Published : 21 Jan 2026, 06:33 PM
‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক কর্তৃপক্ষ যে দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করেছে, তাদের চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, “বাংলাদেশে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা বা একাডেমিক ফ্রিডমের সংকট বরাবরই অত্যন্ত প্রকট। শাসক ও ক্ষমতাবানরা বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার গলা চিপে ধরে ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সকলকে একই সুরে কথা বলতে বাধ্য করতে চান।
“জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা বহু সংকট কাটানোর প্রত্যাশা করেছিলাম। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা। বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা সেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বাকস্বাধীনতা লালনেরই বহিঃপ্রকাশ, যার সঙ্গে খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ধারণাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং বহুমত-বহুপথের সম্মিলনই বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়কে সমাজের অপরাপর প্রতিষ্ঠান থেকে স্বতন্ত্র করেছে।”
তিনি বলেন, “আমরা অত্যন্ত হতাশা ও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করলাম, অভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশে এই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে একটি গোষ্ঠী, যারা ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ভিন্নমত দমনের পাশাপাশি আগ্রাসী পথে ক্ষমতায়িত হতে উদগ্রীব। এ কাজে তারা ব্যবহার করছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোকে।
“বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল স্বাধীন মত-প্রকাশ বা ভিন্নমত পোষণ করার কারণে অনেক শিক্ষককে হেনস্থা ও হয়রানি করা হচ্ছে এবং প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ধর্মানুভূতিকে ঢালাওভাবে ঢাল বানানো হয়েছে। এই প্রবণতারই সর্বশেষ শিকার রাজধানীস্থ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের এই দুই শিক্ষক।”
শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গত রোববার বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর এবং ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের প্রাক্তন পরিচালক এবং বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম মোহসীনকে চাকরিচ্যুত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
লায়েকা বশিরের বিরুদ্ধে 'হিজাব পরায় ছাত্রীকে হেনস্তার' অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। আর, সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম মোহসীনের বিরুদ্ধে ‘আওয়ামী লীগ সম্পৃক্ততার’ অভিযোগ তাদের।
শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলছে, লায়েকা বশীর ‘আভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের শিকার। তাদের ভাষ্য, লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে এমন এক অভিযোগ আমলে এনে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, যা সত্যিকার অর্থেই বিদ্যায়তনিক চর্চার স্বাধীনতাকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট’।
ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের ‘ক্ষুদ্র একটি অংশ’ এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ‘নানা রকমের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে’ বলে শিক্ষক নেটওয়ার্কের ভাষ্য।
সামিনা লুৎফা বলেন, “যে বাকস্বাধীনতার জন্য জুলাইতে লায়েকা ও মোহসীন শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, সেই বাকস্বাধীনতাকে খর্ব করেই শিক্ষার্থীদের একটি উগ্র অংশ লায়েকার বিরুদ্ধে অনলাইন সহিংসতা শুরু করেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
“যে পোস্টের কারণে এ অভিযোগ, তা ধর্মীয় নয় বরং নিরাপত্তা-বিষয়ক উদ্বেগ থেকে লেখা বলে তিনি বিষয়টি স্পষ্ট করে আরেকটি পোস্ট দিলেও তার বিরুদ্ধে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন একের পর এক অভিযোগ ও অনলাইন হয়রানি চলতেই থাকে।”
লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগগুলো তুলে ধরে অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, “এই হয়রানির সময় তার পাশে না থেকে উল্টো কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই উপাচার্য ফোন করে লায়েকা বশীরকে পদত্যাগ করতে নির্দেশ দেন। সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এ চাপকে অস্বীকার করে তিনি সমস্ত বিষয়ের তদন্ত দাবি করেন।
“সে সময় পর্যন্ত আসা অভিযোগগুলো ছিল মূলত ফেইসবুকে, এবং অনেকক্ষেত্রে কতগুলো বায়বীয় বিষয়কে নিয়ে, যার সিংহভাগই এসেছিল ফেইক একাউন্ট থেকে। ফলে হাতে তেমন কিছু না থাকায় তদন্ত কমিটি লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে গুগল ফর্ম তৈরি করে অভিযোগ আহ্বান করে, যা জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল গত বছর ৩১ ডিসেম্বর। এই পুরো প্রক্রিয়াটিই বলে দিচ্ছে, লায়েকা বশীর আভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন, যেখানে অজুহাত ও ঢাল বানানো হয়েছে ধর্মানুভূতিকে এবং ব্যবহার করা হয়েছে দঙ্গলবাজদের।”
লায়েকা বশীরকে চাকরিচ্যুত করা ‘বেআইনি ও ন্যায়বিচারের ধারণার পরিপন্থি’ আখ্যায়িত করে সামিনা লুৎফা বলেন, “তদন্তের আগেই যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া হয় যে একজনকে চাকুরিচ্যুত করা হবে, তাহলে সেই তদন্ত কখনই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে পারে না; শক্তিশালীর আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নই হয়ে ওঠে তদন্তকারীদের একমাত্র উদ্দেশ্য।
“লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে সেটাই করা হয়েছে বলে, এই পুরো প্রক্রিয়াটিই আইনের দৃষ্টিতে আসলে বেআইনি ও ন্যায়বিচারের ধারণার পরিপন্থি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সুস্পষ্টভাবে অন্যায্য ও বেআইনি কাজ করেছে।”
শিক্ষক নেটওয়ার্কের সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন তোলা হয়, “যেভাবে অবিবেচনাপ্রসূত ও অযৌক্তিক দঙ্গল সৃষ্টি করে দীর্ঘদিনের কর্মস্থল থেকে তাদের জবরদস্তি চাকুরিচ্যুত করা হল, যেভাবে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বিপদাপন্ন করে তোলা হল, সেটাই কি আজকের দিনের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত পথ ও প্রবণতা? যে কোনো মূল্যে গলা টিপে মারতে হবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে? এজন্যই কি হয়েছিল জুলাই-অভ্যুত্থান?”
এই দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার ঘটনায় ‘দঙ্গলবাজ শিক্ষার্থী এবং তাদের প্রতি নতজানু হয়ে শিক্ষকদের চাকুরিচ্যুত করার মত দায়িত্বহীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আচরণের’ তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে শিক্ষকদের এ সংগঠন।
পাশাপাশি পুরো ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ‘দীর্ঘ কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও নীরব ভূমিকার’ নিন্দা ও ক্ষোভ জানানো হয়।
সামিনা লুৎফা বলেন, “আক্রান্ত শিক্ষকের পাশে না-দাঁড়ানো ও যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ না-করার অত্যন্ত অপরিণামদর্শী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়, যা ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার জন্য এক চরম অশনি সংকেত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। যে কোনো মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চিন্তার স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক বদ্ধ পরিকর।”
সংবাদ সম্মেলনে চারটি দাবি তুলে ধরেছে শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
১. অবিলম্বে লায়েকা বশীর ও সায়েম মোহসীনকে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে এবং এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ইউএপির অন্যান্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
২. যথাযথ প্রক্রিয়া ও আইনের শাসন চালুর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ধরনের শিক্ষাবিরোধী অপতৎপরতা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বরতদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে এবং দঙ্গলবাজদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
৩. কথায় কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির হুমকি বন্ধ করতে হবে এবং যথোপযুক্ত নীতিমালা বাস্তবায়ন করে তাদের কর্মজীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. বিদ্যায়তনিক শৃঙ্খলা ও স্বাধীনতার স্পিরিটকে রক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ধারণাকে সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদসহ শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্যরা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ।