Published : 29 Jul 2026, 01:11 AM
শিকারিদের পাতা ফাঁদে আহত হয়ে ছয় মাস পুনর্বাসনকেন্দ্রে কাটানোর পর আবার সুন্দরবনে ফিরেছে একটি বাঘিনী। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত একটি আহত বাঘকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি বাঘিনীকে সুস্থ করে বনে ফিরিয়ে দিলেই সুন্দরবনের বাঘ নিরাপদ হয়ে যাবে না। চোরাশিকার, বিষটোপ দিয়ে মাছ ধরা, বনদস্যুদের তৎপরতা এবং আবাসস্থলের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এখনও রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের জন্য বড় হুমকি।
সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শরকির খালসংলগ্ন বনাঞ্চলে গত ৩ জানুয়ারি হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে সেই বাঘিনী।
পরদিন ট্রাঙ্কুইলাইজার গান ব্যবহার করে অচেতন করার পর ফাঁদ কেটে তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে লোহার খাঁচায় করে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে ছয় মাস চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর গত ১২ জুলাই বাঘিনীটিকে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়।
সুন্দরবনে হরিণশিকারীদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে আহত বাঘিনী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার পর ১২ জুলাই সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের আন্ধারমানিক ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে তাকে অবমুক্ত করা হয়
উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলছেন, আহত বাঘকে চিকিৎসা দিয়ে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার এই ঘটনা দেশের সংরক্ষণ সক্ষমতার নতুন দৃষ্টান্ত।
তিনি বলেন, “আহত বাঘিনীকে সুস্থ করে বনে ফেরানোর মত ঘটনা প্রথমবারের মত হল। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এটা এখন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
তবে সেই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, “বাঘের অন্যতম খাবার শিকার বন্ধ না হওয়া, সেই সঙ্গে আবাসস্থলে বিষটোপ দিয়ে প্রতিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। খাদ্যচক্র নিরাপদ করতে হবে, সেই সঙ্গে বনজীবীদের আস্থায় এনে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) মোংলা অঞ্চলের সংগঠক নূর আলম শেখের মতে, দুই দশক ধরে সুন্দরবনের বাঘ নানা সংকটের মুখে রয়েছে।
তিনি বলেন, হরিণ শিকার অব্যাহত থাকায় বাঘের প্রধান খাদ্যের সংকট তৈরি হচ্ছে। আবার বিষটোপ দিয়ে মাছ ধরার কারণে খাদ্যচক্রও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মৃত বাঘের ময়নাতদন্তে বিষক্রিয়ার আলামত পাওয়া গেছে।
তার ভাষায়, “হরিণ শিকারীদের ফাঁদে আটকা পড়েছে একটা বাঘ, এটাকে সুস্থ করে ফিরিয়ে দিল। কিন্তু বাঘটা যে ফাঁদে পড়ল, সেই হরিণ শিকার তো বন্ধ হয়নি, যারা ফাঁদ পাতল, তারা ধরা পড়েছে কিনা। বনটাকে সামগ্রিকভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে। অপরাধীরা তো তৎপরতা রযেছে।”
নূর আলম শেখ মনে করেন, পুরো বনাঞ্চলকে নিরাপদ করতে না পারলে বিচ্ছিন্ন সফলতা দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি ফল দেবে না।
সুন্দরবনে হরিণশিকারীদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে আহত বাঘিনী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার পর রোববার সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের আন্ধারমানিক ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে তাকে অবমুক্ত করা হয়
কেমন আছে সেই বাঘিনী
প্রায় ৯ থেকে ১০ বছর বয়সী এবং প্রায় আট ফুট লম্বা বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার পর তার চলাফেরা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা হয়। খাঁচা থেকে বেরিয়ে শুরুতে কিছুটা হেলে-দুলে হাঁটার ভিডিও দেখে অনেকে তার শারীরিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
তবে বাঘ গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ বলছেন, অবমুক্ত করার আগে বাঘিনীর শারীরিক সক্ষমতা ও শিকারের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি একাধিক ধাপে পরীক্ষা করা হয়েছিল।
তার ভাষ্য, উদ্ধারের সময় আহত হলেও পুনর্বাসনকেন্দ্রে ছয় মাস সাত দিন চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে ছিল সেই বাঘিনী। শুরুতে তাকে মাংস খাওয়ানো হলেও শেষ দেড় মাস জীবন্ত ছাগল ও বুনো শূকর দেওয়া হয়, যাতে তার শিকারের স্বাভাবিক দক্ষতা ফিরে আসে।
তিনি বলেন, “বিহেভিয়ার অবজারভেশন, হান্টিং স্কিল এবং শিকারের কৌশল মূল্যায়নের পর চিকিৎসক ও আচরণ পর্যবেক্ষণকারী দল আলাদাভাবে নিশ্চিত হয় যে বাঘিনীটি অবমুক্তির জন্য উপযুক্ত।"
প্রথম অভিজ্ঞতায় কিছু ‘সীমাবদ্ধতা’
অধ্যাপক আজিজ জানান, বাঘিনীটিকে রাত ৩টার দিকে অজ্ঞান করা হয়েছিল। খুলনা থেকে সড়কপথে মোংলা এবং পরে নৌপথে অবমুক্তির স্থানে নেওয়ায় দীর্ঘ সময় তাকে খাঁচার ভেতর থাকতে হয়।
তার মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল।
তিনি বলেন, দেশের জন্য এটি প্রথম অভিজ্ঞতা। পরে তাদের মনে হয়েছে, খাঁচার নকশায় কিছু ‘উন্নতির সুযোগ’ ছিল। বিশেষ করে ভেন্টিলেশন আরও ভালো হওয়া প্রয়োজন ছিল।
আজিজ বলেন, অবমুক্ত করার দিন আবহাওয়াও অনুকূলে ছিল না। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির কারণে বাতাসে আর্দ্রতা ছিল বেশি। ফলে দীর্ঘ সময় কম বায়ু চলাচলের খাঁচায় ভ্রমণ বাঘিনীর জন্য শারীরিক ধকল তৈরি করেছিল।
তার সঙ্গে অবমুক্তির সময় বিপুলসংখ্যক আলোকচিত্রী, সাংবাদিক, কনটেন্ট নির্মাতা ও অন্যান্য মানুষের উপস্থিতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
অধ্যাপক আজিজের মতে, খাঁচা থেকে বেরিয়ে শুরুতে বাঘিনীটির কিছুটা ধীরগতিতে হাঁটার পেছনে শারীরিক দুর্বলতার চেয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ, গরম আবহাওয়া, মানুষের উপস্থিতি এবং ড্রোনের শব্দ বেশি ভূমিকা রেখেছিল।
তিনি বলেন, "খাঁচা থেকে বের হতে কিছুটা সময় নিলেও তার কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা ছিল না। শারীরিকভাবে সে পুরোপুরি সুস্থ ছিল।"
ক্যামেরায় নজরদারিতে বাঘিনী
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, ওই বাঘিনীকে উদ্ধারস্থল থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরের একটি বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে।
ওই এলাকায় ১৯টি এবং উদ্ধারস্থলের আশপাশে আরও একটি ইনফ্রারেড ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এসব ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও ও স্থিরচিত্র ধারণ করবে, যার মাধ্যমে বাঘিনীটির চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
রেজাউল করিম বলেন, বাঘিনী হওয়ায় তার বিচরণক্ষেত্র তুলনামূলক ছোট। সেখানে খাদ্যেরও সংকট নেই। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সে নিরাপদ পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছে।
কয়েক সপ্তাহের পর্যবেক্ষণের পর ক্যামেরার ভিডিও বিশ্লেষণ করে বাঘিনীর অবস্থা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করেন তিনি।
এই বন কর্মকর্তা বলেন, আহত বন্যপ্রাণীকে চিকিৎসা দিয়ে পুনর্বাসনের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল এবং স্থায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন।
চোরাশিকারবিরোধী অভিযানে কী মিলছে
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুন্দরবনে চোরাশিকার দমনে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। হরিণ শিকার রোধ, বাঘের আবাসস্থল সুরক্ষা, নিয়মিত টহল এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার মত নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সুন্দরবনে ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম (ভিটিআরটি) সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। স্মার্ট প্যাট্রোলিং সফটওয়্যার, ড্রোন ও আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধ শনাক্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, গত তিন বছরে প্রায় দেড় হাজার কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময়ে ৯৬টি মামলা হয়েছে, যাতে আসামি ২০৪ জন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৪৯ জন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৮০০ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়। গত এক বছরে এক লাখ ১৪ হাজার ফুটের বেশি 'মালা ফাঁদ', ৮১৩টি ছিটকা ফাঁদ এবং প্রায় আড়াই হাজার হাঁটা ফাঁদ উদ্ধার করেছে বন বিভাগ।
রেজাউল করিমের ভাষ্য, সুন্দরবনে বর্তমানে লক্ষাধিক হরিণ রয়েছে, যা বাঘের খাদ্যসংস্থান বজায় রাখতে সহায়ক।
|
পূর্ব বনবিভাগ কার্যক্রম |
২০২৩-২৪ |
২০২৪-২৫ |
২০২৫-২৬ |
|
হরিণের মাংস |
৩৯৫ কেজি |
৭৯৩ কেজি |
২৪৯.৫ কেজি |
|
মালা ফাঁদ |
৪,৮৬০ ফুট ও ২ বস্তা |
২৪,৬৪৮ ফুট ও ২ বস্তা |
১,১৪,৫৫৩ ফুট |
|
মামলা/আসামি |
২৭টি আসামি ৫৫, গ্রেপ্তার ৪৪ |
৩৭টি আসামি ৭২, গ্রেপ্তার ৩৫ |
৩২টি আসামি ৭৭, গ্রেপ্তার ৭০ |
|
পশ্চিম বনবিভাগ কার্যক্রম |
২০২৩-২৪ |
২০২৪-২৫ |
২০২৫-২৬ |
|
হরিণের মাংস |
৫১৪ কেজি |
৯৩১.৭ কেজি |
৫৭১ কেজি |
|
মালা ফাঁদ |
১২০ মিটার |
১১৫টি ও ৫০০ ফুট |
১০০ মিটার ৫৪৩টি ১১০০ ফুট ও ১০০ হাত |
|
মামলা/আসাসি |
৩৮টি আসামি ৯৫, গ্রেপ্তার ২০ |
৫০টি আসামি ১১২, গ্রেপ্তার ১২ |
৩১টি আসামি ৪১, গ্রেপ্তার ২১ |
অন্যদিকে, সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, পশ্চিম অংশেও অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
গত তিন বছরের মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ৯৩১ কেজির বেশি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি মালা ফাঁদ উদ্ধারের পাশাপাশি অন্তত ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলেদের বিকল্প সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে জুলাই-আগস্ট মাসের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা চলাকালে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার ১২ উপজেলার ৮ হাজার ২৭১ জন জেলেকে মাসে ৪০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে। বন বিভাগের আশা, এতে বনজ সম্পদের ওপর চাপ কিছুটা কমবে।
পটপরিবর্তনের পর নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রভাব সুন্দরবনেও পড়ে।
বাঘ গবেষক অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, ওই সময় বনদস্যু ও চোরাকারবারিদের তৎপরতা বেড়ে যায়। অনেকেই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চলেও মাছ ধরা ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বাইরে সুন্দরবন থাকবে–এমনটি আশা করা ‘বোকামি’। ফলে সংরক্ষিত এলাকাতেও অবৈধভাবে মাছ ধরা, চোরাচালান এবং ডাকাতির ঘটনা বেড়েছে।
তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিপুল পরিমাণ হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধারের ঘটনাও প্রমাণ করে যে চোরাশিকারের ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি।
সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা: কোথায় ছিল, কোথায় এসেছে
বিশ্বে বর্তমানে যেসব দেশে বন্য পরিবেশে বাঘ রয়েছে, বাংলাদেশ তাদের একটি। একসময় ১৩টি দেশে বাঘ থাকলেও এখন দেশটির সংখ্যা কমে দশে নেমেছে।
বাংলাদেশের জাতীয় প্রাণী রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে মহাবিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে আইইউসিএন বাংলাদেশ। বন বিভাগের সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ১২৫। এর আগে ২০১৫ সালে ছিল ১০৬টি এবং ২০১৮ সালে ১১৪টি।
আইইউসিএন বাংলাদেশের সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ২০০৪-০৫ সালের দিকে পায়ের ছাপ (পাগমার্ক) পদ্ধতিতে সুন্দরবনে চার শতাধিক বাঘ থাকার দাবি করা হয়েছিল।
তবে ওই পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে পরে প্রশ্ন ওঠে।
নিয়াজ আহমেদ খানের ভাষ্য, পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও তখন বাঘের সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে বেশি ছিল বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে ধারণা পাওয়া যায়।
২০১০ এর দশকের শুরুতে চোরাশিকার, বনদস্যুদের তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের কারণে সুন্দরবনের বাঘ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ক্যামেরা ট্র্যাপসহ আধুনিক পদ্ধতিতে জরিপ হওয়ায় বর্তমান তথ্যকে তুলনামূলক বেশি নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেন তিনি।
সংরক্ষণে আরও কী প্রয়োজন
অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানের মতে, শুধু বাঘ গণনা নয়, নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বন বিভাগের গবেষণা সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে।
ভারতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বাঘের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের ধারাবাহিক উদ্যোগ থাকলে সংখ্যাটি আরও বাড়ানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
নিয়াজ আহমেদের মতে, সুন্দরবনে পরিবেশবান্ধব ইকোট্যুরিজম থাকতে পারে, তবে বিলাসবহুল পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা বনটির প্রতিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযান, নিয়মিত ফুট প্যাট্রোলিং, হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার এবং বনজীবীদের সম্পৃক্ত করার কারণে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রভাব সুন্দরবনেও পড়েছিল এবং বনদস্যুদের তৎপরতা কিছু সময়ের জন্য বেড়ে গিয়েছিল।
“বর্তমানে সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে,” বলেন রেজাউল করিম।
'একটি বাঘিনী ফিরলেই সুন্দরবন নিরাপদ নয়'
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরার সদস্যসচিব শরীফ জামিল বলেন, আহত একটি বাঘিনীকে বনে ফিরিয়ে দেওয়া অবশ্যই ‘ইতিবাচক’ ঘটনা; কিন্তু এটিকে সুন্দরবনের সার্বিক উন্নতির প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না।
“এখানে আশপাশে দূষণ উৎপাদনকারী শিল্পায়ন হচ্ছে তাতে দিন দিন ধ্বসের দিকে যাচ্ছে সুন্দরবন। এখানে কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষাটা যেন বর্তমান সরকার যথাযথভাবে করে। বাঘের পরিবেশ রক্ষায় এবং সুন্দরবন টিকিয়ে রাখতে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।”
ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল ইসলামও একই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “কোনোভাবেই হরিণ শিকার করতে দেওয়া যাবে না; খাদ্যচক্র ঠিক রাখতে হবে। এখন নতুন সরকার এসেছে, গ্রিন প্রাইমমিনিস্টার হিসেবে নানা উদ্যোগও নিচ্ছে। আশা করি, সরকার সুন্দরবন রক্ষায়ও সচেষ্ট থাকবেন। সুন্দরবন সুরক্ষিত থাকলে বাঘও সুরক্ষিত থাকবে।”