Published : 05 Dec 2025, 11:07 PM
দর বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে ‘কারণ দর্শাও’ নোটিস ও বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ পাওয়া ব্যবসায়ীরা নতুন দরে বোতলের সয়াবিন তেল বাজারে ছেড়েছেন, যেখানে প্রতিটি বোতলের গায়ে প্রিন্ট করা দর লেখা রয়েছে।
শুক্রবার ঢাকার মহাখালী কাঁচবাজারে পুরনো দরের সঙ্গে নতুন দরের সয়াবিন তেলের বোতলও পাওয়া যায়।
গ্রাহকদের ‘পছন্দ’ অনুযায়ী নতুন ও পুরনো দরে সয়াবিন তেল নেওয়ার সুযোগ রাখার কথা বলেছেন এই বাজারের রাজিব জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী রাজিব হোসেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পুরনো দরের সব তেল আছে। যে নতুনটা নেবে তার জন্য নতুন রেট, পুরনোটা নিলে আগের রেটই। আমরা তো কাস্টমারের লগে ক্যাচাল করতে পারবো না-তাই দুইটাই রাখছি।”

আগের দর অনুযায়ী প্রতি লিটার বোতলের সায়বিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৮৯ টাকা। এখন ৯ টাকা বাড়িয়ে ১৯৮ টাকা দরে বাজারে ছাড়া হয়েছে।
প্রতি পাঁচ লিটারের বোতলের দর ৯২২ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৬৫ টাকা।
দুই লিটারের বোতলে ৮ টাকা বাড়িয়ে ৩৯৬ টাকা দর ঠিক করা হয়েছে।
একই বাজারের শাহরিয়ার ভ্যারাইটিজ স্টোরের কর্মী মাসুদ রানা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা কি করুম। কারণ নাই, জানা নাই-হঠাৎ বাড়াইলো তেলের দাম। এহন বেশি দামে আনলে তো বেশি দামেই বিক্রি করা লাগবে।”
সরকারের অনুমোদন ছাড়াই ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া ব্যবসায়ীদের ‘কারণ দর্শাও’ নোটিস দিয়ে বৈঠকে বসার আমন্ত্রণ জানানোর কথা আগের দিন সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফার্ম গেইটের খামার বাড়িতে বস্ত্র অধিদপ্তরের উদ্যোগে ‘জাতীয় বস্ত্র দিবস’ উদযাপনে আয়োজিত কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, “ব্যবসায়ীরা আমাদের সঙ্গে কথা বলেননি। আমরা তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করেছি। একই সাথে, আমরা তাদের একটি সভায় আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছি।”
গত ১৪ অক্টোবর ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন।
বোতলের সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ছয় টাকা এবং খোলা তেল আট টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা আসে। তার এক দিন আগে খুচরা বাজারে বোতলের সয়াবিন তেলের দাম ১৮৯ থেকে বেড়ে ১৯৮ টাকা হয়ে যায়। খোলা তেলের লিটারে বাড়ে ৫ টাকা।
কিন্তু সরকারের তরফে সেই সিদ্ধান্তে সায় মেলেনি। সরকারকে না জানিয়েই আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়েছে বলে দাবি করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

দেশি পেঁয়াজের ঝাঁজ আরও বেড়েছে
মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠলেও পুরনো দেশি পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়।
ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন বাজারের দৈনিক নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দর প্রকাশ করে রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)।
সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দেশি পেয়াঁজ প্রতি কেজি ১২০-১৪০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
মহাখালী কাঁচাবাজারে পেঁয়াজ কিনতে আসা ইদ্রিস আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পেঁয়াজের প্যাচ যে কবে খুলবে কে জানে। ৭০-৮০ টাকা থাকার কথা পেঁয়াজের দাম। শীত আসলেও দাম কমছে না, উল্টো এক কেজিতে ১০ টাকা বাড়লো। আমাদের উপায় নাই, বেশি দামেই কিনতে হবে।”
সবজির দামে পরিবর্তন নেই
অন্যদিকে শীত মৌসুমের সবজির সরবরাহ বাড়লেও আগের সপ্তাহের চেয়ে দামের খুব একটা পার্থক্য নেই। ঢাকার কাঁচাবাজারগুলোতে দু’একটি পণ্যে সামান্য কমলেও বেশিরভাগ সবজি বিক্রি হচ্ছে আগের দরে।
অবশ্য এ সপ্তাহে নানা রকমের শাকের সরবরাহ বেড়েছে বাজারে।
শুক্রবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শনির আখাড়া, রামপুরা ও মহাখালী কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাছ ও মাংসের দামেও কোনো হেরফের হয়নি।
মহাখালী কাঁচাবাজারের বিক্রেতা মোহাম্মদ রহিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দাম তো বেশি না ভাই। বিচিওয়ালা শিম এখন ৮০ টাকা কেজি। গোল বেগুন ১০০ টাকা আর ফুলকপি ৪০ টাকায় বিক্রি করছি।’’
আগের সপ্তাহেও একই দরে বিক্রি হয় এ তিন সবজি। রাজধানীর আরেক বাজার রামপুরায় শীতকালীন দেশি টক টমেটো আগের সপ্তাহের ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন আলামাছ মিয়া।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বিচিছাড়া শিম ৬০ টাকায় বিক্রি করছি।”

রঙিন শাক
শীতের মৌসুমে পালং, মুলা, মিষ্টি কুমড়া, ডাটা, লাউ ও লাল শাকের সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে। রঙিন এসব শাক বিক্রি হচ্ছে আঁটি আকারে। দামের সঙ্গে আঁটির আকার ছোট-বড় হয়।
সারা বছরই কম-বেশি শাক বিক্রি হলেও শীতকালে শাকের সরবরাহ বেড়ে যায় তুলে ধরে বিক্রেতা মোহাম্মদ সালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এক আঁটি লালশাক ২০ টাকা, মিষ্টি কুমড়ার শাক ৪০-৩৫ টাকা।
মহাখালী কাঁচাবাজারে পালং শাক এক আঁটি ৩০ টাকায় বিক্রির তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে লাল ও মিষ্টি কুমড়ার শাক।
পাশাপাশি মুলা ও কচু শাকও বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা দরে।
ধনে পাতার দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় কেজি প্রতি ৩০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।
পশ্চিম রামপুরা কাঁচাবাজারের বিক্রেতা হাসান আলী বলেন, প্রতি কেজি ধনে পাতা বিক্রি করছেন ১২০-১৩০ টাকায়। হাইব্রিড ও দেশিয় উভয় জাতের ধনে পাতার সরবরাহ বেড়েছে ঢাকার বাজারগুলোতে।
আগের সপ্তাহে ধনে পাতা বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ১৪০-১৬০ টাকা দরে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে প্রতি কেজি গোল বেগুন ১০০ টাকায় বিক্রির তথ্য দিয়েছেন বিক্রেতা জসিম উদ্দিন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শীতকালে লেবু কম উঠে। কাগজি লেবু এক হালি ৪০ টাকা, আর বিচি ছাড়া চাষের লেবু ৩০ টাকা হালি বিক্রি করছেন তিনি।
লম্বা বেগুনও এ সপ্তাহে আগের মতো ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এ বাজারে। আর গোল বেগুনের দরে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
অন্যান্য বাজারের মত যাত্রাবাড়ীতেও কাঁচা মরিচ কেজিতে ৩০-৪০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা দরে।
রামপুরায় পটল ৬০ টাকা, নতুন আলু ১০০ টাকা, পেঁপে ৩০ টাকা ও করলা ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মহাখালী কাঁচাবাজারে চিচিঙ্গা পাওয়া যাচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে।
পটল, পেঁপে ও চিচিঙ্গার দরে কোনো পরিবর্তন হয়নি। নতুন আলু আগের সপ্তাহে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। অবশ্য পুরাতন আলুর দর এখনো কেজিপ্রতি ২০ টাকা।

বড় তেলাপিয়ার দাম বেড়েছে
মহাখালী কাঁচাবাজারে এক কেজি ওজনের রুই ৩৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রির তথ্য দিয়েছে বিক্রেতা আসলাম আলী।
তবে তিনি বলেন, বড় আকারের তেলাপিয়ার দাম একটু বেড়েছে। এক কেজি ওজনের তেলাপিয়া কেজিপ্রতি ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এক সপ্তাহ আগেও তেলাপিয়া ১৩০ টাকা থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
এ বাজারে সুরমা মাছ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩৫০ টাকা দরে। ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হয় এক হাজার টাকা কেজি দরে, আগের সপ্তাহে এই আকারের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৮০০ টাকা দরে।
ইয়াসিন আলী নামে এক ক্রেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মাছটা পছন্দ হওয়ায় কিনলাম। বাসায় মেহমান আসছে, তাই একটু বেশি দাম হলেও ইলিশ নিলাম।”
এক কেজি সরপুটি ২৫০ টাকা ও পাঙ্গাস মাছ বিক্রি হচ্ছে আগের দর ১৮০ টাকায়। অন্যদিকে যাত্রাবাড়ীতে চাষের কই মাছ ২০০ টাকা ও রুই মাছ ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন মোহাম্মদ হাসান। আগের সপ্তাহেও রুই ও কই মাছের এই দরে বিক্রি হয়েছে।
প্রতি কেজি চাষের পাবদা বিক্রি হচ্ছে আগের দরে ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকায়।
যাত্রাবাড়ীতে সোনালী জাতের মুরগি ২৮০ টাকা কেজি ও ব্রয়লার ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়ার তথ্য দিয়েছেন বিক্রেতা জসিম উদ্দিন। আগের সপ্তাহে সোনালী জাতের মুরগি ২৯০ টাকা দরে বিক্রি হলেও ব্রয়লারের দরে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
আগের সপ্তাহের তুলনায় আরো কমেছে খামারের ডিমের দাম। প্রতি হালি ডিম ৪০ টাকায় বিক্রি হয় ঢাকার বিভিন্ন বাজারে।
মহাখালী কাঁচাবাজারের ডিম বিক্রেতা মোহাম্মদ লিটন বলেন, এক ডজন ডিম ১২০ টাকা।
আগের সপ্তাহেও এক হালি ডিম ৪২ টাকা, আর এক ডজন ১২৫ টাকা বিক্রি হয়েছে।