২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮ কার্তিক ১৪৩৩

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ২০ বছর: উদযাপন রূপ নিল শোকসভায়

অনেক স্মৃতির দুয়েকটা বলতে গিয়ে কেউ থামলেন ঘড়ির কাঁটায় চোখ রেখে; কান্নায় কণ্ঠ বুজে আসায় কেউ কেউ কথাই শুরু করতে পারলেন না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ২০ বছর: উদযাপন রূপ নিল শোকসভায়

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার ঘরোয়া আয়োজনে কেক কাটেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা; তাদের সঙ্গী হয়েছেন সাবেকরাও।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 24 Oct 2026, 02:20 AM

Updated : 24 Oct 2026, 02:57 AM

সাবেক কর্মীরা এলেন, বর্তমান কর্মীদের কাজের ব্যস্ততার ফাঁকেই সবাই মিলে আড্ডা-গল্পে উদযাপন করলেন বাংলাদেশের প্রথম ইন্টারনেট সংবাদপত্রের বিগত দিনের পথচলা। বার্তাকক্ষে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এমন ঘরোয়া আয়োজন এবারই প্রথম নয়।

শুক্রবার ২০ বছর পূর্তির মাইলফলক উদযাপনেও আগের মতই এলেন সবাই। কিন্তু সেখানে অনুপস্থিত একজন, যাকে ঘিরে আবর্তিত হত অতীতের সব আয়োজন।

তিনি তৌফিক ইমরোজ খালিদী; বাংলাদেশের সংবাদসেবাকে ডিজিটাল যুগে পৌঁছে দেওয়ার পথিকৃৎ।

বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার ২০ বছর পূর্তির মাহেন্দ্রক্ষণ উদযাপনের প্রস্তুতির মধ্যে ২১ দিন আগে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

সঙ্গত কারণেই পাঁচ তারকা হোটেলের বড় আয়োজন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিলম্বিত হচ্ছে ২০ বছর পূর্তির প্রকাশনাও।

তার বদলে উদযাপনের লগ্নে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বার্তাকক্ষে যে ঘরোয়া আয়োজন করা হল, তা পরিণত হল স্মরণসভায়।

২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নবযাত্রার সূচনার দিনে প্রধান সম্পাদক খালিদীর সঙ্গে ছিলেন, এমন সহকর্মীরা যেমন অনুষ্ঠানে ছিলেন, তেমনি ছিলেন এ পরিবারের নবীন সদস্যরাও। তাদের সবার কথায় নানাভাবে উঠে এলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

অনেক স্মৃতির দুয়েকটা বলতে গিয়ে তাদের কেউ থামলেন ঘড়ির কাঁটায় চোখ রেখে; কান্নায় কণ্ঠ বুজে আসায় কেউ কেউ কথাই শুরু করতে পারলেন না। কেউবা আবার মাঝপথে থেমে গেলেন কী এক শূন্যতায়!

Image

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার ঘরোয়া আয়োজনে কেক কাটেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা; তাদের সঙ্গী হয়েছেন সাবেকরাও।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর দিয়ে যাওয়া ‘অগ্রণী, স্বাধীন, নির্ভীক— ২০ বছর পেরিয়ে…‘ মোটোতেই বিংশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম পরিবার। প্রত্যয় রেখেছে, তার শেখানো সাংবাদিকতার মানদণ্ড বজায় রেখে সামনে এগিয়ে যাবার।

প্রয়াত প্রধান সম্পাদকের উত্তরসূরি, ভারপ্রাপ্ত প্রধান সম্পাদক বিশ্বদীপ দাশ বলেন, “তৌফিক ভাইয়ের কাছ থেকে সততা, সাহস ও আপস না করার যে শিক্ষা পেয়েছি, সেটুকু আঁকড়ে ধরলে আমরা পথ হারাব না।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অনুপস্থিতির শূন্যতা তুলে ধরে তিনি বলেন, দিনটি আনন্দের হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ‘তৌফিক ভাইয়ের’ শারীরিক অনুপস্থিতি তাকে স্তব্ধ করে রেখেছে। তিনি থাকলে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন অন্যরকম হত।

বিশ্বদীপ দাশ বলেন, শোকের কারণে কাজ থামিয়ে দেওয়া হলে তৌফিক ইমরোজ খালিদী নিশ্চয় ‘খুশি হতেন না’। তার আদর্শ ধারণ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে আরও ভালো জায়গায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

খালিদীর মত আরেকজন সাংবাদিক পাওয়া আগামী কয়েক প্রজন্মেও কঠিন হতে পারে মন্তব্য করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান সম্পাদক বলেন, তার রেখে যাওয়া সাংবাদিকতার ধারা ও মূল্যবোধ ধরে রেখে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এগিয়ে নেওয়াই হবে তাকে স্মরণ করার যথার্থ প্রকাশ।

বাংলাদেশের আধুনিক সংবাদসেবার ইতিহাসে অনেক প্রথমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নাম। তার নেতৃত্বেই দুই দশক আগে রচিত হয়েছিল এক ইতিহাস।

শুরুটা হয়েছিল ২০০৫ সালের প্রথমার্ধে। অন্যান্য বার্তা সংস্থার মত ‘বিডিনিউজ’ তখন সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য খবর সরবরাহ করত। দেশের অন্য সংবাদ সংস্থাগুলো টেলিপ্রিন্টারে খবর সরবরাহ করলেও বিডিনিউজ এ কাজটি শুরু করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে।

Image

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার ঘরোয়া আয়োজনে কেক কাটেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা; তাদের সঙ্গী হয়েছেন সাবেকরাও।

২০০৬ সালে বার্তা সংস্থাটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা বদলের পর এর খোলনলচে বদলে যায়। ওই বছর জুলাই মাস সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এ সংবাদমাধ্যমকে দেশের প্রথম ডটকম কোম্পানির রূপ দেয়।

২৩ অক্টোবর নতুন আঙ্গিকে শুরু হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২৪ ঘণ্টার পথচলা। বাংলাদেশে ডিজিটাল সংবাদ যুগের সূচনা তখনই।

২০ বছরের পথচলায় সংবাদের মোড়কে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কার্যত ইতিহাস গ্রন্থনার কাজটিই করে গেছে। নিত্যনতুন উদ্ভাবনে উন্মোচন করে গেছে নতুন নতুন সংবাদসেবা, যে পথ ধরে পরে এগিয়ে এসেছে আরো অনেকে।

সময়ের উদ্ভাবনী মেজাজকে ধারণ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইটে যুক্ত হয়েছে ‘মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট’। মোবাইল ফোনে সংবাদসেবা, ইংরেজি ও বাংলায় ব্রেকিং নিউজ ও নিউজ অ্যালার্ট সেবায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমই বাংলাদেশে পথিকৃৎ। সব বয়সি, সব রুচির পাঠকের জন্যই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ডিজিটাল মাধ্যমে তৈরি করেছে আলাদা আলাদা ক্ষেত্র।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও পাঠক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সঙ্গে পেয়েছে সর্বক্ষণ। কোটির বেশি মানুষ এখন ফেইসবুকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আছেন।

এত সব প্রথমের জন্ম দেওয়াকে নয়, বরং সাংবাদিকতার মানদণ্ডে অবিচল থাকাকে নিজের মূল গর্বের জায়গা হিসেবে দেখতেন প্রধান সম্পাদক খালিদী।

‘সবার আগে নির্ভুল খবর’ দেওয়ার মন্ত্র নিয়ে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে চালিত করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

তার সেই মানদণ্ড সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আরও অনেক প্রথমের সূচনা করার প্রত্যয় জানালেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পরিচালক রাদ শারার খালিদী, যিনি তৌফিক ইমরোজ খালিদীর উত্তরাধিকারী।

রাদ খালিদীর ভাষ্য, বহু বিষয়ে জানার ‘গভীর কৌতূহল’ তার বাবাকে তার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে রেখেছিল। আর ওই কৌতূহলই সাংবাদিকতার খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

“২০ বছর পূর্ণ হওয়া যেমন একটি অর্জন, একই সঙ্গে এটা আমাদের জন্য নতুন করে শুরু করার একটা সময়। সাংবাদিকতা দ্রুত বদলাচ্ছে। মানুষ কীভাবে খবর পড়ছে, দেখছে, শুনছে, সবকিছু বদলাচ্ছে। আমাদেরও বদলাতে হবে। আর অনেক ক্ষেত্রে আমরাই ট্রেন্ড সেট করব, আগেও করেছি, আবারও করব।”

সহকর্মীদের স্মৃতির ‘তৌফিক ভাই’

অনুষ্ঠানে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, তার সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার দেখানো মানদণ্ডের নানান দিক নিয়ে কথা বলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে তার নতুন ও পুরোনো সহকর্মীদের অনেকে।

সংবাদসেবাকে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে তৌফিক ইমরোজ খালিদী কীভাবে ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে আইকনিক ব্র্যান্ড’ হিসাবে গড়েছেন, তার নানা দিক বক্তব্যে তুলে ধরেন সাবেক কর্মী অরুণ দেবনাথ।

বর্তমানে ডেইলি স্টারের এই উপ-সম্পাদক বলেন, “আজ থেকে ২০ বছর আগে যখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জন্ম হয়, তখন ডিজিটাল সাংবাদিকতার সফলতা নিয়ে অনেকের মনেই সংশয় ছিল। কিন্তু তৌফিক ভাই যেভাবে ভেবেছিলেন, আমরা সেভাবে ভাবতে পারিনি। তিনি কেবল সংবাদ বুঝতেন না, প্রযুক্তির চাহিদাও দারুণভাবে বুঝতেন।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্ব ও কাজের ধারার প্রশংসা করে তিনি বলেন, “উনি নিউজরুমে কেবল নির্দেশ দিয়ে দূর থেকে কাজ দেখা ‘কমান্ডার’ ছিলেন না। ধানমন্ডি অফিসে কাজের শুরুর দিনগুলোতে তিনি নিজেই নিউজ ডেস্কে বসে এডিট করতেন, এমনকি সংবাদ প্রকাশও করতেন। সংবাদের সঙ্গে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতেন।”

শুরুর দিনগুলোর চরম আর্থিক সংকট ও প্রতিকূল পরিবেশের কথা তুলে ধরে অরুণ দেবনাথ বলেন, “কর্মীদের এমন কষ্ট দেখে তৌফিক ভাই নিজেও ভীষণ ব্যথিত হতেন, কিন্তু কর্মীদের প্রবল উৎসাহের কমতি ছিল না।”

প্রতিষ্ঠানের দূরদর্শী চিন্তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আজকের যুগে যাকে আমরা ‘মাল্টিমিডিয়া’ বলি, দুই দশক আগে তিনি ‘নিউ মিডিয়া’ হিসেবে সেটা শুরু করেছিলেন। বাংলাদেশে বসে সেই সময়ে এমন চিন্তা করা এবং বাস্তবে রূপ দেওয়া সত্যিই অভাবনীয় ছিল।”

অরুণ দেবনাথ বলেন, বর্তমানে দেশে-বিদেশে অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের বড় একটি অংশের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

“বাংলা কিংবা ইংরেজি—আজকের দিনে যেখানেই যাই, সেখানেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বা কাজ করা দক্ষ পেশাদারদের দেখা পাই। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের।”

এ প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের আশাবাদের কথা শুনিয়ে তিনি বলেন, “প্রযুক্তির রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে আগামীর দিনগুলো হয়ত আরও চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে বর্তমানে যারা দায়িত্বে রয়েছেন—তারা অত্যন্ত দক্ষ, নিবেদিত ও যোগ্য। তরুণ এই টিম প্রতিষ্ঠানটিকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং আগামীতেও এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে।”

১ অক্টোবর লন্ডনের হোটেলে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে তাকে অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া এবং তার অন্তিম সময়ের স্মৃতিচারণ করেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের লন্ডন প্রতিনিধি সৈয়দ নাহাস পাশা।

তিনি বলেন, “তিনি এভাবে চলে যাবেন, তা তো কথা ছিল না। শেষ মুহূর্তের সেই দৃশ্য আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।”

নাহাস পাশা বলেন, এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ঢাকায় আসার কথা ছিল তার। সে অনুযায়ী প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু প্রধান সম্পাদকের আকস্মিক মৃত্যু সেই পরিকল্পনা বদলে দিয়েছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাজের গুণগত মান বজায় রাখার পরামর্শ দিয়ে সাবেক কর্মী পলাশ দত্ত বলেন, “আমরা যখন সংবাদ সম্পাদনা করতাম, তখন সবসময় মাথায় কাজ করত—কাজের মানে তৌফিক ভাই শতভাগ সন্তুষ্ট হচ্ছেন কি না, বা সংবাদ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুললে তার সঠিক উত্তর দিতে পারব কি না।

“তৌফিক ভাই আজ নেই, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বর্তমান কর্মীদের প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা যেন প্রতিটি সংবাদ প্রকাশের আগে কাজের সেই সর্বোচ্চ মান ও তৌফিক ভাইয়ের নীতি বজায় রেখে কাজ করে যান।”

সংবাদ পরিবেশনায় বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা ও সততার আদর্শ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর ব্যক্তিগত রুচিবোধের কথা তুলে ধরেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আর্টস সম্পাদক রাজু আলাউদ্দিন।

তিনি বলেন, ২০১০ সাল থেকে এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাদে কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে কাছ থেকে দেখেছেন।

রাজু বলেন, মামলা-মোকদ্দমা ও আর্থিক সংকটসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তৌফিক ইমরোজ খালিদী তার প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতার আদর্শ ও মান ধরে রেখেছেন। তার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা বর্তমান ও সাবেক সহকর্মীরা বহন করছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কলাম লেখক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সালেক খোকন বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজের প্রতিটি মুহূর্তে তৌফিক ভাই আমার পাশে ছায়ার মতো ছিলেন। অসময়ে দুঃসাহস দেখানোর যে সাহস তিনি শিখিয়ে গেছেন, তার বলেই আজ আমরা এই শূন্যতা জয় করার শক্তি পাই।”

বার্তা সম্পাদক রুহুল আমিন রানা বলেন, “আজ আমার থাকার কথা ছিল কীভাবে র‌্যাডিসন থেকে লাইভ হবে, সেই প্রস্তুতিতে। আর এখন তৌফিক ভাইকে এভাবে স্মরণ করতে হবে, এটা ভাবতেও পারি না।

“এখনো মনে হয়, এই বুঝি নিউজরুমে তৌফিক ভাই এলেন। তৌফিক ভাই আমাদের মাঝে থাকবেন। খবরের মধ্যেই আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।”

জ্যেষ্ঠ বার্তা সম্পাদক শাহ আলম বাবুল বলেন, “দ্বিতীয় দফায় এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে এসে আবিষ্কার করেছি, তৌফিক ভাই সামনে-পেছনে, ওপরে-নিচে সব জায়গায় থাকেন। এখন তিনি নেই, তবু আমার তা-ই মনে হয়। আমরা যা করতে পারি, তা হল তৌফিক ভাইয়ের দেখানো পথে এগিয়ে যাওয়া, তার মত করেই চিন্তা করা।”

স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর রাজীব নূর বলেন, গতবছর তৌফিক ইমরোজ খালিদীর পরিকল্পনায় বিডিনিউজের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংকলন ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ এর প্রকাশনার কাজ যখন শুরু হয়, তখন সময় মোটেও অনুকূল ছিল না। কিন্তু তৌফিক ইমরোজ খালিদী মনে করেছিলেন, সেই সময়েই কাজটি করা জরুরি।

“মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি তৌফিক ভাইয়ের দৃঢ় অবস্থান ছিল। তবে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন বস্তুনিষ্ঠতাকে। তার এই আদর্শ ধরে এগিয়ে যেতে পারলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সবচেয়ে পুরোনো সহকর্মীদের একজন লিটন হায়দার বলেন, তার শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কেটেছে ‘তৌফিক ভাইয়ের’ সান্নিধ্যে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে দেশের সাংবাদিকতা জগতের একজন ‘দিকপাল’ হিসেবে তুলে ধরে লিটন হায়দার বলেন, ‘তৌফিক ভাইকে’ নিয়ে তিনি গর্বিত। তার বিশ্বাস, বর্তমান সহকর্মীরা তাদের প্রয়াত প্রধান সম্পাদকের স্বপ্ন সারাজীবন ধারণ করে রাখবেন।

Image

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার ঘরোয়া আয়োজনে কেক কাটেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা; তাদের সঙ্গী হয়েছেন সাবেকরাও।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান প্রতিবেদক মাঈনুল আলম বলেন, “তৌফিক ভাইয়ের শূন্যতা পূরণ হওয়ার মত নয়। কিন্তু আমরা তার পথ ধরে এগিয়ে যাব, এটাই এখন আমাদের কাজ।”

তিনি বলেন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইতিহাস, কর্মপদ্ধতি ও সুনাম গড়ে তোলার পেছনে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বড় অবদান রয়েছে।

“তার মেধা ও অবদান অন্য কারও পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে প্রতিষ্ঠানের কাজ অব্যাহত রেখে সামনে এগিয়ে নেওয়াই হবে সহকর্মীদের দায়িত্ব।”

সহকর্মী আব্দুর রহিম হারমাছি বলেন, “বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০ বছর, আমার এখানে ১৫ বছর। সাড়ে চার বছর আমি ছিলাম না। তবু তৌফিক ভাইকে নানা আঙ্গিকে আবিষ্কার করেছি। আমি তৌফিক ভাইকে যতটা শ্রদ্ধা করতাম, তার চেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করত আমার ছেলে। আমার স্ত্রীও তা-ই করতেন। তৌফিক ভাই প্রতিটি কর্মীর পরিবারের অংশ ছিলেন।”

সহকর্মী মঈনুল হক চৌধুরী বলেন, “বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে এসে তৌফিক ভাইয়ের কাছ থেকেই শিখেছি, সঠিক ব্যক্তির কাছ থেকে সঠিক বক্তব্য নিতে পারলে সাংবাদিকতা অনেক সহজ হয়ে যায়।”

তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মত আনন্দের দিনে তৌফিক ভাইয়ের অনুপস্থিতি মেনে নেওয়া কঠিন। তিনি শুধু প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন না, সহকর্মীদের কাছে পরিবারের সদস্যের মত ছিলেন।”

সহকর্মী জেসমিন মলি বলেন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে যোগ দেওয়ার পর গণঅভ্যুত্থান ও সরকার পতনের সময় থেকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তির দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন তিনি। এসব প্রতিবেদন প্রকাশে তৌফিক ইমরোজ খালিদী তাকে আশ্বস্ত করেছেন, কখনো বাধা দেননি।

সাবেক সহকর্মী, আলোকচিত্র সাংবাদিক মাহমুদ জামান অভি বলেন, “তৌফিক ভাই আমাকে সবসময় বলতেন, ছবি আগে না, আগে নিজের সেফইটি। যখন যেখানেই ছবি তোলো না কেন, আগে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তারপরে তুমি ছবি তুলবে।”

সহকর্মী মাজহার সরকার বলেন, “তৌফিক ভাই নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতেন। তার উদ্যোগে কুয়াকাটা সফরে লঞ্চে ভাসমান নিউজরুমের ধারণা বাস্তবায়িত হয়েছিল। এখনো সংবাদ সম্পাদনার সময় সহকর্মীদের মনে হয়, কোনো খবর বা বাক্য তৌফিক ভাই কীভাবে দেখতেন।”

সহকর্মী আকিব জাভেদ বলেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদী তার প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকতার জন্য বহু প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু কখনো নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।

তিনি বলেন, ২০ বছর পূর্তি নিয়ে প্রধান সম্পাদক অনেক উচ্ছ্বসিত ছিলেন। তিনি হয়ত এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব সহকর্মীদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন।

সাবেক সহকর্মী শাহীনুল হুদা জুয়েল বলেন, “তৌফিক ভাইয়ের স্বপ্নকে সামনে এগিয়ে নিতে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আমরা হয়ত আরেকটি তৌফিক ইমরোজ খালিদী তৈরি করতে পারব না, তবে সবাই মিলে এক হয়ে কাজ করলে উনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা অসম্ভব কিছু নয়।"

সহকর্মী অনীক মিশকাত বলেন, “তৌফিক ভাই স্পোর্টস টিমের ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন, আমাদের প্রতি যে ভালোবাসা ছিল, সর্বোচ্চটুকু দিয়ে তা রক্ষা করার চেষ্টা করব। আমাদের টিম নিয়ে তার যে গর্ব ছিল, সেই গর্বে আমরা কোনো কালি পড়তে দেব না।”

জালাল উদ্দিন খাঁর গানের পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে সহকর্মী চন্দন কুমার সাহা বলেন, “হল যখন ছাড়াছাড়ি বাঁধতে এলাম বাসা বাড়ি।”

তিনি বলেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের দৈহিক বিচ্ছেদ হলেও তার রেখে যাওয়া দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়াই এখন তাদের কাজ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী যে ঘর নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

জালাল উদ্দিন খাঁর আরেকটি গানের পঙ্ক্তি, “জঙ্গল কেটে গেল রে ভাই হল না ভজন সাধন” উদ্ধৃত করে চন্দন বলেন, বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতা শুরু করার সময় তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে প্রায় শূন্য থেকে পথ তৈরি করতে হয়েছিল।”

সহকর্মী ওমর শরীফ বলেন, “নতুন কিছু করার বিষয়ে তৌফিক ভাইয়ের সবসময় আগ্রহ ছিল। জীবনের শেষ পর্যায়েও তিনি নতুন নতুন প্রকল্প নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করতেন।”

সহকর্মী ফাইজান সিদ্দিকী বলেন, “যে মানুষটার জন্য আমরা অপেক্ষা করতাম, তিনি কখন আসবেন, আমরা কেক কাটব, সেই মানুষটাই আর আসবেন না। গেট দিয়ে ঢুকে সবাইকে বলবেন, ‘কী, কেমন আছ?’—এই কথাটা আর কেউ বলবেন না। এটা মেনে নেওয়াই কষ্টের।”

সাবেক সহকর্মী, গ্রাফিক্স ডিজাইনার পিন্টো বিল্লাহ বলেন, “তৌফিক ভাই ছিলেন আমার সেরা ১০ ক্লায়েন্টের একজন। তিনি কী চান, তা খুব স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে পারতেন।”

সহকর্মী মোস্তাফিজ মামুন বলেন, “আমাদের এখন একটাই কাজ, তৌফিক ভাইয়ের কাজকে এগিয়ে নেওয়া। আমরা সবাই তার জন্য দোয়া করব।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক কর্মী রোহান জিয়াদ বলেন, তার আজকের অবস্থান ও পুরো ক্যারিয়ারের ভিত তৈরি হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠানেই; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম তার জন্য একটি বিদ্যাপীঠের মত এবং তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক।

“২০০৭ সাল থেকে আমি এখানে কাজ করেছি। তৌফিক ভাই নিউজরুমে যেসব দক্ষ সহকর্মীদের গড়ে তুলে রেখে গেছেন, তারাই তার নীতি ও আদর্শ বজায় রেখে এই প্রতিষ্ঠানকে সফলভাবে চালিয়ে নেবেন এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।”

সাবেক সহকর্মী পাভেল রহমান বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় তৌফিক ইমরোজ খালিদী একটি নতুন ধারার সূচনা করেছেন এবং নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পথচলা, এর পেছনের সংগ্রাম ও প্রতিবন্ধকতার ইতিহাস আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা জরুরি।

“বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাংবাদিকতা বিভাগ ও গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এবং এর সাংবাদিকতার ধারা নিয়ে এখন বিস্তর গবেষণা হওয়া উচিত।"

সাবেক কর্মী মাহবুবা ডিনা বলেন, “কাজের শুরুর দিনগুলোতে অনেক সংকট দেখেছি। তখন মনে হত, তৌফিক ভাই যদি একটু আপস করতেন! কিন্তু আজ মনে হয় তিনি নিজের জায়গায় একদম ঠিক ছিলেন। আর তার সেই নীতির কারণেই আজকে তার প্রতি এই শ্রদ্ধা। তিনি অন্যদের মত হলে হয়ত আজ আমরা এভাবে ছুটে আসতাম না।”