বন্ধু-শুভাকাঙ্ক্ষীদের স্মৃতিচারণ: সাংবাদিকতায় সাহস, সম্পর্কের বন্ধনে অনন্য তৌফিক খালিদী
“কিন্তু তৌফিক তো সৃজনশীল মানুষ, এবং কোনো সৃজনশীল মানুষ আসলে ঠিক ছাঁচে দেওয়া কোনো কাজে থাকতে পারে না।”
বন্ধু, অগ্রজ কিংবা অনুজদের কাছে ‘ডানপিঠে, চঞ্চল ও সাহসী’ স্বভাবের তৌফিক ইমরোজ খালিদী আবার বন্ধুত্ব আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রশ্নে একাট্টা; তার সেই অনড় স্বভাব, নৈতিক ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পেশাগত জীবনের টুকরো স্মৃতি উঠে এল এক স্মরণসভায়।
ওই অনুষ্ঠানে এমন মানুষরা কথা বলেছেন, জীবনের নানা বাঁকে যাদের সঙ্গে ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী; ব্যক্তিগত সম্পর্কের সঙ্গে পেশাগত জীবনও তাদের কারও কারও সঙ্গে পথ মিলেছে।
বাংলাদেশের সংবাদসেবাকে ডিজিটাল দুনিয়ায় পৌঁছে দেওয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রয়াত প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে শুক্রবার বিকালে ঢাকার গুলশান ক্লাবে স্মৃতিচারণ করেছেন তার বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
স্মরণসভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেছেন, “তৌফিকের যে ট্যালেন্ট, তার যে মেধা, যে প্রজ্ঞা সেটার সম্পর্কে শুনেছি।
“কিন্তু ব্যক্তি মানুষটা কেমন ছিল তৌফিক? আমরা তো অনেকেই তার সাথে ওঠাবসা করেছি; তার সাথে ছিলাম। সে যে কেমন মানুষ ছিল সবাই বলবেন। শুধু তার অফিসে নয়, তার বন্ধুমহলে।”
ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে পেশাদার সাংবাদিকতার প্রশ্নে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রয়াত প্রধান সম্পাদকের তৌফিক খালিদীর অনড় অবস্থানের কথাও স্মরণ করেন তিনি।
তার সাংবাদিকতা চর্চার ধরনের কথা তুলে ধরে আগামী প্রজন্মের কাছে সেই ধারা সঞ্চারিত করার কথা বলেছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার।
আর পরিবারের উচ্চাশা আর শঙ্কা পেরিয়ে তৌফিক খালিদী কীভাবে সাংবাদিক হিসাবে হয়ে উঠলেন এবং তার সময়ের তুলনায় কীভাবে অগ্রগামী ছিলেন, তার স্মৃতিচারণ করলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব আমিনুল ইসলাম খান।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মতো এই তিনজনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী; রামেন্দু মজুমদার আর রাশেদা কে চৌধুরী ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট অ্যালামনাই সোসাইটির (ইডাস) সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। আর আমিনুল ইসলাম ও তৌফিক খালিদী সামলেছেন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব।
ইংরেজি বিভাগের তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অনুজ শাহাদাত হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে তার সংক্ষিপ্ত জীবনী পড়ে শোনান তার বন্ধু আহমেদ আহসানুজ্জামান সাকলাইন।
অধ্যাপক সাকলাইন বর্তমানে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (আইইউবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক।
সভার শুরুতে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা এবং শেষে তার আত্মার শান্তি কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকা তৌফিক ইমরোজ খালিদী গত ১ অক্টোবর রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক জানান, তার মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ হয়েছে। পরদিন স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদী
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর চর্চায় থাকা সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতার পাশাপাশি চাপের মুখে মাথানত না করার ক্ষেত্রে তার অনড় মনোভাবের কথা স্মরণ করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার।
ইডাসের সাবেক এই সভাপতি বলেন, “সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতা সঞ্চারিত করেছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
“কোনো চটকদার খবরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম শেষ করত না। সবসময় ক্রেডিবল নিউজের জন্যে আমরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর দেখেছি, এটা ওর জীবনের একটা বড় সার্থকতা।”
ইডাসের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে তৌফিক খালিদীর কয়েক মেয়াদে কাজ করার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “সেখানে গুণগত পরিবর্তন ডিপার্টমেন্টের জন্যে এনেছিল। এবং ও কেবল নিজে নয়, তার অফিসের পুরো শক্তিকে ব্যবহার করে এই ডিপার্টমেন্টের কাজ করেছে।
“এটা যদি আমরা ভুলের যাই, স্বীকার না করি তাহলে খুব অন্যায় হবে। এটা অন্তত ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট যারা আছেন, শিক্ষকরা বিশেষ করে, তারা আশা করি মনে রাখবেন।”
রামেন্দু মজুমদার বলেন, “আজকে সাহসী সাংবাদিকতা পেশাটাই খুবই একটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এবং কষ্টকর পেশা। অন্য পেশার মতো এত কুসুমাস্তীর্ণ নয়, পথে পথে কাটা বিছান এবং সাংবাদিকদের সাহসী হলে খুব বিপদ এদেশে।”
তৌফিক খালিদী অনেকবার সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন এবং তার চারিত্রিক দৃঢ়তা দিয়ে সেটা তিনি পার করেছেন, এ কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমরা আশা করব এখন যারা সাংবাদিকতা করেন তারা কিছুটা হলেও যদি তৌফিকের এই যে সাংবাদিকতার নীতি, বস্তুনিষ্ঠতা এবং সাহস-এগুলো নিয়ে তারা অনুপ্রাণিত হন, তবেই তৌফিকের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানো হবে।”
ডিজিটাল সাংবাদিকতার পুরোধা হিসাবে স্বাধীনতা সাংবাদিকতার জায়গা থেকে তৌফিক খালিদীর নানা ‘ঝড়-ঝাপটা মোকাবেলা’ করার কথা বলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী।
বেসরকারি সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের এই নির্বাহী পরিচালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট অ্যালামনাই সোসাইটির সভাপতি থাকার সময়ে তৌফিক ইমরোজ খালিদী সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তার অনড় অবস্থানে থাকার কথা তুলে ধরে রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, “কিন্তু সে অবিচল থেকে সেগুলোকে পার করেছে। আমরা তো অনেকেই ভেতরের অনেক কিছু জানি না।
“দেখলাম, গত বছরই সে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান করল, আমরা অনেকেই ছিলাম। সেখানে নানা ধরনের এই যে মিডিয়ার যে স্ট্রেংথ যেটা, যে ভিন্ন মত, অন্য মত, সবাইকে সম্মান দেওয়া, সবাইকে নিয়ে আসা, এটা তৌফিক পারত। তাকে খুব মিস করব।”
নিজের বাসায় পহেলা বৈশাখের আয়োজনে সব মতের মানুষের সম্মিলন ঘটানোর কথাও স্মরণ করেন তিনি বলেন, “মানে ওইখানেও দেখেছি যে, ওই যে বিভিন্ন মত-পথের মানুষ, এটা তৌফিক ছাড়া আজকের যুগে খুবই কম দেখা যায়।”
তিনি বলেন, “তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। আমরা তাকে মিস করব। কিন্তু এটাও জানি, সে যেখানে থাকবে নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তা তাকে ভালো রেখেছেন, ভালো রাখবেন। আমাদের সবার পক্ষ থেকে তার জন্য অনেক অনেক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা।”
ইংরেজি ও গণিত ভালো জানা, তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সিভিল সার্ভিসে গিয়ে বড় পদে যাওয়ার উচ্চাশা বাবা-মায়ের থাকলেও ‘অস্থির, চঞ্চল ও ডানপিটে’ যুবকের সাংবাদিক হয়ে ওঠার গল্প অনুষ্ঠানে শোনান ইংরেজি বিভাগে তার অগ্রজ আমিনুল ইসলাম খান।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিন থেকে তাকে চেনার কথা তুলে ধরে সাবেক এই স্বরাষ্ট্র সচিব বলেন, “তৌফিককে আমি প্রথম দিন থেকে চিনি, যেদিন সে ইউনিভার্সিটিতে আসে। তাকে নিয়ে তার পিতা-মাতার উচ্চাশা যেমন ছিল, শঙ্কাও ছিল। কারণ সে ছিল খুবই চঞ্চল, অস্থির, সাহসী, ডানপিটে। সেজন্যে পিতা-মাতা খুব শঙ্কার মধ্যে থাকতেন।”
সেই শঙ্কা থেকে বিভাগের অগ্রজ হিসাবে একবার তৌফিক খালিদীর মায়ের ডাক পড়ার কথা তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম বলেন, “তার বন্ধুদের কাছ থেকে জেনেছেন যে ডিপার্টমেন্টে কার কথা সে শোনে। এবং কোনোভাবে আমার নাম পৌঁছে গেছে তার মায়ের কাছে এবং তার মা আমাকে খবর পাঠিয়েছেন দেখা করার জন্য।
“আমি তো মফস্বলের লোক, হোস্টেলে থাকি, হলে থাকি। আমি গিয়েছি, সেই সম্পর্ক। এবং মারা যাওয়ার তিন দিন আগে প্যারিস থেকে সে আমাকে ফোন করেছে, এবং সেটাই আমার তার সঙ্গে শেষ কথা।”
তিনি বলেন, “পিতা-মাতার উচ্চাশা ছিল যে তৌফিক সিভিল সার্ভেন্ট হবে, সর্বোচ্চ পদে যাবে, দেখতে সুদর্শন, স্মার্ট, ভালো ইংরেজি জানে, খুব ভালো অংক জানে।
“কিন্তু তৌফিক তো সৃজনশীল মানুষ, এবং কোনো সৃজনশীল মানুষ আসলে ঠিক ছাঁচে দেওয়া কোনো কাজে থাকতে পারে না। আমরা যারা কম সৃজনশীল, আই মিন বিলো অ্যাভারেজ, আমাদের জন্যই কাজগুলো ঠিক আছে।”
বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা অবস্থাতেই ‘সানডে এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় তৌফিক খালিদীর সাংবাদিকতার ‘খুবই দুর্দান্ত’ সূচনা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ওই পত্রিকায় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হক এবং আহমদুল আমিনের মতো নিষ্ঠাবান মানুষকে পাওয়ার কথা তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম বলেন, “সেই শুরু, তারপরে তো ডেইলি স্টার হয়ে, বিবিসি হয়ে, বিডিনিউজ। তৌফিকের একটা জিনিস ছিল— খুব সহজে সন্তুষ্ট হতে পারতো না।”
তিনি বলেন, ‘এরকম একটা অসুখ’ বরেণ্য শিল্পী, চলচ্চিত্রকার ঋতুপর্ণ ঘোষের থাকার কারণে অমিতাভ বচ্চনকে দিয়ে একটা শট কয়েকবার নিতে বলতেন, এবং শেষে বলতেন, ‘ইটস ওকে, সো সো। বাট কুড হ্যাভ বিন বেটার’।
“তৌফিকেরও সব সময়ই কোনো কিছু অর্ডিনারি, অ্যাভারেজ—এটা পছন্দ ছিল না। সেটা তার পত্রিকার ক্ষেত্রে হোক, বাড়িতে দাওয়াত করার ক্ষেত্রে হোক, কাপড়-চোপড়ের ক্ষেত্রে হোক, বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে হোক, সমস্ত জায়গাতে।”
নিজের সময়ের চেয়ে তৌফিক খালিদীর এগিয়ে থাকার কথা তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম বলেন, “তৌফিক এআই নিয়ে খুব চিন্তা করতো। যে, এআই তো আমাদের সমস্ত জীবনযাপনকে কীভাবে যে ট্রান্সফর্ম করবে, কীভাবে যে ডিজরাপ্ট করবে, এটাও আমরা এখনো কিন্তু প্রোপারলি অ্যান্টিসিপেট করতে পারছি না।
“এবং এআই এডুকেশনকে, মিডিয়াকে কীভাবে রি-অ্যালাইন করবে, সেটা আমরা জানি না। বেশ কিছুদিন আগে এই এআই নিয়ে আমি তাকে কথা বলতে শুনেছি পত্রিকার মাধ্যমে। অর্থাৎ তার মাথার মধ্যে এই বিষয়টাও ছিল। তো আজকে বিডিনিউজের অনেক সহকর্মীরা এখানে এসেছেন, তারাও এই বিষয়গুলো হয়তো চিন্তা করবেন।”
অনুষ্ঠানে তৌফিক খালিদীর পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্যে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা চান তার ভাগনি-জামাই আকিফ আহমেদ।
তৌফিক খালিদীকে ‘বড় ছেলে’ হিসেবে ডাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বড় মামা আসলে আমাদের স্মৃতিতে বেঁচে আছেন এবং বড় মামার কাজ, বড় মামার সংকল্প, সবকিছুই ছিল বিডিনিউজকে ঘিরে।
“সুতরাং বিডিনিউজ যতদিন বেঁচে থাকবে, বিডিনিউজ যতদিন ভালো থাকবে, যতদিন একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে আমাদের সামনে থাকবে, ততদিনই আমরা তৌফিক মামাকে মনে রাখব, বড় ছেলেকে মনে রাখতে পারব এবং তার কাজকে ভ্যালু করতে পারব।”
তিনি বলেন, “আমরা আসলে আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই যে, কীভাবে আমরা বড় ছেলেকে তার কাজের মাধ্যমে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতে সেলিব্রেট করতে পারব, সে বিষয়ে আপনাদের সবার সহযোগিতা কামনা করছি।”
বন্ধু-অগ্রজদের ‘তৌফিক’
ব্যক্তি হিসেবে আজীবন বন্ধু বৎসল এবং জ্যেষ্ঠ-অনুজ সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর গুণের কথা স্মরণ করেন তার বন্ধু ও অগ্রজরা।
সাংবাদিক ও সংগঠক হিসাবে সেরাটা চাওয়া এবং সেটা বের করে আনার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার কথাও এসেছে কারও কারও কথায়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, “তৌফিকের যে ট্যালেন্ট, তার যে মেধা, যে প্রজ্ঞা সেটার সম্পর্কে শুনেছি। কিন্তু ব্যক্তি মানুষটা কেমন ছিল তৌফিক? আমরা তো অনেকেই তার সাথে ওঠাবসা করেছি; তার সাথে ছিলাম। সে যে কেমন মানুষ ছিল সবাই বলবেন। শুধু তার অফিসে নয়, তার বন্ধুমহলে।”
তিনি বলেন, স্মরণ সভায় উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক-বর্তমানরা ‘এত দ্রুত দুজন অতি প্রিয় মানুষকে হারাব ভাবতেও পারিনি’। গতবছর ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং এবার তৌফিক ইমরোজ খালিদীর হঠাৎ চলে যাওয়া ভোলার নয়।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিদায়ে ক্ষতি ও শূন্যতাটা পূরণ হবার নয় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তৌফিকের সাথে আমরা যারা অ্যালামনাইতে ছিলাম, আমাদের ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট অ্যালামনাই সোসাইটিতে, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সবার সাথে কাজ করার।
সোসাইটিতে নিজের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক হিসাবে তৌফিক খালিদীকে পাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “কাজ করা একটা জিনিস, আর করিয়ে নিতে পারাটা অন্য ধরনের দক্ষতা। সেটা তার সাংঘাতিক রকম ছিল। এবং অনেক সময় আমি রাগই করতাম যে, ‘তৌফিক, আপনার সাথে পারি না’।
“‘আপা, পারতে হবে না, কাজটা করতে হবে।’ এই যে বিষয়গুলা। এবং তাকে আমরা সাংঘাতিক রকম মিস করব।”
স্মরণসভায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিচারণ করে তার বিভাগের অগ্রজ মাহবুবা পান্না বলেন, “তৌফিককে নিয়ে এভাবে যে একদিন কথা বলতে হবে, বিশেষ করে যে আমার ছোট, তারটা নিয়ে যে আমাকে বলতে হচ্ছে- এটা কখনো আশা করিনি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৌফিক খালিদীর সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি তুলে ধরে সাবেক এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, “আমরা ফার্স্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ারে উঠলাম, আর তৌফিকরা ঢুকল। ক্লাস শুরু হওয়ার তিন-চার দিনের মাথায় হঠাৎ দেখি বেশ ছিপছিপে সুন্দর গড়নের স্বপ্রতিভ একটি ছেলে সামনে এসে সালাম দিয়ে বলল, ‘আপা, কয়দিন ধরে আপনাকে আমি ফলো করছি। আপনি খুব চঞ্চল, আমরা বন্ধুরা এটা আলাপ করেছি’।”
পিঠাপিঠি দুই ব্যাচের মধ্যে ভাইবোনের মতো সম্পর্কের কথা তুলে ধরে মাহবুবা পান্না বলেন, “একবার পিকনিকে গিয়ে বাসের সিট নিয়ে তৌফিকের সঙ্গে আমার ‘কাইজ্জা’ লেগেছিল। পরে সন্ধ্যায় যখন বাসে গান গাইতে গাইতে ফিরছি, তখন দেখলাম ও নিজে দাঁড়িয়েই আসছে। এভাবেই চলছিল দিনগুলো।”
কর্মজীবনেও তৌফিক খালিদীর শ্রদ্ধাবোধ অটুট ছিল তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভিড়ের মধ্যেও মানুষ সাঁতরে ও কাছে চলে আসত। কাঁধে হাত রেখে মাথার চুলের কাছে আস্তে করে একটা চুমু দিয়ে বলত, ‘আপা, কেমন আছেন?’ একবার এক অনুষ্ঠানে ও আমাকে দেখেনি বলে আমি নিজেই ওর কাছে গিয়েছিলাম। তখন ও অনুযোগ করে বলেছিল, ‘আপা, আমি যেতাম কিন্তু আপনার কাছে। আপনি কেন আসলেন?’ অর্থাৎ বয়সে বড় কেউ তার কাছে আগে এগিয়ে যাবে, এটাও সে মেনে নিতে পারত না।”
বক্তব্যের শেষে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি তৌফিককে চিনি, এটা বোধহয় কোনো বিষয় না; আমি অনুভব করি তৌফিক আমাকে চিনত, এটা আমার জন্য অনেক সম্মানের।”
তৌফিক খালিদীর বিভাগের আরেক অগ্রজ আমিনুল ইসলাম খান বলেন, “ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন এবং বর্তমান অনেক ছাত্র-ছাত্রী এসেছেন। তৌফিকের যেমন খুব ছোটদের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিল, আবার বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিল। সে মূলত সম্পর্ক রক্ষা করার লোক, সম্পর্ক তৈরি করার লোক।”
তিনি বলেন, “মানুষের জীবনও পড়ন্ত দিনের বিকেলের মতো। কিন্তু তৌফিকের জীবন আরও বেশি ছোট। তৌফিক আমার চেয়ে বয়সে ছোট।
“আজকে এমন যদি হতো যে আমার স্মরণসভায় তৌফিক কথা বলবে, সেটাই বোধকরি সঙ্গত হতো। কিন্তু এটা এক ধরনের রোল রিভার্সেল। আমাকে তৌফিকের স্মরণে কথা বলতে হচ্ছে।”
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তৌফিক খালিদীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পথচলার স্মৃতিচারণ করেন তার বন্ধু মো. কোহিনূর মিয়া।
অবসরপ্রাপ্ত এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমরা সকালে তার ক্যাম্পাসে আসার কথা জানতাম। রাতে কখন বাসায় ফিরত তা জানতাম না। ক্লাসের বাইরে নানা কাজে ব্যস্ত থাকত সে।
বন্ধু হলেও চিন্তাভাবনায় এবং মেধার দিক থেকে তৌফিক খালিদীর এগিয়ে থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তৌফিককে বন্ধু বলতে আমি গর্ববোধ করি।”
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পঙক্তি ধার করে কোহিনূর মিয়া বলেন, “তৌফিক আমাদের এখানে সবার মাঝে আছে। সব মৃত্যু মৃত্যু নয়। ‘থাকিতে চরণ, মরণে কী ভয়’। তৌফিক আমাদের মধ্যে এভাবেই থাকবে, ও মরে নাই।”
রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে পড়ার সময়ে তৈরি হওয়া বন্ধুত্ব তৌফিক খালিদীর জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত থাকার কথা স্মৃতিচারণ করে তালাত মাহমুদ বলেন, “ওকে ভোলার না, ভুলতে পারব না।”
অনুজদের ‘তৌফিক ভাই’
স্মরণসভায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিচারণা করে তার বিভাগের অনুজ তাজিন আজিজ চৌধুরী। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এই চেয়ারপার্সন যখন প্রথম বর্ষে ভর্তি হন, তখন তৌফিক খালিদীদেরকে পান বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে।
‘তৌফিক ভাইয়াকে’ বিভাগে অভিভাবক ও বড় ভাইয়ের মতো পাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “সবসময় ছায়ার মতো আগলে রাখতেন। আমাদের প্রতি নির্দেশনা ছিল- ব্রিটিশ কাউন্সিল, নীলক্ষেত কিংবা রেজিস্ট্রার বিল্ডিং যেখানেই হোক, কেউ একা যাবে না; সবসময় কেউ না কেউ আমাদের সঙ্গ দিতেন, সহযোগিতা করতেন।”
সাংবাদিক বা মিডিয়া ব্যক্তিত্বের বাইরে ব্যক্তি তৌফিক খালিদীর বিশাল হৃদয়ের কথা তুলে ধরে তাজিন আজিজ বলেন, “এরকম ষোলো আনা খাঁটি মানুষ পাওয়া যায় না। অনেক মেধাবী ও ক্ষমতাবান মানুষ থাকেন, কিন্তু তিনি ছিলেন সেই মানুষদের একজন যিনি সত্যিকার অর্থেই মানুষের খেয়াল রাখতেন এবং যেকোনো ছোট বা বড় প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াতেন।”
মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিন মাসের কন্যাশিশুকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি যখন ক্লাস করতাম, তখন বাইরে তৌফিক ভাইয়া এবং উনার ব্যাচের অন্য ভাইয়ারা আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। নাটক, পিকনিক বা রিভার ক্রুজ-সবকিছুতেই অংশ নিতে তিনি উৎসাহ দিতেন।”
প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার পর অসুস্থ স্বামীর অস্ত্রোপচারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সময় তৌফিক খালিদী কীভাবে শিক্ষকদের বলে এক ঘণ্টার মধ্যে তার মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) ব্যবস্থা করে দিয়ে শিক্ষাজীবন বাঁচিয়েছিলেন, সেই ঘটনাও আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তুলে ধরেন তিনি।
তৌফিক খালিদীর মৃত্যুতের যে কোনো প্রয়োজনে যে কোনো সময়ে ফোন করবার মত একজনকে হারানোর কথা তুলে ধরে তাজিন আজিজ চৌধুরী বলেন, “রাত ১টা হোক বা সকাল ৮টা- অসময়ে ফোন করলেও তিনি ফোন ধরতেন, না হয় একটু পরে কলব্যাক করে জানতে চাইতেন, কী হয়েছে।
“দেখা হলেই দুহাত ধরে জড়িয়ে কপালে চুমু খেতেন, মাথায় হাত রেখে আদর করতেন। আজ সেই মাথার ওপর হাত রাখার মানুষটা চলে গেছেন।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের আরেক অনুজ এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দেন শাহীনুল হুদা জুয়েল।
তিনি বলেন, “ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার আগেই ঢাকা স্টেডিয়ামে উইলস এশিয়া কাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্টে তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। পরে ডিপার্টমেন্টের সেমিনারে আমাকে দেখে বলেছিলেন, ‘এই ছেলে তুমি এখানে কেন?’
“এক জীবনে এত ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখার মতো বড় ভাই আমাদের আর কেউ নেই। আমাকে আজীবন- ৩৮ বছর উনি আগলে রেখেছেন।”
তৌফিক খালিদীর প্রতি নিজের ঋণের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “এখানে সবাই কোনো না কোনোভাবে ওনার কাছে ঋণী। আর্থিক ঋণ হয়তো যেকোনো সময় শোধ করা যায়, কিন্তু ভালোবাসার ঋণ শোধ করার মতো ক্ষমতা মানুষের হয় না। আমি এই ঋণ নিয়েই কবর পর্যন্ত যেতে চাই।”
তৌফিক ইমরোজ খালিদী সজ্ঞানে কারও ক্ষতি করেননি তুলে ধরে শাহীনুল বলেন, “ওনার কাছে কেউ কোনো উপকার চেয়েছে এবং ওনার ক্ষমতার মধ্যে ছিল কিন্তু উনি করেননি-আমার জানামতে এরকম নজির নেই। যেটা পারেননি, সেটা সরাসরি বলেছেন যে এটা করতে পারবেন না।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম পরিবারের পক্ষ থেকে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা অভিভাবকহীন হয়েছি। আমরা আশা করব, আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন, আমাদের জন্য দোয়া করবেন।”
বিভাগের অনুজ ব্যারিস্টার ইলোরা ফারুক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পরিচয়ের সূত্রে অন্য অনেকের মতো তার সঙ্গেও তৌফিক ইমরোজ খালিদীর পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। সেই ঘনিষ্ঠতা জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত থাকার কথা বলেন তিনি।
স্মরণসভায় তৌফিক খালিদীর স্নেহ পরায়ণতা ও সবক্ষেত্রে তার ‘অগ্রগামী’ হওয়ার কথা বলেন রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ এবং ইংরেজি বিভাগের অনুজ, অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ক্যাপ্টেন জিয়াউল কবির মেনন।
তিনি বলেন, “আমাদের পেশায় ‘অল রাউন্ড পারফর্মার’ হিসেবে পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। বাইরে এই পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে তৌফিক ভাইও ‘অল রাউন্ড পারফর্মার’ হিসেবে পুরস্কার পেতেন।”
