Published : 06 Jun 2026, 08:31 AM
দেশের আর্থিক খাত বর্তমানে ‘রূপান্তর পর্বের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্স এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কায়সার হামিদ।
তিনি বলেছেন, “দীর্ঘদিনের নানা দুর্বলতা গত কয়েক বছরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন ‘চিনওয়্যাগ উইথ দ্য চিফস’ এ দেশের আর্থিক খাতের পরিস্থিতি নিয়ে নিজের এ মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন কায়সার হামিদ।
আর এ পরিস্থিতির জন্য মোটাদাগে ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলার অভাব এবং উচ্চ খেলাপি ঋণকে দায়ী করেছেন তিনি।
তবে সঙ্কটের মধ্যেও সতর্ক ঋণ ব্যবস্থাপনা, আমানতের বৈচিত্র্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার কারণে বাংলাদেশ ফাইন্যান্স গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে বলেই কোম্পানির এমডির ভাষ্য।
তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে থেকেই তারা বড় ঋণ নির্ভরতা কমিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতে গুরুত্ব বাড়িয়েছেন। একই সঙ্গে বড় আমানতকারীর পরিবর্তে ছোট সঞ্চয়ভিত্তিক আমানত সংগ্রহে জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানের আমানতের বড় অংশই এখন স্থিতিশীল বা ‘স্টিকি ডিপোজিট’।
বর্তমানে ৯০ শতাংশের বেশি আমানত নবায়ন হচ্ছে, যা গ্রাহকদের আস্থার প্রতিফলন বলে মনে করেন কায়সার হামিদ।
জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান যে ৩০ শতাংশের মত, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও এ খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তার পর্যবেক্ষণ হল, বড় করপোরেট অর্থায়ন ও বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যাংক এবং ক্ষুদ্র ঋণে এনজিওগুলো কাজ করলেও উদীয়মান মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়ীদের অর্থায়নে একটি ‘শূন্যতা’ রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই জায়গায় বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং বাংলাদেশেও সেই সুযোগ রয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর সেবাদানের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের সিইও বলেন, প্রায় চার বছর আগে থেকেই তার কোম্পানি ডিজিটাল রূপান্তরের কাজ শুরু করে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকরা শাখায় না গিয়েও ঋণ ও আমানত সংক্রান্ত নানা সেবা নিতে পারছেন। ক্রেডিট মূল্যায়ন, ঋণ অনুমোদন, ঋণ ব্যবস্থাপনা, হিসাব খোলা এবং অন্যান্য গ্রাহকসেবা ডিজিটাল প্লাটফর্মে আনা হয়েছে।
কায়সার হামিদ বলেন, ফিনটেক, এগ্রিটেক ও এসএমইভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সংযোগের মাধ্যমে একটি সমন্বিত প্লাটফর্ম গড়ে তোলা হয়েছে। এর লক্ষ্য হল প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকদের জন্য অর্থায়ন সহজ করা এবং সেবা নেওয়ার খরচ কমানো।
তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী উদ্যোগে অর্থায়নের চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, কৃষি, পশুপালন, যানবাহন, মোবাইল ডিভাইস ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ডিজিটাল প্লাটফর্মভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ফলে অনেক কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সরাসরি শাখায় না গিয়েই ডিজিটাল মাধ্যমে ঋণ নিতে পারছেন।
ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতে শরিয়াহভিত্তিক সেবাদানের জন্য যে কোম্পানিগুলো প্রথম দিকে লাইসেন্স পেয়েছে, বাংলাদেশ ফাইন্যান্স তার একটি।
কায়সার হামিদ বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের সেবার চাহিদা রয়েছে। তার কোম্পানি ধীরে ধীরে শরিয়াহভিত্তিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে এবং ভবিষ্যতে পুরো ব্যবসাকে পর্যায়ক্রমে শরিয়াহভিত্তিক কাঠামোয় রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের এমডি বলেন, বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও বিনিয়োগের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেন। তবে বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের ঘাটতি এবং পুঁজিবাজারের দুর্বলতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

কায়সার হামিদ বলেন, দেশে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের কাছাকাছি হলেও বাংলাদেশ ফাইন্যান্স ধারাবাহিকভাবে তা ১০ শতাংশের নিচে রাখতে সক্ষম হয়েছে। গত পাঁচ বছরে বিতরণ করা প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে নতুন খেলাপি ঋণের হার ১ শতাংশেরও কম।
তিনি বলেন, ঋণ বিতরণের পর থেকেই নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং একটি ‘আর্লি অ্যালার্ট সিস্টেম’-এর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ আগেভাগে শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। খেলাপি হয়ে গেলে কোম্পানির নিজস্ব আইনি ও সম্পদ পুনরুদ্ধার টিম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
তারপরও ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফাইন্যান্স কেন লোকসান দিল, তার ব্যাখ্যায় কায়সার হামিদ বলেন, “এটি মূলত অতিরিক্ত প্রভিশনিংয়ের কারণে হয়েছে, অপারেশনাল লোকসানের কারণে নয়। বর্তমান তারল্য সংকটের সময়ে অভ্যন্তরীণ মূলধন শক্তিশালী করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।”
আগামী দিনের পরিকল্পনা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, কোম্পানির চারটি প্রধান অগ্রাধিকার হল—ঢাকার বাইরে প্রান্তিক অঞ্চলে পৌঁছানো, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর, প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
কায়সার হামিদের ভাষায়, “ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের মূল ভিত্তি হল আস্থা। সেই আস্থা অর্জন ও ধরে রাখাই আমাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।”