ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ
Published : 05 Sep 2025, 03:32 AM
ইংল্যান্ডের মাটিতে সবশেষ যখন দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজ জিতেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, ম্যাথু ব্রিটস্কির তখন জন্মই হয়নি। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে দুর্দান্ত শুরু করা এই ব্যাটসম্যানই প্রোটিয়াদের দীর্ঘ খরা কাটাতে রাখলেন বড় অবদান। চোট কাটিয়ে ফিরে আরেকটি চমৎকার ইনিংস খেলে দলকে বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দিলেন তিনি। রান তাড়ায় ইংল্যান্ড সম্ভাবনা জিইয়ে রাখল শেষ বল পর্যন্ত। কিন্তু পারল না তারা অল্পের জন্য।
দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডকে ৫ রানে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখে সিরিজ জিতে নিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম ইংল্যান্ডের মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজ জিতল তারা।
লর্ডসে বৃহস্পতিবার দক্ষিণ আফ্রিকা করে ৩৩০ রান। ক্রিকেট-তীর্থ খ্যাত এই মাঠে ওয়ানডেতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোর এটি।
এখানে এই সংস্করণে রান তাড়ায় তিনশর বেশি করার নজির ছিল এতদিন কেবল একটিই। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩২৬ রানের লক্ষ্য তাড়ায় স্মরণীয় জয় পেয়েছিল ভারত।
সিরিজে ফিরতে ইংল্যান্ডকে তাই গড়তে হতো এখানে সর্বোচ্চ রান তাড়ার নতুন রেকর্ড। হেডিংলিতে প্রথম ম্যাচে ১৩১ রানে গুটিয়ে যাওয়া ইংলিশরা এবার যেতে পারে ৩২৫ পর্যন্ত।
২০২৩ বিশ্বকাপের পর থেকে ছয়টি দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজের পাঁচটিতেই হেরে গেল ইংল্যান্ড। এই বছর ১১ ওয়ানডে ম্যাচের ৮টিতে হারল তারা।
গত জুনে লর্ডসে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ২৭ বছর পর কোনো আইসিসি ট্রফি জয়ের স্বাদ পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। সেখানেই এবার ২৭ বছরের আরেক অপেক্ষার অবসান হলো তাদের।
দক্ষিণ আফ্রিকার নায়ক ব্রিটস্কি। ৭ চার ও ৩ ছক্কায় ৭৭ বলে ৮৫ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচের সেরা ২৬ বছর বয়সী এই ব্যাটসম্যান। ওয়ানডে ইতিহাসে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ ইনিংসেই পঞ্চাশ ছোঁয়ার কীর্তি গড়েন তিনি এ দিন।
দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ফিফটি করেন আরও একজন। ৬২ বলে ৫৮ রানের ইনিংস খেলেন ট্রিস্টান স্টাবস। সঙ্গে ডেওয়াল্ড ব্রেভিসের ঝড়ো ও কর্বিন বশের ক্যামিও ইনিংসে বড় পুঁজি পায় প্রোটিয়ারা।
জবাবে ইনিংসের প্রথম বলে উইকেট হারালেও জো রুট, জ্যাকব বেথেল ও জস বাটলারের ফিফটি লড়াইয়ে রাখে ইংল্যান্ডকে। উইল জ্যাকস দলকে তিনশর কাছে নিয়ে ফেরার পর শেষ দিকে অবিশ্বাস্য কিছুর আশা জাগান জফ্রা আর্চার।
শেষ ওভারে ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ছিল ১৬ রান। বাঁহাতি স্পিনার সেনুরান মুথুসামির প্রথম দুই বলে এক রানের পর, তৃতীয় ও পঞ্চম বলে চার মারেন আর্চার। ম্যাচ সুপার ওভারে নিতে শেষ বলে মারতে হতো ছক্কা। বেরিয়ে এসে ঠিকমতো খেলতে পারেননি আর্চার, নিতে পারেন এক রান।
শুরুতেই জেমি স্মিথের বিদায়ের পর আরেক ওপেনার বেন ডাকেটও ভালো করতে পারেননি। ৬৬ রানে ২ উইকেট হারানোর পর দলের হাল ধরেন রুট ও বেথেল।
আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে বেথেল ফিফটি করেন স্রেফ ২৮ বলে। পঞ্চাশ ছুঁতে রুটের লাগে ৫৮ বল। কিন্তু দুই থিতু ব্যাটসম্যানই বিদায় নেন পরপর দুই ওভারে।
বেথেলকে (৪০ বলে ৫৮) ফিরিয়ে ৭৭ রানের জুটি ভাঙেন পেস বোলিং অলরাউন্ডার বশ। রুটকে (৭২ বলে ৬১) বিদায় করেন বাঁহাতি স্পিনার কেশাভ মহারাজ।
জোড়া ধাক্কার পর পঞ্চম উইকেটে ইংল্যান্ড আরেকটি পঞ্চাশোর্ধ জুটি (৬৯) পায় অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক ও সাবেক অধিনায়ক বাটলারের ব্যাটে। ৪০ বলে ৩৩ রান করে ফেরেন ব্রুক। পঞ্চাশ ছোঁয়ার পর ইনিংস টেনে নিতে পারেননি বাটলারও (৫১ বলে ৬১)।
শেষ ছয় ওভারে ইংল্যান্ডের দরকার ছিল ৬৪ রান। চেষ্টা করে যান জ্যাকস ও ব্রাইডন কার্স। লুঙ্গি এনগিডিকে ছক্কার পর মুথুসামির একই ওভারে একটি করে চার ও ছক্কা মারেন জ্যাকস।
কিন্তু নান্দ্রে বার্গারের করা ৪৭তম ওভারে কার্স ও জ্যাকসের বিদায়ে (৩৩ বলে ৩৯) ইংল্যান্ডের আশা অনেকটাই শেষ হয়ে যায়। এরপর আর্চার চেষ্টা করলেও দলকে কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় পৌঁছে দিতে পারেননি। ২টি করে চার ও ছক্কায় ১৪ বলে ২৭ রানে অপরাজিত রয়ে যান এই পেসার।
দক্ষিণ আফ্রিকা এ দিন ব্যাটিংয়ে নেমেছিল টস হেরে। ৭৩ রানের উদ্বোধনী জুটিতে দলকে ভালো শুরু এনে দেন এইডেন মার্করাম ও রায়ান রিকেলটন। এরপর কয়েক ওভারের মধ্যে এই দুজনের পাশাপাশি টেম্বা বাভুমাকেও হারায় তারা। রিকেলটন ৩৩ বলে ৩৫, মার্করাম ৬৪ বলে ৪৯ রান করেন।
৯৩ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর ১২৬ বলে ১৪৭ রানের বড় জুটিতে দলকে এগিয়ে নেন ব্রিটস্কি ও স্টাবস।
ক্যারিয়ারের প্রথম চার ওয়ানডেতে পঞ্চাশ ছোঁয়ার পর, অস্ট্রেলিয়া সিরিজের শেষ ম্যাচে ও এই সিরিজের প্রথম ম্যাচে ব্রিটস্কি খেলতে পারেননি হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটের কারণে। ফিরেই পঞ্চাশ স্পর্শ করেন তিনি ৫৭ বলে। জাগান দ্বিতীয় সেঞ্চুরির সম্ভাবনাও। কিন্তু মাইলফলক থেকে ১৫ রান দূরে থাকতে আর্চারের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে যান তিনি।
পাঁচ ম্যাচে ৯২.৬০ গড়ে তার রান এখন ৪৬৩, ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ ওয়ানডে ইনিংসে কোনো ব্যাটসম্যানের যা সর্বোচ্চ রান। পেছনে পড়ে গেছে নেদারল্যান্ডসের টম কুপারের ৩৭৪।
স্টাবসও এরপর বেশিক্ষণ টেকেননি। তার ৫৮ রানের ইনিংস গড়া ২ চার ও ১ ছক্কায়। ছয় নম্বরে নেমে ৩টি করে চার ও ছক্কায় ২০ বলে ৪২ রানের ইনিংসে দলের স্কোর তিনশর কাছে নিয়ে ফেরেন ব্রেভিস। ২৯ বলে অপরাজিত ৩২ রানের ইনিংসে দলকে ৩৩০ পর্যন্ত নিয়ে যান বশ।
শেষ ওভারে যদিও ২ উইকেট হারিয়ে ৪ রানের বেশি করতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে শেষ পর্যন্ত জয়ের জন্য যথেষ্ট হলো এই পুঁজিই।
আগামী রোববার সাউথ্যাম্পটনে হবে সিরিজের শেষ ম্যাচ। হোয়াইটওয়াশড হওয়ার চোখ রাঙানি ইংল্যান্ডের সামনে। ২০০৬ সালের পর থেকে ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজে এই তেতো স্বাদ পেতে হয়নি তাদের।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
দক্ষিণ আফ্রিকা: ৫০ ওভারে ৩৩০/৮ (মার্করাম ৪৯, রিকেলটন ৩৫, বাভুমা ৪, ব্রিটস্কি ৮৫, স্টাবস ৫৮, ব্রেভিস ৪২, বশ ৩২*, মুথুসামি ৭, মহারাজ ১; আর্চার ১০-০-৬২-৪, সাকিব ১০-১-৫৩-০, কার্স ১০-০-৬৮-০, রাশিদ ১০-১-৩৩-২, বেথেল ৫-০-৬১-১, জ্যাকস ৫-০-৫১-০)
ইংল্যান্ড: ৫০ ওভারে ৩২৫/৯ (স্মিথ ০, ডাকেট ১৪, রুট ৬১, বেথেল ৫৮, ব্রুক ৩৩, বাটলার ৬১, জ্যাকস ৩৯, কার্স ৭, আর্চার ২৭*, রাশিদ ২, সাকিব ২*; বার্গার ১০-০-৬৩-৩, এনগিডি ১০-০-৭২-১, বশ ১০-১-৩৮-১, মহারাজ ১০-০-৫৯-২, মার্করাম ২-০-২৭-০, মুথুসামি ৮-০-৬১-১)
ফল: দক্ষিণ আফ্রিকা ৫ রানে জয়ী
সিরিজ: ৩ ম্যাচের সিরিজে ২-০তে এগিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা
ম্যান অব দা ম্যাচ: ম্যাথু ব্রিটস্কি