বর্তমানে বিসিবির অ্যাড-হক কমিটির প্রধান তামিম ইকবাল আপনার সাবেক সতীর্থ ও একসময়ের বন্ধু। তার এই ছোট্ট মেয়াদে কোনো উদ্যোগ নেওয়ার আছে বলে মনে করেন?
সাকিব: বলা মুশকিল। এই বোর্ডের তো মূল দায়িত্ব নির্বাচন আয়োজন করা। এরকম বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার খুব একটা ক্ষমতা থাকার কথা নয়।
সামনে নির্বাচনের পর যে বোর্ড আসবে, আশা করি তারা চার বছর থাকবে। অন্তত বোর্ডে স্থিতিশীলতা আসবে। তখন হয়তো আবার যোগাযোগ শুরুর একটা জায়গা তৈরি হবে।
তামিম যদি নির্বাচিত হয়ে আসেন, তার কাছে চাওয়া কি একটু বেশি থাকবে, সাবেক সতীর্থ ও বন্ধু হিসেবে?
সাকিব: সে যদি আসে, তখন সেটা দেখব। আসার আগে কিছু চিন্তা করে লাভ নেই। গত দেড় বছরে অনেক চিন্তাই করেছি, যেগুলো হয়নি। এই কারণে চিন্তা করাই বন্ধ করে দিয়েছি। যখন যেটা হবে, সেটা নিয়েই থাকব।
ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের হয়তো এখানে ভূমিকা রাখার সুযোগ বেশি। ক্রীড়া মন্ত্রী আমিনুল হক নিজেও ছিলেন খেলোয়াড়, দেশের সর্বকালের সেরা গোলকিপারদের একজন। তার সঙ্গে কথা হয়েছে?
সাকিব: ক্রীড়া মন্ত্রীর ভূমিকা রাখার জায়গা অবশ্যই আছে। এখন তিনি কতটা করতে চান, নাকি চান না, সেটা তার ব্যাপার।
কথা হয়েছিল তার সঙ্গে, মনে হয়েছিল খুবই আন্তরিক আমাকে ফেরানোর ব্যাপারে। তিনি বলেছিলেন তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ফোন করে সাড়া পাইনি।
এখন তাহলে দেশে ফেরার আশা আপনার কতটা আছে?
সাকিব: পুরোপুরিই আছে। আমি ফিরব, আশা করি তাড়াতাড়িই ফিরতে পারব।
আমি ফিরব, কোর্টে যাব, মামলা লড়ব। কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমার নিরাপত্তা তো দিতে হবে! এতটুক তো আশা করতেই পারি। আমি তো বলছি না যে, নিরাপত্তা মানে আমার জন্য রাস্তা বন্ধ করে দিতে হবে বা পুলিশের চারটা গাড়ি সামনে থাকবে। ওরকম তো চাচ্ছি না। তবে একটা স্বাভাবিক নিরাপত্তা তো আছে, আইনী প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত হয়রানি করবে না। ব্যাস, এতটুকুই আশা করি। সাধারণ নাগরিক হিসেবেই তো এটুকু আশা করতে পারি। হয়রানি না করার নিশ্চয়তা যদি কালকে দেওয়া হয়, পরশুই দেশে যাব আমি।
জুলাই আন্দোলনে এত এত প্রাণহানি ও যা কিছু হলো, সেসব নিয়ে আপনি নানা সময়ে কথা বলেছেন। তবু প্রশ্ন রয়ে গেছে। আরেকবার নিজের অবস্থান তুলে ধরবেন?
সাকিব: প্রথমত, আমি বিশ্বকাপের আগে (২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ) গিয়েছি যুক্তরাষ্ট্রে। মাঝে ২-৩ দিনের জন্য গিয়েছিলাম। পরে মেজর লিগ ক্রিকেট খেলেছি (যুক্তরাষ্ট্রে), পরে কানাডায় গ্লোবাল টি-টোয়েন্টি খেলেছি। লম্বা সময় দেশ থেকে দূরে ছিলাম, দেশের অবস্থা পুরো উল্টো জায়গায় বলা চলে। স্বাভাবিকভাবেই আমার কাছে সব খবর আসত পরে। খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এত খবরও জানতাম না।
দ্বিতীয়ত, একটা সময়ে গিয়ে তো ইন্টারনেট পুরা বন্ধই ছিল। আমিও খুব বেশি আপ টু ডেট ছিলাম না। হ্যাঁ, শুনেছি যে প্রতিবাদ হচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে, শুনেছি যে কারফিউ দিয়েছে। আসলে বাংলাদেশে তো অনেক সময় অনেক ধরনের আন্দোলন হয়েছে এবং যেহেতু গভীরভাবে অনুসরণ করিনি এটা, চিন্তাও করিনি যে কতটা গুরুতর। খেলার ভেতরই ছিলাম। হয়তো দেশে থাকলে ঘটনার গভীরতা বুঝতে পারতাম, তখন আমার জন্য একটা স্ট্যান্স নেয়া সহজ হতো।
আমি যেটা বুঝি, সবাই আশা করেছে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেব। স্ট্যাটাস দিলে অনেকে দেখত অবশ্যই, কিন্তু পরিস্থিতি কি বদলে যেত? সরকার থেকে আমাকে বলাও হয়েছিল স্ট্যাটাস দিতে এবং সরকারের পক্ষে দিতেও বলা হয়নি। সুন্দর সমাধানের পথ খোঁজা ধরনের স্ট্যাটাস আর কী, অনেক ক্রিকেটার যেমন দিয়েছিল, তেমনই কিছু। কিন্তু ওসবে কি খুব বড় পার্থক্য হতো? জানি না।
আমি যেটা সবসময় বলি, প্রতিটি জীবন মূল্যবান। একটা পরিবারে যখন একটা মানুষ মারা যায়, সেই পরিবারের কষ্ট অন্য কারও পক্ষে বোঝা মুশকিল। প্রতিটা মানুষের জীবনই মানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এখন হামে কত বাচ্চা মারা গেছে এই যুগে এসে, ভাবা যায়! প্রতিটা মানুষের প্রাণ ম্যাটার করে। ওই সময় আন্দোলনকারী যারা মারা গেছেন, পুলিশ সদস্য যারা মারা গেছেন, যে অবস্থায় যারা মারা গেছেন, সবার লাইফই ম্যাটার করে।
ওই সময় আপনার স্ত্রীর একটা ইনস্টাগ্রাম পোস্ট আপনাকে নিয়ে ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছিল। এখনও নানা প্রসঙ্গেই সেই পোস্ট উঠে আসে…
সাকিব: ওই সময়টাই আসলে ফুটিয়ে তোলে, কীভাবে আমার নেতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা বা নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। ওই কয়েকটা দিনে যেভাবে আমাকে নিয়ে নেগেটিভ জিনিসগুলো ছড়ানো হয়েছে, এর আগে কখনও সেভাবে হয়নি। শুরুতে আমার কাছে একটু অস্বাভাবিকই লাগছিল, পরে বুঝেছি।
আমরা ছিলাম কানাডাতে। ছবিটি ওইদিনই তুলেছি নাকি আগের দিন তুলেছি, না কবে তুলেছি, দুই দিন আগে পোস্ট করা হয়েছে নাকি পরে, কেউ কি জানে তারা? নাটকীয়ভাবে যখন এটাকে উপস্থাপন করা হয় এবং প্রমোট করা হয়, লোকে খুব গভীরভাবে না চিন্তা না করেই সেটি দেখবে এবং জাজ করবে। ওই সময়ে একটা লোক গুলি খেয়েছে এবং সেটা জেনেও ছবি পোস্ট করেছি, সেটা কি হয়?
চাইলেই এসব নেতিবাচকভাবে ফুটিয়ে তুলে ফায়দা নেওয়া যায়। যেহেতু আমি সরকারের অংশ ছিলাম, স্বাভাবিকভাবে আমার নেগেটিভটা ছড়াতে পারল বেশি প্রভাব পড়বে, তারা হয়তো চিন্তা করছে। যাই হোক, এটা আসলে এত ব্যাখ্যা করারও কিছু নেই।
কানাডায় তখন প্রবাসী বাংলাদেশি দর্শকদের কেউ কেউ তো সামনাসামনিই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, নানা কিছু বলেছেন…
সাকিব: এসব থেকেই ব্যাপারটি আরও ভালোভাবে বোঝা গেছে। মাঠে এসে একজন নানা কিছু বলছে, আরেকজন ভিডিও করছে, এতে বোঝা যায় যে আপনি পরিকল্পিতভাবে কিছু করার চেষ্টা করছেন। একটার সঙ্গে আরেকটা সম্পর্কিত মনে হয়েছে।
অবশ্য তা নাও হতে পারে। সব যে আমার ভাবনা মতোই হবে, তা নয়। হতে পারে, আলাদা ঘটনাই ছিল ওখানে। কিন্তু ওই সময়কার পরিস্থিতিতে মনে হয়েছে, একটার পর একটা হয়েই যাচ্ছে। একটা মানুষ ১৫-১৬ বছর জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেছে, তাকে আপনি জিজ্ঞেস করছেন, ‘দেশের জন্য কী করেছেন’, এই ঘটনা কি স্বাভাবিক?
ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেওয়া বেশি বড় নাকি ১৫-১৬ বছর দেশের হয়ে খেলা? আমি তো আন্দোলনের বিপক্ষেও কিছু লিখিনি বা বলিনি!
আপনি সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বলেছেন যে বিশ্বকাপে না খেলাটা বাংলাদেশ সরকারের ‘ব্লান্ডার’ ছিল…
সাকিব: অবশ্যই ব্লান্ডার ছিল, এখনও তো বলছি।
মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদ বা পদক্ষেপ বাংলাদেশের কি হতে পারত বলে আপনার মনে হয়?
সাকিব: প্রথমত হচ্ছে বিসিসিআই কিংবা কলকাতা নাইট রাইডার্স, যারাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে (মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়া), এটার অনেক রকম উপায় ছিল, যেটাতে সুন্দরভাবে সমাধান হতে পারত। কেন তারা সুন্দরভাবে সিদ্ধান্ত নেয়নি, উত্তরটা আমার জানা নেই। কারণ আমার ক্ষেত্রে এরকম হয়েছে যে, বাংলাদেশের সিরিজের কারণে তখন আইপিএলে খেলতে পারব না, তখন ওরাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে যে, আমি নিজে থেকেই সরে দাঁড়ালে ওদের কাজটা সহজ হয়। পারস্পরিক সমঝোতায় সেভাবেই করেছি। মুস্তাফিজের সঙ্গেও তারা সেভাবে করতে পারত।
দ্বিতীয়ত, মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পর দুই বোর্ড কথা বলতে পারতো যে, “একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, আমরা নিজেদের মধ্যে সমাধান করে নেই।” আলোচনায় অবশ্যই সমাধান হতো।
এটা তাদের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট। তারা যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। সমস্যা লেগেছে তাদের সঙ্গে, আমি যুদ্ধ লাগিয়ে দিলাম আইসিসির সঙ্গে, এটা তো কাজের কথা হলো না। এখানে পলিটিক্যাল গেম খেলা হয়েছে এবং মানুষের আবেগকে পুঁজি করে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করেছে ওই সময়ের সরকার ও দায়িত্বপ্রাপ্তরা।
সরকার বা তখনকার ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নাহয় ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করলেন। বিসিবির কি কিছু করার ছিল না?
সাকিব: অবশ্যই, বোর্ড এখানে শক্ত অবস্থান নিতে পারত, যা তারা নেয়নি। একটা ব্যাপার হলো, সরকারের কথা তাদেরকে মানতেই হবে। তবে বোর্ডেরই দায়িত্ব সরকারকে বোঝানো। যেভাবেই হোক, তারা বোর্ডকে বোঝাবে যে, বিশ্বকাপে না গিয়ে আমরা নিজেদের ক্ষতি করতে পারি না। জানি না, বুলবুল ভাই (তখনকার বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল) কেন এসব করেননি, জানি না।
আমার মনে হয়, বুলবুল ভাইয়ের সভাপতির দায়িত্ব হারানোর পেছনে এটাও একটা বড় কারণ। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে গেলে হয়তো তিনিই সভাপতি থাকতেন এখনও। যদিও এটা স্রেফ আমার ধারণা।
কেন আপনার এরকম ধারণা হলো?
সাকিব: তিনি আইসিসিতে চাকরি করতেন, সেখানে তার দাপট না থাকলেও যোগাযোগ ছিল, আইসিসি থেকে সবুজ সঙ্কেত পেয়েই এখানে এসেছিলেন। জানি না, তিনি কেন সেই যোগাযোগ ধরে রাখতে পারলেন না।
আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের তো কারও শত্রু হওয়ার প্রয়োজন নেই। অবশ্যই আমরা হাত কচলাব না, নতজানু হব না, তবে শত্রু কেন বানাব? আমার এত বছরের ক্যারিয়ারে প্রথমবার দেখলাম, আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে অন্য কোনো বোর্ডের ঝামেলা।

প্রতিবাদে আমিনুল ইসলাম বুলবুল তো পদত্যাগ করতে পারতেন!
সাকিব: পদত্যাগ করার প্রয়োজন হতো না। এমনকি পদত্যাগের কথা বলাও জরুরি ছিল না। উনি যদি জায়গামতো শুধু বলতেন যে, “আমরা বিশ্বকাপ খেলতে প্রস্তুত, সেটা সরকারকে জানিয়ে দিয়েছি। এখন সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপার।”
বুলবুল ভাইরা তো এমন কিছু বলেননি বা করেননি। সরকারের সঙ্গেই একমত ছিলেন তারা।
এটা নিয়ে গোটা দেশে বিশেষ একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে যে, ‘আমরা মাথানত করব না’, ‘গোলামি করব না’… নানা লোক দেখানো কথা বলা হয়েছে। অথচ তেল, পেঁয়াজ, মরিচ, যাবতীয় নানা কিছু সব ভারত থেকে এনেছে সেই সরকারই… ক্রিকেটের বেলায় কেবল দাসত্ব মানব না!
আপনি কি নিচ্ছেন না ভারতের কাছ থেকে? এখনও তো প্রতিদিন যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে যে, ভিসা খুলবে কবে। প্রতিদিন বাণিজ্য হচ্ছে না দুই দেশের? মেডিকেল ভিসা নিয়ে লোকে ভারতে যাচ্ছে না? যত দেশপ্রেম, শুরু হয়ে যায় শুধু ক্রিকেটেই। ভারত যখন সফরে আসে, তখন বোর্ডের যে আয়, এক বছরের বাজেট উঠে যায় এক সিরিজে। তারা না এলে ক্ষতিটা কে পোষাবে?
আমি বলছি না গোলামি করতে হবে। তবে নিজের ভালো তো বুঝতে হবে। এত বছর ধরে চলে আসা সম্পর্ক গোলামি করে হয়নি। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।
সাকিব আল হাসানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কি?
সাকিব: কিছুদিন আগে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছি, রাজনীতির জন্য আজীবন সময় আছে। আপাতত ক্রিকেট খেলে নিচ্ছি।
সেখানে বলছিলেন যে, আপনার একটা দল আছে। ওই দল, মানে আওয়ামী লীগের প্রতিই আপনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ?
সাকিব: সেটাই তো হওয়ার কথা, তাই না? আমার এত দল পরিবর্তন করার শখ নেই, ইচ্ছা নেই এবং কোনো কালেও ছিল না। আমি এই জিনিস কখনও করিনি। ঠিক আছে? আমি যদি একটা ছোট দলেও কোনো দিন নাম লিখিয়েছি তো ওই দলের প্রতি সবসময় অনুগত ছিলাম। পল্টি দেওয়ার অভ্যাস নাই।
আপনার ওই কথার পর সামাজিক মাধ্যমে নানা রকম প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে…
সাকিব: কেন, দল করা কি খারাপ নাকি? যে কেউ যে কোনো দলকে বেছে নিতে পারে। এখন যারা বলছে, ‘অমুক দল খারাপ’, তাহলে যখন সময়-সুযোগ আসবে, তাদের দলও খারাপ হয়ে যাবে। তাই না?
তারা যখন বিপাকে পড়বে তখন?
সাকিব: না না, বিপাকে পড়ার কথা বলিনি। কাউকে বিপাকে ফেলার দরকার নেই। আমি এমনি কখনও ওই চিন্তাতে জীবনে ক্রিকেটও খেলিনি। কখনও চিন্তা করিনি যে কারও পারফরমেন্স খারাপ হলে আমার সুযোগটা আসবে। সারা জীবন চিন্তা করেছি, কেউ ভালো করুক, তার থেকে আমি ভালো করে দেখাব। সোজা হিসাব আমার।
আমার দল নিয়েও আমি ওরকমই চিন্তা করি। অন্য কোনো দল যদি ভালোভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারে, অবশ্যই ভালো। আমরা সুযোগ পেলে আরও ভালো করব। লোকে তখন আমাদেরকেই ভোট দেবে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে জিজ্ঞেস করার কারণ হলো, আওয়ামী রাজনীতি এখন তো নিষিদ্ধ…
সাকিব: এখন নিষিদ্ধ, তাই বলে আজীবন নিষিদ্ধ থাকবে নাকি? আজীবন কি কেউ কাউকে নিষিদ্ধ করে রাখতে পারে? এটা তো মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। দেশের একটা বড় অংশকে তো দাবিয়ে রাখতে পারবেন না। হ্যাঁ, জোর করে কিছুদিন সম্ভব আটকে রাখা বা যতদিন সম্ভব দমিয়ে রাখতে পারেন। কিন্তু এটাতে আসলে দেশের কোনো উন্নতি বা রাজনীতির ভালো আছে বলে আমার মনে হয় না।
আওয়ামী লিগও তো চেষ্টা করেছে বিরোধীদের দমিয়ে রাখতে!
সাকিব: ধরুন, এই ভুলটা যদি আমরা করে থাকি, ১০-১৫-২০ বছর আগের রাজনীতির সেই সময়ে দলের ভাবনা তো আমি জানি না, কিন্তু আমরা যদি এরকম ভুল করে থাকি, সেই ভুলেরও তো তাহলে এখন পুনরাবৃত্তি হচ্ছে! পরে যদি আবার অন্য কোনো দল ক্ষমতায় আসে বা আমরা আসি এবং পুনরাবৃত্তি করি, তাহলে এই খেলা তো চলতেই থাকবে। কাউকে না কাউকে এগুলো শেষ করতে হবে।
যে দলই এগুলো শেষ করবে, আমি বিশ্বাস করি, তারা দারুণভাবে লাভবান হবে। দৃষ্টান্ত স্থাপন করে মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারবে।
সত্যিকারের রাজনৈতিক সচেতন মানুষগুলো এমনই চায়। সবার সুযোগ থাকবে, সবাই মাঠে নেমে ন্যায্যভাবে লড়াই করবে তাদের নীতি নিয়ে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সবকিছু হবে এবং লোকে যাকে পছন্দ করবে, তাকে ভোট দেবে।
৫ অগাস্টের পর যে পরিবর্তনের আশা ছিল, আপনার কি মনে হয় মানুষের সেই আশা পূরণ হয়েছে?
সাকিব: এগুলো তো মানুষই বিচার করবে! আমি-আপনি বিচার করার লোক নই। বাংলাদেশের মানুষকেই বিচার করতে দিন, তারা কী চায়। মানুষের বিচার করার পথ হলো ভোট। পছন্দের দলকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। একটা বড় অংশকে ভোটের বাইরে রাখা মানে তো মানুষের পছন্দকে বেছে নেওয়ার অধিকার খর্ব করা।
সবাইকে সুযোগ দিতে হবে। মানুষই বেছে নেবে তাদের পছন্দের দল। তখন অন্য দলগুলি চেষ্টা করবে আরও ভালো করে মানুষের মন জয় করতে।
নিউ ইয়র্কে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আপনার ছবি-টবি প্রায়ই দেখা যায় সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও যেতে দেখা যায়। এসব কি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকারই প্রয়াস?
সাকিব: ভাই, নিউ ইয়র্কে আমি এমন অনেকের সঙ্গেও মিশি, যারা অন্য দলের। বিএনপির অনেক বড় নেতাও আছে। এখানে রাজনীতি তো আর বাংলাদেশের মতো নয়। এখানে অনেকের সঙ্গেই সম্পর্ক আছে, যারা বিএনপির, বা অন্য নানা দলের। আমার বাসায় আসেন তারা বা আমি যাই, গল্প করি, নানা কিছু শেয়ার করি। আওয়ামী লীগের লোকজন তো আছেই।
এখানে এমন নয় যে ভিন্ন দলের সঙ্গে মেশাই যাবে না। ভিন্ন দলের হয়েও একসঙ্গে ব্যবসা করছে, কমিউনিটি প্রোগ্রামে একই মঞ্চে সব দলের লোক থাকে, আবার অরাজনৈতিক লোকও থাকে। এসব এখানে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ক্রীড়াবিদরা যেন ক্যারিয়ার চলার সময় রাজনীতিতে না জড়ান। আপনার কি মনে হয়?
সাকিব: উনার ভাবনা আমি শ্রদ্ধা করি। অবশ্যই উনার কথায় যুক্তি আছে।
তামিম ইকবাল বিসিবির অ্যাড-হক কমিটির প্রধান হয়েছেন জানার পর ভাবনা কেমন ছিল?
সাকিব: ও তো অনেক দিন ধরে চেষ্টা করছিল। তাই প্রত্যাশিতই ছিল। এগুলো নিয়ে আমার খুব বেশি ইন্টারেস্ট ছিল না, কে বোর্ডে এলো, কে গেল।
তামিম বোর্ড সভাপতি হওয়ার পরে কথা হয়েছে তার সঙ্গে?
সাকিব: হ্যাঁ, একবার ফোন করেছিল তামিম, ওই ক্যাপ্টেনস কার্ডের জন্য।
লম্বা আলোচনা ছিল নাকি ছোট্ট?
সাকিব: খুব বেশি না। ওই ক্যাপ্টেনস কার্ড দিচ্ছে, আমি যেহেতু দেশে নেই, কাউকে পাঠিয়ে দিয়ে নিতে পারি অথবা যখনই দেশে ফিরব, তখন নিতে পারব, এই ধরনের কথা আর কী।
ক্যাপ্টেনস কার্ড নিয়েও আবার প্রশংসা যেমন হয়েছে, সমালোচনাও হয়েছে!
সাকিব: এসব ব্যাপারে আলোচনা-সমালোচনা থাকবেই। যেটা হচ্ছে যে, ক্রিকেটারদেরকে ক্যাপ্টেনস কার্ডের মাধ্যমে আলাদা করাটা ঠিক নয়। অনেকেই ক্রিকেটার হিসেবে অনেক ম্যাচ খেলেছে, কিন্তু অধিনায়কত্ব পাচ্ছে না বলে এই সুবিধাটা পাচ্ছে না, আরেকজন আবার বেশি ম্যাচ না খেললেও এক ম্যাচে অধিনায়কত্ব করেই এটা পাচ্ছে। সেই জায়গা থেকে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে। আবার এটাও ঠিক, সম্মান তো সম্মানই। ক্রিকেটে অধিনায়কের আলাদা জায়গা থাকে এবং সম্মান দেওয়াও ঠিক আছে।
তবে সব ক্রিকেটারকেই সম্মানটা দেওয়া উচিত। সম্মানটা তাদের প্রাপ্য এবং সেটা পেলে তারা খুশি হয়। সবাইকে যতটা সম্ভব সমান ধরনের সুযোগ দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশের খেলা দেখছেন? কেমন করছে দল?
সাকিব: দল তো ভালোই করছে। তবে আমার মনে হয়, কঠিন প্রতিপক্ষ সেভাবে পাচ্ছে না। দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোতে তো এখন অনেক সময়ই দলগুলি তাদের সেরা দল খেলায় না বা খেলাতে পারে না নানা কারণে। বিশ্বকাপে না যাওয়ায় এখানেও একটা বড় ক্ষতি হয়েছে। টি-টোয়েন্টি দলটা এমনিতে ভালো খেলছে। কিন্তু সত্যিকারের পরীক্ষা হচ্ছে না ওদের। বিশ্বকাপে গেলে সত্যিকারের পরীক্ষা হতো যে, আসলেই কতটা ভালো দল। বোঝা যেত কোন জায়গায় দলটা আসলেই ভালো, কোন জায়গায় উন্নতি করতে হবে।
দলের পারফরম্যান্সকে আমি খাটো করছি না। টি-টোয়েন্টি দল ভালো খেলছে, ওয়ানডে দল তো টানা কয়েকটি সিরিজ জিতেছে।
আপনার কি মনে হয়, এই দলে জায়গা করে নিতে পারবেন?
সাকিব: সবশেষ যে টুর্নামেন্টগুলো খেলেছি, আমার মনে হয় ভালোই করেছি। সিপিএলে আমাদের দল মোটেও ভালো ছিল না। তার পরও প্লে-অফে খেলেছি। কানাডায় সুপার সিক্সটিতে ফাইনালে খেলেছি। গ্লোবাল টি-টোয়েন্টিতে ফাইনালে খেলেছি। আমার পারফরম্যান্স তো দেখেছেনই আপনারা। এই কারণে আত্মবিশ্বাস আছে যে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেললে খারাপ খেলব না।
হ্যাঁ, যেটা লাগবে, এক মাস ট্রেনিং লাগবে। ফিটনেস ট্রেনিংসহ সবকিছু এক মাস করলেই হবে। আবহাওয়া, মাঠ, সবকিছুর সঙ্গে একটু মানিয়ে নিতে হবে। এই তো।
আর যদি দেখি দুটি সিরিজে পারফর্ম করতে পারলাম না, খেলা ভালো হচ্ছে না, বিদায় নেব তখন। এমন তো নয় যে খেলতেই থাকব বা দলের বোঝা হয়ে থাকব। দলের বোঝা হয়ে ওঠার আগে নিজেই উপলব্ধি করব এবং ছেড়ে দেব।
কিছুদিন আগে আপনার সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন বলছিলেন যে বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ, আপনার হাতে অফুরন্ত সময়। বাচ্চাদের সামলানো নিয়ে তাহলে এখন বেশ ব্যস্ত থাকছেন?
সাকিব: তখন স্কুল বন্ধ ছিল ওদের। এখন আবার খুলে গেছে। সামনে সামার ব্রেক আছে।
বাচ্চাদের সামলানো সহজ নয়। ভালো তো লাগেই, তবে আমার যেহেতু অভ্যাস নেই, ক্রিকেট নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম, কাজেই কষ্টও হয়। মায়েদের কষ্টও বোঝা যায় এতে, তারা কত পরিশ্রম করে। তবে নিউ ইয়র্কে একটা সুবিধে হলো, অনেক ছুটি থাকে স্কুলে।
বাড়িতে আপনাকে এখন এত বেশি পাচ্ছে, বাচ্চারা অবাক হয় না?
সাকিব: ওরা তো খুশি। তবে বাড়িতে বেশি থাকতে থাকতে এমন হয়েছে যে, এখন এই তিন-চার দিনের জন্য বাড়ির বাইরে থাকলেও ওদের খারাপ লাগে। বাড়িতে বেশি থাকার ফল!
শেষ প্রশ্ন, নির্বাচন করার সময় বলেছিলেন যে, মাগুরার উন্নয়ন করতে চান, মাগুরার মানুষের জন্য কাজ করতে চান। ভবিষ্যতে সুযোগ পাবেন বলে মনে হয়?
সাকিব: মাগুরার মানুষের জন্য সারা জীবন আছে আমার। মাগুরার মানুষ আমাকে আবার সুযোগ দেবেই। যতদিন সুযোগ না পাচ্ছি…. তারপরও যদি ভালো করতে পারি, হয়তো আরও সুযোগ দিবে। আমার ধারণা, একবার সুযোগ পেলে আমি যে কাজ করব, তাতে আর বারবার করা লাগবে না।
আমার শতভাগ বিশ্বাস আছে, ওখানে নির্বাচন করলেই আমি জিতব। মানুষ আমাকে ভোট দেবে, যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়।
আমি তো এবারের নির্বাচনই করতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম নির্বাচন করি, ভোটে দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দেই। পরে ভাবলাম, আমাকে নির্বাচন করতে দেবে না। এছাড়া দলেরও তো একটা সিদ্ধান্ত থাকে, সেটার বাইরে যাওয়া যায় না। নাহলে নির্বাচন করে দেখিয়ে দিতাম।
জাতীয় দলে ফিরতে 'এক মাসের ট্রেনিং' যথেষ্ট মনে করেন সাকিব
দেশে ফিরব, কোর্টে যাব, মামলা লড়ব, কিন্তু নিরাপত্তা তো দিতে হবে : সাকিব
এবারও ভোটে দাঁড়িয়ে 'দেখিয়ে দেওয়ার' কথা ভেবেছিলেন সাকিব
আওয়ামী লীগেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সাকিব, 'পল্টি দেওয়ার অভ্যাস নেই'