Published : 18 Jun 2026, 12:04 PM
বর্তমানে বাংলাদেশে পররাষ্ট্র-বিষয়ক নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘সিনা টান টান’ (স্ট্যান্ড টল) তত্ত্ব। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে বাংলাদেশে প্রচলিত এই নতুন জাতীয়তাবাদী তত্ত্ব বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ, দ্বিপাক্ষিক কোনো রাষ্ট্রীয় সমস্যা বা সম্ভাবনা সামনে আসলে জনপরিসরে সেটির একমাত্র সমাধান হিসেবে ভাবা হয়— “আমাদের ‘সিনা টান টান’ (স্ট্যান্ড টল) করে থাকতে হবে বা আমাদের ‘চোখে চোখ রেখে’ (স্টেয়ার ডাউন) কথা বলতে হবে”। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দেখা যায়, এই আলোচনা জনপরিসর ছাপিয়ে প্রায়শই নীতিনির্ধারকদের পরিসরে পৌঁছে গেছে। ভারত কর্তৃক চলমান ‘পুশ-ইন’-এর ঘটনায় ‘সিনা টান টান তত্ত্ব’ আবার সামনে এসেছে। একটি জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোতে এই ধরনের আলোচনা সারা পৃথিবীতে বেশ পুরোনো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি দেশের ‘সিনা’ কী, বা দেশ নামক ভূখণ্ডের সেই ‘সিনা টান টান’ হয় কিসে?
ব্যক্তি মানুষের এই ‘সিনা টান টান’ করে চলা বা কথা বলার বিষয়টি আক্ষরিক নয়; বরং তা একজন ব্যক্তির ‘সাহসিকতা’ প্রকাশের একটি প্রাথমিক উপায় হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ, বিপক্ষের সঙ্গে বিপদে বা তর্কে ‘উন্নত মম শির’ রাখার জন্য মানুষ প্রাথমিক এই শারীরবৃত্তীয় পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে, যা বিবাদমান ব্যক্তিকে বিপক্ষের ওপর একধরনের চাপ তৈরি করে তাৎক্ষণিকভাবে ‘তুলনামূলক সুবিধা’ দেয়। যদিও সেই তুলনামূলক সুবিধা আদৌ তার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে কি না, সে ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা নেই। পরিশেষে বলা যায়, এই ‘সুবিধা’ বা ‘অসুবিধা’র দোলাচল থাকলেও এই অঙ্গভঙ্গি তাকে একধরনের আত্মসাহস ও আত্মসম্মান দেয়। একটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই ‘সিনা টান টান’ পদ্ধতি কেমন হতে পারে এবং একবিংশ শতাব্দীতে রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী চরিত্র কেমন, সেটিই এই লেখার মূল আলোচ্য বিষয়।
ব্যক্তি, পরিবার বা সমাজের পরাকাষ্ঠা পেরিয়ে একটি রাষ্ট্রের জন্য ‘সিনা টান টান’ করা বা ‘চোখে চোখ রেখে’ প্রতিপক্ষের সমানে দাঁড়ানো একজন ব্যক্তির মতো এতটা সহজগম্য বা সহজবোধ্য নয়। কারণ, ব্যক্তি যেহেতু তার আচরণের সময় বহুলাংশে জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে থাকে, সেহেতু ব্যক্তির মতো রাষ্ট্রের জন্য ‘সিনা টান টান’ বা ‘চোখে চোখ রাখা’ এতটা সহজ হয়ে ওঠে না। কারণ, রাষ্ট্রের আচরণের প্রতিটি মাত্রাই অন্য রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান দ্বারা বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে আতশিকাচের মাধ্যমে পরখ করা হয়। তাই এই ধরনের ‘সিনা টান টান’ (স্ট্যান্ড টল) বা ‘চোখে চোখ রেখে’ (স্টেয়ার ডাউন) চলা রাষ্ট্রের জন্য অনেক ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের সম্পর্কের ভিত্তি হয় ‘স্বার্থভিত্তিক’। আর সেখানে যেহেতু ‘চিরস্থায়ী কোনো বন্ধু বা শত্রু’ না থাকা একধরনের প্রমাণিত সত্য, তাই সেটির ব্যত্যয় হলে একটি রাষ্ট্র অন্য একটি রাষ্ট্রকে শাস্তি দিতে দ্বিতীয়বার ভাবে না; যা একটি রাষ্ট্রের জন্য নিমিষেই ‘অর্থনৈতিক’, ‘সামরিক’ কিংবা ‘কূটনৈতিক’ সংকট তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। ‘র্যাশনাল অ্যাক্টর মডেল’ তত্ত্ব মূলত একটি রাষ্ট্রের এই যৌক্তিক আচরণ কেমন হওয়া বাঞ্ছনীয়, সেটি বিশ্লেষণ করে থাকে। এই তত্ত্বে রাষ্ট্রকে এমন একটি ‘যৌক্তিক সত্তা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা আবেগ, অহংবোধ বা ব্যক্তি মর্যাদার প্রশ্নে নয়; বরং সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি, ঝুঁকি ও জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে, একটি রাষ্ট্র যখন প্রকাশ্য অন্য কোনো দেশের বিপক্ষে ‘সিনা টান টান’ করার উদ্দেশ্যে শক্তি প্রদর্শন করে, তখন সেটি সেই রাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষতি, সামরিক উত্তেজনা বা কূটনৈতিক সংকটসহ নানা রকম ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে। ফলে, ‘সিনা টান টান’ করার পদক্ষেপের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে অত্যন্ত কৌশলী হতে হয়।
এবার মূল আলোচনায় যাওয়া যাক। ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় রাষ্ট্রের কাঠামোতে এই ‘সিনা টান টান’ তত্ত্ব বেশ স্পষ্ট। বিভিন্ন যুগে রাষ্ট্রের এই পদ্ধতি ও কৌশল ছিল ভিন্ন ভিন্ন। মধ্যযুগের জাতিরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের সময় ‘সিনা টান টান’ করা ছিল রাষ্ট্রের নিরাপত্তার একমাত্র সমাধান, এবং সেটি ছিল ‘হার্ড পাওয়ার’ বাড়ানোর মাধ্যমে। কারণ, নিজস্ব জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য এটিই ছিল সেই সময়ের একমাত্র কার্যকরী পথ। নিজের অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে যুদ্ধে জয়ের জন্য সৈন্য সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের মাধ্যমে এই ‘সিনা টান টান’ করে যুদ্ধ করতে পারলে বিজয় অনেকটা নিশ্চিত থাকত। এই সামরিক ও কৌশলগত শক্তি প্রদর্শন রাষ্ট্রের ইতিহাসে অত্যন্ত মৌলিক একটি অংশ। কারণ, মানুষ জন্মগতভাবে নিজের ও নিজের পরিবারের নিরাপত্তার জন্য এই প্রতিরক্ষামূলক সহজাত প্রবৃত্তি বহন করে। একসময় আমাদের দেশের সামাজিক পরিসরে পরিবারের ‘লাঠির সংখ্যা’ বৃদ্ধির গুরুত্বের কথা শোনা যেত—অর্থাৎ, ছেলে সন্তান যত বেশি, সেই পরিবারের নিরাপত্তাও তত বেশি। কেতাবি ভাষায় বললে, ‘হার্ড পাওয়ার’ যত বৃদ্ধি পাবে, পরিবারের নিরাপত্তা তত বৃদ্ধি পাবে। এটি বললেও অত্যুক্তি হবে হবে না যে, বেশি সন্তান জন্ম দেওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল পরিবারের এই ‘হার্ড পাওয়ার’ বৃদ্ধি করা। এত গেল একান্ত পারিবারিক ও সামাজিক সহজাত প্রবৃত্তির কথা। এখন প্রশ্ন হলো, একটি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে সহজাত প্রবৃত্তি কী এবং রাষ্ট্র কী ধরনের হার্ড পাওয়ার উৎপাদন করতে আগ্রহী? এই প্রশ্নের সরল উত্তর খুঁজতে যাওয়া বোকামি হবে। কারণ, কালের বিবর্তনে রাষ্ট্রের এই প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত নীতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। আমরা যদি মধ্যযুগের সামন্তবাদী ব্যবস্থার দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যায় যে, তখন এই ‘সিনা টান টান’ করে দাঁড়ানোর একমাত্র উপায় ছিল যুদ্ধের শক্তি বৃদ্ধি। অর্থাৎ, জনবল ও উন্নত অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে হার্ড পাওয়ার বৃদ্ধি করে রাজ্যের প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করা এবং রাজ্যের ও রাজ্যের জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যে রাজ্যের এই যুদ্ধের সক্ষমতা বেশি ছিল, তার ‘সিনা’ সবচেয়ে বেশি ‘টান টান’ থাকত।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় বললে, ‘গতানুগতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি’ বা ‘ট্রেডিশনাল সিকিউরিটি থ্রেটস’-এর বিপক্ষে সামরিক প্রস্তুতি। যেহেতু ‘নিরাপত্তা’ অর্থ আসন্ন নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার সার্বিক অবস্থা, সেহেতু একসময় রাষ্ট্র এই অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য পদ্ধতি বেছে নেয়। ঐতিহাসিক সমর কৌশলবিদ সান জু, ক্লজউইৎস বা কৌটিল্য মূলত এই সামরিক কৌশল নিয়েই আলোচনা করেছেন। কীভাবে এই হার্ড পাওয়ারের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায় এবং সঠিক কৌশলের মাধ্যমে কীভাবে সেটির উত্তম ব্যবহার করে যুদ্ধ জয় করা যায়—সেই বিষয়ে তারা বিশেষ আলোকপাত করেছেন। যেমন— সান জু তার ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’-এ যুদ্ধকে মূলত প্রতারণা, উত্তম কৌশল ও নিখুঁত হিসাব-নিকাশের বিষয় হিসেবে দেখেছেন। এই হার্ড পাওয়ার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি সংঘাত এড়িয়ে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ফলাফল অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন। একইভাবে, ক্লজউইৎস যুদ্ধ বা সামরিক শক্তির ব্যবহারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যদিকে, কৌটিল্য ‘অর্থশাস্ত্রে’ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও দেশের স্বার্থ হাসিলের জন্য ‘দণ্ড’-এর ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। এর পাশাপাশি তিনি বিশেষভাবে কূটনৈতিক পদক্ষেপ, জোট তৈরি বা গুপ্তচরবৃত্তির কথাও উল্লেখ করেছেন। এই তিন সমর কৌশলবিদ ‘দণ্ড’ বা হার্ড পাওয়ার ব্যবহারের কথা বললেও, তারা কেউই আবেগতাড়িত আত্মপ্রদর্শনের পক্ষে ছিলেন না।
এই নিরাপত্তা তত্ত্বের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় বিগত শতাব্দী সত্তরের দশকে। ১৯৭৩ সালের বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এই নিরাপত্তা ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে এবং সমর কৌশলবিদরা নতুন এক ধারণার বিকাশ ঘটান। কৌশলগত অধ্যয়নের এই বিকাশ নিরাপত্তার ধারণাকে বিস্তারিতভাবে দেখতে সুযোগ করে দেয় এবং ‘অ-গতানুগতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি’ (নন-ট্রেডিশনাল সিকিউরিটি থ্রেটস)-এর ধারণা প্রবর্তন করে। অর্থাৎ, একটি দেশের নিরাপত্তা বলতে সামরিক সক্ষমতা নয়; বরং দেশটির খাদ্য মজুত, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সমৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং তথ্য নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে। ফলে, ১৯৮০-এর দশকেই সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি অ-সামরিক নিরাপত্তা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হতে থাকে। এই আলোচনার অন্যতম কারণ ছিল—একটি দেশের নিরাপত্তা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তা সামগ্রিক নিরাপত্তা ধারণার অসম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে; অনেক সময় সেটি ভুলও হতে পারে। তাই দেখা যায়, স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নির্দিষ্ট কিছু রাষ্ট্র ছাড়া অধিকাংশ রাষ্ট্রই মূলত অ-সামরিক নিরাপত্তার দিকে গুরুত্ব দিতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কথা বলা যেতে পারে। এছাড়াও, এই সফট পাওয়ারে গুরুত্ব দিয়ে সমৃদ্ধশালী হওয়া দেশগুলোর মধ্যে ফিনল্যান্ড, কোস্টারিকা ও সিঙ্গাপুরের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এই তালিকায় আরও পাওয়া যাবে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও রুয়ান্ডার মতো দেশকে। এশিয়ায় সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো— চীন। যদিও অনেকে যুক্তি প্রদর্শন করতে পারেন যে, চীনের তো একধরনের ‘নিউক্লিয়ার ডেটারেন্স’ বা পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে—এই যুক্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি সত্য যে, এই পরমাণু ‘দাঁতাত’ বা কৌশলগত ভারসাম্য তাকে অনেকাংশে তার মতো উন্নয়ন করতে সহায়তা করেছে; কিন্তু এটিও উল্লেখ করতে হবে যে, সেই উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার ছিল শক্তিশালী অর্থনীতি। চীন মূলত কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের খোলসে থেকে ক্যাপিটালিজমের মুখোশ পরে সারা পৃথিবীতে ব্যবসা করে চলেছে। চীনের কৌশল দেখলে এটি স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সামরিক নয়, বরং অ-সামরিক অর্থনৈতিক উন্নয়নই দেশটির মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্যের সফল বাস্তবায়ন চীনকে বিশ্বের বিকল্পহীন এক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। কেউ চীনকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। সারা পৃথিবীর বাজারে এখন চীনের একচেটিয়া দাপট। কিন্তু চীনের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে দেশটির সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে অর্থনৈতিক কৌশল বেশি কাজে দিয়েছে।
এখন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আসা যাক। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর বাংলাদেশ এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। এই নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কগুলো বিবেচনায় নতুন নতুন প্রস্তাবনা ভেসে বেড়াচ্ছে। বর্তমানে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো দেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী ভারত, ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তি পাকিস্তান এবং ঐতিহাসিকভাবে সেই পরাজিত শক্তির ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। ভারত যেহেতু বৃহত্তম প্রতিবেশী এবং দেশটির সঙ্গে যেহেতু আমাদের অধিকাংশ সীমানা, তাই ভারতের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি না চাইলেও চলে আসে। বর্তমানে ‘পুশ-ইন’ ঘিরে চলমান সীমান্ত সংকট আমাদের সেই অনিবার্য পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে শুধু জনপরিসরই নয়, নানান দায়িত্বশীল মহল থেকেও বাংলাদেশকে সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। একটি সার্বভৌম দেশের হার্ড পাওয়ার বৃদ্ধি অযৌক্তিক কোনো দাবি নয়; কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতে যেখানে দেশের ‘অ-গতানুগতিক নিরাপত্তা’ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা বেশি, সেখানে আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো কয়েক দশক আগে গুরুত্ব হারানো ‘যুদ্ধবাজ নীতি’। যদিও ইউক্রেইন যুদ্ধোত্তর সময়ে অনেক দেশ সামরিক সমৃদ্ধির দিকে ঝুঁকেছে, তবুও আমাদের মতো দেশ—যেখানে ‘অ-গতানুগতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি’ অত্যন্ত বেশি, সেখানে এই ধরনের সামরিকায়নের আলোচনা অত্যন্ত আত্মঘাতী। কারণ, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে ‘গতানুগতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি’র চেয়ে ‘অ-গতানুগতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি’ অনেক বেশি। অর্থাৎ, দেশে সামরিক সমৃদ্ধির চেয়ে জলবায়ু, স্বাস্থ্য, খাদ্য মজুত, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সমৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং তথ্য নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয়গুলো অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
এই অত্যাধুনিক চিকিৎসা সেবার যুগে আমাদের দেশে আমরা এখন হাম থেকে শিশুকে বাঁচাতে পারি না। 'নাম্বিও হেলথ কেয়ার ইনডেক্স' মতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার মান ৯৭টি দেশের মধ্যে ছিল ৯৬তম। আবার ২০২৬সালে ১০০টি দেশের মধ্যে অবনমন হয়ে হয় ৯৮তম। 'নাম্বিও হেলথ কেয়ার ইনডেক্স' মূলত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সামগ্রিক গুণমান যাচাইয়ের একটি পরিমাপক। আবার ২০২৫ সালে জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক প্রতিবেদনে 'ওয়ার্ল্ড রিস্ক ইনডেক্স ২০২৩'-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে নবম স্থানে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তার ভূখণ্ডের ১৭ শতাংশ এলাকা হারাবে, যার ফলে দেশের ৩০ শতাংশ কৃষিজমি বিলীন হয়ে যাবে। একই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয় যে, হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের ৫৫ শতাংশ এলাকায় তীব্র বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। জলবায়ু সংকটের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির ওই প্রতিবেদনে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ধান উৎপাদন প্রতি বছর ৭.৪ শতাংশ হারে হ্রাস পাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একটি কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এটি একটি পরমাণু বোমার মতো নিরাপত্তা ঝুঁকি। এছাড়াও আমাদের দেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর তথ্য নিরাপত্তা অত্যন্ত নাজুক। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তথ্য নিরাপত্তা অন্যতম বড় ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’। আমরা প্রায়শই সেই নিরাপত্তার ব্যূহ ভেদ হতে দেখি। এবার জ্বালানি নিরাপত্তার দিকে নজর দেওয়া যাক। ওয়ার্ল্ড এনার্জি কাউন্সিল (WEC) কর্তৃক ১২০টিরও বেশি দেশের জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরিমাপের বার্ষিক সূচক হলো ‘ওয়ার্ল্ড এনার্জি ট্রাইলেমা ইনডেক্স’। এই ইনডেক্সের তথ্য মতে, ২০২৩ সালে ৯৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮৩তম; যা ২০২২ সালের তুলনায় পাঁচ ধাপ নিচে। অর্থাৎ, জ্বালানি নিরাপত্তায়ও আমাদের অবনমন হয়েছে। সর্বোপরি, অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশকে উদীয়মান ‘টাইগার’ বলা হলেও, এ অর্থনীতি এই বিশাল জনসংখ্যার অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট নয়।
তাই বলতেই হয়, যে দেশে নিরাময়যোগ্য হামে শিশুমৃত্যু রোধ করা যায় না, শত শত শিশু মারা যায়; যে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে, যে দেশের মানুষের তথ্য নিরাপত্তা নেই, যে দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নেই— সেই দেশে যারা কেবল অস্ত্র তৈরির কথা বলে, তাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। তাদের লক্ষ্য দেশের নিরাপত্তা নয়, অন্য কিছু। এটি নিতান্তই ‘গরিবের ঘোড়া রোগ’ বৈ কিছু না।
অথচ এই মুহূর্তে আমাদের মতো অনুন্নত দেশের মূল আলোচনা হওয়া উচিত আমাদের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশ নিয়ে। কীভাবে এই অপার সম্ভাবনার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগিয়ে নিজেদেরকে সফট পাওয়ার হিসেবে দাঁড় করানো যায়, সেই আলোচনা হওয়ার কথা ছিল আগে। কীভাবে নিজেদেরকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ভালো বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা যায়, সেটাই হওয়ার কথা ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের সামরিক শক্তি নেই, কিন্তু আমাদের জনসংখ্যাই আমাদের জন্য অন্যতম বড় নিরাপত্তা ঢাল। এই ঢালকে উন্নত করতে পারলে আমাদের ‘সিনা’ হবে সবচেয়ে টান টান। তখন আমরাই হতে পারি পৃথিবীর অন্যতম নিরাপদ ও সমৃদ্ধ এক ভূখণ্ড।
এম. টি. ইসলাম জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। ই-মেইল: [email protected]