Published : 16 Aug 2022, 08:27 PM
উত্তরার গার্ডার ধসে নিহত রুবেলসহ অন্যদের লাশের ময়নাতদন্ত যখন চলছিল সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, তখন মর্গের বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন বেশ কয়েকজন নারী।
তারা সবাই নিজেদের রুবেলের স্ত্রী দাবি করছিলেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে এই ব্যক্তির সাত স্ত্রী থাকার কথা জানা গেছে, এদের কোনো স্ত্রীর সঙ্গে অন্য স্ত্রীর যোগাযোগ ছিল না।
অথচ সোমবার এই দুর্ঘটনার পর আহত রেজাউল করিম হৃদয়ের মা রেহানা বেগমের স্বামী হিসেবেই রুবেলের পরিচয় জানা গিয়েছিল।
সেই সঙ্গে তার নাম নিয়েও দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি; এক সংসারে এক নামে পরিচিত ছিলেন তিনি।
ছেলে হৃদয়ের বিয়ের দুদিন পর পুত্র-পুত্রবধূ-বেয়াইনসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে প্রাইভেটকার চালিয়ে ছেলের শ্বশুরবাড়িতে যাচ্ছিলেন রুবেল।
ঢাকার কাওলা থেকে আশুলিয়ায় যাওয়ার পথে উত্তরায় জসীম উদদীন সড়কে বিআরটি প্রকল্পের ক্রেন থেকে একটি গার্ডার পড়ে সেই গাড়ির উপর।
এতে হৃদয় ও তার স্ত্রী রিয়া মনি বেঁচে গেলেও প্রাণ হারান রিয়ার মা ফাহিমা (৪০), খালা ঝর্না (২৮) এবং ঝর্নার দুই সন্তান জান্নাত (৬) ও জাকারিয়া (২)।
লাশ উদ্ধারের পর রাতেই পাঠানো হয় সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল মর্গে। সেখানে মঙ্গলবার দুপুরে ময়নাতদন্ত হয় পাঁচজনের।
তখন মর্গের সামনে হৃদয়ের মা রেহানা বেগম ছিলেন।
তিনি ছাড়াও সাহিদা আক্তার নামে একজন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়ে রত্নাকে সঙ্গে নিয়ে।
হৃদয়ের মা রেহানা দাবি করেন, তার স্বামী আরেকটি বিয়ে করেছেন, এটা তার জানা ছিল। কিন্তু সেই পরিবারের কারও সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না।
অন্যদিকে রত্নার মা সাহিদা আক্তারের ভাষ্য, তার স্বামীর (রুবেল) একাধিক স্ত্রী-সন্তান আছে, এটা তার জানাই ছিল না।
রত্নার সৎ ভাই শহিদুল ইসলাম রোমান বলেন, “বাবা (সৎ বাবা) সোমবার দুপুর পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে মানিকগঞ্জে ছিল। বনানীতে কাজের কথা বলে চলে আসে।”
সাহিদার বাড়ি মানিকগঞ্জে, রুবেল ঢাকায় বাড়ি করলেও তার পৈতৃক বাড়ি মেহেরপুরে।
হৃদয়ের বিয়ের খবর তারা জানতেন না বলে দাবি করেন রোমান।

অন্যদিকে সালমা আকতার পুতুল নামে এক নারীও মর্গের বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন, তিনিও রুবেলকে স্বামী দাবি করেন।
পুতুলের ভাষ্য, একাধিক বিয়ের অভিযোগে রুবেলের বিরুদ্ধে তিনি মামলাও করেন। গত ১১ অগাস্ট রুবেলের সঙ্গে তার সর্বশেষ দেখা হয়েছিল।
তার কাছ থেকে রুবেল জমি কেনার কথা বলে ১১ লাখ টাকা নিয়েছেন বলে দাবি করেন এই নারী।
এছাড়া খন্দকার বিউটি নামে আরেক নারী রুবেলের স্ত্রীর দাবি নিয়ে মর্গে আসেন। এই নারীর দাবি, গাড়ি কেনার কথা বলে রুবেল তার কাছ থেকে সাড়ে ১৬ লাখ টাকা নিয়েছিলেন।
অন্যদিকে নিপা আকতার নামে এক নারী দাবি করেন, রুবেল তার বাবা। আর তার মা নার্গিস বেগম অন্যত্র বিয়ে করে সংসার করছেন।

রুবেলের সন্তান দাবি করা গৃহবধূ নিপা তার বাবার সাতটি বিয়ের খবর দেন।
“বাবা অন্তত সাতটি বিয়ে করেছেন। প্রথম স্ত্রী টিপু আকতার সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় মারা গেছেন। পারভীন পুষ্পা নামে টঙ্গীতে বাবার আরেক স্ত্রী আছে।”
নিপাকে চেনার কথা স্বীকার করেন রুবেলের ভাই ইয়াহিয়া। তিনি বলেন, বিভিন্নজনের স্ত্রী-সন্তান দাবির বিষয়টি নিয়ে পারিবারিকভাবে বসে পরে সিদ্ধান্ত নেবেন।
তবে রত্না বলেন, “এখন অনেকেই স্ত্রী-সন্তান দাবি করে আসছেন, বাবার (সম্পদের উপর) ভাগ বসাতে।”
মর্গের সামনে রত্নাকে চিৎকার করে কাঁদতে দেখা গেলেও নিপা ছিলেন অনেকটাই শান্ত।
নিপা বলেন, “আমার মাকে ফেলে বাবা যখন চলে যায়, তখন মা আরেকটা বিয়ে করে সংসার পাতে। আমি নানীর কাছে মানুষ হই। বড় হয়ে বাবা কয়েকদিন যোগাযোগ করেছিল। এরপর যোগাযোগ কমে আসে। হৃদয়, হৃদয়ের মা, রত্না, রত্নার মা, চাচারা সবাই আমাকে চেনে।
“এখন আমার আর কেউ নেই। মা থেকেও নেই, বাবা তো চলে গেলেন। এখন আমার একটাই দাবি, পরিবারের সবার কাছে যেন আমি সন্তান হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা পাই।”
রুবেলের ভাই ইয়াহিয়ার কাছে নিপার পরিচয় জানতে চাইলে বলেন, নিপা তার ভাইয়ের সন্তান।
এর মধ্যেই মর্গের সামনে সাহিদা আক্তার ও রেহানা বেগম পরস্পর আলোচনা করে রুবেলের লাশ প্রথমে মানিকগঞ্জে নেওয়ার বিষয়ে রাজি হন। ঠিক হয়,সেখানে জানাজা শেষে লাশ মেহেরপুরে নিয়ে দাফন করা হবে।

রুবেলের আসল নাম কী
গার্ডার দুর্ঘটনায় সোমবার রাতে উত্তরা পশ্চিম থানায় করা মামলায় রুবেলের নাম রয়েছে আইয়ুব আলী হোসেন রুবেল।
তবে রুবেল তার বাবার প্রকৃত নাম নয় বলে মর্গে দাবি করেছেন তার মেয়ে হিসেবে দাবি করে আসা রত্না।
তিনি বলেন, তার বাবার নাম নুর ইসলাম। সে অনুযায়ী তার জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। গাড়ির কাগজও রয়েছে।
সেই জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম লেখা ছিল নুর ইসলাম। ঠিকানা মানিকগঞ্জ। এই জাতীয় পরিচয়পত্রটি রুবেলেরই বলে দাবি করেন তার ভাই ইয়াহিয়া।
তিনি বলেন, “রুবেল ডাক নাম।”
একাধিক নাম বিভ্রাট ও স্ত্রী-সন্তান দাবির বিষয়টি নিয়ে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রাথমিক তথ্য আমরা পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি।”

লাশের নমুনা সংগ্রহ
বেলা ১২টার পর রুবেলসহ দুর্ঘটনায় নিহত পাঁচজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয় বলে জানান সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক নাশিত জামিল।
তিনি জানান, পুলিশ সুরতহাল রিপোর্টে যা উল্লেখ করেছে, ময়নাতদন্তে সেটাই পাওয়া গেছে।
ডা. জামিল বলেন, “মৃতদেহ থেকে কিছু নমুনা নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিবেদন পাওয়ার পর ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়া হবে।”
ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে ওই পাঁচজনের লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
এদের মধ্যে নিহত ফাহিমা ও তার বোন ঝর্ণা এবং দুই শিশুর মরদেহ জামালপুরে নিয়ে দাফন করা হবে বলে তার স্বজনরা জানিয়েছেন।