৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

২২ দিন পর পদ্মা-মেঘনায় মাছ ধরা শুরু, সরগরম চাঁদপুরের মাছ ঘাট

“এক শ্রেণির জেলে নিষেধাজ্ঞার সময় মা ইলিশ শিকার করেছেন। প্রশাসন তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 30 Oct 2026, 06:22 PM

Updated : 30 Oct 2026, 06:37 PM

২২ দিনের অপেক্ষার অবসান। আবারও ইলিশের আশায় পদ্মা-মেঘনার বুকে ছুটছেন হাজারো জেলে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকেই জাল-নৌকা নিয়ে নদীতে নামতে শুরু করেন তারা।

কারও জালে ধরা পড়েছে রুপালি ইলিশ, কারও জালে ইলিশের সঙ্গে উঠেছে পাঙাশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। ভোরের আলো ফুটতেই মাছ নিয়ে জেলেদের নৌকা ভিড়তে শুরু করে চাঁদপুরের হরিণা মাছঘাটে।

দীর্ঘ বিরতির পর জেলেদের পদচারণ, মাছের কেনাবেচা আর আড়তদারদের হাঁকডাকে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে ঘাটটি।

শুক্রবার সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত সদর উপজেলার হরিণা ফেরিঘাট-সংলগ্ন মাছঘাটে দেখা যায়, একের পর এক নৌকা এসে ভিড়ছে। নৌকা থেকে নামানো হচ্ছে প্লাস্টিকের ঝুড়িতে সাজানো ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।

মাছ নামানোর পরপরই শুরু হচ্ছে দরদাম। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে কিছুক্ষণের মধ্যেই জমে উঠছে আড়তগুলো।

নদীতে প্রথম দফায় মাছ পেয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে জেলেদের মুখে। ঘাটের পাশের গোবিন্দপুর গ্রামের জেলে লিটন তপাদার রাতে নদীতে নেমে ভোরে ঘাটে এসে ১২ হাজার টাকার ইলিশ বিক্রি করেছেন।

তিনি বলেন, এভাবে ইলিশ পাওয়া গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারবেন। নদীতে ইলিশের সরবরাহ অব্যাহত থাকবে বলে তাদের প্রত্যাশা।

এদিকে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় ধারাবাহিক অভিযান এবং নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের ফলে ‘সুফল’ মিলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘাটটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০টি ইলিশের আড়ত রয়েছে। এসব আড়তে আসা মাছের বড় অংশই সংরক্ষণ না করে দ্রুত বিক্রি করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, একদল খুচরা ব্যবসায়ী শহরের বাজারে বিক্রির জন্য মাছ কিনছেন। অন্যদিকে বড় স্টেশন মাছ অবতরণ কেন্দ্রে নিয়ে বিক্রির জন্য মাছ কিনছেন আরেক দল ব্যবসায়ী। ফলে জেলে, আড়তদার, শ্রমিক ও পাইকারদের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো মাছঘাট।

সাতজনের একটি দল নিয়ে মধ্যরাতে নদীতে নেমেছিলেন জেলে আবুল কালাম খান। তাদের ধরা মাছ বিক্রি হয়েছে ১৫ হাজার টাকায়। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবারও নদীতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।

আবুল কালাম বলেন, কয়েক দিন পর ইলিশের প্রাপ্যতা কমে আসতে পারে। তাই শুরুতেই যতটা সম্ভব মাছ ধরার চেষ্টা করছে।

তবে নদীতে মাছ ধরার উৎসব ফিরলেও বাজারে এখনো কমেনি ইলিশের দাম। হরিণা মাছঘাটের আড়তদার জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। আর ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি হালি ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়।

ইলিশের পাশাপাশি পাঙাশও আসছে জেলেদের জালে। আকারভেদে বড় পাঙাশের কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ছোট পাঙাশের কেজি ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

জাহাঙ্গীর হোসেনের ভাষ্য, “ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় দাম কমার সম্ভাবনা কম। তবে মাছের সরবরাহ বাড়লে দামে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে।”

মো. সেলিম নামের আরেক আড়তদার বলেন, “সকালে মাছ আসতে শুরু করেছে। আজকে আর আগামীকাল মাছের সরবরাহ দেখে পরিস্থিতি বোঝা যাবে। আগের বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রথম দুই দিন ভালো মাছ এলেও পরে সরবরাহ কমে যেতে দেখা গেছে।”

আড়তদার ইব্রাহীম মিয়ার পর্যবেক্ষণ, নিষেধাজ্ঞা শেষে এবার বড় আকারের ইলিশ তুলনামূলক বেশি আসছে। ছোট ইলিশের সংখ্যা কম। ইলিশের পরিমাণ আশানুরূপ না হলেও পাঙাশ পাওয়ায় জেলেদের কিছুটা লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে মাছঘাটের প্রবীণ ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম ছৈয়ালের কণ্ঠে রয়েছে হতাশা। তার মতে, একসময় এ সময়ে নদীতে ইলিশের প্রাচুর্য থাকত। এবার সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, “এক শ্রেণির জেলে নিষেধাজ্ঞার সময় মা ইলিশ শিকার করেছেন। প্রশাসন তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।”

ফলে অভিযান চালিয়েও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি বলে মনে করেন তিনি।

এ দিকে চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারকের ভাষ্য, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় দুটি অভিযান কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করায় জেলেরা এখন সুফল পাচ্ছেন। ইলিশের পাশাপাশি পাঙাশও পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, পাঙাশের উৎপাদন বাড়াতে সরকারিভাবে প্রকল্প নেওয়া হলে এ মাছও ইলিশের মতো জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।