Published : 18 Aug 2022, 01:08 PM
উত্তরায় বিআরটি প্রকল্পের যে ক্রেইনটি ভারসাম্য হারিয়ে গার্ডারের চাপায় এক পরিবারের পাঁচজনের প্রাণ গেছে, সেটি চালাচ্ছিলেন চালকের সহকারী, এ কাজের কোনো প্রশিক্ষণ তার নেই।
আর চালক সে সময় বাইরে থেকে তাকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন, তারও ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্স নেই বলে জানিয়েছে র্যাব।
দুদিন আগের ওই ঘটনায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করার পর বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি বলেন, বিআরটি প্রকল্পের ঠিকাদার চায়না গ্যাঝুবা গ্রুপ করপোরেশন (সিজিজিসি) ভারী যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করে ইফসকন নামের একটি দেশীয় কোম্পানি থেকে। ইফসকনের কাছে বড় ক্রেন না থাকায় সেদিন বিল্ড ট্রেড কোম্পানির কাছ থেকে ওই ক্রেইনটি ভাড়া নিয়েছিল।
গ্রেপ্তার ১০ জন হলেন- ক্রেইন অপারেটর আল আমিন হোসেন হৃদয় (২৫), তার হেলপার রাকিব হোসেন (২৩), দুর্ঘটনাস্থলে নিরপাত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ফোর ব্রাদার্স গার্ড সার্ভিসের ট্রাফিক ম্যান মো. রুবেল (২৮), আফরোজ মিয়া (৫০), ঠিকাদার কোম্পানির সেইফটি ইঞ্জিনিয়ার জুলফিকার আলী শাহ (৩৯), হেভি ইকুইপমেন্ট সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত ইফসকন বাংলাদেশ লিমিটেডের মালিক ইফতেখার হোসেন (৩৯), হেড অব অপারেশনস আজহারুল ইসলাম মিঠু (৪৫), ক্রেন সরবরাহকারী বিল্ড ট্রেড কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার তোফাজ্জল হোসেন তুষার (৪২), প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুহুল আমিন মৃধা (৩৩) ও মঞ্জুরুল ইসলাম (২৯)।
রাজধানীর জুরাইন, যাত্রাবাড়ী, কালশি, সাভার এবং গাজীপুর, সিরাজগঞ্জ ও বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে র্যাব।
গার্ডার সরাতে ৩ ঘণ্টা: ‘অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাড়ির ভেতর মরতে দেখলাম’
গার্ডার পড়ে নিহত রুবেলের নাম বিভ্রাট, কয়েক স্ত্রী মর্গে
গার্ডার দুর্ঘটনা: ‘দুপুরে যাদের মিষ্টি হাতে দেখলাম সন্ধ্যায় শুনি তারা নেই’
কমান্ডার আল মঈন বলেন, ওই ক্রেইনের মূল অপারেটর আল আমিন। তার হালকা গাড়ি চালানোর অনুমোদন থাকলেও ভারী গাড়ী চালানোর লাইসেন্স নেই।
“২০১৬ সালে ক্রেইন চালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে ২-৩টি নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করার পর চলতি বছরের মে মাসে বিআরটি প্রকল্পে ক্রেইন অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করে সে। আর হেলপার রাকিব তিন মাস আগে ওই প্রকল্পের ক্রেইন হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করে। তার ক্রেন চালানোর কোনো প্রশিক্ষণ নেই।”
ঢাকা-ময়মনিসংহ মহাসড়কের উত্তরা অংশে জসীম উদ্দীন রোডের মাথায় প্যারাডাইস টাওয়ারের সামনে সোমবার বিকালে বিআরটি প্রকল্পের একটি বক্সগার্ডার ট্রেইলারে তোলার সময় ভারসাম্য হারায় ক্রেইন। বিপুল ওজনের কংক্রিটের গার্ডারটি টঙ্গীমুখী সড়কে চলমান একটি প্রাইভেট কারের ওপর পড়ে।
ভারী ওই গার্ডারের চাপে মুহূর্তের মধ্যে চ্যাপ্ট হয়ে যায় গাড়িটি। ততে গাড়ির ভেতরেই মৃত্যু হয় পাঁচজনের, দুজনকে উদ্ধার করে পাঠানো হয় হাসপাতালে। তারা সবাই এক পরিবারের সদস্য।
র্যাবের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দুর্ঘটনার দিন আল আমিন ও রাকিব দুপুর ২টার দিকে ক্রেন চালানো শুরু করেন। একটি গার্ডার সরানোর কাজ শেষে দ্বিতীয় গার্ডার তোলার সময় ক্রেনটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাইভেটকারের ওপর গার্ডার ছিটকে পড়ে।
“ক্রেইনের ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত ওজনের গার্ডার উত্তোলনের জন্য এটা ঘটে। এ সময় হেলপার রাকিব ক্রেইনটি চালাচ্ছিলেন এবং ক্রেইন অপারেটর আল আমিন বাইরে থেকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার পর তারা দুজন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।”
গার্ডার দুর্ঘটনা: নিরাপত্তা নিতে সতর্ক করে চিঠি, ব্যবস্থা নেয়নি ‘কেউই’
গার্ডার দুর্ঘটনা: ঠিকাদারের ‘গাফিলতি’ পেয়েছে তদন্ত কমিটি
গার্ডার চাপায় চিড়ে চ্যাপ্টা গাড়ি, ভেতরেই গেল ৫ প্রাণ
ওই ঘটনায় নিহতদের পরিবার উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা করেছে। চীনা ঠিকাদার কোম্পানি, ক্রেইন চালক এবং প্রকল্পের নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলায় এই প্রাণহানি হয়েছে বলে সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকবে। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার নির্দেশ দেন।
দুর্ঘটনার দিনই সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আখতারকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে কমিটি বলেছে, দুর্ঘটনার পেছনে চীনা ঠিকাদার কোম্পানি সিজিজিসির ‘গাফিলতি’ পাওয়া গেছে।