সুন্দরবনে মাছের মজুদ: বেড়েছে ৯ প্রজাতির, কমেছে ৬
গবেষণায় প্রথমবারের মতো নথিভুক্ত হয়েছে ৫ প্রজাতির মাছ; নতুন দুই প্রজাতির চিংড়ির সন্ধানও মিলেছে।
অবৈধভাবে মাছ আহরণ, পোনা ধরা ও পরিবেশগত নানা প্রতিকূলতায় সুন্দরবনে অন্তত ছয় প্রজাতির মাছের মজুদ কমছে।
তবে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ায় ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে নয় প্রজাতির মাছ; বাকি প্রজাতিগুলোর মজুদ সহনীয় পর্যায়ে।
বছর দুয়েক ধরে ‘অ্যাসেসমেন্ট অব অ্যাকুয়েটিক রিসোর্চেস অব দ্য সুন্দরবন’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসার কথা বলেছেন বিশ্লেষকরা।
মূলত মাছের মজুদ বুঝতেই এ গবেষণায় নামেন বিশেষজ্ঞরা। তাতে অলুয়া/আমাদি, পারশে, ভেটকি/কোরাল, পোয়া, দাতিনা, গ্যাগড়া টেংরা, পাঙ্গাস, হরিণা চিংড়ি ও চাকা চিংড়ি— এই নয় প্রজাতির মাছের মজুদ বাড়তির দিকে রয়েছে।
আর মজুদ কমতির দিকে রয়েছে— পায়রা/চিত্রা/বিষতারা, নোনা টেংরা, কাইন মাগুর, গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ী ও শীলা কাকড়ার।
সুন্দরবনের জলজসম্পদের সার্বিক মূল্যায়নচিত্র তুলে ধরে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণসহ নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জলজসম্পদ, বিশেষ করে মাছের মজুদ, হুমকি, করণীয় বিষয়ে সুপারিশ পাওয়ার পরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হকের নেতৃত্বে আরও আট গবেষক এ গবেষণা চালান।
ড. এনামুল হক বলেন, “আমাদের মূল কাজ ছিল মাছের বর্তমান অবস্থা, মজুদের পরিমাণ, হুমকি ও ভবিষ্যতের ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করা। দেখা গেছে, আগে সুন্দরবনে বড় প্রজাতির মাছের (যেমন ভেটকি) প্রাচুর্য বেশি থাকলেও এখন ছোট আকারের প্রজাতিগুলোর প্রাচুর্য কিছুটা বেড়েছে।”
তিনি জানান, এই গবেষণায় প্রথমবারের মতো ডিএনএ বারকোডিংয়ের মাধ্যমে ৭টি প্রজাতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে।
সুন্দরবনে মাছের মজুদের কী অবস্থা জানতে চাইলে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, “আমরা প্রায় ১৫টি মাছ ও চিংড়ির প্রজাতির মজুদ বা স্টক স্ট্যাটাস নিয়ে বিশ্লেষণ করেছি। এর মধ্যে অন্তত ছয় প্রজাতির মজুদ কমতির দিকে, যা উদ্বেগের। অন্যদিকে বাকি প্রজাতির মাছগুলোর মজুদ সহনশীল বা স্থিতিশীল মাত্রায় আছে। যেসব মাছের মজুদ কমছে, সেগুলোর সুরক্ষায় বন বিভাগ জালের ফাঁস বা আহরণের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে।”
সুন্দরবনে মাছের মজুদ বাড়াতে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা-
>> সাতক্ষীরা রেঞ্জে ভেটকি মাছের অতিরিক্ত আহরণ হচ্ছে, মাছ ধরার চাপ কমাতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এর জন্য আহরণের কোটা কমানো, প্রজননকালে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা এবং পোনা রক্ষার জন্য ব্যবস্থা জরুরি।
>> পাঙ্গাস মাছের ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে খুলনা ও শরণখোলায় এর মজুদ চাপে রয়েছে।
>> শরণখোলায় গ্যাগড়া টেংরা মাছের অতিরিক্ত আহরণ হচ্ছ। সাতক্ষীরা ও চাঁদপাই রেঞ্জে কঠোর নিয়ন্ত্রণসহ টেকসই আহরণ নিশ্চিত করায় ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রয়োজন।
>> কাইন মাগুর মাছেরও অতিরিক্ত আহরণ হচ্ছে। যদিও এর পরিমাণ কমে যাওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য।
>> শীলা কাঁকড়ার অতিরিক্ত আহরণ হচ্ছে, মাছ ধরায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
>> গোলদা ও বাগদা চিংড়ি মাছের অতিরিক্ত আহরণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, এর জন্য কঠোরভাবে আহরণ সীমিত করা প্রয়োজন।
>> আমাদি, পারশে,, পোয়া, দাতিনা, হরিনা ও চাকা চিংড়ি সহ অন্যান্য প্রজাতিগুলো নিরাপদ সীমার মধ্যে রয়েছে।
নতুন সাতটিসহ সব মিলিয়ে ৩৮২ প্রজাতি
বন অধিদপ্তরের ‘প্রটেকশন অব সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট প্রজেক্ট-পিএসএমএফপি’ এর অধীনে আরণ্যক ফাউন্ডেশন ও সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) এ গবেষণা চালায়।
এ গবেষণায় জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা, মৎস্য জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ, শামুক-ঝিনুক সম্পদের মূল্যায়ন, মাছ ও শামুক-ঝিনুকের মজুদ মূল্যায়ন, সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদের ডিএনএ শ্রেণিবিন্যাস, সুন্দরবনের অ-মৎস্য প্রজাতি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ব্যবস্থাপনাগত হস্তক্ষেপ, নীতিগত নির্দেশনা ও বিধিবিধান সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়।
সমীক্ষা দলের প্রধান বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক এনামুল হক বলেন, “সুন্দরবনে আগে রেকর্ড করা হয়নি, এমন সাতটি নতুন প্রজাতির মাছ পাওয়া গেছে। তবে এটি আমাদের কাজের একটি অংশ মাত্র। সামগ্রিকভাবে দুই বছরের স্টাডিতে আমরা প্রায় ২৬১ প্রজাতির মাছ পেয়েছি। পূর্ববর্তী গবেষণা ও আমাদের কাজ মিলে বর্তমানে সুন্দরবনে প্রায় ৩৮২ প্রজাতির মাছের তথ্য পাওয়া যায়।”
তিনি জানান, নতুন নথিভুক্ত মাছের মধ্যে রয়েছে -এক ঠ্ইুটা ( Dermogenys burmanica), কুলি বেলে (Butis humeralis), সবুজ বাইল বা ফোঁটা বেলে (Acentrogobius viridipunctatus), ফোটা বাট (Crenimugil seheli) ও বড় আইশ পারশে (Planiliza macrolepis)।
নতুন দুই প্রজাতির চিংড়ির মধ্যে রয়েছে মাকড়সা চিংড়ি (Nematopalaemon tenuipes) ও ফোঁটা চিংড়ি (Cloridopsis scorpio)।
কেমন আছে মৎস্য সম্পদ, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদের প্রধান সমস্যা খালে বিষ ছিটিয়ে মাছ ধরা। ছোট পোনা বা রেণু আহরণও বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনছে।
তারা বলছেন, পোনা সংগ্রহের পর শুধু নির্দিষ্ট প্রজাতি রেখে বাকি ক্ষুদ্র জলজ প্রাণীগুলো ফেলে দেওয়া হয়, যা মারা যায়। বর্তমানে সুন্দরবন সংরক্ষণে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো, বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করা এবং নিয়মিত মনিটরিং করা।
জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংগঠন আইইউসিএনের সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল লোকজনের জীবিকার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো মাছ। যারা মাছের ওপর নির্ভরশীল, অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় এর উৎপাদন বাড়ানো দরকার।
চলমান ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন প্রজেক্টের টিম লিডার এ বিশেষজ্ঞ বলেন, “সুন্দরবনে এখন গাছ কাটা বন্ধ রয়েছে। এখন অন্যতম অর্থনৈতিক খাত হচ্ছে মাছ। সেক্ষেত্রে এর সমৃদ্ধির জন্য অবৈধ মৎস্য শিকার, বিষটোপ দিয়ে মাছ মারা, ছোট পোনা ধরা বন্ধ করতে হবে। সুন্দরবনে মাছের মজুদ বাড়াতে অবৈধ শিকার রোধে কার্যকর অভিযানের পাশাপাশি এর প্রজাতির প্রজননের অনুকূল পরিবেশ রাখা, মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পদক্ষেপ জরুরি।”
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক (খুলনা অঞ্চল) ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় তদারকিমূলক নিয়মিত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। চলমান গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে চূড়ান্ত কর্মশালাও হবে।
“এ স্টাডি থেকে নতুন যেসব সুপারিশ আসবে, তা বাস্তবায়নের প্রস্তাব করব। এ ধরনের গবেষণা প্রতিবেদন সরকারের কাছে পাঠানো হয় এবং এরপর মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও আসবে।”
গবেষণা দলের প্রধান বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক এনামুল হক বলেন, সামগ্রিকভাবে সুন্দরবনের মাছের অবস্থা সন্তোষজনক বলা যায়।
“তবে মানবসৃষ্ট চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার চাপ রয়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো বিষ দিয়ে মাছ ধরা। এটি ছাড়া সার্বিকভাবে মাছের উৎপাদন একটি স্থিতিশীল পজিশনে আছে।”
তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাছের শরীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে। এছাড়া মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাবও পড়ছে। সুন্দরবনের তিনটি ইকোলজিক্যাল জোন রয়েছে (মিঠা পানি, আধা-লবণাক্ত ও বেশি লবণাক্ত জোন)। যেমন বাগেরহাট অঞ্চলে মিঠা পানির মাছের প্রাচুর্য বাড়ছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে লবণসহিষ্ণু মাছের সংখ্যায় তারতম্য দেখা যাচ্ছে।
