১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

শেষ বিদায়ের মাঠে কফিনবন্দি খালিদী, স্মৃতিদের ভিড়

“বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় সম্পাদকীয় স্বাধীনতার পক্ষে যারা কাজ করেন, তাদের জন্যও একটি মডেল ছিলেন।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 10 Oct 2026, 08:12 PM

Updated : 10 Oct 2026, 08:43 PM

বাংলাদেশের সংবাদসেবাকে ডিজিটাল দুনিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার পুরোধা তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় শেষ বিদায় জানালেন তার বন্ধু, স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা। কান্না আর শোক নিয়ে তারা স্মৃতিচারণ করেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রয়াত প্রধান সম্পাদককে নিয়ে।

শনিবার দুপুর আড়াইটায় বনানীর ওল্ড ডিওএইচএস খেলার মাঠে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রয়াত প্রধান সম্পাদকের শেষযাত্রা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এক পশলা বৃষ্টি থেমে তখন ঝলমলে রোদ ওঠে।

শ্রদ্ধা জানাতে আসা এলজিআরডি মন্ত্রী আবদুল মঈন খান বলছিলেন, তার কাছে সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রয়াণ এখনও ‘অবিশ্বাস্য’ ঠেকছে।

“তার মৃত্যুর সংবাদটি যখন পেয়েছি, আমি অবাক হয়ে গিয়েছি এবং আমি আজকে পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারিনি। তার মুখের দিকে যখন একটু আগে তাকিয়েছি, আমার মনে হচ্ছে—তিনি জীবন্ত হয়ে আমার সামনে উপস্থিত হয়েছেন।”

খালিদীর সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সূত্র ধরেই তাদের পরিচয় হয়েছিল। পরে সেই সম্পর্ক ‘রূপ নেয় বন্ধুত্বে’।

প্রবীণ রাজনীতিক মঈন খান বলেন, “খালিদী শুধু সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার বিশ্লেষণও গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হবে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী ১৯৯১ সালে এস এম আলী সম্পাদিত ডেইলি স্টারে কূটনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন। কাজ করেন প্রায় দুই বছর।

এরপর ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসসহ অন্যত্র কাজ করে ১৯৯৭ সালে আবার যখন ডেইলি স্টারে ফেরেন, তখন সম্পাদকের আসনে মাহফুজ আনাম।

২০০০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তৌফিক খালিদী ডেইলি স্টারে কাজ করেছেন যুগ্ম বার্তা সম্পাদক এবং বাণিজ্য ও অর্থনীতি ডেস্কের প্রধানসহ বিভিন্ন পদে।

সাবেক সহকর্মীর স্মৃতিচারণ করে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, “এ ইয়াং ম্যান, ভেরি এনার্জেটিক, ভেরি ব্রাইট…।”

তিনি বলেন, “যেজন্য আমি তাকে (খালিদীকে) শ্রদ্ধা জানাতে চাই, সেটা হলো—টু সেট আপ হিজ ইনস্টিটিউশন। আমরা অনেকেই সাংবাদিকতায় জীবন উৎসর্গ করেছি, কিন্তু বিডিনিউজের মতো একটি সংস্থাকে সে সেবা করেছে। সে শুধু সেটাকে সেট আপই করেনি, এটাকে সে পরিচালনাও করেছে।

“আমি সবসময়ই মনে করি, যে সাংবাদিক এমন একটা প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়, যে সাংবাদিক প্রতিষ্ঠানকে নৈতিকতার মধ্য দিয়ে পরিচালনা করে, যার সংগঠন সাংবাদিককেন্দ্রিক মূল্যবোধ, সাংবাদিককেন্দ্রিক স্বাধীনতা ও সাংবাদিককেন্দ্রিক নৈতিকতাকে ধারণ করে—ইথিক্স অব জার্নালিজম; তিনি কিন্তু তার সংগঠনে প্রতিষ্ঠা করেছেন।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে সাংবাদিক ও মানুষ হিসেবে ‘অতুলনীয়’ বলে বর্ণনা করেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমার মনে আছে, ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিতে যখন ভাষা শহীদদের ওপর গুলি করাহয়, পরদিন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় একটা ঐতিহাসিক শিরোনাম হয়েছিল। সে শিরোনামটি লিখেছিলেন আমাদের প্রয়াত একজন বিখ্যাত সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত। তিনি ওই পত্রিকার নিউজ এডিটর ছিলেন।

“‘তিনি লিখেছিলেন যে- মৃত্যুর জানাজা মোরা কিছুতেই করিব না পাঠ, কবরেও ঘুম ভাঙে, জীবনের দাবী আজ এতই বিরাট’। তেমনই তৌফিক ইমরোজ খালিদীর জীবনের দাবি আমরা সবাই অনুভব করি। তিনি বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এক ধরনের পথিকৃৎ ছিলেন।”

কলাম লেখক চিররঞ্জন সরকার বলেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যু দেশের সাংবাদিকতা জগতের জন্য ‘বিরাট ক্ষতি’।

তিনি বলেন, “সাংবাদিক হিসেবে, মানুষ হিসেবে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া ব্যক্তি হিসেবে তৌফিক ভাই সারাজীবন যে ভূমিকা পালন করেছেন, অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ও নেতিবাচক প্রবণতাকে অগ্রাহ্য করে যেভাবে এগিয়ে গেছেন, তা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

অভিনেতা তারিক আনাম খান স্মৃতিচারণ করে বলেন, “বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম যখন শুরু হয়, তখন থেকেই উনার নাম শুনেছি। দেশের প্রথম অনলাইন নিউজ পোর্টাল হিসেবে এটি আমাদের জন্য বড় গর্বের বিষয় ছিল। এই ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সত্যিকারের পথিকৃৎ।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর কাজের প্রতি ‘নিষ্ঠা ও স্পষ্টবাদিতার’ প্রশংসা করে এ অভিনেতা বলেন, “ইট ইজ রিয়েলি শকিং! উনি যা মনের মধ্যে লালন করতেন, সেটাই সরাসরি বলতেন, কোনো কিছু ঢেকে রাখা বা বানিয়ে বলার মানুষ তিনি ছিলেন না।

“সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম নিয়ে ওনার দারুণ কিছু রুচিশীল পরিকল্পনা ছিল, নিমা রহমানের সঙ্গে কিছু কাজ ও ইউটিউব চ্যানেলকেন্দ্রিক নতুন ভাবনার কথা উনি শেয়ার করেছিলেন। এমন একজন কাজের মানুষ চলে যাওয়া বড় ক্ষতির। উনার আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর ‘আতিথেয়তা ও দিকনির্দেশনার’ কথা স্মরণ করে অভিনেত্রী নিমা রহমান বলেন, “শেষের আট মাস আমি খুব ঘনিষ্ঠভাবে উনাকে দেখেছি। কোনো কাজ বা মিটিং শেষে উনি না খাইয়ে কখনোই আসতে দিতেন না। রাত হয়ে গেলে বলতেন, ‘ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খেয়ে যান’। আমি বলতাম, ‘ডিম ভাজি দিয়ে খাব না’, যা নিয়ে আমাদের মাঝে অনেক হাসাহাসিও হত।"

বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য ও দৈনিক সময়ের আলোর উপদেষ্টা সম্পাদক শায়রুল কবির খান বলেন, “তৌফিক ইমরুজ খালিদীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিক গুণাবলি দুটোই চমৎকার। প্রতিটি ধাপে ও প্রতিটি কাজেই তিনি ছিলেন অসাধারণ ব্যাক্তিত্ব। আজকে তিনি আমাদের মাঝ থেকে চলে যাচ্ছেন। উনার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে যে শূন্যতা, সেই শূন্যতা পূর্ণ হবে আমাদের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে সখ্যতার দুই দশকের স্মৃতিচারণ করে বিটিভির সাবেক উপ-মহাপরিচালক খ ম হারূন বলেন, “প্রায় ২০ বছর আগে যখন ইন্টারনেট এত সহজলভ্য ছিল না, সেই সময়ে উনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল শুরুর মত সাহসী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দেশের শ্রেষ্ঠ সাংবাদিকদের এক ছাতার নিচে এনেছিলেন।”

বটতলার নাট্য নির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দার বলেন, “তৌফিক ভাই আমাদের কাছে মনে হত, তিনি যুগ থেকে অনেক সামনে দেখতে পেতেন। ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা কী হবে, সেটা ধারণা করতে পারতেন।

“উনি অনেক উন্নত মানের মানুষ ছিলেন, তরুণদের নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করতেন। তৌফিক ভাইয়ের মৃত্যুতে বাংলাদেশ এক সাহসী সাংবাদিকতা ও তরুণরা এক সঠিক নির্দেশকের অভাব অনুভব করবে।”

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, “আমাদের দেশে তো খুব একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড়ায়নি, যেটা প্রফেশনালি চলে এবং সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে ওটা আরও বেশি সত্যি।

 “তো সেইখানে দাঁড়িয়ে একটা খুব প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে কীভাবে পেশাদারত্বের সাথে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর সবসময় কাজ করে গেছে, এটা ছিল তার লিডারশিপের একটা বড় প্রতিফলন।”

তিনি বলেন, “আমার কাছে যেটা মনে হয়, তার অনেক কিছু দেওয়ার ছিল আমাদের দেশকে। উনি অনেক প্রকাশনাও করেছিলেন যেগুলো প্রকাশিত হলেই বইগুলো আমাকে পাঠাতেন।

 “এবং সেখানেও আমি দেখেছি অনেক নতুনত্ব এবং ইনোভেশন ছিল। এবং আমাদের কাজকে উনি সবসময় খুব গুরুত্ব দিতেন। এবং চাইতেন যে আমরা এগুলো নিয়ে আরও কথা বলি।”

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, “তৌফিক আমার স্কুলের ছোট ভাই, একইসাথে আমার ছোট ভাইয়ের সহপাঠী। আমি খুব কাছে থেকেই ওকে দেখেছি, খুব ক্লোজলি কাজ করেছি। আমার মনে হতো যে, সে কোনো কিছুতে কম্প্রোমাইজ করতো না।”

বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, “তৌফিকের সাথে যখনই দেখা হতো বাংলায় একটি কথাও বলতো না।

“আজ মনে হচ্ছে আর তো কেউ আমার সাথে ইংরেজিতে কথা বলবে না। তার গতিময়তা, তেজদীপ্ততা এটা আমাদের মধ্যে থাক। সে বেঁচে থাকুক আমাদের মধ্যে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “খুব অল্প সময়ে আমরা উনাকে হারিয়েছি। এদেশে সত্য প্রকাশের জন্য উনার নেতৃত্ব অনেকদিনের জন্য প্রয়োজন ছিল।”

ডেইলি স্টারের কনসালটিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, “বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে যে অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিয়েছে, সেখান থেকে প্রতিকূলতার বহু ধাপ পেরিয়ে একটি সফল জায়গায় সে নিয়ে এসেছে। সেটা অবশ্যই তার কৃতিত্ব; এজন্য তাকে স্মরণ করতেই হবে।

“বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অপ্রত্যাশিত, অযথাই একটি হয়রানির মুখে তাকে পড়তে হয়েছিল এবং এই হয়রানির সময় তিনি অনেককেই তার পাশে পাননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি তার দৃঢ়তা ও একাগ্রতার মাধ্যমের সেই বাধা কাটিয়েছেন।”

সাবেক রাষ্ট্রদূত শাহেদ আখতার বলেন, “তিনি (খালিদী) বডি ল্যাংগুয়েজের মাধ্যমে মানুষকে আপন করতে পারতেন। উনি কাউকে অপছন্দ করেন, নাকি সেটা বুঝতেও দিতেন না।

“মানুষ সহজে ভুলবে না উনাকে। উনি যে এত জলদি চলে যাবেন, এটা কেউ বিশ্বাস করেননি।”

সাংবাদিক শাহরিয়ার করিম বলেন, “মধ্য আশির দশক থেকেই আমরা বন্ধু ছিলাম, তারপর আমরা একসাথে তিনটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি।

“তার একটি অসম্ভব নেতৃত্বগুণ ছিল। বাংলাদেশে এত প্রতিকূলতার মাঝে এরকম খবর নির্ভর একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা খুবই কষ্টকর। এজন্য অন্তত তাকে মানুষ মনে রাখবে।”

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাবেক সহকর্মী কাজী নাফিয়া রহমান বলেন, “উনি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা আমাদের শিখিয়েছেন। আমরা যখন সাংবাদিকতা পড়াই, তখন সোর্সকে এত গুরত্ব দিয়ে বোঝাতাম না।

“কিন্তু তৌফিক ভাই আমাদের শিখিয়েছেন—পাঠকের আস্থা ও বিশ্বাস আয়ত্তে আনতে গেলে সোর্স দিতে হবে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রয়াতের খবর এখনো মেনে নিতে পারছেন না লেখক সালেক খোকন।

তিনি বলেন, “তার সাথে আমার সম্পর্ক প্রায় ১৪ বছরের। আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করেছি, আর বিডিনিউজ খুব গুরুত্বের সাথে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করে আসছে। বিশেষ করে, চব্বিশের অগাস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রথম আঘাত হয়েছে, আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন বিচার বিশ্লেষণ…কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ওপর আঘাতটা তৌফিক ইমরুজ খালিদী কিংবা বিডিনিউজ সেই জায়গায় শক্ত অবস্থান নিয়েছিল।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর স্মৃতিচারণ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, “তৌফিক ইমরোজ খালিদী ডিজিটাল গণমাধ্যমের একজন পুরোধা।

“বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি গণমাধ্যমের পরিসরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদেরও তুলে আনতে পেরেছিলেন।”

সাদেকা হালিম বলেন, আদিবাসী, দলিত, নারী অধিকারকর্মী, শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের মতো বিভিন্ন সংগ্রামে যুক্ত মানুষের খবর খালিদী গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখতেন। তাদের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল।

খালিদীর দলগত কাজের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “তিনি তার সাংবাদিক সহকর্মীদের এমনভাবে প্রশিক্ষিত করেছিলেন, যাতে তারা নিরপেক্ষভাবে সংবাদ পরিবেশন করতে পারে।

“বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ নিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনগুলোকে আমরা বেশ নিরপেক্ষ বলতে পারি।”

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, “একজন সৎ ও সাহসী সাংবাদিক হিসেবে আমাদের পেশায় তিনি অনেক অবদান রেখে গেছেন। আমরা তার এই অবদান স্মরণে রাখব। তাকে বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে হয়রানির চেষ্টা হয়েছে। আমরা সব সময় সেসবের নিন্দা জানিয়েছি।

“আজ তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আশা করি, যারা এসব কাজ করেছেন, তারা অনুতপ্ত হবেন। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন, তিনি যেন পরকালে সুখে থাকেন।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক স্পোর্টস এডিটর ও দৈনিক আগামীর সময়ের সম্পাদক মোস্তফা মামুন বলেন, “তৌফিক ইমরোজ খালিদী শুধু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জন্য নন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় সম্পাদকীয় স্বাধীনতার পক্ষে যারা কাজ করেন, তাদের জন্যও একটি মডেল ছিলেন। সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, সাংবাদিকতায় সংযম এবং দূরদর্শিতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।”

তার মৃত্যু ‘সবার জন্য একটা বড় লস’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “২০০৭-০৮ সালেই তৌফিক ইমরোজ বলেছিলেন, একসময় মোবাইল ডিভাইসেই সবকিছু চলে আসবে।

“তখন বিষয়টি অনেক দূরের মনে হলেও পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমের ধরন ও কাজের পদ্ধতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন।”

মোস্তফা মামুন বলেন, “তার সঙ্গে অনেক চিন্তার জায়গায় আমার মিলত না। কিন্তু তাকে ছাড়ার পরে বুঝতে পেরেছি, আমার যে চিন্তাগুলোর সঙ্গে তার মিলত না, সেগুলোর মধ্যে তার দূরদর্শিতা ছিল, যেটা ওই সময় আমরা অনেকেই বুঝতে পারিনি।”

ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফয়েজ আহম্মদ বলেন, “তৌফিক ভাইয়ের সাথে আমার কখনো কাজ করা হয় নাই, কিন্তু তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার একটা দূরতম সম্পর্ক ছিল। উনার কিছু পার্টিকুলার ইস্যুসে আমি উনার পাশে থাকার চেষ্টা করছি বিভিন্ন সময়ে।

“তার সাংবাদিকতার কথা যদি বলি, তৌফিক ভাই তো আমার প্রফেশনের একজন বড় ভাই। উনার সাংবাদিকতা দেখে আসলে আমরা শিখতাম যে সাংবাদিকতার অ্যাকুরেসি বলেন, যে অ্যাট্রিবিউশনের জায়গাটা বলেন, যেটা আমাদের এখানকার সাংবাদিকতায় আসলে খুব রেয়ার প্র্যাকটিস হয়—সেটা তৌফিক ভাই বিডিনিউজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চর্চা করে গেছেন। সেটা আমাদের নতুন প্রজন্মে যারা সাংবাদিকতা করে, তাদের জন্য একটা বড় লার্নিং প্রসেস।”

চ্যানেল আই অনলাইনের সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান বলেন, “তৌফিক ভাইয়ের সাথে আমার ৩০ বছরের বেশি সময়ের সম্পর্ক। আমরা প্রায়ই বলি যে ‘অমুকের মৃত্যু অপূরণীয় ক্ষতি’; এটা আসলেই অপূরণীয় ক্ষতি।”

খালিদী ‘সাহসী সাংবাদিক’ ছিলেন মন্তব্য করে সাংবাদিক নজরুল ইসলাম মিঠু বলেন, “তার মতো জার্নালিস্ট এ শহরে এখন আর নেই। তিনিই সর্বশেষ ছিলেন। তার কথায়, বলায়, চলায়—সবকিছুতেই উনি ছিলেন ট্রান্সপারেন্ট।”

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বের স্মৃতিচারণ করে বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান বলেন, “তৌফিক ইমরোজ খালিদী আমার বন্ধু। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে পড়েছি। আমি আইন বিভাগে আর সে ইংরেজি বিভাগে পড়ত। আমরা দুজনই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকেই আমাদের অত্যন্ত গভীর ও আন্তরিক সম্পর্ক ছিল।”

“তৌফিক অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও বন্ধুবৎসল একজন মানুষ ছিল। বাংলাদেশ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে পেশাগত জীবনে প্রবেশের দীর্ঘ ১২ বছর পর আমি যখন ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টারি পড়তে যাই, তখন সেখানে আবার বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে এক সময় কাজ করার স্মৃতিচারণ করে সাংবাদিক প্রদীপ চৌধুরী বলেন, “এদেশের সাংবাদিকতায় তৌফিক ভাই অমরত্ব লাভ করেছেন।

“বাংলাদেশের বাস্তব সাংবাদিকতাটা উনি আমাদের যেমন শিখিয়েছেন, তেমনই পাঠকের কাছেও নিয়ে গেছেন তেমন। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অনেকেই ছাড় দিয়েছেন—শব্দে, বাক্যে কিংবা তথ্যে। কিন্তু তৌফিক ভাই কখনো এসবে ছাড় দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেননি।”

এপির ঢাকা ব্যুরো প্রধান জুলহাস আলম রিপন বলেন, “বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কারণে তার সহকর্মীদের কাছে তিনি সবসময় শিক্ষকের মতোই ছিলেন। উনার সাথে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে।

“আমি উনার সম্পাদকীয় নীতি, উনার যে অবস্থান, উনার সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা আর সাংবাদিকতার প্রতি তার যে অবদান—সেটা অতুলনীয়।”

সহকর্মী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাংবাদিক গাজী নাসিরুদ্দীন খোকন বলেন, “আমার ক্যারিয়ারের উত্থান তৌফিক ভাইয়ের হাত ধরেই। সারা দুনিয়াতে যখন টেকনোলজির শিফট হচ্ছিল, তখনো সারা দুনিয়াতে মিডিয়াতে টেকনোজিক্যাল ট্রান্সফারমেশনের কথা ভাবছিল। তখন তৌফিক ভাইয়ের সাহসী উদ্যোগ ও দুরদর্শিতায় তিনি মিডিয়ার ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন এবং গণমাধ্যমকে এদেশে প্রথম ডিজিটালাইজড করেন।”

সাবেক ফুটবলার কায়সার হামিদ বলেন, “তৌফিক ভাইয়ের সকল সেক্টরের মানুষদের সাথেই ভালো সম্পর্ক ছিল, বিশেষ করে আমাদের ক্রীড়া জগতের সাথে। উনার প্রয়াণ আমার মনে হয় অপূরণীয় ক্ষতি।”

জানাযায় অংশ নিতে এসেছিলেন মোবাইল অপারেটর রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার শাহেদ আলম।

তিনি বলেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে তার পরিচয় লন্ডনে পড়াশোনার সময়।

“উনি কোনো সময় নিজের প্রিন্সিপাল থেকে নড়তেন না। তার সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও আমি দেখেছি যেকোনো কম্প্রোমাইজ করতেন না। এজন্য উনাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে, উনার কর্মজীবনে।”

ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকা তৌফিক ইমরোজ খালিদী গত ১ অক্টোবর রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা জানান, তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। পরদিন স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

৮ অক্টোবর জোহরের নামাজের পর পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেইন মসজিদে তার জানাজা হয়। সেখানে সাবেক সহকর্মী ও স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা শেষ শ্রদ্ধা জানান।

শনিবার বেলা ১১টার দিকে বিমান বাংলাদেশের একটি ফ্লাইটে তার মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভাতিজা তারাফ তাজিজ খালিদী ও ভাগনি-জামাই আকিফ আহমেদ কফিন গ্রহণ করেন। সহকর্মীরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

এরপর কফিন নেওয়া হয় তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কার্যালয়ে। সেখানে দুপুর ১২টা থেকে ১২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত মরদেহ রাখা হয়। পরে মরদেহ নেওয়া হয় তার বাসায়, যেখানে পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা শেষবারের মতো তাকে দেখেন।