১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মেঘনায় ‘দুই-তিন গুণ বেশি জাল’, ইলিশ ধরার নেপথ্যে কারা

জেলে, আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তুলনামূলক কম দামেই এসব ইলিশ বিক্রি হচ্ছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 15 Oct 2026, 09:57 AM

Updated : 15 Oct 2026, 09:57 AM

মা ইলিশ রক্ষায় সরকারিভাবে ঘোষণা দিয়ে বরিশালের মেঘনা নদীতে মাছ ধরা, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও, কার্যত এখন ‘স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি’ জাল ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠেছে।

এর পেছনে হিজলা উপজেলা বিএনপির দুই নেতার নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব কাজ করছে বলে অভিযোগ এলেও তারা সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তবে, নিষিদ্ধ সময়ে মেঘনা নদীতে যে জাল ফেলে ইলিশ ধরা হচ্ছে, সেটি তারা অস্বীকার করছেন না।

জেলে, আড়তদার ও ব্যবসায়ীরাও বলছেন, বাজারে ইলিশ আসছে ও বিক্রি হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তুলনামূলক কম দামেই এসব ইলিশ বিক্রি হচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশ নিষেধাজ্ঞার সময়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও তারা জনবল স্বল্পতায় নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথাও বলেছেন। কোস্ট গার্ডও আলাদাভাবে অভিযান পরিচালনা করছে।

হিজলা উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা কে এম মাহফুজুর রহমান বলেন, “স্বাভাবিক মৌসুমের চেয়ে বর্তমানে মেঘনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি জাল ফেলছেন জেলেরা। অভিযান করে ধাওয়া দিলে সরে যায়।

“জাল তুলতে গেলে ১০-১২ নৌকা সশস্ত্র অবস্থায় হামলা করে। প্রতিদিনই জেলেরা ভয়ঙ্কর আচরণ করছে।”

এদের পেছনে কারা আছে- জানতে চাইলে ওই মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, “সবকিছু বুঝলেও বলা যাচ্ছে না। তবু আমরা চেষ্টা করছি, যতটুকু রক্ষা করা যায়।”

ইলিশে প্রভাব পড়বে

৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশের প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে টানা ২২ দিন ইলিশ মাছ ধরা, বিক্রি, পরিবহন, বিপণন ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার।

এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শুধু মেঘনা নয়, জেলার সব নদীতে মা ইলিশ শিকারে মেতে উঠেছেন জেলেরা। অভিযান চালানোর সময় কিছুক্ষণের জন্য জেলেরা নদী থেকে বিতাড়িত হলেও আবার তারা ফিরে আসছেন।

অনেক ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ হয়ে জেলেরা সশস্ত্র অবস্থায় অভিযানিক দলের উপর হামলা করছে এমন অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নিষেধাজ্ঞার পাঁচদিনেই মৎস্য, নৌ-পুলিশসহ প্রশাসনের নাভিশ্বাস ওঠেছে।

হামলাকারী জেলেদের নিবৃত্ত করতে পাঁচ দিনে কোস্টগার্ড ১১টি ফাঁকা গুলিও করেছে। হামলায় হিজলা উপজেলার মৎস্য অধিদপ্তরের স্পিডবোটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশালের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আলম বলেন, ইলিশ প্রজনন মৌসুমে স্বচ্ছ ও মিষ্টি পানিতে ডিম ছাড়ে। সমুদ্র থেকে উঠার পর সেই স্বচ্ছ ও মিষ্টি পানি পায় মেঘনা নদীর মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়া থেকে পুরো হিজলা অংশে। এই অংশ ১০-১২ নদীর মুখ হওয়ায় এখানে গভীরতা অনেক বেশি। কোনো চর নেই। তাই প্রজনন মৌসুমে প্রচুর ইলিশ এখানে আসে।

“গত বছর কঠোর অভিযানের কারণে এ বছর ইলিশের পরিমাণ ও আকার দুটোই বেড়েছে। কিন্তু সংঘবদ্ধ জেলেদের কারণে মা ইলিশ রক্ষা করা যাচ্ছে না।”

মোহাম্মদ আলম বলেন, মেঘনা নদীর মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়া পর থেকে অন্তত ৬০ কিলোমিটার এলাকা গুরুত্বপূর্ণ। এ এলাকায় মাছ শিকার বন্ধ করতে না পারলে নিষেধাজ্ঞায় কোনো ফল আসবে না। আগামীতে ইলিশ আরো কমে যাবে।

‘নিয়ন্ত্রণ কঠিন’

বরিশাল জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ১০ উপজেলার ৭৯ হাজার ৮৯০ জন নিবন্ধিত জেলেদের মাঝে ১৯৯৭.২৫০ টন চাল বরাদ্দ হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত ১০৮৪.৭০০ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। জেলায় মোট ৮৫ হাজার ২৯৫ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছে।

গত পাঁচ দিনে ২৫ জেলেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানা আদায় হয়েছে ৫১.০১০ লাখ টাকা। জাল উদ্ধার হয়েছে ১৬.২৬৩ লাখ মিটার ও মা ইলিশ ০.২৫০ টন।

হিজলা উপজেলার অন্তত ১০ জন জেলে ও বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার গৌরবদি ইউনিয়নের কাঁকুড়িয়া বাজার সংলগ্ন খাল, ওরাকুল রাস্তার মাথা, ধুলখোলা ইউনিয়নের খেয়াঘাট এবং মাঝেরচর এলাকা মূল মেঘনার পাড়ে। এখানে ২৪ ঘণ্টাই মাছ শিকার, আহরণ ও বিক্রি হচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, হিজলা উপজেলার বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খোকন দপ্তরি এবং সদস্যসচিব দেওয়ান মনির হোসেন মেঘনা নদীর মাছ শিকার ও কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের ছাত্রছায়ায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি আবুপুর লঞ্চ ঘাট, টুমচর নদীর কিনারায় বেবাজিয়া পাড়া, নাচকাটি, ক্রোপ, কাঁকুড়িয়া, অন্তর্বাম, চরকিল্লা, জানপুর তিন নম্বর ঘাট, উলানিয়া নিয়ন্ত্রণ করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি নেতা ও সংশ্লিষ্টরা মাছ বিক্রির পর শতকরা ১০ শতাংশ টাকা নিয়ে নিচ্ছেন। নদীতে প্রতিটি জালের জন্য গড়ে দুই হাজার টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।

হিজলা উপজেলার একজন সংবাদকর্মী বলেন, মেঘনা নদী বর্তমানে জেলেদের দখলে। অভিযান হয় আশপাশের ছোট নদীতে। সেখানেও তারা হামলার শিকার হয়।

তিনি বলেন, “ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা এ বিষয়ে কোনো ধরনের সংবাদ প্রচার করতে নিষেধ করেছেন। সংবাদ যাতে না হয় সেজন্য তাদের লোকও আছে।”

হিজলার মেঘনা নদীর প্রবীণ জেলে মোতালেব হোসেন বেপারী বলেন, “এ বছর মেঘনা নদীতে প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে। এ কারণে জেলেদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। হাজার হাজার জেলে মাছ শিকার করছে।

“কোনো বাহিনীর পক্ষে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। যদি ১০টি বাহিনীও একত্র হয়, তবু তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।”

হিজলা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইয়াছিনুল হক বলেন, “মেঘনা অনেক বড় নদী। সেই তুলনায় আমাদের লোকবল খুবই কম। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেরা হিংস্র হয়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে সেই ধরনের আচরণ তো করা যায় না। রাতের বেলায় অভিযানে গিয়ে সবাইকে ঝুঁকিতে ফেলা হয়। অভিযান করা হয়, আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী।”

‘প্রভাবশালী’ ২ নেতার সহায়তা চেয়েছে প্রশাসন

অভিযোগের বিষয়ে হিজলা উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খোকন দপ্তরি মঙ্গলবার রাতে বলেন, “মেঘনায় মাছ ধরা পড়ছে। তবে আমি জানি না। আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না।”

অভিযোগের বিষয়ে হিজলা উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব দেয়ান মনির হোসেন বলেন, “আমরা সরকারের পক্ষে আছি। যারা মাছ শিকার করবে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। আমার প্রশাসনের পক্ষে রয়েছি।”

এসব বিষয়ে হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস সিকদার বলেন, “দুই প্রভাবশালী নেতাকে ডেকে নিষেধাজ্ঞা সময়ে যেন মাছ শিকার না করে সেই সহায়তা চাওয়া হয়েছে। রাতের বেলায় সব সময় অভিযান করা হয় না। দুই-একবার করা হয়, ফাঁকা সময়ের সুযোগ নিয়ে শিকার করে। আমরা চেষ্টা করছি, সেটা বন্ধ করার।”

কম দামে বিক্রি

হিজলার ওরাকুল মাছ ঘাটের আড়তে প্রতিদিন ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে। তবে এ নিয়ে কেউ কথা বলতে চান না।

মাছ বিক্রির বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক আড়তদারকে মোবাইল করা হলে তিনি ফোন ধরে পরিচয় জানতে চান। পরে সাংবাদিক পরিচয় দিলে তিনি আড়তে ইলিশ মাছ বিক্রি হয় না বলে ফোন কেটে দেন।

তবে একজন আড়তদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ইলিশ আসছে ও বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু যারা এটি নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাদের ভয়ে কেউ কথা বলেন না।”

তিনি বলেন, এখন প্রায় এক কেজির ওজনের প্রতি হালি ইলিশ প্রায় ছয় হাজার টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এ ধরনের ইলিশ প্রতিটি প্রায় আড়াই হাজার টাকা কেজিদরে বিক্রি হয়।

“আড়াইশ গ্রামের ইলিশ, চারটিতে এক কেজি হয়- এমন ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা করে। এ ধরনের ইলিশ সাধারণত ৭৫০-৮০০ টাকায় বিক্রি হয়।”

নিষেধাজ্ঞার সময়ে বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “মেঘনা নদীর ৬০ কিলোমিটার এলাকা গুরুত্বপূর্ণ। এ এলাকায় নৌ-বাহিনীর একটি জাহাজ যদি মোতায়েন করা যেত, সঙ্গে কোস্ট গার্ড ও পুলিশ থাকলে মাছ শিকার বন্ধ করা যেত। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে অনেক কিছুই তো আমরা বলতে পারি না।”