Published : 13 Jul 2026, 08:27 PM
বিরোধীদলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন এনসিপির সদস্য আখতার হোসেন।
বিএনপি ‘একদলীয় শাসন ব্যবস্থা’ তৈরি করতে চায় কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
রংপুর-৪ আসনের এই সংসদ সদস্য সরকারের কাছে ওই অতিরিক্ত দায়িত্বের আওতা ও সাংবিধানিক ভিত্তির ব্যাখ্যাও চেয়েছেন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের কোনো সুনির্দিষ্ট আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকা নেই। পুরো বাংলাদেশেই তারা সংসদীয় দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
সোমবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে এ নিয়ে আলোচনা হয়। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তখন বৈঠকে সভাপতিত্ব করছিলেন।
এর আগে প্রশ্নোত্তর পর্বে সম্পূরক প্রশ্ন করার সময় সংরক্ষিত নারী আসন-১২-এর বিএনপির সদস্য জীবা আমিনা খান পীরগঞ্জ ও মিঠাপুকুরকে তার ‘অতিরিক্ত দায়িত্বের’ এলাকা হিসেবে বলেন।
রোববার ওই দুই এলাকা সফর করে আসার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানকার ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
হাসপাতালগুলোর জনবল সংকটের কথা তুলে ধরে স্থানীয় বেকার তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগী হিসেবে কাজে লাগানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না, তা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে জানতে চান জীবা আমিনা।
ওই সংসদ সদস্যর বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলতে চান আখতার হোসেন। তবে তখন আছরের নামাজের জন্য সংসদের বৈঠকে বিরতি দেওয়া হয়।
বিরতির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে আখতার বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনের ওই সদস্য রংপুরের দুটি সংসদীয় আসনকে তার ‘অতিরিক্ত দায়িত্বের’ এলাকা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
“ওই সদস্য এলাকা সফর করার পর স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বলতে শোনা গেছে, সেখানে সরাসরি নির্বাচিত ব্যক্তি ‘এমপি নন’; বরং সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যই ওই এলাকার এমপি এবং এলাকার সব কাজ তার মাধ্যমে করতে হবে।”
আখতার বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে এর আগে বলতে শুনেছেন যে সংরক্ষিত নারী আসনের কোনো সদস্যকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। অথচ সংসদে একজন সংরক্ষিত নারী সদস্য নিজেই ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ পাওয়ার কথা বলেছেন।
“আসলে কোন বিষয়টা সত্য? অতিরিক্ত দায়িত্বের আওতা কত? সেটা কীভাবে পালন করা হবে? সেই অতিরিক্ত দায়িত্বের সাংবিধানিকতা কতটুকু, সেটাও জানতে চাই,” বলেন তিনি।
শুধু বিরোধী দলের সদস্যরা যেসব আসনে নির্বাচিত হয়েছেন, সেসব আসনেই সংরক্ষিত নারী সদস্যদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আখতার।
তিনি বলেন, “এখানে আশঙ্কার জায়গা তৈরি করছে, বিএনপি কি বিরোধী দলের আসনে তাদের নারী এমপিদের দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা তৈরি করতে চায়?”
বিষয়টি এতদিন ‘অনানুষ্ঠানিক’ পর্যায়ে ছিল মন্তব্য করে এনসিপির এই এমপি বলেন, সংসদের ভেতরে একজন সদস্য বিষয়টি বলার পর তা আনুষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
এ বিষয়ে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা ও সমস্যার সুরাহা চান তিনি।
আখতার হোসেনের বক্তব্যের পর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে জবাব দেওয়ার জন্য ফ্লোর দেন।
ডেপুটি স্পিকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে জবাব দেওয়ার সুযোগ চাইলেও সব সময় তাকে সময় দেওয়া হয় না। তবে এদিন ডেপুটি স্পিকার নিজে থেকে জবাব দেওয়ার আহ্বান জানানোয় তিনি কৃতজ্ঞ।
আখতার হোসেন যে বিষয়টি পয়েন্ট অব অর্ডারে উত্থাপন করেছেন, তা সেদিনের কার্যক্রমে পয়েন্ট অব অর্ডার হিসেবে প্রযোজ্য কি না, সে প্রশ্নও তোলেন সালাহউদ্দিন।
তিনি বলেন, “মাননীয় সদস্য জনাব আখতার হোসেন যে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন পয়েন্ট অব অর্ডারে, সেটা আজকের জন্য বোধহয় পয়েন্ট অব অর্ডার হবে না। তারপরেও যেহেতু উত্থাপিত হয়ে গেছে, আপনিও আহ্বান করছেন জবাব দেওয়ার জন্য, আমার জবাব দেওয়া জরুরি।”
এরপর সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতীয় সংসদ সরাসরি নির্বাচিত ৩০০ সদস্য নিয়ে গঠিত। এর অতিরিক্ত সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ সদস্যও সংসদের অংশ।
তিনি বলেন, সাধারণ আসনের ৩০০ সদস্য একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচিত হন। উপজেলা, পৌরসভা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের সীমানা বিবেচনায় সীমানা নির্ধারণ আইন অনুযায়ী এসব নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ করা হয়।
নির্বাচনী এলাকার সীমানা ‘স্থায়ী নয়’ দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সীমানা নির্ধারণ আইন অনুযায়ী সময়ে সময়ে সেগুলো পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও কয়েকটি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে সরাসরি নির্বাচিত সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকার বিধান সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের ক্ষেত্রে ‘প্রযোজ্য নয়’ বলে তার ভাষ্য।
সালাহউদ্দিন বলেন, “তারা যে আসনে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের লিমিটেড এরিয়া হচ্ছে হোল কান্ট্রি বাংলাদেশ।”
তিনি বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের কার্যপরিধি একটি বা দুটি সংসদীয় আসনে সীমিত নয়; পুরো বাংলাদেশেই তারা সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকা’ বা আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকার ধারণা ‘সাংবিধানিকভাবে প্রযোজ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন।
তিনি বলেন, “সারা বাংলাদেশের সমস্ত অধিক্ষেত্রে নির্বাচনী এলাকা। মাননীয় সংসদ সদস্যগণ ইচ্ছা করলে তাহাদের সংসদের যে দায়িত্ব, সে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।”
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরাও যে অন্য সদস্যদের মত পূর্ণাঙ্গ সংসদ সদস্য, সে কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থা থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে তারা যেসব বরাদ্দ পান, তা দেশের যে কোনো স্থানে দিতে পারেন।
নিজের নির্বাচনী এলাকার উদাহরণ দিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, কোনো সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য চাইলে তার এলাকায় বরাদ্দ দিতে পারেন। আবার একই সদস্য বাঁশখালী বা সাতকানিয়াতেও বরাদ্দ দিতে পারেন।
“যে সমস্ত বরাদ্দ তারা সংসদ সদস্য হিসেবে প্রাপ্ত হন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সরকারি বিভিন্নভাবে, তারা তাদের সেই প্রাপ্ত বরাদ্দ বাংলাদেশের যে কোনো স্থানে উপবরাদ্দ দিতে পারেন।”
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্নার উদাহরণ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওই সদস্যের এলাকা কেবল কক্সবাজার নয়; পুরো বাংলাদেশ। তিনি চাইলে কক্সবাজারে যেমন কাজ করতে পারেন, তেমনি বাঁশখালী বা সাতকানিয়ায়ও কাজ করতে পারেন।
কোনো সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সংসদে একটি বা দুটি আসনকে ‘আমার এলাকা’ বললে তিনি নিজেই নিজের দায়িত্বের পরিসর সীমিত করেন বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন।
সংরক্ষিত নারী সদস্যদের নির্দিষ্ট এলাকায় ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ দেওয়া হয়েছে—আখতার হোসেনের এমন বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট আঞ্চলিক দায়িত্ব তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
“মাননীয় সংসদ সদস্য যে এটা উত্থাপন করেছেন, যে দায়িত্বপ্রাপ্ত বা সুনির্দিষ্ট এলাকা, সেটা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল হাস্যরস করে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য শামীম আরা স্বপ্নাকে কক্সবাজার ও বাঁশখালীর পাশাপাশি নেত্রকোণা-১ আসনের দিকেও নজর রাখার অনুরোধ করেন।