Published : 11 Jul 2026, 05:32 PM
নোয়াখালীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে গত ছয় মাসে নিরাপদ প্রসবসেবা দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ২৯৭ জন নারীকে। যার মধ্যে মাত্র ২৩ জন মায়ের অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। অর্থাৎ ৯৮ শতাংশের বেশি সেবাগ্রহিতা নরমাল ডেলিভারি বা স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমেই সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।
প্রসূতি ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবায় এমন অনন্য দৃষ্টান্তের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটি সারাদেশে জেলা পর্যায়ে ৬৪টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে প্রথম এবং জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত হয়েছে।
যার পুরস্কার হিসেবে রোববার (১২ জুলাই) বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদপত্র গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন নোয়াখালী মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) মুহাম্মদ জিহাদুল হক।
তিনি বলেন, “২০১৬ সালে এই প্রতিষ্ঠানে প্রসব সংখ্যা ছিল শুন্য। সেই প্রতিষ্ঠান আজকে জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষে অবস্থান করছে।”

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০০৫ সালের ১৭ এপ্রিল নোয়াখালী সদরের মাইজদীতে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি আনুষ্ঠানিক যাত্রা করে। তবে নানা সংকটে প্রত্যাশিত সেবা দিতে ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি। এতে কয়েক বছরের মাথায় ২০১৬ সালে প্রসবসেবা শূন্যের কোটায় নেমে আসে।
পরে ২০২১ সালে করোনাকালীন সময়ে চিকিৎসক মুহাম্মদ জিহাদুল হক প্রতিষ্ঠানটিতে মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) হিসেবে দায়িত্ব পান। তিনি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত সবাইকে নিয়ে ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ প্রসবসেবা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
বিদ্যমান সংকটগুলো একে একে তারা নিজেদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং স্থানীয়দের সহায়তায় সমাধান করেন। এভাবে দিনদিন সেবাগ্রহীতাদের আস্থা বাড়তে থাকে এবং এ প্রতিষ্ঠানের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।
এখন মাসে দুই শতাধিক নরমাল ডেলিভারিসহ প্রয়োজনীয় সংখ্যক অস্ত্রোপচার বা সিজার করা হয় এখানে।

এছাড়া প্রসবপূর্ব, প্রসবকালীন এবং প্রসবপরবর্তী সব ধরনের সেবা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা এবং শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন সেবা দেওয়া হয় এখানে।
প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ছয়জন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন ল্যাব টেকনোলজিস্ট, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন মিডওয়াইফ, একজন অ্যাম্বুলেন্স চালক ও পাঁচজন আয়া রয়েছেন।
তাদের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার ফলে ২০২৫ সালে নোয়াখালীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ডেলিভারি হয়েছে ২ হাজার ৭০৪টি। এর মধ্যে সিজার হয়েছে মাত্র ৯৬টি।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ১ হাজার ২৭৪টি নরমাল ডেলিভারি এবং ২৩টি সিরাজ করা হয়েছে। সর্বশেষ জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে ৫৬টি নরমাল ডেলিভারি করা হয়েছে।
কেবল নোয়াখালী নয় পাশের জেলা থেকেও এই কেন্দ্রে সেবা নিতে আসেন অনেক প্রসূতি।

লক্ষীপুরের রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার থেকে আসা সুফিয়া বেগমের বৃহস্পতিবার নরমাল ডেলিভারিতে সন্তান হয় এখানে। তিনি বলেন, “এখানে সবার যত্নে আমরা ভালো আছি।”
এখানে সেবা নেওয়া নোয়াখালী সদর উপজেলার লক্ষীণারায়নপুর এলাকায় কামরুন নাহার বলেন, “এখানকার সবার আন্তরিক সেবা আমাদের মুগ্ধ করেছে। আমার সন্তান পৃথিবীতে আসার আগে থেকে এখানে আমি প্রয়োজনীয় সব ধরনের সেবা পেয়েছি।
“এ কেন্দ্রেই চিকিৎক এবং পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা আপার নিবিড় তত্ত্বাবধানে আমার সন্তান পৃথিবীতে এসেছে। আলহামদুলিল্লাহ দুজনই এখন ভালো আছি।”
প্রসূতি মায়েদের এমন সেবা দিতে পেরে খুশি এ কেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও।
এ বিষয়ে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা নাসরিন সুলতনা বলেন, “একজন মায়ের কোলে তার নবজাতক সন্তানকে তুলে দেওয়ার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এমন সময়ে মায়েদের পাশে থাকতে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত।”
প্রতিষ্ঠানটির মেডিকেল অফিসার জিহাদুল হক বলেন, “আমরা চেষ্টা করেছি মায়েদের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে, যেখানে এসে মা মনে করবেন না তিনি বাড়ি আছেন না হাসপাতালে আছেন।”
তিনি বলেন, “এই প্রতিষ্ঠানে আমরা চেষ্টা করেছি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সকল সেবা দেওয়ার জন্য এবং তা আমরা নিশ্চিত করেছি। আমাদের ল্যাব ফ্যাসিলিটি রয়েছে, আলটাসোনোগ্রাম ফ্যাসিলিটি রয়েছে। সেগুলো আমরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়ার চেষ্টা করছি।”

এই চিকিৎসক বলেন, “সব সেবা বিনামূল্যে রাখার কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষজন যারা কখনো হাসপাতালে আসার চিন্তা করতেন না, উনারাও এখানে আসছেন এবং তাদের আত্মীয় স্বজনদের উৎসাহিত করছেন। তারই ফলশ্রুতিতে আসলে আজকের এই অর্জন।
“এভাবে মায়েদের পাশে থাকতে পেরে, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে পেরে এবং নিরাপদ মা এবং শিশুর পৃথিবীতে আগমনটা নিশ্চিত করতে পেরে আমরা আনন্দিত।”
তবে এই কেন্দ্রে একজন সার্বক্ষণিক গাইনী বিশেষজ্ঞ থাকলে সেবার মান আরো কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এছাড়া একটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ না থাকায় রোগী আনা নেওয়া যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত ঔষধ সরবরাহ না থাকায় হিমশিম খেতে হয়, বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিবার পরিকল্পনা, নোয়াখালীর উপ-পরিচালক আবুল কাশেম মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, “সরকারের একটা কর্মসূচি আছে সেটা হলো স্বাবাভিক প্রসবসেবাটা প্রতিষ্ঠানে করানো এবং জিরো হোম ডেলিভারি। আর প্রতিষ্ঠানে প্রসবসেবার প্রতি বিমূখ হন মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠী। আর্থিক সক্ষমতা না থাকার কারণে তারা সেবাকেন্দ্রে আসতে অনীহা বোধ করে।
“ফলে অদক্ষ ধাত্রী দ্বারা বাড়িতে প্রসবসেবা করে থাকে। এতে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু দুইটারই ঝুঁকি থাকে। এখানে সেই দরিদ্র মানুষজনই বিনামূল্যে সেবা পেয়ে থাকেন।”
এখানে যারা সেবা নিতে আসেন বেশিরভাগই দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উল্লেখ করে তিনি বলেন, “একজন দরিদ্র মা যখন এখান থেকে বিনামূল্যে ভালো সেবাটা পান তখন তিনি আরো পাঁচজন মাকে বলেন। এভাবেই এখানকার সেবার মানটা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
“এছাড়া এখানে চিকিৎসকসহ যে টিমটা আছে, তারা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ। প্রত্যেকটা মা এখানে সেবা নিতে এসে, সেবা পেয়ে খুশি হন।”
তিনি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে এ সেবাকেন্দ্রটির প্রথম হয়েছে এটা অবশ্যই আমাদের জন্য গর্বের এবং এটা আমাদের এই অগ্রযাত্রাকে আরো উৎসাহিত করবে, আমাদের এই সেবা কার্যক্রমের সাথে যারা জড়িত তাদেরকেও কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে এ উৎসাহটা।”
এছাড়া এই কেন্দ্রের সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এমটাই প্রত্যাশা সবার, বলেন তিনি।