Published : 18 Jun 2026, 01:18 PM
বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে এক ধরনের মৌসুমি গণতন্ত্র চালু হয়। এটি এমন এক গণতন্ত্র, যেখানে নির্বাচন কমিশনের দরকার হয় না, ভোটকেন্দ্র লাগে না, ব্যালট বাক্সেরও প্রয়োজন নেই। তবু কোটি কোটি মানুষ পক্ষ বেছে নেয়, যুক্তি দেয়, তর্ক করে, সম্পর্ক নষ্ট করে, আবার ম্যাচ শেষে একসঙ্গে চা-ও খায়। যে দেশে নিজস্ব ফুটবল দল বিশ্বকাপের প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ পড়ে, সেই দেশই বিশ্বকাপের সময় পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয় ফুটবল পরাশক্তিতে পরিণত হয়।
চারদিকে তখন পতাকার সমাহার। কারও ছাদে ব্রাজিল, কারও বারান্দায় আর্জেন্টিনা, কারও গাড়িতে স্পেন, কারও মোটরসাইকেলের পেছনে জার্মানি। আবার কেউ ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল, কেউ এমবাপ্পের ফ্রান্স, আবার কেউ কেউ এতটাই আধুনিক যে এক সপ্তাহ পরপর পতাকা বদলায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন উত্তেজনা তৈরি হয় যেন ফিফা কাউন্সিলের বৈঠক বসেছে শ্যামলী, বগুড়া কিংবা কাউখালীর চায়ের দোকানে। এমনকি অনেকের ফুটবল জ্ঞান অফসাইড আর কর্নারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও সমর্থনের দৃঢ়তা থাকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মতো। এখন অবশ্য ইন্টারনেটের যুগে সবাই সব-জান্তা শমসের!
কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের প্রথম দিকের ম্যাচগুলো একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে এনে দিয়েছে। ফুটবল আর নামের খেলায় সীমাবদ্ধ নেই। ইতিহাস, ট্রফি, ঐতিহ্য, গৌরব—এসব এখনও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ম্যাচ জেতার জন্য এগুলোকে মাঠে নামানো যায় না। মাঠে নামাতে হয় খেলোয়াড়, কৌশল, ফিটনেস এবং পারফরম্যান্স।
বিশ্বকাপের প্রথম পর্বের সব ম্যাচ শেষ হতে না হতেই দেখা গেল, বড় দলগুলোর জন্য এটি মোটেও আরামদায়ক ভ্রমণ নয়। ব্রাজিল ভেবেছিল মরক্কোর বিপক্ষে নিজেদের ঐতিহ্য ও দক্ষতার প্রদর্শনী করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলে ড্র করে তারা বুঝেছে, বিশ্বকাপে আর কাউকে ‘ফুটবল শেখানোর ছাত্র’ মনে করার সুযোগ নেই। মরক্কো এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলেছে, যেন তারা শুধু ম্যাচ খেলতে নয়, পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো বদলাতে মাঠে নেমেছে।
স্পেনের অবস্থা আরও শিক্ষণীয়। ‘নামহীন গোত্রহীন’ কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচটিকে অনেকেই আনুষ্ঠানিকতা ভেবেছিলেন। কিন্তু কেপ ভার্দে এমন প্রতিরোধ গড়ে তুলল যে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর তাদের হতবিহ্বল দেখাচ্ছিল! স্প্যানিশরা সম্ভবত প্রথমবারের মতো গুগলে খুঁজেছে: ‘কেপ ভার্দে আসলে কতটা ভালো দল?’ গোলশূন্য ড্রয়ের মাধ্যমে আফ্রিকার এই দলটি জানিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপে সম্মান ধার করে পাওয়া যায় না; অর্জন করে নিতে হয়। আর কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া ৪০ বছর বয়সে রাতারাতি বিশ্বতারকা বনে গেছেন তার অতিমানবীয় গোল ঠেকানোর কৌশল ও দক্ষতার কারণে।
বেলজিয়ামও মিশরের সঙ্গে ড্র করে উপলব্ধি করেছে যে ফিফা র্যাঙ্কিং অনেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের মতো। চাকরির ইন্টারভিউতে কাজে লাগতে পারে, কিন্তু মাঠে নেমে গোল করার দায়িত্ব সে নেয় না।
নেদারল্যান্ডস জাপানের বিপক্ষে দুইবার এগিয়ে গিয়েও জয় নিশ্চিত করতে পারেনি। জাপান আবারও দেখিয়েছে কেন তাদের ‘সামুরাই ব্লু’ বলা হয়। তারা শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত লড়াই করে। আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি এখন তাদের শৃঙ্খলা, গতি এবং মানসিক দৃঢ়তা। মনে হয় তারা ফুটবল খেলার পাশাপাশি প্রকৌশলবিদ্যারও কিছু নিয়ম মেনে চলে—যেখানে প্রতিটি পাস, প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি অবস্থান হিসাব করে করা হয়।
সৌদি আরব উরুগুয়েকে আটকে দিয়েছে। ইরান নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে পয়েন্ট ভাগ করেছে। কানাডা বসনিয়ার সঙ্গে ড্র করেছে। কাতার শেষ মুহূর্তে গোল শোধ করে ১-১ গোলে আটকে দিয়েছে সুইজারল্যান্ডকে। এসব ফলাফল আলাদা আলাদা ঘটনা নয়; এগুলো একটি বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। বিশ্বকাপ যেন বড় দলগুলোর অহংকার ভাঙার আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।
অবশ্য সবাই যে হোঁচট খেয়েছে, তা নয়। জার্মানি কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছে যে পুরোনো যন্ত্র কখনও কখনও দুর্দান্তভাবে কাজ করতে পারে। ফ্রান্স সেনেগালকে হারিয়ে সমর্থকদের রক্তচাপ স্বাভাবিক রেখেছে। আর্জেন্টিনা আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে হারিয়ে জানিয়েছে, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অবসর নেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। অন্তত কয়েক দিনের জন্য দেশের আর্জেন্টাইন সমর্থকদের পরিবারও নিশ্চিন্তে থাকতে পেরেছে। নরওয়ে ইরাককে ৪-১ গোলে, অস্ট্রিয়া জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে নিজেদের আস্থাভাজন করে তুলেছে। কিন্তু এসব ম্যাচেও প্রতিপক্ষরা লড়াই করেছে; জয়গুলো খুব কম ক্ষেত্রেই একতরফা আধিপত্যের গল্প হয়ে উঠেছে। সামগ্রিক চিত্র একটাই—এখন আর কেউ অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
একসময় বিশ্বকাপে কিছু দল ছিল রাজা, বাকিরা ছিল প্রজা। ম্যাচ শুরুর আগেই ফলাফল অনুমান করা যেত। এখন অবস্থা ভিন্ন। সবাই যেন একই পরীক্ষার হলে বসা ছাত্র। কারও হাতে প্রশ্নপত্র আগে পৌঁছায়নি। কারও জন্য আলাদা নম্বর বরাদ্দ নেই। যে ভালো লিখবে, সেই নম্বর পাবে।
ফুটবলের বিশ্বায়ন এই পরিবর্তনের মূল কারণ। আগে কয়েকটি দেশের হাতে উন্নত প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো ও কৌশলগত জ্ঞান সীমাবদ্ধ ছিল। এখন ইউটিউব, ডেটা অ্যানালিটিক্স, আন্তর্জাতিক কোচিং এবং বৈশ্বিক লিগব্যবস্থা সেই জ্ঞান পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছে। ফলে মরক্কো, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ক্রোয়েশিয়া কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দল আর বিস্ময় নয়; তারা এখন প্রতিযোগী।
বড় দলগুলোর অনেককে দেখে মনে হয়েছে তারা সরকারি অফিসের অভিজ্ঞ কর্মকর্তার মতো। চাকরির বয়স অনেক, দেয়ালে প্রশংসাপত্রের অভাব নেই, অতীতের অর্জনের তালিকাও দীর্ঘ। কিন্তু কাজের গতি কখনও কখনও আগের মতো থাকে না। অন্যদিকে নতুন দলগুলো অনেকটা স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের তরুণ উদ্যোক্তার মতো—কম সম্পদ, বেশি উদ্যম, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং হারানোর ভয় কম।
দর্শকরাও এই পরিবর্তন বুঝতে শুরু করেছে। একসময় মানুষ দলকে ভালোবাসত ইতিহাসের কারণে। এখন ভালোবাসে খেলার কারণে। আজ মরক্কো ভালো খেললে হাততালি মরক্কোর জন্য। কাল কেপ ভার্দে স্পেনকে আটকে দিলে প্রশংসা কেপ ভার্দের জন্য। পরশু জাপান চমক দেখালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাতারাতি জাপান-ভক্তের জন্ম হবে।
এটি বাঙালির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক পরিবর্তন। আমরা সাধারণত ইতিহাসনির্ভর মানুষ। দাদার পছন্দ, বাবার পছন্দ, বড় ভাইয়ের পছন্দ—সবকিছু উত্তরাধিকার সূত্রে গ্রহণ করতে ভালোবাসি। ফলে অনেক সময় নিজের মতামত তৈরি হওয়ার আগেই সমর্থনের সিদ্ধান্ত হয়ে যায়।
কিন্তু নতুন প্রজন্ম একটু ভিন্ন। তারা শুধু পুরোনো ট্রফির সংখ্যা দেখে না। তারা পরিসংখ্যান দেখে, হাইলাইটস দেখে, প্রেসিং দেখে, এক্সজি দেখে, ট্যাকটিকস বোঝে। তাদের কাছে পাঁচটি পুরোনো ট্রফির চেয়ে আজকের ম্যাচে কে ভালো খেলল, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রবণতা ফুটবলের বাইরেও একটি মজার শিক্ষা দেয়। মানুষ যদি মাঠে পারফরম্যান্স দেখে সমর্থন দিতে শেখে, তাহলে হয়তো জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও একই অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে। অন্তত বিশ্বকাপের এক মাসের জন্য হলেও মানুষ উপলব্ধি করতে পারে—স্লোগানের চেয়ে ফলাফল বড়, পরিচয়ের চেয়ে কাজ বড়, অতীতের গৌরব সম্মানের বিষয় হলেও বর্তমানের সাফল্যের বিকল্প নয়।
অবশ্য এই নতুন সংস্কৃতির কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। পারফরম্যান্সভিত্তিক সমর্থনের যুগে সমর্থকদের বিশ্বস্ততা কমে যেতে পারে। আজ এক দলের জার্সি পরে সেলফি, কাল আরেক দলের পতাকা নিয়ে মিছিল। আজ মরক্কোর প্রশংসা, কাল স্পেনের। বিশ্বকাপ শেষে অনেককে জিজ্ঞেস করলে হয়তো নিজেরাই নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না, আসলে তারা কোন দলের সমর্থক ছিল।
তবুও ইতিবাচক দিকটি অনেক বড়। কারণ এতে খেলাটাই জিতে যায়। যখন মানুষ শুধু একটি দলের বিজয়ের অপেক্ষায় না থেকে ভালো ফুটবলের অপেক্ষায় থাকে, তখন প্রতিটি ম্যাচ উপভোগ্য হয়ে ওঠে। প্রতিটি দল সম্ভাব্য নায়ক হয়। প্রতিটি ম্যাচ নতুন গল্প লেখার সুযোগ পায়।
সবচেয়ে বড় কথা, এতে আমাদের চিরাচরিত ফুটবল-যুদ্ধও কিছুটা কমতে পারে। প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বন্ধ, আত্মীয়ের সঙ্গে মনোমালিন্য, বন্ধুত্বে ফাটল—এসবের পেছনে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বিরোধের অবদান মোটেও কম নয়। পৃথিবীর খুব কম আন্তর্জাতিক ঘটনা সামাজিক সম্প্রীতির ওপর এত গভীর প্রভাব ফেলতে পেরেছে।
যদি মানুষ সত্যিই পারফরম্যান্সকে মূল্য দিতে শেখে, তাহলে তর্ক থাকবে, আবেগ থাকবে, পতাকা থাকবে, জার্সি থাকবে কিন্তু শত্রুতা কমবে। বাস্তবতা মেনে নেওয়া সহজ হবে। ভালো খেলাকে সম্মান করা সহজ হবে। ফিফা হয়তো বিশ্বশান্তির কোনো প্রকল্প হাতে নেয়নি। জাতিসংঘও এখনও নানা সংকট নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু বিশ্বকাপ যদি মানুষকে দল নয়, খেলা ভালোবাসতে শেখায়, তাহলে সেটিও কম অর্জন নয়। কারণ ফুটবল শেষ পর্যন্ত একটি সহজ কিন্তু গভীর শিক্ষা দেয়—ইতিহাস সম্মান পায়, কিন্তু ম্যাচ জেতে বর্তমান। নাম পরিচয় দেয়, কিন্তু ফলাফল তৈরি করে কাজ। আর সমর্থনের সবচেয়ে সুন্দর রূপ হলো, ভালো খেলাকে সম্মান করা।
তাই এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে উপযুক্ত স্লোগান সম্ভবত একটাই: ‘দল নয়, খেলা দেখুন; পরিচয় নয়, পারফরম্যান্স দেখে প্রেমে পড়ুন!’
চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: [email protected]