Published : 24 Nov 2025, 04:36 AM
তিন দশকের মধ্যে দেশে বিদ্যুতের ব্যবহার ব্যাপক হারে বাড়লেও অধিক উৎপাদনশীল খাতে তা যাচ্ছে কম। মোট বিদ্যুৎ বিক্রিতে শিল্পের অংশ কমছে ক্রমাগত। কৃষিতেও তা নিম্নমুখী।
অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখা অধিক উৎপাদনশীল খাতের বদলে বিদ্যুতের বেশি অংশ যাচ্ছে বাসাবাড়িতে; যা জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যেকার ফারাককে দৃষ্টিকটুভাবে সামনে এনেছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশ্লেষকরা।
জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হওয়া বিদ্যুৎ বিক্রির ১৯৯৪ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিল্পের মত কৃষিতেও বিদ্যুৎ ব্যবহারের হার কমেছে; যদিও পরিমাণগত দিক থেকে তা উভয় খাতেই বেড়েছে।
দেশের অর্থনীতির প্রধান এ দুই খাতে বিদ্যুতের অংশ কমে যাওয়ার হার বিদ্যুতের অধিকতর কম উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের প্রবণতা নির্দেশ করছে বলে মত বিশ্লেষকদের।

তারা অধিক উৎপাদনশীল খাতে বিদ্যুতের ব্যবহারের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে এর দুর্বলতার কারণ খুঁজে বের করা এবং ভবিষ্যত অগ্রাধিকার ঠিক করার পরামর্শ দিয়েছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ নিয়ে বছরের পর বছর আলোচনা হলেও সব সরকারই এটি করতে পারেনি কিংবা যথাযথভাবে করতেই চায়নি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশে ভারী শিল্পায়ন যেভাবে হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। শিগগির এটি হওয়ার সম্ভাবনাও নেই।
বিদ্যুতের ব্যবহারে শিল্পের অংশ কমে যাওয়ার প্রভাব সুদূরপ্রসারী মন্তব্য করে জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা ভারী শিল্পায়নের প্রথম বাধা হিসেবে সস্তা শ্রমের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কথা বলছেন। তাদের মতে, অধিকতর উৎপাদনশীল খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি অন্যতম বাধা।
তারা বলছেন, স্থায়ী জ্বালানি ঘাটতি, নীতি নির্ধারণে দূরদর্শিতা ও অবকাঠামোর অভাবও ভারী শিল্পায়নের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এরমধ্যেও আগের সরকারগুলো দেশে সব ধরনের শিল্পায়ন বাড়াতে জোর দিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। একইসঙ্গে উচ্চাভিলাসী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত উভয় ধরনের পরিকল্পনাই বাস্তবে খুব একটা কাজে আসেনি।
গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০৪১ সালের মধ্যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনের লক্ষ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির জন্য একের পর এক যেসব পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল সেগুলো ছিল বিপুলভাবে আমদানিনির্ভর।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এলএনজি, কয়লা ও তেল আমদানিতে বিপুল ব্যয় করে। ওই সরকারের শেষের কয়েক বছরে তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ব্যাপক চাপ তৈরি করে।
একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হতে থাকে। তবে জ্বালানি সংকটে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়নি। এক পর্ায়ে এসব কেন্দ্র বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এগুলোর জন্য বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, যেগুলো কোনো বিদ্যুৎই উৎপাদন করছে না।
অতিরিক্ত সক্ষমতার কেন্দ্র তৈরির কারণে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক ঋণ পরিশোধের দায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারে।
২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ২৯ গিগাওয়াটে পৌঁছাবে বলে তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে বলছেন সিপিডির মোয়াজ্জেম হোসেন। তার ভাষ্য, এর মানে প্রায় ৩৫ গিগাওয়াট স্থাপিত সক্ষমতা যথেষ্ট হবে। বর্তমানে দেশে স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ দশমিক ৩৫ গিগাওয়াট; এর সঙ্গে ব্যক্তি মালিকানাধীন ২ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের ক্যাপটিভ উৎপাদন যোগ করা হয়নি।
চাহিদা অনুযায়ী সরকারের কাছ থেকে বিদ্যুৎ না পেয়ে অনেক শিল্প কারখানায় নিজস্ব ব্যবস্থাপনা গ্যাস বা তেলচালিত ছোট কেন্দ্র বসিয়ে ‘ক্যাপটিভ’ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এর মাধ্যমেও শিল্প খাতের বিদ্যুতের যোগান হয়ে থাকে যা পিডিবির উৎপাদিত বিদ্যুতের বাইরে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় গ্রিড এখনো চাহিদা অুনযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না। বছরজুড়েই থাকছে লোডশেডিং। এমনকি শীতকালেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কবলে পড়তে হচ্ছে। অথচ কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অতিরিক্ত ৬০ শতাংশ বা এরও বেশি ব্যবহার করা যাচ্ছে না জ্বালানি ঘাটতির কারণে।
সরকার শুধু বিদ্যুৎ খাতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে এবং বহু ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার পরও বাংলাদেশ এখনও শিল্পে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দিতে পারছে না। এমনকি দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক কারখানগুলোতেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি।
তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। আর কৃষি খাতের কাজে জড়িত দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ।
ডেটা ও পরিসংখ্যান বিষয়ক অনলাইন প্রতিষ্ঠান ‘আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটা’ বলছে, জ্বালানি ব্যয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ সংঘাতে বিধ্বস্ত তিউনিসিয়া ও সিরিয়ার থেকেও নিচের তালিকায় রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন বলেন, নানামুখী সংকটের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশ। অর্থনীতিতে এখনও স্থিতিশীলতা আসেনি, জ্বালানি সরবরাহ দুর্বল এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও স্বস্তিদায়ক নয়।
“সমস্যাগুলো সবাই দেখতে পাচ্ছে। এজন্য জটিল বিশ্লেষণ লাগবে না। মানুষ কাজও পাচ্ছে না।”
কম উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ
আবাসন ও বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের ব্যবহার বছরের পর বছর বেড়েই চলেছে। অথচ এসব গ্রাহকদের বিদ্যুতের যোগান দিতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচির অধীনে এমন সব প্রত্যন্ত অঞ্চলে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ গেছে, যেখানে আগে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার হত।
বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হলেও জাতীয় গ্রিডের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসছে।
বর্তমানে আরও দুটি খাতে বিদ্যুৎ বিক্রি বেড়েছে- বিদ্যুৎচালিত গাড়ি ও বাণিজ্যিক খাত। এ দুই খাতে ব্যাপক বিদ্যুৎ চুরির অভিযোগও রয়েছে।
কোন খাতে কত ব্যবহার
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট উৎপাদিত প্রায় ৯১ হাজার ইউনিট বিদ্যুতের ২৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ শিল্প খাতে বিক্রি হয়েছে। ১৯৯৪ সালে ৬ হাজার ইউনিটের মধ্যে শিল্প খাতে এর অংশ ছিল ৪৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। ২০২৪ সালে শিল্পে এ হার ছিল ২৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) খাতভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য ১৯৯৪ সাল থেকে পাওয়া যায়।
সেই তালিকার তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে সব সংস্থা মিলে জাতীয় গ্রিড থেকে কৃষি খাতে মোট বিদ্যুতের ২ দশমিক ২২ শতাংশ বিক্রি করা হয়েছে। ১৯৯৪ সালে যা ছিল ৪.৩৭ শতাংশ।
তবে এ খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বছরভেদে কখনও কখনও অনেক ওঠানামা করেছে। কখনও ৬ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার হয়েছে, আবার কখনও ৩ শতাংশের নিচে নেমেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের উদ্যোগ ফলপ্রসূ না হওয়ার কারণেই এমনটি হয়েছে।
অপরদিকে পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, আবাসনে বিদ্যুৎ ব্যবহার ১৯৯৪ সালের ৩৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৫৭ দশমিক ১৩ শতাংশে বেড়েছে–অর্থাৎ প্রায় ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। ২০২৪ সালে যা ছিল মোট বিক্রির ৫৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের আরেক বড় খাত বাণিজ্যিকে ১৯৯৪ সালে বিদ্যুৎ গেছে ৯ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৮৩। এর মধ্যে সেবা খাত ও ক্ষুদ্র শিল্পও রয়েছে।
২০২২ সালে ইভি চার্জিং প্রথমবার সম্ভাবনাময় নতুন বিদ্যুৎ গ্রাহক হিসেবে আবির্ভূত হয়, যেখানে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ যায়। ২০২৫ সালে এ হার ১ শতাংশের বেশি হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে উৎপাদনশীল খাতে বিশেষ করে ভারী শিল্পে বিদ্যুতের ব্যবহার না বাড়াকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম।
কেননা শিল্পখাত বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বেশি মূল্য পরিশোধকারী গ্রাহক। এ কারণে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পিডিবি তার সবচেয়ে মূল্যবান এই গ্রাহকদের ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে বাড়তে থাকা উৎপাদন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাবে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল বলেন, “নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো দুরাশা। যদিও শিল্প এক মুহূর্তও বিদ্যুৎ ছাড়া চলতে পারে না।”