Published : 29 Jun 2026, 12:14 AM
মোবাইল ফোন এখন মানুষের কাছে নিত্যপণ্য; যে কারণে অর্থনীতিতে মন্দার মধ্যেও এ খাতে প্রবৃদ্ধি কমেনি বলে মনে করেন শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি জেনারেল ম্যানেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী।
মূল্যস্ফীতির এ দুঃসময়ে চাহিদা যেমন বাড়ছে, তেমনি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা আস্তে আস্তে একটু বেশি দামের ফোনের দিকে ঝুঁকছে বলে বাংলাদেশের বাজার নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
স্মার্টফোনের আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছেন, বৈশ্বিকভাবে মোবাইল ফোন তৈরিতে প্রয়োজনীয় মেমোরি চিপের দাম বাড়ায় সামনের দিনগুলোতে স্মার্টফোনের দাম আরও বাড়তে পারে। একইসঙ্গে কর কাঠামোর কারণে বাজারে বেশি দামি ফোনের সরবরাহে টান পড়তে পারে।
চীনের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনকারী শাওমির বাংলাদেশপ্রধান জিয়াউদ্দিন চৌধুরী এসব নিয়ে কথা বলছিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকের নিয়মিত আয়োজন ‘চিনওয়্যাগ উইথ দ্য চিফস’ এ।
ইরান যুদ্ধসহ নানা কারণে বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনীতিতে অস্থিরতার এ সময়ে স্মার্টফোনসহ প্রযুক্তিপণ্যের বাজারে লাগা দোলাচল, দাম বাড়তে থাকার গণঅভিযোগ, শাওমির গৃহসরঞ্জাম বাজারে প্রবেশে এবং ব্র্যান্ডটির নতুন প্রযুক্তির যান ও উদ্ভাবন নিয়ে আলাপচারিতা করেছেন তিনি।
এ আলোচনা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে সম্প্রচার করা হয়।

শিগগির বাংলাদেশের বাজারে শাওমির গাড়িসহ সবরকমের গৃহস্থালী পণ্যের সহজপ্রাপ্তির কথাও বলেন জিয়াউদ্দীন চৌধুরী। দেশের বাজারে মোবাইল ফোন থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য চালকবিহীন গাড়ি আনার নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন তিনি।
ডলারের দর, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের মত সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু বিষয় স্থিতিশীল থাকাকে মোবাইল ফোন খাতের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি। বলেন, “একটা পরিবর্তন আমরা দেখতে পাই সেটা হচ্ছে স্মার্টফোনে আস্তে আস্তে একটু মানুষ ওপরের দিকে যাচ্ছে। যেমন আগে হয়তবা যে পাঁচ হাজার বা ১০ হাজার টাকার ফোন কিনত, এখন তিনি ১৫ হাজার টাকার ওপরের ফোন কিনছেন।
“এখন বাংলাদেশের বাজারের মোর দেন ফিফটি পার্সেন্ট ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজারের ফোন, ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজারের ২০-২৫ পার্সেন্টের মত আর ৩০ হাজারের ওপরে আগে ছিল ১-২ পার্সেন্ট, এখন সেটা বাড়তে বাড়তে ৫-৬ পার্সেন্টের মত হচ্ছে। এটা একটা ধারণা দেয় যে আসলে মানুষের একটা শ্রেণির হয়তোবা ডিসপোজেবল ইনকাম বাড়ছে অথবা তার ইন্টেন্ট টু বাই স্মার্টফোন এখন আসলে বাড়ছে।”
প্রস্তাবিত বাজেটে কাঁচামালের শুল্ক হ্রাস ও ভ্যাট অব্যাহতির মত সুবিধাগুলো স্থানীয় উৎপাদন ও ফোনের দামে কতটা প্রভাব ফেলবে এমন এক প্রশ্নের জবাবে জিয়াউদ্দীন চৌধুরী বলেন, “এই বছরের বাজেটে আমরা যেটা দেখেছি যে যেসব নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে অথবা যেসব নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে, তা মূলত পাঁচ বছর মেয়াদী দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। এই পাঁচ বছরের যে একটা লং টার্ম আমাদের ভিজিবিলিটি দেওয়া হয়েছে, এইটা আসলে অনেক সিকিউরিটি দেবে আমাদের।
“এগুলো ছাড়াও এই যে অব্যাহতিটা থাকছে অথবা ভ্যাট হ্রাস হয়েছে, সেটার চেয়ে আমার পাঁচ বছরে আমাকে সিকিউরিটি দেবে, এটি আমাকে পাঁচ বছর মেয়াদী একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরিতে সাহায্য করবে। তখন আমি আসলে বুঝতে পারব যে আমি এই সেগমেন্টে প্রোডাক্ট বানাব না কি ওই সেগমেন্টের প্রোডাক্ট বানাব। এইভাবে আমি বিনিয়োগের মাধ্যমে আমি আমার দরটাকে আসলে কমিয়ে রাখতে পারব। সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাকে আমি অবশ্যই স্বাগত জানাই এবং আমার মতে এগুলো অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রেক্ষাপটনির্ভর।”
মধ্যম ও কম দামের ফোন দেশে উৎপাদন করলেও বেশি দামি ফোনগুলো আমদানি করার তথ্য দিয়ে জিয়াউদ্দীন চৌধুরী বলেন, ৩০ হাজার অথবা ৪০ হাজার টাকার ওপরে বাংলাদেশের বাজারের আকারই হচ্ছে ১ বা ২ শতাংশ। যেহেতু বেশি দামের ফোনে অনেক বিনিয়োগ করতে হয় কিন্তু বাজার ছোট সে কারণে তারা তিনি একটি মিশ্র পদ্ধতি অনুসরণ করছেন।
আমদানিকে নিরুৎসাহিত করার সরকারি নীতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, হ্যান্ডসেট আমদানির শুল্কছাড় নবায়ন করা না হলে বাজারে দামি ফোনের সংকট দেখা দিতে পারে।
“এই জানুয়ারিতে যখন ট্যাক্সটা কমেছিল তখন আমরা কিছু কিছু আমদানি করে আনতাম। একটু হাইএন্ডের ফোন আমরা আমদানি করেছি। যেটা আসলে ৫০ হাজার টাকার নিচে যেটা আমার কমার্শিয়ালি ভায়াবল হচ্ছে সেটা আমরা লোকাল ম্যানুফ্যাকচারিং করেছি। এখন (শুল্কছাড় না থাকলে) ইফেক্টিভলি যেটা হবে হয়তোবা আমরা ওটা (আমদানি) করতে পারব না। অথবা আমাদের চেষ্টা করতে হবে যেকোন সমাধান পাওয়া যায় কি না স্থানীয়ভাবে এটা বানানোর জন্য। আমার কাছে মনে হয় যে ইমিডিয়েটলি একটা ইমপ্যাক্ট আসবে কেউ যদি একটা অফিশিয়াল ভালো দামি ফোন কিনতে চায়, আমার ধারণা সেটা দাম বাড়ার চেয়েও বাজারে পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করবে।”
কম দামে সেরা স্পেসিফিকেশনের ফোনের কারণে এক সময় শাওমির পরিচয় ছিল ‘বাজেট কিং’। কিন্তু সম্প্রতি মিডরেঞ্জ ও ফ্ল্যাগশিপে মনোযোগ বাড়ানোয় হ্যান্ডসেটের দামও বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে জিয়াউদ্দীন চৌধুরী বলছেন, “আমরা টেকনোলজিটাকে আসলে পৌঁছে দিতে চাই সবার কাছে। আপনি যদি পাঁচ বছর আগে চিন্তা করেন, মানুষ হয়তো একটা স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসরসহ ফোন নেওয়ার কথা ভাবত। বিফোর ফাইভ ইয়ার্স পিপল ইউজ টু থিংক অ্যাবাউট আই উইল হ্যাভ আ স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসর। কিন্তু এখন ওই স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসর মানুষ প্রত্যাশা করে না, এটা এখন কাজ করবে না। তাই এখন আমরা ফ্ল্যাগশিপ অভিজ্ঞতার গণতন্ত্রায়ন করতে চাই। আমরা ১০০ ওয়াট চার্জার আনছি, এফএইচডি ডিসপ্লে আনছি খুব কম দামে। আমরা কার্ভড ডিসপ্লে এনেছি খুব কম অ্যাফোর্ডেবল প্রাইসে। আমরা লাইকা ক্যামেরা ফোন এনেছি ৮০ হাজার টাকায়।

“আরেকটা বিষয় আপনি যেটা বলছেন যে দাম এখন আসলে বেড়েছে। এই দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে আমাদের সারা পৃথিবীতেই মেমোরি রিলেটেড সমস্ত প্রোডাক্টের দাম বেড়েছে। আমি একটু ব্যাখ্যা করতে চাই। কারণ আমরা আসলে পুরো ব্লেমটা নিই যে মোবাইল ফোনের দাম বেড়েছে। বিষয়টা হচ্ছে পৃথিবীতে আসলে মেমোরি বানায় দুই থেকে তিনটা কোম্পানি। আমরা সবাই এদের কাছ থেকে কিনি। এখন এআই কোম্পানিগুলোর কাছে মেমোরি প্রডাক্টের হিউজ ডিমান্ড। এবং দে হ্যাভ আ হিউজ পকেট। আমি যখন স্মার্টফোন একটা বিক্রি করি এরপর কিন্তু ওখান থেকে আমার কোনো আয় নেই। কিন্তু একটা এআই কোম্পানি যখন একটা সাবস্ক্রিপশন বিক্রি করে, একটা প্রোডাক্ট বিক্রি করে তখন থেকে তার আয় শুরু হয়।
“এই কারণে এআই কোম্পানিগুলো মেমোরি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোকে বলা যায় ব্ল্যাংক চেক দিচ্ছে। আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আমরা যে এলপিডিডিআর র্যাম-রম ব্যবহার করি, সেগুলো এআইতে তারা ব্যবহার করে না। তাদের যে মেমোরি লাগে সেগুলোকে বলে এইচবিএম মেমোরি।”
জিয়াউদ্দীন চৌধুরীর ভাষ্য, তাই এখন মেমোরি কোম্পানিগুলো শুধু উচ্চ মূল্যের এইচবিএম মেমোরি তৈরির দিকে ঝুঁকেছে। মোবাইল উৎপাদনকারীদেরও তাই বেশি দামেই উচ্চমূল্যের ওসব মেমোরি চিপ কিনতে হচ্ছে। যার কারণে উৎপাদন পর্যায়েই খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “একটা ৪ জিবির ফোন যেটা আমি এ বছরের শুরুতে হয়তোবা ১০ হাজার টাকা করে বিক্রি করতাম, ওইটাতে আমার মেমোরি কস্ট ছিল অ্যারাউন্ড ১৫ থেকে ২০ পার্সেন্ট- ম্যাক্সিমাম। এই জেনারেশনে আমি যে ফোনটা বানাব ওইটার মেমোরি কস্ট অলরেডি ৪০ পার্সেন্টে পৌঁছেছে (মোট উৎপাদন খরচের)। এবং আমরা ধারণা করছি যে, এই মেমোরি খরচ শেষ পর্যন্ত ৮০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে।”
শাওমির গাড়ি ও গৃহস্থালী পণ্য
সাম্প্রতিক সময়ে শাওমি বাংলাদেশ বিভিন্ন গৃহস্থালী (হোম অ্যাপ্লায়েন্স) পণ্য বাজারে নিয়ে এসেছে।
এ বিষয়ে জিয়াউদ্দীন চৌধুরী বলছেন, “আমরা টেলিভিশন এনেছি, এই টিভি বিক্রিও প্রায় শেষ। ওয়াশিং মেশিনসহ আরও পণ্য নিয়ে এসেছি। এখন আমরা শুধু হোম অ্যাপ্লায়েন্সস বিক্রি করতে চাই না। আমরা একটা স্মার্ট হোম দিতে চাই। এরপর আমরা গাড়িও দিতে চাই।
“এটা আমার ব্যক্তিগত স্বপ্ন, একসময় আমরা এমন একটি আনতে গাড়ি চাই যেখানে কোনো চালকের প্রয়োজন হবে না। আমাদের শাওমি ফোনই আপনার গাড়ি চালাতে সাহায্য করবে।"