প্রিয় প্রাঙ্গণে শেষবার তৌফিক ইমরোজ খালিদী
“তার শেখানো সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা আমাদের রক্তে-মাংসে মিশে গেছে।”
বিমানবন্দরে নেমেই সরাসরি অফিসে আসবেন প্রধান সম্পাদক—এর আগে অনেকবারই এরকম হয়েছে। তবে এবারের যাত্রা একেবারেই ভিন্ন, মহাখালীর রেড ক্রিসেন্ট কনকর্ড টাওয়ারের নিচে এল তাকে বহনকারী গাড়ি; তবে তিনি ঢুকলেন না চিরচেনা নিউজরুমে। আর কখনও আসা হবে না প্রিয় এ প্রাঙ্গণেও।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রয়াত প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মরদেহ তার কর্মস্থলে পৌঁছায় শনিবার দুপুর ১২টায়। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শাহজালাল বিমানবন্দরে তার কফিন গ্রহণ করেন ভাতিজা তারাফ তাজিজ খালিদী ও ভাগনি-জামাই আকিফ আহমেদ।
সেখান থেকে সরাসরি তার মরদেহ নেওয়া হয় মহাখালীতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অফিস প্রাঙ্গণে। সেখানে প্রয়াতের সাবেক ও বর্তমান সহকর্মীরা তার প্রতি সম্মান জানান; তাকে বিদায় জানায় তার প্রিয় ‘নিউজরুম’।
সহকর্মীরা আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন। দুপুর ১২টার কিছু আগে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত এক্সিও গাড়ি নিয়ে অফিসের সামনে থামলেন গাড়ি চালক রিয়াজুল।
অনেকেই তাকিয়ে ছিলেন, তবে বরাবরের মতো গাড়ির পেছনের আসন থেকে হুড়মুড়িয়ে নেমে এলেন না প্রিয় প্রধান সম্পাদক। এর কিছু পরেই পেছনে বাজল লাশবাহী ভ্যানের সাইরেন।
ভ্যানের সামনে বরাবরের মতোই তৌফিক ইমরোজ খালিদীর দীর্ঘদিনের সঙ্গী ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আকিব জাভেদ আর সহকারী সুজন মিয়া। ‘স্যার’কে তারা শেষবারের মতো নিয়ে এলেন অফিসের আঙিনায়।
মরদেহ আসার পর আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অশ্রুসজল সহকর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে অফিসে এসেছিলেন সাবেক সহকর্মীদের অনেকে।
তাদের একজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ও দৈনিক আগামীর সময়’র নির্বাহী সম্পাদক এহসানুল হক বাবু বলেন, “তৌফিক ভাই শুধু আমাদের সম্পাদক ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক।
“তার মতো একজন মানুষকে এভাবে হারানো মেনে নেওয়া কঠিন। তার সঙ্গে কাজের স্মৃতি, সাংবাদিকতার প্রতি তার নিষ্ঠা এবং সহকর্মীদের প্রতি তার দায়িত্ববোধ সারাজীবন মনে থাকবে।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের চট্টগ্রাম ব্যুরো অফিসের সহকর্মী মোহাম্মদ ফারুক সকালে ঢাকায় এসে হাজির হন সম্পাদককে বিদায় জানাতে।
তিনি বলেন, “আমি ২০০৭ সাল থেকে এখানে আছি। মানুষের উপকারে, বিপদে-আপদে তিনি সবসময় পাশে থাকতেন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা খুবই মর্মাহত ও শোকাহত। আমরা সব সময় তার জন্য দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাকে বেহেশত নসিব করেন।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সহকর্মী কাজী সারাহ সাদীয়া নূর স্বর্ণ বলেন, “বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম মানেই তৌফিক ইমরোজ খালিদী। গত দুই দশক ধরে এই দুটি নাম সমান্তরালভাবে চলেছে। সেই নিজের, একান্ত প্রিয় প্রাঙ্গণে তিনি ফিরলেন কফিনবন্দি হয়ে। সহকর্মীরা তাকে ঘিরে ধরেছেন।
“তৌফিক ইমরোজ খালিদী, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদকের এমন ফেরা কেউ চাননি। কিন্তু তিনি এভাবেই ফিরেছেন, যা তার সহকর্মীদের জন্য মেনে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টকর, অসম্ভব।”
সাবেক সহকর্মী কামাল হোসেন তালুকদার বলেন, “২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিডিনিউজে কাজ করেছি। তৌফিক ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছি, অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়ার আগে ভালোভাবে জেনে যেতে হবে, সঠিক প্রশ্ন করতে হবে।
“রাষ্ট্রকে তোষামোদ করে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। তার শেখানো সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা আমাদের রক্তে-মাংসে মিশে গেছে।”
প্রয়াতের সহকর্মী শেখ আবু তালেব বলেন, “চিন্তার রাজ্যে সবসময় রাজত্ব করতেন তৌফিক ভাই। সব কিছুতেই নিজস্ব একটা নতুন চিন্তা শক্তি তুলে ধরার মত অনন্য সাংবাদিক তিনি। তৌফিক ভাইয়ের সান্নিধ্য পাওয়া, তার সঙ্গে কাজ করা বিরল সৌভাগ্য আমার।
“কখনো কল্পনাও করতে পারিনি—তাকে এই সময়ে হারাব। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না—তৌফিক ভাই নেই। কখনো কথা বলবেন না নিউজ নিয়ে, বলবেন না ‘আরো গভীরে যাও, বক্তব্যর জন্য কেউ ফোন না ধরলে তার অফিসে চলে যাবা’।”
চট্টগ্রাম ব্যুরোর মিঠুন চৌধুরী বলেন, “তৌফিক ইমরোজ খালিদী আমার সম্পাদক, আমাদের সম্পাদক। বাংলাদেশে অসংখ্য সংবাদকর্মীর অনুপ্রেরণার নাম তৌফিক ইমরোজ খালিদী। উনি আমাদের সর্বংসহা অভিভাবক।
“আমাদের সর্বাধিনায়ক উনার অকাল প্রয়াণে আমরা অভিভাবক হারা হলাম। বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগৎ হারাল একজন পথ প্রদর্শককে। আপনাকে চিরদিন মনে রাখব।”
বিডিনিউজ কার্যালয় যে ভবনে অবস্থিত, সেই রেড ক্রিসেন্ট কনকর্ড টাওয়ারের নিরাপত্তা কর্মী জবান আলীরও চোখ ছলছল।
তিনি বললেন, “তৌফিক সাহেব খুব ভালো লোক ছিলেন। আমাদের সাথে খুব ভালো ব্যবহার করতেন। উনার জন্য দোয়া করি। আল্লাহ উনাকে জান্নাত নসিব করুন।”
২০ মিনিটের মতো অফিসের প্রাঙ্গণে থেকে তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে বহনকারী ফ্রিজার ভ্যানটি তার বাসার দিকে চলে যায়।
এরপর দুপুর ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত তার মরদেহ রাখা হবে বনানীর ওল্ড ডিওএইচএস খেলার মাঠে। বন্ধু, স্বজন, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ীসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিরা সেখানে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন। বেলা ৩টায় সেখানেই তার জানাজা হবে।
পরে বিকাল ৫টায় মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত হবেন সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকা তৌফিক ইমরোজ খালিদী গত ১ অক্টোবর রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক জানান, তার মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ হয়েছে। পরদিন স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এরপর ৮ অক্টোবর জোহরের নামাজের পর পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেইন মসজিদে খালিদীর জানাজা হয়। সেখানে সাবেক সহকর্মী এবং স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।
শনিবার বেলা ১১টার দিকে বিমান বাংলাদেশের একটি ফ্লাইটে সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মরদেহ ঢাকায় পৌঁছায়।
