বাউল নিপীড়ন করে কি সাংস্কৃতিক বিপ্লব হয়?

জয়ন্তসাহা
Published : 20 May 2020, 07:01 AM
Updated : 20 May 2020, 07:01 AM

চর রামনগর গ্রামের ২৮ জন বাউলের কথা কি কারও মনে আছে?  অথবা যশোরের ডুমদিয়া গ্রামের বাউল মুক্তার হোসেনের কথা? মনে পড়ছে না তো? তাদের কথা তো আমরা বেমালুম ভুলে গিয়েছি।

বাউল গান গাওয়ার অপরাধে  চুল-দাড়ি কেটে মসজিদে নিয়ে তওবা করানো হয়েছিল, মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য রাজনৈতিক চাপে মামলা তুলে নিতে হয়েছিল। ডেরায় বসে গান বাধার কালে মুক্তার হোসেনকে বোমায় উড়িয়ে দেওয়ার কথা… মনে পড়ে?

মনে পড়ে না! আমরা ভুলে যাব এমনি করে লালন সাঁইজি, শাহ আবদুল করিম আর রণেশ ঠাকুরের কথাও।  বাংলার একতারা, ঢোল,সারিন্দার কথা মনে করেই বা কী হবে?

পারস্যের সুফি মতবাদ থেকে উপজাত হয়ে মধ্যযুগে বাংলায় ঢুকে পড়ে আধ্যাত্মবাদী সংগীত চর্চা।  ভারত উপমহাদেশে এসে বৌদ্ধ সাধনার সঙ্গে যোগ ঘটে সেই মরমি ভাব সাধনার।  যুগে যুগে নানা ধারা-উপধারায় সমৃদ্ধ হয়ে বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হল সংগীতের নতুন ধারা বাউল সংগীত।

সেই বাউল সংগীতকে যুগে যুগে সমৃদ্ধ করেছেন  লালন  ফকির লালন শাহ, পুঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ , কামাল উদ্দিন, রশিদ উদ্দিন, শাহ ইব্রাহীম মাস্তান বকশ, শাহ আবদুল করিম আরও কত জনে!

বাউল গানকে 'ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ'-এর তালিকাভুক্ত করেছে নিয়েছে ইউনেস্কো। বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ যে বাউল গান আমাদের গর্বের হতো ভীষণ, সেই বাউল গানকে আমরা কি যত্নে রেখেছি?

যুগে যুগে ধর্মের সঙ্গে বিভেদ রচনা করেছেন ধর্মান্ধরা। ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থাকা হায়েনারা বাউল গানকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছেন ধর্মের ধোয়া তুলে।দাদা-ঠাকুমার কাছে শোনা গল্পে পূজনীয় বাউলরা এখন নিগৃহীত।

বাউলদের চুল-দাড়ি কেটে, হারমোনিয়াম-ঢোলক পুড়িয়ে অথবা বোমা ছুঁড়ে অশেষ নেকি হাসিলের বিরাট স্বপ্নে বিভোর ঐসব ধর্মান্ধদের পেলেপুষে বড় করে এ সমাজ, এ রাষ্ট্র। একাত্তরের ধর্মান্ধরা খেয়েপরে এতদিনে বিশালাকার দানোতে পরিণত হয়েছে। বাহাত্তর থেকে কোভিড-১৯ মহামারীকালে ওদের আস্ফালন বেড়েছে বৈ কমেনি।

হাজার বছরের আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা বলি, লিখিও কালেভদ্রে।  কিন্তু সেই ঐতিহ্যের ছিঁটেফোটাও এখন রয়েছে কোথাও? কেবল গান গাইলে, নাচলে বা কবিতা পাঠ করলেই কি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে লালন করা হয়?

বাঙালির অন্তর হতে ক্রমেই মুছে ফেলা হচ্ছে বাঙালিয়ানা। ঐতিহ্যের সব লোপাট করে দেওয়া হচ্ছে রাতারাতি।  গান শেখার টোল, ক্লাস কবে বন্ধ হয়ে গেছে!

স্কুলগুলোতে বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বদলে এখন  ধর্মান্ধের অনুগত দাসানুদাসেরা ইবাদত, বন্দেগি অথবা পূজা পার্বণের নাম করে হরিলুটের আসর বসায়। কে কার চেয়ে বেশি পরহেজগার, বেদে কার বেশি পান্ডিত্য- ওসবে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে।

আল্লাহ, খোদা আর ভগবানকে ডাকার হাজারো রকমের তরিকা। যে যার মতো করে তরিকা বাতলে দেয়। পরকালের ঐকান্তিক ভোগবিলাসে উন্মত্ত জনতা সহস্র কোটি টাকার বিনিময়ে লুফে নেয় সেসব তরিকা।

অথচ আমাদের বাউলরা শরীয়ত-মারফতের কথাও বলেন, দেহতত্ত্বের সুলোক সন্ধান করেন। স্রষ্টার সঙ্গে অন্তরঙ্গ ভাব বিনিময়ে স্বর্গ ও মর্ত্যের মৈত্রী স্থাপন করেন। সে মৈত্রীর বাঁধন শক্ত হলেই না পরে খোদা সাড়া দেন।তখন তারে চাইলেই পাওয়া যায়।

বাউলরা কখনো কোরআন আর বেদের তফাৎ করেন না। তারা বলে যান, যিনি খোদা, তিনিই পরমেশ্বর। মানুষ ভজ, মানুষ চিন্ত, মানুষ করো সাধন হে- বাউলরা যে মানবধর্মের কথা বলে যান, তা কতজনে বুঝি?

ধর্মান্ধদের ভয়, প্রান্তিকের পথে পথে বাউলরা অমন সাধন-ভজনে যদি মানুষকে পথের দিশা দেন, তবে ওদের এত বছরের ফন্দিফিকিরের হবেটা কী?

আশ্চর্য হই রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা দেখে। ধর্মাদ্ধদের কাছে নতজানু হয়ে সরকার শরীয়ত, রিতাদের জেলে পুরে রাখে। বাউলের ঘর পুড়ানো মামলার নথি গায়েব হয়। বাউলদের চুল-দাড়ি কেটে যখন বিজয়োৎসব করে ধর্মাদ্ধরা, সরকারও তখনও চুপ করে সায় দিয়ে যায়।

বাউল সাধকদের চোখের জল মাটিতে গড়ায়, তা পরে শুকিয়ে যায়।

গুলশানের হলি আর্টিজান ট্র্যাজেডির পরে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ধোঁয়া তুলেছিলো সরকার। বিপথগামিতা রুখতে তরুণ মনে সাংস্কৃতিক জাগরণের নিমিত্তে পদক্ষেপও নেয় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। কী করলো? বিশাল অঙ্কের টাকা লগ্নি করলো হারমোনিয়াম,  তবলা কিনতে। সেগুলো পাঠানো হল স্কুল-কলেজে।

যে স্কুলে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় না, কো-এডুকেশন হলে গোনাহগার হবে বলে খুদেদের রীতিমতো পাকিস্তানি ভাবধারায় বড় করা হয়, যে স্কুলগুলো মালাউন-কাফের গালিটাও শিখিয়ে দেয়, সেখানে হুট করে সাংস্কৃতিক জাগরণ হবে কেমন করে?

হারমোনিয়াম, তবলা দেওয়ার পর খোঁজা শুরু হলো দলীয় লোক কোথায় পাওয়া যায় যারা একটু একটু গান পারে? বাজাতে পারে?

পরে জানা গেলো, সাংস্কৃতিক জাগরণের বিশাল প্রকল্প ডাহা ফেইল করেছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সংস্কৃতির সরকারি পাহারাদারেরা ফুলে-ফেঁপে বড় হয়। এসব নিয়ে বাগবিতণ্ডা করলে হুমকিও দেওয়া হয়। বিরোধী মত গ্রাহ্য করা হবে না।

সংস্কৃতির সরকারি পাহারাদারেরা কালেভদ্রে বাউল উৎসব করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে। তাতেই ওরা নিজেদের বিশালাকার সংস্কৃতিসেবী দাবি করে। নামের পাশে একদিন লেগে যায় সংস্কৃতিজন। কিন্তু বাউলদের দিনমান উন্নয়নে, বাউল সংগীতের বিস্তৃতিতে, বাউল ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠায় নজর রাখার বিষয়ে প্রশ্ন তুললে তারা নীরব।

লালন সাঁইজির সমাধিস্থলে নির্মাণ করা হল লালন কমপ্লেক্স। গোটা কমপ্লেক্স নির্মাণে সমালোচনার তোয়াক্কা করেনি সরকার। করবেই বা কেন?  ক্ষমতাসীনদের বোঝানো হয়েছে ব্যবসার আদ্যোপান্ত। ব্যবসার সুযোগ থাকলে সেটা কেই বা ছাড়তে চায়?

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের আয়োজন। শত শত বাউল শিল্পীকে ধরে আনা হল শিল্পকলা একাডেমিতে। অন্যের রচিত আর সুরারোপ করা গানে গাইতে বাধ্য হলেন বাউলরা। কেন বাধ্য হলেন বাউলরা?  বাউলরা কি কম ভালোবাসেন বঙ্গবন্ধুকে? বঙ্গবন্ধু জীবদ্দশাতেই যাদের অন্ন সংস্থানের ভার নিয়েছিলেন, সেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তারা মনের আনন্দেই তো গাইবেন। বাউলদের তাদের ঘরানা থেকে বের করে এনে ওয়েস্টার্ন ফিউশনের এক্সপেরিমেন্ট করার কী মানে থাকতে পারে তা জানা গেল না।

বাউলরা কপিরাইট আইন কি তা জানেন না। তাই তাদের গান দেদারসে বাজাচ্ছে যত্রতত্র।  যে শিল্পীকে তার শিল্পমূল্য দিতে শিখিনি আমরা, সে শিল্পী কেন গান ধরে রাখবে? ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য তাকেও যে ভিন্ন পন্থা বেছে নিতেই হবে। বাউলরা গান ছেড়ে কৃষিতে চলে যাচ্ছেন। সুনামগঞ্জের হাওরে তাদের মাতম শোনা যায় কান পাতলেই।

কদিন আগে  সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে, মহামারীকালে কর্মহীন হয়ে পড়া অস্বচ্ছল শিল্পীদের তালিকা প্রণয়ন করে এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান করার কথা বলে শুরুতে।

তারপর খবর আসে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার আবর্তে সে অনুদানটি ঈদের আগে পাচ্ছেন না অসহায় শিল্পীরা। তাদের বলা হল, যাদের অনুদানের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে, অনুদান প্রাপ্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হবে।

প্রান্তিকে বসবাস করা বাংলার নিভৃতচারী শিল্পীদের অধিকাংশ জানে না ইন্টারনেট আদতে কী? জাতীয়ভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে তালিকা চূড়ান্ত করার পরে ফের কেন আবেদন করার কথা বলা হলো? তবে কি জাতীয়ভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উপর আস্থা হারিয়েছে মন্ত্রণালয়? প্রান্তিকের বাউল, বাদকদের সঙ্গে এ কেমন রসিকতা?

একতারা, ডুগডুগি,দোতারা, সারিন্দা, বাঁশির ফসিলের হারিয়ে যাওয়ার দিনে এ দেশে সাংস্কৃতিক বিপ্লব, জাগরণ, ঐতিহ্য এসব এখন বড় 'বাকোয়াজ' লাগে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক